Home Blog Dr Firoz Mahboob Kamal সংঘাত ও ঐতিহাসিক সম্ভাবনার পথে বাংলাদেশ

eBooks

Latest Comments

সংঘাত ও ঐতিহাসিক সম্ভাবনার পথে বাংলাদেশ PDF Print E-mail
Dr Firoz Mahboob Kamal
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 02 November 2008 19:19
বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির সমগ্র ময়দান জুড়ে চলছে সংঘাত। সে সংঘাত নিছক সভা-সমাবেশ, লেখা-লেখি ও রাজনৈতিক দলাদলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, নির্মম হত্যাকান্ডও ঘটাচ্ছে। দেশের সেকুলার পক্ষটি এ হত্যাকান্ডকে আরো তীব্রতর ও রক্তাত্ব করতে চায়। তারা দাবী তুলেছে, একাত্তরের ন্যায় আরেকটি যুদ্ধের। অভিন্ন দেশ, অভিন্ন ভাষা, অভিন্ন খাদ্য-পানীয় ও জলবায়ুর দেশ বাংলাদেশ। জনসংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশী মুসলমান। খোলাফায়ে রাশেদার আমলেও মুসলমানগণ মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগ ছিল না। নানা ভিন্নতায় ভরপুর প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের বহু দেশ। প্রশ্ন হল, এতটা অভিন্নতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে কেন এ বিরামহীন সংঘাত? কারণ একটিই| ভাষা, বর্ণ ও পোষাকপরিচ্ছদে এক হলেও এক নয় চেতনা, জীবনবোধ ও দর্শন।

আর সকল বিতর্ক ও সংঘাতের শুরুতো এ ভিন্ন জীবনবোধ বা দর্শন থেকেই।
নবীপাক (সাঃ)এর যুগে আরবদের ভাষা, বর্ণ ও পোষাক-পরিচ্ছদে কোন পার্থক্য ছিল না। অথচ সেখানে রক্তক্ষয়ী প্রচন্ড যুদ্ধ হয়েছে বার বার। সে যুদ্ধেরও কারণ ছিল দুটি ভিন্ন চেতনা ও ভিন্ন দর্শন। একটি হল ইসলাম, অপরটি জাহেলিয়াত বা অজ্ঞতা। একদল চেয়েছিল আল্লাহর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার নির্মাণ। আরেকদল চেয়েছিল আদিম অজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত আরবের সমাজ ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ। কোন পক্ষই নিজ নিজ অভিষ্ট লক্ষ থেকে এক পা পিছু হটতে রাজী ছিল না। কোন সমাজে যখন এমন দুটি আপোষহীন প্রতিপক্ষ জন্ম নেয় সে সমাজে সংঘাত তো অনিবার্য। তখন ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে এবং পিতা পুত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে। তাই এ সংঘাত নিছক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনা বা নামায-রোযার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সীমাবদ্ধ ছিল না নিছক মুর্তি গড়া বা ভাঙ্গার মধ্যেও। বরং সে সংঘাত প্রবেশ করেছিল সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির প্রতিটি অঙ্গণে। সে সংঘাতে সেদিন বিজয়ী হয়েছিল ইসলামের পক্ষের শক্তি। তাদের সে বিজয়ে আরব থেকে যে শুধু মুর্তি ও মুর্তিপুজা অপসারীত হয়েছিল তাই নয়, অপসারিত হয়েছিল মদ্যপান, উলঙ্গতা, ব্যাভিচার, সূদ, সন্ত্রাস, অপসংস্কৃতি, অপ-সাহিত্যসহ সকল প্রকার মিথ্যাচার ও দুর্বৃত্তি। ইসলামের সে বিজয়ে ন্যায়, সুবিচার ও পবিত্রতা নেমে এসেছিল শুধু আরব ভূমিতেই নয়, ইরান, মিশর, তুরস্ক, আফগানিস্তান, মধ্য-এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা, স্পেনসহ বিশ্বের বিশাল ভূ-ভাগে। ইসলামের বিজয়ে সেদিন মহাকল্যাণ ঘটেছিল মানব জাতির। বাংলাদেশের মানুষের বড় দুর্ভাগ্য যে দেশটিতে ইসলামের একটি পরিপূর্ণ বিজয় কোন কালেই ঘটেনি। শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ ইসলাম কবুল করলেও দেশটির রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, আইন-আদালত, বুদ্ধিবৃত্তিতে ইসলাম কোন কালেই বিজয়ী শক্তি রূপে আবির্ভূত হয়নি। আসেনি বুদ্ধিবৃত্তিক কোন আমূল বিপ্লব। তবে এর কারণও ছিল। দেশটি বিজিত হয়েছিল তুর্কি মুসলমানদের হাতে। তাদের নিজেদেরই ইসলামের বহু মৌলিক বিষয় অজানা ছিল। তাদের অনেকেই মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছিল আব্বাসীয় খলিফাদের কৃতদাস হিসাবে। তাদের বাহাদুরী ছিল শুধু রণাঙ্গণে। ফলে তুর্কিদের হাতে বিস্তুর সাম্রাজ্য বিস্তার হলেও, ইসলামী জ্ঞানের বিস্তার বা উন্নয়ন ঘটেনি। শাসক মুর্খ বা জ্ঞানবিমুখ হওয়ায় বাংলাদেশে জ্ঞানার্জনের ন্যায় ফরয ইবাদতটি যথার্থ ভাবে পালিত হয়নি। গুরুত্বও পায়নি। ফলে ইসলামের বহু মৌলিক বিষয়ই বাংলাদেশীদের অজানা থেকে গেছে। এবং সেটি শত শত বছর ধরে। জনসংখা বিচারে আরব ও ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানদের পরই তাদের স্থান। দেশটিতে ইসলামের ইতিহাস ৮ শত বছরের। অথচ মাত্র শত বছর আগেও বাংলায় ইসলামি বই বলতে বুঝানো হত মীর মোশররফের লেখা “বিষাদ সিন্ধু” বা কিছু প্রাচীন পুঁথি সাহিত্য। কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদ হয়েছে গিরিশ চন্দ্র নামক একজন হিন্দুর হাতে। সেটিও উনবিংশ শতাব্দীতে। এটি কি কম ব্যর্থতা? দেশবাসীর আরেক দুর্ভাগ্য, একটি উপনিবেশিক কাফের শক্তির গোলামী করেছে ১৯০ বছর ধরে। সমগ্র মুসলিম জাতির ইতিহাসে এমন ঘটনা দ্বিতীয়টি নেই। নিজদেশে সংখাগরিষ্ঠ অন্য কোন মুসলিম জনগোষ্ঠী এত দীর্ঘকাল কোন অমুসলিম শাসকের গোলামী করেনি। বাঙ্গালী মুসলমানদের সে গোলামী শুরু হয়েছিল ১৭৫৭ সালে। উত্তর-ভারত, মহিশূর ও পাঞ্জাবের মুসলমানদের জীবনে সেটি শুরু হয়েছিল এর প্রায় একশত বছর পর। ইরাকে ও ফিলিস্তিনে শুরু হয়েছিল ১৯১৭ সালে। মুসলিম বিশ্বে উপনেবিশীক কাফের শাসনের শুরু মূলতঃ এ বাংলা থেকেই। মুসলিম উম্মাহর ভিতরে ঢুকতে শত্রুরা সবসময়ই দুর্বল স্থানটি খুঁজেছে। আর সেদিন দুর্বল গণ্য হয়েছিল বাংলাদেশ। বাংলা জয়ের ফলেই শত্রুর পক্ষে দিল্লি-বিজয় সহজ হয়ে যায়। মুসলমান হওয়ার অর্থ শুধু এ নয়, সে শুধু মসজিদ পূর্ণ করবে। জ্বিহাদের ময়দানও তাকে পূর্ণ করতে হয়। আর অতি গুরুত্বপূর্ণ জ্বিহাদ হল, মুসলিম ভূমিতে কাফেরী হামলার প্রতিরোধ। এ লক্ষ্যে শক্তিসঞ্চয় করা ও রণাঙ্গণে নামা মুসলমানের উপর ফরয। পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে,

“ওয়াআয়িদ্দুলাহুম মাআস্তাতা’তুম মিন কুউয়া” অর্থঃ “এবং তাদের (শত্রুর) বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সম্ভাব্য সর্বশক্তি দিয়ে প্রস্তুত হও।” –(সুরা আনফাল আয়াত ৬০)।

পবিত্র এ আয়াতের অর্থ দাঁড়ালো, যেখানেই শত্রুর হামলার সামান্যতম সম্ভাবনা আছে সেখানেই সর্বশক্তি দিয়ে প্রস্তুতিও থাকতে হবে। একাজ শুধু বেতনভোগী সেপাইয়ের নয়। প্রতিটি মুসলমানের। হামলার মুখে অপ্রস্তুত থাকাটিই হল, আল্লাহর এ নির্দেশের অবাধ্যতা। এমন অবাধ্যতা শুধু পরাজয়ই নয়, আযাবও ডেকে আনে। ইহুদীদের সে অবাধ্যতা তাদের অপমান বাড়িয়েছে দেশে দেশে। তাই নবীজী (সাঃ)র আমলে জ্বিহাদে ময়দানে নামেননি এমন কোন সাহাবী খুঁজে পাওয়া যাবে না। নেমেছেন নবীজী (সাঃ) স্বয়ং। আফগানিস্তানে ও ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ যুদ্ধের মুল দার্শনিক ভিত্তি তো এটিই। কিন্তু মার্কিনীরা ও তাদের সেকুলার মিত্ররা মুসলমানদেরকে সে কোরআনী দর্শন ও নির্দেশ থেকে দূরে হটাতে চায়। অতীতে ব্রিটিশেরাও সেটি করেছিল। জ্বিহাদের নির্দেশ ভূলিয়ে দিতে তারা গোলাম আহম্মদ কাদিয়ানীর ন্যায় ভন্ড ধর্মপ্রচারকের জন্ম দিয়েছিল। ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতার সুরক্ষার দায়িত্ব নবাব সিরাজ-উদ্দৌলার একার ছিল না। তাই পরাজয়ের দায়ভার শুধু মীর জাফর ও তার সহযোগীদের ঘাড়ে চাপালে সুবিচার হয়না। মুসলমান নাগরিকগণই বা কোন দায়িত্বটি পালন করেছে? মীর জাফর তো প্রতিদেশেই থাকে। আফগানিস্তানে ও ইরাকে এরাই কাফের বাহিনীর সাথে সহযোগিতা করছে। কিন্তু দেশদুটির ধর্মপ্রাণ মানুষ কি সেটি মেনে নিয়েছে? তারা তো নেমেছে প্রতিরোধে। এসব জ্বিহাদী মুসলমানেরাই তো আফগানিস্তানে পরাজিত করেছিল এককালের বিশ্বশক্তি রাশিয়াকে। কয়েকবার পরাজিত করেছে হানাদার ব্রিটিশদের। কিন্তু ১৭৫৭ সালে বাংলাদেশে সেটি হয়নি। সিংহকে বছরের পর বছর চিড়িয়াখানায় রাখার পর ছেড়ে দিলে স্বাধীন শিকার ধরারও যোগ্যতা হারায়। তখন রুচী লোপ পায় স্বাধীন জীবনের। দরজা খুলে দিলেও তখন সে ঘর থেকে বের হয় না। তেমন অবস্থা দীর্ঘকাল গোলামী জীবনে অভ্যস্থ্ একটি জাতিরও। তখন বেড়ে উঠে ভিখারী-সুলভ মানসিকতা। সত্তরের দশকে বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক ভিক্ষার ঝুলির খেতাব পেয়েছিল সেটির কারণ নিছক দুর্ভিক্ষ ছিল না, ছিল গোলামী মানসিকতাও। উপনেবেশিক শাসনের এটিই বড় কুফল। বিদেশী অধীনতা থেকে মূক্তিপ্রাপ্ত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি এখনও তাই সাহায্য-নির্ভর তথা পর-নির্ভর। ১৯০ বছরের গোলামীর কারণে তেমন একটি পর-নির্ভর অবস্থা অতিশয় তীব্রতর হল বাংলাদেশে। সেটি শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষ্রেত্রে নয়, আদর্শিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রেও। এরূপ গোলামীর অবস্থার কারণেই দেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থা দেখা দিলেই রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা ধর্ণা দেয় বিদেশী দূতাবাসে। ২০০৭ সালে জন্ম নেওয়া কেয়ার টেকার সরকার হল মূলতঃ ছিল তাদেরই ফসল। কোন স্বাধীন দেশে কি এটি সম্ভব? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স বা জার্মানী কি একটি দিনের জন্যও এমন বিদেশী হস্তক্ষেপ মেনে নিবে? বাংলাদেশের বহু বিষয় নিয়েই বহু বিতর্ক। তবে যা নিয়ে কোন বিতর্ক নেই তা হল, দেশটিতে প্রবল ভাবে বিজয়ী হল, ইসলামের বিপক্ষ শক্তি। দেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিসহ তাদের দখলে গেছে আইন-আদালত, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ময়দানও। মুসলমানদের জন্য এটি শুধু রাজনৈতিক পরাজয় নয়, আদর্শিক ও চেতনাগত বিপর্যয়ও। ইসলামের বিপক্ষ শক্তিটির দীর্ঘকালব্যাপী বিজয়ের ফলে দেশটিতে ব্যাভিচার যেমন বৈধ কর্ম, তেমনি বৈধ হল সূদ, মদ্যপাণ এবং সিনেমা, নাটক ও নাচের নামে উলঙ্গতা ও অশ্লিলতা। ইসলাম পরিণত হয়েছে একটি পরাজিত জীবন-দর্শনে। অতিশয় জড়সড় হয়ে টিকে আছে মসজিদে। মূর্তি-নির্মাণের ন্যায় হারাম কাজও গণ্য হচ্ছে সাংস্কৃতিক কর্মরূপে। সে হারাম কর্মটি বাঙালী মুসলমানের সাংস্কৃতিক কর্মরূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ঢাকা বিমান-বন্দরের সামনে প্রধান সড়কের উপর লালন শাহের মুর্তি স্থাপনের মধ্য দিয়ে। সেটি অপসারিত হয়েছে। কিন্তু সে হারাম কাজটির সমর্থণে কলম ধরেছে দেশের সেকুলার বুদ্ধিজীবীরা। মুসলমান নামধারি অনেকে মুর্তি-নির্মান ও মুর্তি-স্থাপনের পক্ষে রাজপথে মিছিলেও নেমেছে। অনেকে এটিকে ইসলাম-সম্মত করারও চেষ্টা করেছে। অথচ তাদের এ বোধটুকুও নেই, মুর্তি-নির্মান ধর্মীয় বৈধতা পেলে সবচেয়ে বেশী মুর্তি নির্মিত হত মক্কা-মদিনায়। কারণ মুসলিম ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষদের সিংহভাগ জন্ম নিয়েছে তো সেখানে। ইসলামে মুর্তি নির্মান হারাম। এ বিষয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে নবীজী(সাঃ)র হাদীসঃ “বিচারের দিন ঐ সব লোকেরা সর্বাপেক্ষা তিরস্কারের পাত্র হবে যারা আল্লাহর সৃষ্টির অনুসরণে জীবজন্তু প্রস্তুত করবে তথা মুর্তি গড়বে।” -সহীহ আল-বোখারী। ফলে মূর্তিগড়া ইসলাম সম্মত হয় কি করে? মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দরতম সভ্যতর জন্ম দিয়েছে ইসলাম। কিন্তু কোথাও কি নির্মিত হয়েছে মুর্তি? ভারতবর্ষে দীর্ঘ ৮ শত বছর মুসলিম শাসনে বহু মিনার, বহু স্মৃতী সৌধ নির্মিত হয়েছে। নির্মিত হয়েছে তাজমহল। কিন্তু কোন মুর্তিও কি মুসলমানদের হাতে নির্মিত হয়েছে? মুর্তি নির্মিত হয়েছে কি উমাইয়া ও আব্বাসী আমলে? দেহে ব্যাধী বাড়লে জ্বরও বাড়ে। তখন ওজন কমে, ক্ষুধাও কমে যায়। দৈহীক অসুস্থ্যতার এগুলো লক্ষণ। তেমনটি ঘটে চেতনা-রাজ্যে বা ঈমানে রোগ ধরলে। ব্যক্তির রোগাগ্রস্ত চেতনা বা ঈমানহীনতার লক্ষণ হল, সে শুধু সূদ-ঘুষই খায় না, বা শুধু ব্যাভিচারিতেই নামে নামে না, বরং মুর্তি গড়া ও সেটির স্থাপনেও আগ্রহ দেখায়। একটি রাষ্ট্রে কতজন বেঈমান মানুষের বাস সেটির পরিমাপটি যে শুধু সেদেশের সুদী বাংক, পতিতাপল্লি বা মদের দোকানের সংখ্যা থেকে ধরা পড়ে তা নয়, ধরা পড়ে কতটা মুর্তি নির্মিত হল সেটি দেখেও। ইরানের বাদশাহ রেজা শাহের সেকুলার শাসনামলে বহু মুর্তি গড়া হয়েছিল। তুরস্কে মুর্তি গড়া হয়েছিল কামাল পাশা ও তার অনুসারিদের শাসনামলে। জামাল আব্দুন নাসেরের শাসনামালে মুর্তি নির্মিত হযেছিল মিশরে। চিন্তাচেতনায় এরা সবাই ছিল সেকুলার তথা ইসলামশূণ্য। আল্লাহর বিধানের অবাধ্যতাই ছিল তাদের রাজনীতি। এভাবে আল্লাহর অবাধ্যতা যেখানেই বিজয়ী হয়েছে, সেখানে মুর্তি-গড়ারও রেওয়াজ বেড়েছে। কথা হল, এসব পথভ্রষ্ট-পাপীদের পাপকর্ম কেন মুসলমানদের কাছে অনুসরণীয় হবে। অথচ বাংলাদেশে মুর্তিগড়া জায়েজ করতে গিয়ে কেউ কেউ সে নজিরও হাজির করেছেন। বাংলাদেশে মুসলমান নামধারি সেকুলারদের চেতনা রাজ্যে আল্লাহর অবাধ্যতা যে কতটা ব্যাপক ভাবে বেড়েছে সেটি বুঝা যায় মুর্তি নির্মানের পক্ষে তাদের এরূপ বক্তব্য ও বিপুল আয়োজন দেখে। দেশ যে কত দ্রুততার সাথে ভ্রষ্টতার পথে এগুচ্ছে এসব হল তার প্রমাণ। ইসলামের মূল কথা, আল্লাহ ও তার বিধানের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। যার শাশ্বত মডেল হযরত ইব্রাহীম(আঃ)।আল্লাহর পক্ষ থেকে যখনই যে হুকুম এসেছে তখনই তিনি সে হুকুমের প্রতি “লাব্বায়েক” তথা “আমি হাজির” বলেছেন। এমনকি নিজ সন্তানের কোরবানীতেও। মুসলমান শব্দটিও তাঁর দেওয়া। মুসলমানের জীবনে সে আনুগত্যের প্রতিফলন ঘটাতে হয় শুধু নামায-রোযায় নয়, তার প্রতিটি আচরণ, কাজকর্ম ও সংস্কৃতিতে। এক্ষেত্রে সামান্যতম অবাধ্যততাই হল পথভ্রষ্টতা বা কুফরি। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানদের জীবনে সে আনুগত্য কতটুকু? পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছেঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যখন কোন বিষয়ে হুকুম এসে যায় তখন কোন পুরুষ বা মহিলা ঈমানদারের আর কোন অধিকার থাকে না যে সে হুকুমের অবাধ্য হবে। এবং যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশাবলীর অবাধ্য হল তারাই পথভ্রষ্ট হল সুস্পষ্ট ভ্রষ্টতার দিকে।”-(সুরা আল-আহযাব, আয়াত ৩৬)। এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকটি হল, যে বিষয়ে মহান আল্লাহর সুস্পষ্ট বিধান এসে গেছে সে বিষয়ে মত প্রকাশ বা গ্রহণ-বর্জন নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে মুসলমানের কাজ হল সেটি পালন করা। নইলে সে শামিল হয় সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টদের দলে। বাংলাদেশ মসজিদ-মাদ্রাসার দেশ। গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে ব্যাপক ভাবে পঠিত হয় পবিত্র কোরআন। কিন্তু প্রশ্ন হল, মহান আল্লাহতায়ালার এ কোরআনী ঘোষণা কি এসব লক্ষ লক্ষ পাঠকদের নজরে পড়েনি? আর পড়লে তা থেকে তারা শিক্ষাটি কি পেল? শিক্ষা পেলে তার বাস্তবায়নই বা কোথায়? সূদ, ঘুষ, ব্যাভিচার, মদ্যপাণ ইসলামে হারাম। এব্যাপারে সুস্পষ্ট ঘোষণা এসেছে মহান আল্লাহর। কিন্তু সে নির্দেশের পরও বাংলাদেশে সেগুলি অবাধে চলছে। এসব পাপকর্ম সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রহরাও পাচ্ছে। মুসলমান পুলিশ পতিতাপল্লি পাহারা দিবে, ব্যাংকে বসে রোযাদার সূদের হিসাব কষবে -নবীজী(সাঃ)র আমলে কি এগূলি ভাবা যেত? এগুলি তো আল্লাহর সুস্পষ্ট অবাধ্যতা। আল্লাহর অবাধ্য বা পথভ্রষ্ট হওয়ার জন্য কি প্রয়োজন পড়ে মুর্তিপুজারী হওয়ার? অবাধ্য বা পথভ্রষ্ট হওয়ার জন্য তো শুধু এটুকুই যথেষ্ট, কোন বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণা আসার পরও সে সেটির অমান্য করল। উপরের আয়াতে তো সেটিই বলা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে সেটিই অহরহ হচ্ছে। সূদীব্যাংক, পতিতাপল্লি, আদালতে বৃটিশ-আইন, সরকারি উদ্যোগে মদের দোকান –এসব তো আল্লাহর অবাধ্যতারই প্রতীক। এখন আবার দাবী উঠেছে রাস্তায় রাস্তায় মুর্তি নির্মানের। যে কোন ব্যক্তির সামনে রাস্তা মাত্র দুটি। একটি আল্লাহর, অপরটি গায়রুল্লাহর।হয় সে আল্লাহর আনুগত্যকে মেনে নিবে। নতুবা শয়তানের|।ব্যক্তির ন্যায় রাষ্ট্রের সামনেও এ দুটি রাস্তা ভিন্ন তৃতীয় রাস্তা নেই। কিন্তু বাংলাদেশের প্রশাসন ব্রিটিশ আমল থেকেই শয়তানের তথা গায়রুল্লাহর পথ অনুসরণ করে আসছে। ব্রিটিশেরা বিদায় নিয়েছে, কিন্তু তাদের গড়া আল্লাহর অবাধ্যতার পথে পরিবর্তন আনা হয়নি। এজন্যই বাংলাদেশে আইন-সিদ্ধ হল পতিতাবৃত্তির ন্যায় জ্বিনা বা ব্যাভিচার। এমন পাপও স্বীকৃতি ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে একটি পেশা রূপে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে সূদী কায়কারবার। বাংলাদেশ মুসলিম রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিতি পেলেও সে মুসলিম চরিত্র পায়নি। কোন ধর্মপ্রাণ মুসলমান কি এ অবস্থা মেনে নিতে পারে? ফলে সংঘাত শুধু ঢাকার রাস্তা থেকে মুর্তি সরানো নিয়ে নয়। লড়াইয়ের কারণ আরো গভীরে। সেটি হল, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্র থেকে আল্লাহর অবাধ্যতা নির্মূল করা। দেশের ৯০% ভাগ মুসলমানের উপর এটিই হল সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে অবহেলা হলে সারা জীবন নামায পড়েও কি লাভ হবে? আব্দুল্লাহ বিন উবাই ঘুষখোর-সূদখোরের বাড়ীতে মিলাদ পড়ায় এমন কোন ধর্ম ব্যবসায়ীর পিছনে নামায পড়েনি। নামায পড়েছিল মহান নবীজী(সাঃ)র পিছনে। কিন্তু সে নামায তাকে মুনাফিক হওয়া থেকে বাঁচাতে পারেনি। তার অপরাধ, ইসলামের বিজয়ের বদলে সে আত্মনিয়োগ করেছিল ইসলামের পরাজয়ে। জোট বেঁধেছিল মক্কার কাফেরদের সাথে। আজও সেরূপ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বাংলাদেশের বহু রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কমকর্তা, বুদ্ধিজীবী ও এনজিও প্রধান। এমনকি তাদের সাথে জড়িত ধর্মের লেবাসধারি বহু ধর্মব্যবসায়ীও। এরাই সম্মিলিত ভাবে টিকিয়ে রেখেছে বাংলাদেশের ইসলামবিরোধী চরিত্র। এবং ভবিষ্যতেও সে চরিত্রকে অক্ষুণ্ন রাখতে রায়। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বলতে তারা ইসলাম-বিরোধী চরিত্রের এ অক্ষুন্নতাকেই বুঝায়। এবং পরিবর্তনের যে কোন উদৌগকেই বলছে মৌলবাদ। এ কাজে তারা বিপুল সাহায্য পাচ্ছে কাফের রাষ্ট্রগুলো থেকে। এ লড়াই কে বলছে মৌলবাদী ইসলাম ঠেকানোর লড়াই। আসলে এটি হল, ইসলামের মৌলিক শিক্ষা তথা আল্লাহর বিধান প্রতিহত করার লড়াই। ইসলামের বিরুদ্ধে এটি আরেক ক্রসেড্ বা ধর্মযুদ্ধ। এবং এ যুদ্ধ চলছে হয়েছে বিশ্বব্যাপী। ইসলামের বিজয় রুখতে একমাত্র বাংলাদেশেই শত শত কোটি টাকা আসছে বিদেশী রাষ্ট্র থেকে। কোন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি কি তার নিজ বিশ্বাসের পরাজয়ের এ রাজনীতিতে জড়িত হতে পারে? বরং তার লড়াই তো হবে এমন ইসলামের বিজয়ে|। আল্লাহর কাছে মুসলমান রূপে স্বীকৃতি পেতে হলে ইসলামের বিজয়ের এ লড়ায়ে যোগ দেওয়া ছাড়া অন্য পথ আছে কি? মুসলমান কোন বিদেশী শক্তির মন জুগাতে রাজনীতি করে না। তার রাজনীতির লক্ষ্য তো একমাত্র আল্লাহকে খুশি করা। এবং আল্লাহকে খুশি করার মাধ্যমে জান্নাত-প্রাপ্তীকে সুনিশ্চিত করা। তবে অতি পরাজিত-দশা দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানের। নিজ দেশে ইসলামের পরাজয়ও তারা নীরবে মেনে নিয়েছে। যেন কিছু করার নেই, সে পরাজয় রোধের সামর্থও যেন তাদের নেই। ইসলামি সংগঠনের বহু নেতা তো প্রতিযোগীতায় নেমেছে কি করে মার্কিনীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া যায়। তাদের অনেকে জ্বিহাদমূক্ত ইসলামের আবিস্কার নিয়ে ব্যস্ত। কথা হল, কোন দিক দিয়ে কি তারা নবীজীর (সাঃ)আমলের মুসলমানের চেয়েও দরিদ্র ও অক্ষম? নবীজী (সাঃ)ও তাঁর সাথীদেরকে তিন বছর অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে থাকতে হয়েছে। অনাহারে ও অর্থাভাবে দিনের পর দিন তাঁদেরকে গাছের পাতা খেতে হয়েছে। বাংলাদেশের মুসলমানদের জীবনে আজ তেমন খাদ্যভাব ও অর্থাভাব আছে কি? ফলে কোথায় সে অক্ষমতা? পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,

“তোমাদের আয়োজন বা প্রস্তুতি কম হোক অথবা বেশী হোক, বেরিয়ে পর আল্লাহর রাস্তায় এবং জ্বিহাদ কর নিজেদের মাল ও জান দিয়ে। এটিই তোমাদের জন্য অতি কল্যাণকর যদি তোমরা সেটি বুঝতে পার।” –(সুরা তাওবাহ, আয়াত ৪১)।

বাংলাদেশে ১৪ কোটির বেশি মুসলমান। নবীজী (সাঃ)র আমলে বাংলাদেশের একটি জেলার অর্ধেকের সমান মুসলিম জনসংখ্যা ছিল না। এত লক্ষ লক্ষ মসজিদ, হাজার হাজার মাদ্রাসা, কোটি কোটি মুসল্লি এমনকি খোলাফায়ে রাশেদার আমলেও ছিল না। অথচ সে সীমিত সামর্থ নিয়ে সে আমলের মুসলমানগণ একমাত্র নবীজীর আমলেই ৫০ বারের বেশী জ্বিহাদে নেমেছেন। অথচ বাংলাদেশের মুসলমানেরা বিগত ৮০০ বছরের মুসলিম ইতিহাসে ক’বার নেমেছে? ফলে যা হবার তাই হয়েছে। ইসলামের পরাজিতদশা সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস জুড়ে। শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও দোয়া-দরুদে কি বিজয় অর্জিত হয়? বিজয় অর্জনের এটি কি সূন্নতি তরিকা? এত মুসলমান, এত মসজিদ, এত মাদ্রাসা ও এত ইসলামি প্রতিষ্ঠান তৈরীর হওয়ার পরও কি বলতেই থাকবে, এখনও তাদের সে সামর্থ সৃষ্টি হয়নি? তবে সে সামর্থ কি সৃষ্টি হবে ইসলামের জেগে উঠার শক্তি পুরাপুরি বিলুপ্ত হওয়ার পর? এমন নীতি বহু কাল চললে তাতে কি বেঁচে থাকে মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের আগ্রহ? বাংলাদেশে ইসলামের আজ যে পরাজয়, ইসলামের শত্রুপক্ষটি সেটিকেই একটি স্থায়ী রূপ দিতে চায়। দেশ তাই এগুচ্ছে একটি নিশ্চিত আত্মসমর্পনের দিকে। শুধু বর্তমান সরকার ও তার বিদেশী প্রভুগণই নয়, বাংলাদেশের সেকুলার দলগুলিও সেটিই চায়। এরূপ একটি পরাজিত ও আত্মসমর্পিত অবস্থা থেকে যারাই বিজয়ের পথ খুঁজে তাদেরকেই মৌলবাদী বলা হচ্ছে। অনেকের কাছে তারা হত্যাযোগ্যও গণ্য হচ্ছে। যাদের ঈমান আছে, এবং আছে সর্বশক্তিময় রাব্বুল আ’লামীনের কাছে আত্মসমর্পণের আগ্রহ, এমন একটি পরাজিত ও আত্মসমর্পিত অবস্থা কি তারা মেনে নিতে পারে? পারে না বলেই বেড়ে উঠছে সংঘাত। বাংলাদেশে অসংখ্য মীর জাফর আছে। তবে দেশটিতে অসংখ্য ঈমানদারও আছে। তাই এটি আর এখন ১৭৫৭ সাল নয়। ফলে কিছু মীর জাফরদের কারণে বীনা লড়ায়েই আত্মসমর্পণ ঘটবে, সে সম্ভাবনা এখন কম। এমন ঈমানদারদের কারণে এ সংঘাতটি নিছক কোন ভোট-যুদ্ধ নয়। নিছক ক্ষমতা দখলের লড়াইও নয়। বরং তার চেয়ে এটি অতি গুরুতর। তাই আজকের যে অস্থিরতা ও সংঘাত সেটি এক গুরুতর সংঘাতের শুরু মাত্র, শেষ নয়। যে সংঘাতের গুরুতর রক্তাক্ষরণে বিলুপ্ত হয়েছে সোভিয়েত রাশিয়া এবং ডুবু ডুবু অবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, সে সংঘাতই নির্মূল করবে বাংলাদেশের ইসলামের শত্রুপক্ষের। বাংলাদেশে ইসলামের ৮০০ বছরের ইতিহাসে এটিই হবে দেশটির সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধরণের গুণগত পরিবর্তন। ০১/১১/০৮
 

Add comment


Security code
Refresh