Home EBooks দুই পলাশী দুই মীরজাফর অধ্যায় ৯: পাকিস্তান প্রস্তাব ও মুসলমানদের নবযাত্রা

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ৯: পাকিস্তান প্রস্তাব ও মুসলমানদের নবযাত্রা Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:19

পাকিস্তান প্রস্তাব ও মুসলমানদের নবযাত্রা

হিন্দুদের বৈরিতা ও সংঘাতপূর্ণ ঘটনা প্রবাহের মধ্যে মুসলমানদের চেতনায় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই ঐক্যবদ্ধ চেতনাই ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ পাকিস্তান প্রস্তাব হিসেবে প্রকাশ পায়। লাহোরে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় মুসলিম সম্মেলনে শেরে বাংলা ফজলুল হক এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবের তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয় : ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী সীমানা সুসামঞ্জস্য করে এ সকল অঞ্চল এমনভাবে নির্দিষ্ট করতে হবে যাতে ভারতের উত্তর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের যে সকল স্থানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সেই সকল অঞ্চলসমূহকে যেন স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করা যায় এবং এই রাষ্ট্র গঠনকারী অংশসমূহ স্বায়ত্ব শাসিত ও সার্বভৌম হবে।

কংগ্রেসের দাবী ছিল প্রথমত কংগ্রেসই ভারতবাসীর একমাত্র প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান দ্বিতীয়ত স্বাধীন ভারত হবে অখন্ড। কংগ্রেসের এই দাবীকে মুসলিম লীগ চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চাইল মুসলমান ভারতের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান মুসলিম লীগ। ডিপি মেনন লিখেছেন- ‘মুসলিম লীগ ইতিপূর্বে ঘোষণা করেছিল যে, পাকিস্তানের প্রশ্নে এবং মুসলিম লীগই যে মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান এই দাবীতে তারা নির্বাচনী সংগ্রামে অবতীর্ণ হচ্ছেন, জিন্নাহ ও লীগের অন্য মুখপাত্রগণ ঘোষণা করেন যে, তাদের লক্ষ্য হচ্ছে পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, বাংলা ও আসাম প্রদেশগুলির সমন্বয়ে সামগ্রিকভাবে পাকিস্তান নামক একটি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই দাবীর প্রেক্ষিতে ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় পরিষদের নির্বাচনে ৩০টি মুসলিম আসনের ৩০টিতে বিজয়ী হয় মুসলিম লীগ। ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারীতে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক পরিষদের ৪৯৫টি আসনের মধ্যে ৪৩৪টি আসনে জয়লাভ করে মুসলিম লীগ। ওয়াল ব্যাঙ্ক লিখছেন- ‘জিন্নাহর প্রতিষ্ঠান যে ভারতের জনগণের মুখপাত্র এ ব্যাপারে আর কোন সন্দেহ রইল না।’

১৯৪৬ সালে ৯ই এপ্রিল ৪৭০ জন মুসলমান পরিষদ সদস্যবর্গের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সর্বসম্মাতিক্রমে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই প্রস্তাবের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয় : ভারতীয় সমস্যা সমাধানের জন্য ভারতের উত্তর পূর্ব অঞ্চলের বাংলা ও আসাম এবং উত্তর পশ্চিম অঞ্চলের পাঞ্জাব, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ সিন্ধু ও বেলুচিস্তান অঞ্চলসমূহ যেখানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেগুলোর সমন্বয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র করা হোক এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দ্ব্যর্থহীন প্রতিশ্রুতি অবিলম্বে দেয়া হোক। লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল দলীয় সম্মেলনে, যেখানে বলা হয়েছিল উপমহাদেশে এক বা একাধিক মুসলিম রাষ্ট্রের কথা। কিন্তু দিল্লীতে গৃহীত এক পাকিস্তানের প্রস্তাব অধিক গুরুত্বের দাবী রাখে। কেননা একদিকে দিল্লী সম্মেলন দলীয় সম্মেলন অন্যদিকে একে বলা চলে মুসলমানদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্মেলন। এ সম্মেলনের এক পাকিস্তান গঠনের পরিকল্পনা দ্বারা আগের প্রস্তাবের আংশিক নাকচ হয়ে যায়।

বাংলা বিভক্তির ষড়যন্ত্র
১৯৪৭ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারী বৃটিশ সরকার ভারত ত্যাগ ও ভারত বিভাগের সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ করে। এই ঘোষণার পর পরই কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক চক্র ও হিন্দু মহাসভার বর্ণহিন্দুরা বাংলার ভবিষ্যতের ব্যাপারে সক্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলা বিভাজনের ষড়যন্ত্র শুরু হয়। প্রকাশ্য জনমত গঠনের জন্য হিন্দু নেতৃবৃন্দ মাঠে নেমে পড়ে এবং এনিয়ে নেপথ্য প্রাসাদ ষড়যন্ত্র শুরু হয়। হিন্দু মহাসভার নেতা ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ২৩শে ফেব্রুয়ারী বাংলার গর্ভনর বারোদের সাথে সাক্ষাতের পর সংবাদপত্রে বিবৃতি দেন। এতে বলা হয়, মুসলমানদের জন্য যদি ভারত বিভক্ত হয় তাহলে হিন্দুদের জন্য বাংলা বিভক্ত হতেই হবে। এই বিবৃতি দানের মাধ্যমে শতাব্দীর গোড়ার দিকে বর্ণহিন্দুদের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী চেতনা সাম্প্রদায়িকতার শানিত ছুরি দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হল। তারপর তারা নব আঙ্গিকে নতুনরূপে নতুন ষ্ট্রাটেজীতে বাংলাকে খণ্ডিত করার জন্য তৎপর হয়ে উঠল। অবশ্যি বঙ্গভঙ্গ বিরোধিতা এবং বাংলাকে খন্ডিত করার আন্দোলনের মধ্যে প্রকৃতিগত পার্থক্য মোটেও ছিল না। নতুন বোতলে সাম্প্রদায়িকতার পুরাতন মদ। দুটোতে একই সত্য বিদ্যমান ছিল, ছিল মুসলিম বিদ্বেষ, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার উন্মাদনা।

বাংলা খণ্ডিত হল বর্ণ হিন্দু ষড়যন্ত্রে
কায়েদে আযমের অক্লান্ত পরিশ্রম, তার সদিচ্ছা ও ক্ষুরধার যুুক্তির প্রেক্ষিতে ১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী ভারত বিভক্তির প্রশ্নটি যখন চূড়ান্ত হল, তখন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অখণ্ড বাংলার স্বাধীনতার জন্য সক্রিয় হয়ে উঠলেন। শরত বসু তার সমর্থনে এগিয়ে এলেন। মুসলিম ভারতে অবিসংবাদিত নেতা কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আপত্তি না জানিয়ে স্বাগত জানালেন। কিন্তু বর্ণ হিন্দুরা বাংলা বিভাজনের জন্য তৎপর হয়ে উঠল। হিন্দু মহাসভার নেতা ডক্টর শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী ২৩ ফেব্রুয়ারী এক বিবৃতিতে বললেন- ‘মুসলমানদের জন্য যদি ভারত বিভক্ত হয় তাহলে হিন্দুদের জন্য বাংলা বিভক্ত হতেই হবে। ৫ই এপ্রিল তারকেশ্বরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভা সম্মেলনে স্বতন্ত্র হিন্দু বাংলা গঠনের জন্য ডঃ শ্যামা প্রসাদ মুখার্জীকে ক্ষমতা প্রদান করা হয়। বাংলা কংগ্রেসের ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের দলভুক্ত নেতা ও কর্মীরা বাংলা বিভাগের দাবীতে সোচ্চার হয়ে উঠে। প্রবল ইঙ্গহিন্দু বিরোধিতার মুখে বাংলার অখণ্ডতা রক্ষার শেষ প্রয়াস হিসেবে বঙ্গীয় বিধান সভার সদস্যদের বৈঠক আহবান করা হয়। 

১৯৪৭ সালের ২০ জুন বিধানসভার হিন্দু ও মুসলমান সদস্যদের যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়। বড়লাটের পার্সোনাল রিপোর্ট নং ১০ (২৮ শে জুন) মোতাবেক এই সভায় ১২৬ জন সদস্য এইমর্মে এক প্রস্তাবের সপক্ষে ভোট দেন যে, বাংলা অখণ্ড থাকবে এবং পাকিস্তানে যোগ দেবে। প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট পড়ে ৯০টি। একই দিন বঙ্গীয় বিধান সভার মুসলমান ও হিন্দু সদস্যরা পৃথক বৈঠকে মিলিত হন। মুসলিম সদস্যদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন জনাব নূরুল আমীন এবং হিন্দু সদস্যদের বৈঠকে উদয়চাঁদ মেহতা। হিন্দুদের বৈঠকে ৫৮ জন সদস্য বঙ্গ ভঙ্গ এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলসমূহের ভারতের সাথে যোগদেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মুসলিম সদস্যরা পুনর্বার অখণ্ড বাংলার পক্ষে মতামত প্রকাশ করেন। তবে ১০৫ জন সদস্য এইমর্মে প্রস্তাব গ্রহণ করেন যে, যদি বাংলাকে হিন্দুদের অনমনীয় ভূমিকার জন্য ভাগ করতেই হয় তাহলে পূর্ববঙ্গ আসামের সিলেটসহ পাকিস্তানে যোগদান করবে। (খণ্ডিত বাংলাদেশ, দৈনিক ইনকিলাব ১ জানুয়ারী, ১৯৯১)
কিন্তু শেষ অবধি অখণ্ড বাংলার স্বপ্ন হিন্দুর ষড়যন্ত্রের কারণে অর্জিত হল না। এমনকি আসামও যুক্ত হল না পূর্ববাংলার সাথে।

কোলকাতা নিয়ে বৃটিশ হিন্দু ষড়যন্ত্র
যেহেতু পূর্ব বাংলায় কোন বন্দর ছিল না। পূর্ব বাংলার আমদানী রপ্তানীর জন্য কোলকাতা উভয় রাষ্ট্রের জন্য উন্মুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। এছাড়াও পূর্ব বাংলার কাঁচা মালের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছিল কোলকাতার শিল্প বিশেষ করে জুট মিলগুলো। এজন্য উন্মুক্ত বাজার হিসেবে কোলকাতা উন্মুক্ত থাকা একান্তভাবে বাঞ্ছনীয় ছিল কিন্তু সেটা হতে দিল না বৃটিশ এবং বর্ণ হিন্দুরা যৌথভাবে। জিন্নাহর দাবী ছিল অবিভক্ত বাংলা ও আসাম স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হবে। এ দাবী যখন অগ্রাহ্য হল তখন কোলকাতাসহ পূর্ববঙ্গ ও আসাম এবং একটি করিডোর চেয়েছিলেন। যাতে করে পূর্ব ও পশ্চিমের সংযোগ রক্ষা করা যায়। যখন এটাও অগ্রাহ্য হল তিনি চাইলেন পূর্ববঙ্গের সাথে কোলকাতা। জিন্নাহর ভাষায় ‘কোলকাতা বিহীন পূর্ববঙ্গ নিয়ে কি করব?’ সর্বশেষে তিনি কোলকাতায় গণভোট দাবী করলেন, যদিও কোলকাতার মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ মুসলমান ছিল। কিন্তু তার ভরসা ছিল তফসিলি সম্প্রদায় যা মোট জনসংখ্যার অর্ধেক। গণভোট হলে তারা পাকিস্তানের সপক্ষে ভোট দেবে। তার এই প্রচেষ্টাকেও ইংরেজ ও হিন্দুচক্র বানচাল করে দেয়। অতঃপর দাবী করা হয় কোলকাতাকে ফ্রি সিটি হিসেবে বহাল রাখার। কিন্তু সেটাও অগ্রাহ্য হল। সোহরাওয়ার্দী অনুরোধ করলেন, বাংলা বিভাগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েই গেছে তখন কোলকাতাকে মুক্ত শহর হিসেবে থাকতে দেয়া হোক। যদি এটাও সম্ভব না হয় অন্তত ৬ মাসের জন্য কোলকাতাকে মুক্ত রাখা হোক। এ ব্যাপারে ভাইসরয় কংগ্রেসের মতামত জানতে চাইলে প্যাটেল বলেন, Not even for six hours. এখানে ভাইসরয় কোন ভূমিকা নেননি। নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার আগেই সুনির্দিষ্ট সংলাপের রিহার্সাল দেয়া হয়েছে অনেক দিন ধরে।

পাকিস্তান দাবীর প্রেক্ষিতে হিন্দু নেতৃবৃন্দ
স্বাধীন ভারতের স্থপতি ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহারলাল নেহেরু বলেনঃ পরিণাম যাই হোক কংগ্রেস কখনও পাকিস্তানের দাবী স্বীকার করবে না। (স্টেটসম্যান, ১৬ এপ্রিল, ১৯৪৭)
হিন্দু ভারতের আপোষহীন নেতা স্বাধীন ভারতের ডিপুটি প্রধানমন্ত্রী সরদার প্যাটেল বলেনঃ পাকিস্তানের বিষয়ে কংগ্রেস কখনও আপোষ করতে পারে না। (প্রাগুক্ত) অহিংসনীতির অবতার ভারতের জাতির পিতা করমচাঁদ গান্ধী বলেনঃ সারা ভারত যদি জ্বলতে থাকে তাহলেও আমরা পাকিস্তান দেব না, এমনকি মুসলমানরা যদি তলোয়ারের মুখে দাবী করে তাহলেও না। (প্রাগুক্তঃ ৩০ শে ১৯৪৭)

সম্ভাবনাহীন ভুখণ্ড নিয়ে পাকিস্তানের যাত্রা শুরু
অখণ্ড ভারত কেন্দ্রিক চূড়ান্ত স্বাধীনতা দানের উদ্দেশ্য নিয়েই লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ভাইসরয়ের দায়িত্ব নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু কায়েদে আযমের অনমনীয় মনোবৃত্তি এবং আপোষহীন নেতৃত্বের বলিষ্ঠ যুক্তির কাছে পরাজিত হয়ে ষড়যন্ত্রকারী লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন হিন্দু নেতৃত্বের সহযোগিতায় এমন একটি ‘কাটা-ছেঁড়া পোকায় খাওয়া পাকিস্তান’ দিলেন যা নিজস্ব অর্থনৈতিক বৃত্ত রচনা করতে সক্ষম হবে না, যা দুনিয়ার বুকে স্বনির্ভর হয়ে কোন দিনও দাঁড়াতে পারবে না। অখণ্ড ভারতে বিশ্বাসী মাউন্ট ব্যাটেনের ধারণায়- ‘ভবিষ্যতের পাকিস্তান প্রকৃতিগতভাবেই হবে ক্ষণস্থায়ী। নিজের অন্তর্নিহিত গলদের দরুন, তাকে ধ্বংস হবার সুযোগ দিতে হবে। পরিণতিতে যাতে মুসলমানরা অখণ্ড ভারতের পথে ফিরে আসে।’ ভাইসরয় আরো বলেন- ‘পূর্ব বাংলার সাথে সিলেট থাকলেও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সেটা টেকসই হবে না এবং ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে বাধ্য হবে। (Freedom at Midnight, P-114)’ তার ভাষায়ঃ যেভাবে পাকিস্তান দেয়া হল তাতে সিকি শতাব্দীর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাবে। (Freedom at Midnight, P-127) হিন্দু নেতৃবৃন্দেরও ধারণা ছিল অনুরূপ। একারণে বাংলার সবকটি সম্ভাবনাহীন এলাকা পূর্ব বাংলা অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে বরাদ্দ করে। যে ভূখণ্ড উন্নত নয় এমন সম্ভাবনাহীন ভূখণ্ড নিয়েই পাকিস্তান যাত্রা শুরু করে নিয়তির উপর নির্ভর করে।

হিন্দু নেতৃবৃন্দের প্রত্যাশা
প্যাটেল মনে করেছিলেন, পাকিস্তান গ্রহণ দ্বারা মুসলিম লীগকে তিক্ত শিক্ষা দেয়া হবে। অল্পদিনের মধ্যে পাকিস্তান ধ্বংস হয়ে যাবে এবং বিচ্ছিন্ন প্রদেশগুলিকে অকথ্য অসুবিধা ও দুর্ভোগে পড়তে হবে।
প্যাটেল তার বন্ধু কাণ্ডী দ্বারকাদাসকে এক পত্রে বলেন- ‘পূর্ববঙ্গ, পাঞ্জাবের একাংশ, সিন্ধু, বেলুচিস্তান বাদেও ভারতের কেন্দ্র এত শক্তিশালী হবে যে বাকী অংশ (পাকিস্তানের এলাকাসমূহ) অবস্থার গতিতে আবার ফিরে আসবে ভারতে।’ নেহেরুর প্রত্যাশা ধ্বনিত হয়েছে ভাইসরয়ের ৩১শে মের ‘In this opinion Eastern Bengal was likely to be a great embarrassment to Pakistan. Presumably Pandit Nehru considered that eastern Bengal was bound sooner or later to rejoin India’ অর্থাৎ ‘তার মতে পূর্ববাংলা পাকিস্তানের জন্য একটি বিরাট বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করবে। সম্ভবতঃ পণ্ডিত নেহেরু ধারণা করেছিলেন যে, আজ হোক আর কাল হোক পূর্ববাংলাকে আবার ভারতে যোগদান করতে হবেই।’
কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট আচার্য ক্রিপালিনী বললেন : খণ্ডিত মাতৃভূমিকে একত্রীকরণের জন্য আমাদের সব রকম শক্তি ও সামর্থকে কেন্দ্রীভূত করতে হবে।
পণ্ডিত নেহেরু বললেনঃ ভারতের হৃদয় ভাঙ্গলেও এর একত্রীকরণ সম্ভাবনা ধ্বংস হয়নি।
সরদার প্যাটেল বললেনঃ ভারত বিভাগের যদিও সিদ্ধান্ত হয়েছে কিন্তু এখনও এটা অবাস্তব পরিকল্পনা... ভারত একক এবং অখন্ড একটি দেশ। কেউ সাগরকে অথবা প্রবাহমান জলরাশিকে স্বতন্ত্র করে রাখতে পারে না।
গান্ধীর ধারণায় বিভক্ত ভারত পুনরায় অখণ্ড ভারতে পরিণত হবে। তার ধারণায় মুসলিম লীগই ভারতের সাথে পাকিস্তানের সংযুক্ত হওয়ার কথা বলবে। তারা নেহেরুকে ডাকবে এবং নেহেরু তাদের ফিরিয়ে নিয়ে আসবে।
সক্রিয় সাম্প্রদায়িক সংগঠনসমূহ যেমন হিন্দু মহাসভা, স্বয়ং সেবক সংঘ এবং সংখ্যালঘু অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলন সীমান্তরেখা নির্মূল করতে দাবী জানাল এবং শক্তি প্রয়োগ করে পূর্ববাংলাকে ভারতের অংশে পরিণত করতে অথবা অর্থনৈতিক চাপের সম্মুখীন করার পরামর্শ দিল।
কেথ কেলার্ড বলেন- ‘ভারতীয়দের অনেকে মনে করেন পাকিস্তানের সৃষ্টিটাই হল এক বেদনাদায়ক ভ্রান্তি। এই ভুলের সংশোধন হওয়া দরকার। অন্তত পূর্ব পাকিস্তানের ভারতে অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারটা তারা চিন্তা করে থাকেন। ...পাকিস্তানীদের জীবনকে দুঃসহ করে তোলার জন্য ভারত সবরকম উদ্যোগ নিয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম বাংলার সাথে সংযুক্ত করার ব্যাপারে পশ্চিম বাংলার নেতৃবৃন্দের আগ্রহের কারণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুটোই। তারা আশা করে যে সীমান্ত রেখা মুছে ফেলা সম্ভব হলে পূর্ব বাংলায় তাদের আধিপত্য কায়েম হবে এবং শিল্প কারখানার জন্য কাঁচামালের বাজার হবে অবারিত।
দিল্লীর সাম্প্রদায়িক নেতৃত্বের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানকে খন্ডিত ভারতের মানচিত্র সংযুক্ত করে অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠা। এই উদ্দেশ্য সামনে রেখে তারা সুপরিকল্পিতভাবে তাদের তৎপরতা শুরু করে।

(বইটির pdf version download করুন এখানে)

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh