Home EBooks দুই পলাশী দুই মীরজাফর অধ্যায় ১০: বিভাগোত্তর পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ১০: বিভাগোত্তর পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:20

বিভাগোত্তর পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা

তৎকালীন বিভাগোত্তর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কি দারুণ সংকটের মধ্যে ছিল সেটা কুম্যুনিষ্টদের একটি গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত এবং উত্তেরাধিকার সূত্রে পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে কি প্রাপ্তিযোগ হয়েছিল তা ভারত বর্ষ তথা বাঙ্গালা বিভক্তির পর তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্ববঙ্গ প্রদেশ (বর্তমান বাংলাদেশ) সে সময় (১৯৪৭) কি-কি ভাগে পেয়েছিল তার একটি মোটামুটি ধারণা অবশ্যই শ্রমিক শ্রেণীর জানা থাকা দরকার। পূর্ববঙ্গ পেয়েছিল ৪ কোটি ২০ লক্ষ জনসংখ্যা অধ্যুষিত ৫৪,৫০১ বর্গমাইল এলাকা। আর এজনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশই ছিলেন আধা-সর্বহারা বা সর্বহারা। এখানকার অধিকাংশ জমিদারই ছিলেন হিন্দু-সম্প্রদায়ের। ধনশালী আর সম্পদশালী ছিলেন তাঁরাই। পূর্ববঙ্গের বড় ব্যবসায়ী ও মহাজন প্রায় সবই হিন্দু-সম্প্রদায়েরই ছিলেন। তাঁদের বৃহৎ অংশই অর্থাৎ ধন-সম্পদশালীদের প্রায় সবই যা কিছু গড়েছিলেন বা বিনিয়োগ করেছিলেন তার প্রায় সবই কলিকাতা ও হুগলী ভিত্তিক এবং বাঙ্গালা বিভক্তির পর তাঁরা পূর্ববঙ্গ ছেড়ে চলে যাওয়ার ফলে তাদের পূঁজি-সঞ্চিত অর্থসহ অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী সবই ভারতে চলে যায়। জ্ঞান চক্রবর্তী তাঁর “ঢাকা জেলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের অতীত যুগ” বইয়ের ১৩১ পৃষ্ঠায় বলেছেন,

“ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রকে হিন্দু জনসাধারণ প্রথম হইতেই আপনার বলিয়া মনে করিতে পারে নাই। ফলে দেশ বিভাগের পরেই হিন্দুরা ব্যাপকভাবে দেশত্যাগ শুরু করে। হিন্দু সরকারী কর্মচারীরা প্রায় সকলেই অপশনের ব্যবস্থা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে চলিয়া যায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরাও, বিশেষ করিয়া আর, এস, পি, ও ফরোয়ার্ড ব্লকের লোকেরা তাহাদের পরিবারসহ দেশত্যাগ করে।” ঐ পর্যায়ে মুসলমান সম্প্রদায়ের হাতে মূলতঃ তেমন কোন মূলধন ছিল না। এমনকি এ অঞ্চলের একমাত্র অর্থকরী ফসল পাট ব্যবসাটিও মূলতঃ হিন্দু মাড়ওয়ারীদের হাতেই ছিল। তারা আবার মুনাফার টাকাটা ভারতেই বিনিয়োগ বা স্থানান্তরিত করতেন।

পূর্ববঙ্গের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির অধিকাংশই প্রতিষ্ঠিত ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের দ্বারা। তাই কয়েক হাজার সম্পদশালী হিন্দু পরিবার পূর্ববঙ্গ থেকে চলে যাওয়ার ফলে শুধু যে পূর্ববঙ্গের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছিল তাই নয়, এখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিও মারাত্মকভাবে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। সে বিপর্যস্ত অর্থনীতির পাশাপাশি ভারত থেকে আসতে থাকল লক্ষ লক্ষ নিঃস্ব বাস্তুত্যাগী মানুষের ঢল যার সংখ্যা সরকারী হিসেবেই সাত লক্ষ বলে বলা হল। পুর্ববঙ্গের ভাগে চাষযোগ্য জমি পড়েছিল সর্বমোট দুই কোটি চল্লিশ লক্ষ একরের মত, যার মধ্যে ঐ সময়কালে এক কোটি আশি লক্ষ একরের মত চাষ করা সম্ভব হত; আর এর মধ্যে আঠার লক্ষ একরের মত পাট চাষযোগ্য জমি ছিল। অর্থকরী ফসল বলতে ছিল একমাত্র পাট। কিন্তু বাঙ্গালার ৬৮,২৫৮টি তাঁত সম্বলিত ১১৩টি পাটকলের মধ্যে একটি পাটকলও পূর্ববঙ্গের মাটিতে ছিল না। আর এখানে খাদ্যশস্য যা উৎপন্ন হত তা আবার এই প্রদেশের জনসংখ্যার প্রয়োজনের তুলনায় ছিল কম; তাই ছিল খাদ্য ঘাটতি সমস্যা।

শিক্ষার দিক থেকে পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা পিছিয়ে ছিলেন যথেষ্ট পরিমাণে। তাই চাকুরীর ক্ষেত্রেও এখানকার হিন্দু সম্প্রদায়ই অগ্রগামী ছিলেন; তাদের মধ্যকার সক্ষম অংশও তখন ভারতে চলে গেলেন। এ প্রসঙ্গে একটি মাত্র উল্লেখ থেকেই তখনকার পূর্ববঙ্গের বাকি অবস্থাটা বুঝতে পারা যাবে তাহল এই যে, সে সময় সুপেরিয়র সিভিল সার্ভিসে এখানকার মাত্র একজন নমিনেটেড মুসলমান কর্মচারী ছিলেন। (এর ফলে যে প্রশাসন যন্ত্র পূর্ববঙ্গের জনগণের উপর চেপেবসে তা গঠন করতে হয় পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের লোক ও বাস্তুত্যাগীদের মধ্য থেকেই।)

খনিজ সম্পদ বলতে পূর্ববঙ্গ কিছুই পায়নি। তবে এখানে মৎস্য সম্পদ ছিল। আর ছিল দুই লক্ষ হস্তচালিত তাঁত। বন সম্পদ যা পাওয়া গিয়েছিল তা রাজেন্দ্র প্রসাদ-এর ‘ইন্ডিয়া ডিভাইডেড’ বইয়ের ২৯০ পৃষ্ঠায় উল্লেখিত তথ্যই যথেষ্ট। তিনি বলেছেনঃ “ঐ সময়ের (বিভাগপূর্ব) সমস্ত বাঙ্গালার ৬,৫৮,০৩৩ টাকা সরকারী রাজস্ব আয়ের বনাঞ্চলের মধ্যে যে অংশ পূর্ববঙ্গের ভাগে পড়ে তার সরকারী রাজস্বের পরিমাণ ছিল মাত্র ২,০০,০০০ টাকার কিছু উপরে। আর পশ্চিমবঙ্গে পেয়েছিল ৪,৫০,০০০ টাকা রাজস্ব আয়ের বনাঞ্চল।” অর্থাৎ পূর্ববঙ্গের ভাগে বনসম্পদ পড়েছিল রাজস্ব আদায়ের অনুপাতে সমগ্র বাঙ্গালার বন সম্পদের ১৩ ভাগের ৪ ভাগ মাত্র।

পুর্ববঙ্গের স্থলপথ ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। তেমন উল্লেখযোগ্য পরিমাণের পাকা রাস্তা এখানে ছিল না। তবে রেলপথ উন্নত ছিল এবং রেলপথ পাওয়া গিয়েছিল ১,৬১৯ মাইল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই রেলপথগুলি খুব বেশী ব্যবহারের ফলে ইঞ্জিন ও গাড়ী যা পাওয়া গিয়েছিল তার অবস্থা প্রায় ভগ্নদশায় এসে দাঁড়িয়েছিল।

শিল্প বলতে যা বুঝায় তা পূর্ববঙ্গের ভাগে যা পড়েছিল তা অতি নগণ্য-তেমন উল্লেখযোগ্য শিল্প এখানে স্থাপিত ছিল না। এ প্রসঙ্গে প্রফেসর আর, কুপল্যান্ড-এর খতিয়ানটি উল্লেখযোগ্য। তিনি তাঁর The future in India (ভারতের ভবিষ্যৎ) বইয়ের ৯৬ পৃষ্ঠায় বলেছেন যে, “বৃটিশ ভারতের শতকরা ২০ ভাগ লোকের বাস বাঙ্গলায় এবং শিল্প শ্রমিকের সংখ্যার হিসেবের অনুপাতে বৃটিশ ভারতের শিল্প মাত্র ২.৭ শতাংশ।” অর্থাৎ বৃটিশ ভারতের সমগ্র শিল্পের মধ্যে বাঙ্গালায় ছিল ৩৩ শতাংশ শিল্প। তার মধ্যে পূর্ববঙ্গ পেল ঐ ৩৩ শতাংশের মধ্যে মাত্র ২.৭ শতাংশ, আর বাকি ৩০.৩ শতাংশ শিল্পের অধিকারী হল ভারতভুক্ত পশ্চিবঙ্গ। তাছাড়া বৃটিশ ভারতের সমগ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলির মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র পড়েছিল সমগ্র পাকিস্তানের ভাগে।

রাজেন্দ্র প্রসাদ ‘ইন্ডিয়া ডিভাইডেড্’ বইয়ের ২৯৫-২৯৬ পৃষ্ঠায় এ প্রসঙ্গে যা বলেছেন তা হলঃ পূর্ববঙ্গ, পশ্চিম পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, বেলুচিস্তান ও সিন্ধু (অর্থাৎ তদানিন্তন পাকিস্তান-লেখক) অংশে বৃটিশ ভারতের ২৬.৭ শতাংশ লোকের বাস ছিল; কিন্তু এ সকল অঞ্চলে সম্মিলিতভাবে শিল্পের অবস্থান বৃটিশ ভারতের মাত্র ১৩.৯ শতাংশ। আর বৃটিশ ভারতের শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের মধ্যে মাত্র ৭.৩৬ শতাংশ শ্রমিক এ সকল অঞ্চলের (অর্থাৎ তদানিন্তন সমগ্র পাকিস্তান-লেখক) শিল্পে নিযুক্ত ছিল। আদতে শিল্পের দিক থেকে পূর্ববঙ্গ পরিপূর্ণভাবেই অবহেলিত ছিল। এমনকি বিখ্যাত রাজনীবিদ এ, কে, ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং খাজা নাজিমুউদ্দীনও এক্ষেত্রে কোন উল্লেখযোগ্য অবদানের অধিকারী হতে পারেননি। পূর্ববঙ্গে কি-কি শিল্প তখন ছিল না বা পশ্চিমবঙ্গে কি-কি শিল্প পড়ল তা বলে বক্তব্য দীর্ঘায়িত করব না। শুধু পূর্ববঙ্গ তখন শিল্প বলে যা পেয়েছিল তাই এখানে উল্লেখ করছি আর তা হল :
১.    ৫০,০০০ টন উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন একটি মাত্র সিমেন্ট ফ্যাক্টরী ছাতকে।
২.    ৭টি কাপড়ের কল ২৬০০ লুম ও ১,১২,০০০ স্পিন্ডল সম্বলিত।
৩.    ৫টি চিনির কল।
৪.    ৩৫ থেকে ৪০টির মত জুট বেলিং প্রেস।
৫.    ৬০/৬৫টি ধান ভাঙ্গান কল।
৬.    ছোট ছোট কয়েকটি ছাপাখানা।
৭.    ছোট-খাট কয়েকটি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ ও ডক।
৮.    মাত্র ৭,৭০০ একরের চা বাগান।
৯.    সৈয়দপুর ও পাহাড়তলীতে শুধু মেরামতযোগ্য দু’টি রেলওয়ে ওয়ার্কশপ।
১০.     ছোট ছোট ৪টি ম্যাচ (দিয়াশলাই) কারখানা।
এর বাইরে উল্লেখ করার মত আর কোন শিল্প পূর্ববঙ্গের ভাগে পড়েনি। পূর্ববঙ্গ আর যা পেয়েছিল তা হল :
(ক)    মাত্র ৭২৮৬ কিলোওয়াট বিদ্যু উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র।
(খ)     নদী পথে চলাচলের জন্য যাত্রীবাহী কিছু জাহাজ ও লঞ্চ ছিল।
(গ)    নদী পথে মাল চলাচলের জন্য বার্জ, ফ্লাট, স্টিমার ও টাগ প্রভৃতি ছিল।
(ঘ)    সে সময়কালে বছরে মাত্র ৫ লক্ষ টনের মত মাল হ্যান্ডলিং করার ক্ষমতাসম্পন্ন চট্টগ্রাম বন্দর।
(ঙ)    ঢাকায় একটি ছোট বিমান ঘাটি ছিল্
এ প্রসঙ্গে আর উল্লেখ করার মত কিছু পূর্ববঙ্গ পায়নি।’

অনেক টানা-পোড়নের পর বৃটিশ এবং কংগ্রেস শর্ত সাপেক্ষে পাকিস্তান প্রস্তাব মেনে নিতে সম্মত হল। শর্ত ছিল বাংলা এবং পাঞ্জাবের বিভক্তি। তৎকালীন বাংলার প্রধান মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং তার সহকারীরা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পূর্ব বাংলা টেকসই হবে না ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। অন্য সব সংকট বাদ দিলেও শুধু মাত্র খাদ্য ঘাটতি পূর্ব পাকিস্তানকে বিপন্ন করবে এমন একটা ধারণা তখন বিরাজ করছিল। তাদের স্থির বিশ্বাস ছিল পূর্ব পাকিস্তান টিকবে না। পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়িয়ে যাবার উদ্দেশ্যে তারা মরিয়া হয়ে অবিভক্ত বাংলার দাবীতে সক্রিয় হয়ে উঠলেন। এমনকি উপমাহাদেশের মুসলমানদের প্রাণের দাবী পাকিস্তানের বাইরে অবস্থান নিয়ে হলেও যুক্ত বাংলার দাবীতে সোচ্চার হয়ে উঠলেন। তার উদ্বেগের পেছনে যথেষ্ট কারণ ছিল, মাউন্ট ব্যাটেন পূর্ব বাংলাকে সম্ভাবনাহীন অজ গ্রাম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই দুর্বহ বোঝা স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেয়ার জন্য তিনি জিন্নাহর প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন (Mountbatten paper file –196)| মাউন্ট ব্যাটেনের আগে বাংলার গভর্নর আর জি ক্যাসী এই ভীতি আর উদ্বেগের প্রশ্নটি ব্যাপক প্রচার করে বাংলার মুসলিম নেতৃবৃন্দকে পাকিস্তানের দাবী থেকে সরে আসতে এবং অবিভক্ত ভারতের পক্ষে সমর্থনের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন।

সূচনা পর্বে পূর্ব পাকিস্তানের অবকাঠামো শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনুপযোগী ছিল তা নয়, রাজধানীর উপযোগী একটি শহরও ছিল না। পূর্ব বাংলা ছিল অশিক্ষিত পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী সমৃদ্ধ। প্রশাসনিক ও টেকনিকালী অদক্ষ মানুষে পূর্ণ ছিল পূর্ব বাংলা। এখানে তেমন কোন শিল্প গড়ে উঠেনি। একটিও পাটকল অথবা হাইড্রোলিক জুট প্রেসিং ছিল না। শুধু মাত্র ৫টি কটন মিল এবং ৪টি সুগার মিল ছিল। এসবের মালিক এবং পরিচালক সকলেই ছিল হিন্দু। (এস মুজিবুল্লাহ, নতুন সফর, এপ্রিল ১৯৯৬)। পূর্ব বাংলার আয়ের প্রধান উৎস ছিল কাঁচা পাট। যা দিয়ে ৯ কোটি টাকা বার্ষিক আয় হতো। কিন্তু পাটের বাণিজ্য পুরোটাই ছিল হিন্দু মাড়োয়ারীদের হাতে। এরা তাদের লভ্যাংশ ভারতে পাচার করতো। এটা সত্য যে কোলকাতার পাটকলগুলো পূর্ব বাংলায় উৎপাদিত পাটের প্রধান ক্রেতা ছিল এবং বিশ্ব বাজারে পাট রপ্তানী হতো কোলকাতা বন্দর দিয়ে। যে কারণে পাট থেকে বাংলার মূল আয়ের পুরোটাই নির্ভর করত দিল্লীর মেজাজ মর্জির উপর। স্বাধীনতা উত্তর প্রাথমিক পর্যায়ে বাণিজ্য বিষয়ে পাকিস্তানী প্রতিপক্ষের সাথে আলাপ আলোচনাকালে ভারতীয় বাণিজ্য প্রতিনিধিরা স্পষ্টতই জানিয়ে দেয় আপনারা পাট নিয়ে কি করবেন আমাদের কাছে পাট বিক্রি ছাড়া আপনাদের ভিন্ন কোন পথ নেই। এসব আপনারা পুড়িয়ে ফেলুন অথবা বঙ্গপোসাগরে নিক্ষেপ করুন।’

শুরুতে এই প্রদেশে মাত্র ৫ কিলোমিটার শক্তি সম্পন্ন বেতার কেন্দ্র ছিল। একটি দৈনিক পত্রিকা ছিল না। কোন প্রকাশনা শিল্প, আধুনিক ছাপাখানা এমন  কি ব্লক তৈরীর কোন ব্যবস্থাও ছিল না। যখন দৈনিক সংবাদ পত্র প্রকাশ হল তখন করাচী থেকে ব্লক তৈরী হয়ে বিমানে ঢাকায় আনা হতো। পূর্ব বাংলায় তখন ১০,৭০০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো। শহরের ৮০ শতাংশ সম্পত্তির মালিকানা ছিল হিন্দুদের এবং এখানকার ৮০ শতাংশ সম্পদের মালিকও ছিল হিন্দু।

শিক্ষার সম্পূর্ণটাই ছিল হিন্দুদের দখলে। প্রায় সবকটি হাই স্কুল এবং কলেজ হিন্দুদের অর্থানুকুল্যে এবং তাদের দ্বারাই পরিচালিত হত। উচ্চ শিক্ষিত মুসলমানদের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলমানদের উচ্চ শিক্ষার জন্য। ১৯৪৭ সাল অবধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্র সংখ্যা ছিল অত্যল্প এবং মুসলিম শিক্ষকের সংখ্যা ছিল অনুল্লেখযোগ্য। দ্বিতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী কলেজের অবস্থা এর চেয়ে উত্তম ছিল না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের প্রাধান্য ১৯৫০ সাল অবধি একই রকম বিরাজ করছিল। এদের পরীক্ষা নেওয়া হতো কোলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয়ে। এই প্রদেশে প্রশাসনিক জ্ঞান সম্পন্ন জনশক্তি ও স্থানীয় নেতৃত্ব ছিল না, যাদের উপর নির্ভর করে উন্নয়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া যায়। এখানে ২০/২৫ জন ডিপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট এবং সাব ডিপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন। পুলিশ অফিসার এবং কনষ্টেবলের সংখ্যা ছিল ন্যূনতম প্রয়োজনের এক পশ্চমাংশ। অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানে যেমন রেলওয়ে জনশক্তিতে পূর্ব বাংলার মানুষ ছিল প্রায় অনুপস্থিত। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ছিল প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে। মাত্র ২শ’ জন শক্তি নিয়ে একটি সেনা বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না। তখন প্রশাসনিক সামরিক কোন ক্ষেত্রেই পূর্ব বাংলা স্বনির্ভর হওয়ার মত প্রয়োজনীয় পরিমাণ দক্ষ জন শক্তি ছিল না। ভারত থেকে আসা অবাঙালী দক্ষ জনশক্তি ও প্রশাসনিক জনশক্তি তৎকালীন পূর্ব বাংলার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। তখন খাদ্য ঘাটতিও ছিল তীব্র। এই খাদ্য ঘাটতি সূচিত হয় সিরাজের পতনের পরবর্তী পর্যায় থেকে। স্বাধীনতা উত্তর প্রাথমিক পর্যায়ে চট্টগ্রামে খাদ্য সংকট তীব্র হয়ে উঠলে সিন্ধুর গভর্নরের আবেদন ক্রমে সংগৃহীত তহবিল দিয়ে পর্যাপ্ত খাদ্য চট্টগ্রামে প্রেরণ করে আসন্ন দুর্ভিক্ষের মুকাবিলা করা হয়।

অগ্রসর হিন্দু জনগোষ্ঠীর অসহযোগিতা এবং দিল্লীর প্ররোচনায় হিন্দুস্থানে পাড়ি জমানোর ফলে যে ভযাবহ শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা অবাঙালী মুসলিম দক্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী দিয়ে তা পূরণ করা হয়। এখানকার অগ্রসর দক্ষ জনগোষ্ঠী কখনোই পূর্ব বাংলার স্বাধীনতাকে তাদের স্বাধীনতা মনে করেনি, যে কারণে সাত চল্লিশে স্বাধীনতার আগেই তারা তাদের অর্থ বিত্ত নিয়ে হিন্দুস্থানে পাড়ি জমায়। এই অর্থ বিত্ত ও দক্ষ জন শক্তিহীন পশ্চাৎপদ অঞ্চল নিয়ে কায়দে আযম কখনই নিরাশায় ভেঙে পড়েননি। কৃষি নির্ভর এ অঞ্চল উন্নয়নের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অতি আশাবাদী।

পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার অগ্রগতি
যদিও এ কথা সত্য যে তৎকালীন পাকিস্তানে তথা পূর্ব পাকিস্তানে শিল্প-বিল্পব শৈশবকালীন অবস্থায় ছিল, তবুও স্বীকার করতেই হবে যে এখানকার বুর্জোয়ারা তাদের সাম্রাজ্যবাদী মাতা-পিতার হাত ধরে হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে পা ফেলতে ফেলতে এগোচ্ছিল। ১৯৪৭ সালে পূর্ববঙ্গে (পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমান বাংলাদেশ) একটি পাটকলও ছিল না অথচ ১৯৭০ সালের মধ্যে ২৪,৩৩৪টি লুম সম্বলিত ৬৮টি পাটকল স্থাপিত হল; ১৯৪৭ সালে যেখানে ২৬০০ লুম ও ১,১২,০০০ স্পিন্ডল সম্বলিত মাত্র ৭টি কাপড়ের কল ছিল সেখানে ১৯৭০ সালের মধ্যে তা ৭,০০০ লুম ও ৭,৫০,০০০ স্পিন্ডল সম্বলিত ৪৪টি কাপড়ের কলে উন্নীত হয়; চিনিকল ছিল ৫টি, তা ১৯৭০ সালের মধ্যে ১৫টিতে উন্নীত হল; ম্যাচ ফ্যাক্টরীর উৎপাদন ক্ষমতা যেখানে সমগ্র পাকিস্তানে ১৯৪৭ সালে ছিল ৮০ লক্ষ গ্রুস বাক্স শুধুমাত্র পূর্ব পাকিস্তানেই ১৯৭০ সালে উৎপাদন হল ১১৩ লক্ষ গ্রুস বাক্স; রেলওয়ে ওয়ার্কসপ (উন্নত মানের) তৈরি হল দুইটি, খুলনায় তৈরী হল শিপইয়ার্ড, নারায়ণগঞ্জে ডক ইয়ার্ড নির্মিত হল; স্টিল মিল হল একটি, গালফ্রা হাবিব নামে জুট মিল স্পেয়ারস তৈরির কারখানা হল; ক্যাবল ফ্যাক্টরী হল, রসায়ন শিল্প হল, অক্সিজেন তৈরির কারখানা হল, অ্যরড্ন্যানস ফ্যাক্টরী হল; দুইটি কাগজ কল, একটি নিউজপ্রিন্ট মিল ও একটি হার্ডবোর্ড মিল হল; বৃহৎ মুদ্রণ শিল্প স্থাপিত হল; সার কারখানা হল; গাড়ী সংযোজন কারখানা হল, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী হল, ইলেক্ট্রিকাল ইকুইপমেন্ট তৈরির কারখানা হল; বাই-সাইকেল সংযোজন-তৈরি কারখানা হল; তৈল শোধনাগার হল; যেখানে কোন সিগারেট ফ্যাক্টরী ছিল না সেখানে সিগারেট ফ্যাক্টরীর উৎপাদন ১৯৬৯-৭০ সালে এক হাজার সাত শত কোটি সিগারেট-এ উন্নীত হল; ১৯৬৯-৭০ সালে কস্টিক সোডা উৎপাদন হল ৩,৩৫০ টন, সালফিউরিক এসিড উৎপাদন হল ৬,৪৫০ টন, ক্লোরিন উৎপাদন হল ২,৯০০ টন, বাস, ট্রাক, কার ও জীপ এসেম্লিং হল ৪৫৫টি, ইউরিয়া ফার্টিলাইজার উৎপাদন হল ৯৬,০০০ টন; চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দরের মাধ্যমে ১৯৬৭-৬৮ সালে রপ্তানী হয়েছিল ১৪ লক্ষ টনের উপর এবং আমদানী হয়েছিল ৪২ লক্ষ টনের উপর মালামাল; ১৯৪৭ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল মাত্র ৭,২৮৬ কিলোওয়াট তা ১৯৭০ সালের মধ্যে ৫,৪৮,০০০ কিলোওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্বলিত উৎপাদন কেন্দ্রে উন্নীত হল; ১৯৪৭ সালে সমগ্র পাকিস্তানে কার, জীপ, ট্যাক্সী, বাস, ট্রাক, ব্যাবিট্যাক্সী, মোটর সাইকেল প্রভৃতি রাস্তায় চালিত যানের সংখ্যা ছিল ২৫,৪৩৫ তা ১৯৭০ সালের মধ্যে শুধু পূর্ব পাকিস্তানের ৭০,০৮৬টিতে উন্নতি হয়েছিল; ১৯৪৭ সালে সমগ্র পাকিস্তানে টেলিফোনের সংখ্যা ছিল ৩৫ হাজার, তা ১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানে দাঁড়িয়েছিল ৪৫,৬৫৭টিতে; নতুন রেলপথ নির্মিত হল ১৫৭ মাইল; ১৯৫২ সালে যেখানে উন্নতমানের পাকা রাস্তা ছিল ৫৯৪ মাইল ও নিম্নমানের পাকা রাস্তা ছিল ১,০২৮ মাইল, সেখানে ১৯৬৯-৭০ সালের মধ্যে তা উচ্চামান সম্পন্ন পাকা রাস্তা হল ৪,৪৮১ মাইল আর নিম্নমানের পাকা রাস্তা হল ১৮৭৪ মাইল। ১৯৬৯-৭০ সালে কৃষিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার হল ২,৭৭,০০০ টন; পাওয়ার পাম্প ও নলকূপের সাহায্যে জল সেচের ব্যবহার হল ঐ বছর ৮ লক্ষ একরেরও বেশী জমিতে।
বিদ্যুৎ, রাস্তা, যোগাযোগ, পরিবহণ, সেচ, বন্দর প্রভৃতি ক্ষেত্রে উন্নয়নের পাশাপাশি প্রায় ১৫০টি বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল। তা ছাড়া রেল, নৌ ও সড়ক পরিবহণ শিল্পের উন্নতি নিশ্চয়ই সামন্ততান্ত্রিক কায়দায় শোষণের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯৬৯-৭০ সালে শুধুমাত্র রেলওয়েতে চালান দেওয়া মালের ওজন ছিল ৪৮ লক্ষ টন।

এর পাশাপাশি ১৯৪৭ সালে মাত্র, ৭,৭০০ একরের চা বাগান শিল্প উন্নীত হয়ে ১৯৬৯ সালের মধ্যে এক লক্ষ একরে দাঁড়িয়েছিল; জুট প্রেসও প্রায় ৭০টিতে উন্নীত হয়েছিল। এ ছাড়া গড়ে উঠেছিল মাঝারি ও ছোট আকারের অনেক রি-রোলিং মিল, ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা, মুদ্রণ, প্রকাশনা ও প্যাকেজিং শিল্প, সংবাদপত্র শিল্প, ঔষধ প্রস্তুত শিল্প, চামড়া শিল্প, পাদুকা উৎপাদন কারখানা কাঁচের দ্রব্যাদি প্রস্তুত শিল্প, লৌহ কারখানা, ঢালাই কারখানা, এলুমিনিয়াম ফ্যাক্টরী, মেরামত কারখানা ও ডকইয়ার্ড, ইট তৈরি শিল্প, ফার্নিচার তৈরি শিল্প, স-মিল, আটা-চাল- তৈল-ডাল ভাঙ্গান কল, ময়দা শিল্প, লবণ তৈরি কারখানা, বিস্কুট ও বেকারী শিল্প, প্লাষ্টিক ও রাবার শিল্প, টায়ার উৎপাদন শিল্প, হোসিয়ারী শিল্প, ইলেক্ট্রিক তার, বাল্ব, পাখা ইত্যাদি তৈরি শিল্প; মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আলু হিমায়িতকরণ শিল্প, প্রসাধনী সামগ্রী প্রস্তুত শিল্প, ব্যাটারি উৎপাদন শিল্প, সাবান কারখানা, পিচবোর্ড ও কাগজের দ্রব্য প্রস্তুত কারখানা, বিভিন্ন ধরনের সংযোজন ও মেরামত কারখানা, পোশাক তৈরি শিল্প প্রভৃতি কয়েক হাজার শিল্প- যার মধ্যে ১৯৭০ সালে সরকারীভাবে রেজিস্ট্রিকৃত ছিল সাড়ে তিন হাজারের উপর, আর চীফ ইনসপেক্টর অব ফ্যাক্টরীজ এন্ড এষ্ট্যাবলিশমেন্টস-এর ১৯৬৯ সালের রেকর্ড অনুযায়ী ছিল ৫,৫৪১টি শিল্প প্রতিষ্ঠান। ১৯৭০ সালে চলচ্চিত্র গৃহের সংখ্যা ছিল ১৬৬টি।

আরও ছিল অগণিত হস্তচালিত তাঁত (সরকারীভাবে স্বীকৃত হ্যান্ডমুল ফ্যাক্টরী ছিল প্রায় সাড়ে সাত শত) শিল্প ও বিভিন্ন কুটির শিল্প, অলংকার প্রস্তুত শিল্প, বিড়ি তৈরি কারখানা, নির্মাণ শিল্প, টেইলারিং সপ, বই বাঁধাই কারখানা ইত্যাদি। যাতে নিযুক্ত ছিল লক্ষ লক্ষ শ্রমিক। এর পাশাপাশি ছিল হাজার হাজার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও দোকান। ছিল ইম্পোর্ট-এক্সপোর্ট ব্যবসা, ক্লিয়ারিং-ফরোয়ার্ডিং ব্যবসা, ক্যারিং ব্যবসা, কনসাল্টিং ফার্ম, ব্যাংক ও বীমা শিল্প ইত্যাদি। ১৯৬৯-৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আমদানী ও রপ্তানী বাণিজ্যের টাকার পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১৮১ কোটি ও ১৬৭ কোটি টাকা। সে সময়ে এক টন পাটজাত দ্রব্যের গড় রপ্তানী মূল্য ছিল ১,৫৫৫৩.০০ টাকা ও এক টন কাঁচা পাটের গড় রপ্তানী মূল্য ছিল ১,২২৩.০০ টাকা এবং এক পাউন্ড চা-র গড় রপ্তানী মূল্য ছিল এক টাকা পঞ্চাশ পয়সার মত। প্রশ্ন হচ্ছে, পুঁজির বিকাশ ছাড়া এসব হল কী করে? আর এর থেকে কি পূর্ববতী সামাজিক অবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটেনি?

রাশ ব্রুক উইলিয়াম ১৯৭১ সালে লিখেছেন- ‘আমার পর্যবেক্ষণ আমাকে এই উপসংহার টানতে বাধ্য করেছে যে, মাত্র শতাব্দীর এক চতুর্থাংশ অর্থাৎ ২৫ বছরের মধ্যে পাকিস্তান যেভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অগ্রগতির নতুন দিগন্ত রচনা করেছে অতীতের লম্বা ইতিহাসের কোন পর্যায়েই এমন অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। সফল স্থাপনা কাপতাইবাধ, চট্টগ্রামকে প্রধান সামুদ্রিক বন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠা, চন্দঘোনা পেপার মিল, ফেঞ্জুগঞ্জ সার কারখানা যা পাকিস্তানের যে কোন স্থানে নির্মিত হতে পারত। কিন্তু সেটা ছিলো কেন্দ্রের উদ্যোগ। কেন্দ্রের উদ্যোগে প্রাইভেট সেক্টরেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।’
১৯৬৭-৬৮ সাল নাগাদ ৯২৭টি বৃহৎ শিল্প ৬ শতাংশ জিডিপি অর্জন করে। (সি এম আই রিপোর্ট ইসলামাবাদ ১৯৬৯) ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আরো অগ্রগতি হয়েছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এবং শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে পঞ্চম বাহিনীর নায়ক শেখ মুজিব যখন বিষোদগার করছেন তখন পর্যন্ত ৭৯টি জুট মিল, ৪২টি কটন মিল ২০টি চিনির মিল, তিনটি সার কারখানা, ২টি পেপার মিল, একটি নিউজ প্রিন্ট মিল, দুটো পেপার বোর্ড মিল, ২টি রেয়ন মিল, একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরী, একটি মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী, একটি রিফাইনারী এবং অসংখ্য চামড়া ট্যানিং ফ্যাক্টরী প্রতিষ্ঠিত ছিল। তখন পর্যন্ত পিচঢালা সড়ক নির্মিত হয়েছিল ৩ হাজার মাইল। রেল পথ বর্ধিত হয়েছিল ১৮০০ মাইল পর্যন্ত এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১ লক্ষ কিলোয়াট। জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ হয়েছিল ১৯৫০ সালেই। উচ্চ বর্ণের হিন্দু সাংসদদের বিরোধিতা সত্ত্বেও মুসলিম বায়তদের মালিকানা স্বত্ব প্রদান করা হয়। স্থবির কৃষি সেক্টরে প্রাণ চাঞ্চল্যের সূচনা করা হয়েছিল এমন ভাবে যে, দুর্ভিক্ষ কোন দুর্ভিক্ষই তার কালো হাত বাড়াতে পারেনি। ষাটের দশকে পূর্ব বাংলা খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হয়।

১৯৪৭ সাল নাগাদ যেখানে পুর্ব বাংলায় মাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয় একটি ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল, অর্ধডজন ডিগ্রি কলেজ ছিল সেখানে পাকিস্তান যুক্ত করেছ ৫টি বিশ্ববিদ্যালয় (তিনটি সাধারণ, একটি ইঞ্জিনিয়ারিং এবং একটি কৃষি)। এছাড়া এখানে ৩টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ৬টি ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল ১৭টি পলিটেকনিক এবং ৭টি মেডিক্যাল কলেজ, ৪টি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ’৭১ সালে। ১৯৪৬ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং ষাটের দশকের শুরুতে মোনয়েম খান যখন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রী ছিলেন তখন তিনি ৭টি মেডিকেল স্কুলকে কলেজ ঘোষণা করেন। পরে গভর্নর হয়ে এ ঘোষণা কার্যকর করেন। এবং অসংখ্য মেডিক্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠিত করা হয়। বিজ্ঞান কলা ও বাণিজ্য অধ্যয়নের জন্য ২ শতেরও অধিক কলেজ প্রতিষ্ঠিত করা হয়। শিক্ষিত হিন্দুরা দেশ ত্যাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষিতের হার ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়। পাকিস্তান আমলে শিক্ষিতের হার দাঁড়ায় ১৯ শতাংশ অথচ পশ্চিম পাকিস্তানে শিক্ষিতের হার ছিল ১৮ শতাংশ।

১৯৪৯-৫০ সালে পাকিস্তানের পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। যারা লিখিত পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে এমন বাংলাভাষী ৪০ জনকে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন শাখায় নিয়োগ দেয়া হয় সরকারী নির্দেশে। ১৯৪৯-৫০ সালে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মেধা ভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয় ২০ শতাংশ বাকী ৮০ শতাংশ পদ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেয়া হয়। (R Symond, the British and their Successors 44-90) অথচ পূর্ব পাকিস্তানের কতিপয় পরিচিত মুখ এর বিরোধিতা করে। ষাটের দশকের মধ্যভাগ থেকে সিএসপিদের ৩ বছর কম সময় অতিক্রান্ত হলে তাদের নিজ প্রদেশে প্রত্যাবর্তন করানো শুরু হয়। ১৯৫৫ সালের প্রাথমিক পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানী সিএসপির অনুপাত ৩৫ শতাংশে পৌছে। ১৯৭১ সালে নাগাদ এদের সংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানীদের সমপর্যায়ে উন্নীত হয়। ১৯৪৭ সালে এখানে কয়েকজন কমিশন অফিসার, ৫০/৬০জন জুনিয়র কমিশন এবং ২০০ জন জোয়ান ছিল। ১৯৭১ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০ হাজারে।

হিন্দু প্রতিযোগীদের অবর্তমানে মুসলমানরা ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অগ্রগতি ও বিস্তৃতির যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছিল। পাকিস্তানোত্তর পূর্ব বাংলার মুসলমানদের মধ্যে খুব দ্রুত শিক্ষার বিস্তৃতি ঘটে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অর্জন করেছে নবতর মর্যাদা। যেমন এর আগে হিন্দুদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে হীনমন্যতা অনুভব করতো, খুব সহজে এই হীনমন্যতা অতিক্রম করেছে। (জিপি ভট্টাচার্য ১৯৭৩, ১১৯, ২০) শুরু থেকে হিন্দুরা মুসলমানদের এই উত্থান অসহ্য মনে করেছে।

স্বাধীনতার প্রথম পর্যায়ে পাকিস্তানের সব মুসলমানই ভাবতে শুরু করে তারা উচ্চ শ্রেণীর, তারা শাসকের বংশধর এবং হিন্দুরা তাদের অধীন। একজন ঠেলাগাড়ী চালক ও একজন প্রভাবশালী হিন্দুকে একথা বলার সাহস রাখতো যে আপনাদের দ্বিধা সংকোচের কোন কারণ নেই, নির্ভয়ে চলাফেলা করুন। কেননা মুসলমানরা অর্থাৎ তারা শাসক এবং হিন্দুদের নিরাপত্তা দেয়া তাদেরই দায়িত্ব। এটাই ছিল মুসলমানদের মানসিকতার প্রাণবন্ত উত্থান। (পিসি লাহিরী  ১৯৪৬ : ৮-৯)

পরিস্কার ভাবে একথা বলা যায় যে, পাকিস্তান সামাজিক অর্থনৈতিক মনস্তাত্বিক মুক্তির ব্যাপারে কয়েক শতাব্দী রুদ্ধ দ্বার উন্মুক্ত করেছে যা তাদের মধ্যে এনে দিয়েছে সার্বিক উন্নয়নের সামর্থ। এতদ্সত্বেও এটা ঠিক যে, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বৈষম্য নিয়ে পাকিস্তানের যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং সেই বৈষম্য পূর্ণাঙ্গভাবে দূরীভূত করা তখনও সম্ভব হয়নি।


বৈষম্য নিরসনের উদ্যোগ
পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য অনাকাঙ্খিত হলেও এটা অস্বাভাবিক ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তান বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন হয় পলাশীর শত বছর পর। যে কারণে বাংলার মানুষ যেভাবে বৃটিশ এবং তাদের সহযোগী বর্ণ হিন্দুদের ধারাবাহিক নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং সামগ্রিক ভাবে তেমন শোষণ বঞ্চনার সম্মুখীন হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানে বাংলার মত কোন হিন্দু জমিদারের নিষ্পেষণ এবং মহাজনদের দৌরাত্ব ছিল না। অথবা বাংলার মত আধুনিক শিক্ষা ও কর্মের ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ ছিল না। তদুপরি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে সেখানে কখনো প্রশাসনিক ঔদাসীন্যও পরিলক্ষিত হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানের এলাকা সমূহে কৃষি ব্যাপক সেচ সুবিধা পেয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য অবকাঠামো গত সুবিধা থেকে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল লাভবান হয়েছে। মোটের উপর দ্রুত অথনৈতিক অগ্রগতি অর্জনের প্রয়োজনীয় উপাদান সেখানে মওজুদ ছিল। (জিপি ভট্টাচার্য, ১৯৭৩ : ১১৯-২০)

১৯৪৮ সালের মার্চে পূর্ব পাকিস্তান সফর কালে জিন্নাহ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য অনাকাঙ্খিত বলে উল্লেখ করেন। তিনি সহযোগিতা প্রদান এবং ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়ে যতদ্রুত সম্ভব পূর্ব ও পশ্চিমের বৈষম্য দূরীকণের আশ্বাস দেন। কায়দে আযমের এই আশ্বাস সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে গুরুত্ববহ হয়ে উঠে। ১৯৫৬ এবং ৬২ সালে উভয় সংবিধানে রাষ্ট্রের উভয় অংশের মধ্যকার বিরাজমান বৈষম্য দূরীকরণের এবং জাতীয় পরিষদে এ ব্যাপারে পর্যালোচনা করার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

আইয়ুব খান ১৯৪৮ সালে জানুযারীতে যখন পূর্ব পাকিস্তানের জিওসির দায়িত্ব প্রাপ্ত হলেন তখন এখানে সেনা বাহিনীর মাত্র ৫টি কোম্পানী সহকারে দুটো ব্যাটেলিয়ান ছিল। জেনালের আইয়ুব তার আত্মজীবনী ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার’স গ্রন্থে লিখেছেন- ‘সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে কোন টেবিল চেয়ার বা ষ্টেশনারী ছিল না, বলতে গেলে আমাদের কিছুই ছিল না। এমনকি পূর্ব পাকিস্তানের একটি মানচিত্র পর্যন্ত ছিল না। পূর্ব পাকিস্তান সফরকালে জিন্নাহ সেনাবাহিনীতে অধিক সংখ্যক পূর্ব পাকিস্তানের জোয়ানদের নিয়োগ দেয়ার জন্য ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং একজন পূর্ব পাকিস্তানী মেজর আব্দুল গণিকে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠন করার দায়িত্ব প্রদান করেন। পরবর্তীতে ডকিং সুবিধা সহ একটি নেভাল বেজ চট্টগ্রামে স্থাপন করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের তরুণদের রিক্রুটের জন্য একটি ডিপো, অনেক বিক্রুটিং সেন্টার এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনা করা হয়। অন্য আর একজন পূর্ব বাংলার কর্নেল আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীকে পূর্ব পাকিস্তানের তরুণদের যুগোপযোগী দক্ষ হিসেবে ভবিষ্যত নেতৃত্বের জন্য গড়ে তোলার ব্যাপারে ক্যাডেট কলেজ স্থাপনের দায়িত্ব অর্পন করা হয়। ৬৯ থেকে ৭১ সালের মধ্যে ৪টি রেজিমেন্ট গড়ে তোলা হয় শুধু মাত্র পূর্ব পাকিস্তানীদের নিয়ে। এর উপরে পাঞ্জাব, বেলূচ এবং ফ্রন্টিয়ার রেজিমেন্ট গড়ে তোলার সময় ২৫ শতাংশ পূর্ব পাকিস্তানীকেও রিক্রুট করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানীদের এত দ্রুত নিয়োগ দেয়া হচ্ছিল যে, ঢাকার ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার সেনাবাহিনীর মান হ্রাস হওয়ার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

আইয়ুব শাসনামলের প্রাথমিক পর্যায়ে দেখা গেছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দৌড়ে পূর্ব পাকিস্তান অনেক পিছিয়ে রয়েছে। পুর্ব পাকিস্তানের মাথা পিছু গড় আয়ের বৃদ্ধি সত্ত্বেও এখানকার তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বেশী। এটা সম্ভব হয়েছিল প্রাথমিক পর্যায়ের সুযোগ সুবিধা ও অবকাঠামো থাকার কারণে স্বাভাবিকভাবে গড় পড়তা আয়ের ক্ষেত্রে উভয় প্রদেশের মধ্যে বৈষম্য ব্যাপক হতে থাকে। ১৯৫১-৫২ সালে গড় পড়তা আয়ের ক্ষেত্রে বৈষম্য ছিল ১৮ শতাংশ, ১৯৬৭-৬৮ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৩০ শতাংশে দাঁড়ায়। (রিপোর্ট অব দি প্যানেল ইকোনমিস্ট অন দি সেকেন্ড ফাইভ ইয়ার প্ল্যান) কেন্দ্রীয় সরকারের প্লানিং কমিশনের মধ্যকার বেশ কিছু পূর্বপাকিস্তানী অর্থনীতিবিদ এবং অর্থনৈতিক মন্ত্রণালয় মনে করে গড়পড়তা আয়ের পার্থক্য সূচিত হয় অধিক হারে বিনিয়োগ এবং পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পদ পাচারের কারণে। দৃষ্টিভঙ্গীগত পার্থক্যের জন্য তারা বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও ধারণার আশ্রয় গ্রহণ করে। পশ্চিম পাকিস্তানী সহযোগীরা তাদের কিছু অভিযোগের ব্যাপারে বাধ সাধে। এর জবাবে তারা অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলে যে, কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনার ব্যয় প্রতিরক্ষা সেক্টরের ব্যয়, আন্ত প্রদেশ বাণিজ্য উদ্বৃত্ত এবং ব্যাঙ্কিং ও বীমার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হচ্ছে। (ইসলামিক রিলেসন বিটুইন ইষ্ট এন্ড ওয়েষ্ট পাকিস্তান) তাদের বিদ্যমান বৈষম্যের ব্যাপারে এবং তাদের বিশ্লেষনের ব্যাপারে বিপরীত মত ছিল না। ক্রমে বিতর্ক গুরুত্ববহ হয়ে উঠে। কেন্দ্রীয় সরকার বৈষম্য বিরোধী পদক্ষেপ নেয়ার ফলে যখন কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ব পাকিস্তানীদের প্রতিনিধিত্বের আশানুরূপ অগ্রগতি হচ্ছিল তখন পূর্ব পাকিস্তানী অর্থনীতিবিদদের বিলাপ বেসুরো হয়ে বাজছিল।

সরকারের সিনিয়র অর্থনৈতিক উপদেষ্টাদের দ্বন্দ্ব চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপকরা পশ্চিম পাকিস্তানের কথিত ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠে। এদেরই একজন প্রস্তাব দেয় যে, পাকিস্তানের দুই অংশের জন্য দুটো অর্থনীতি পৃথকভাবে সংগঠিত ও পরিচালিত করতে হবে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব বিষয়টির উপর গুরুত্বরোপ করেন এবং অর্থনীতি পৃথকীকরণের পক্ষে কাজ শুরু করেন। ১৯৬২ সালের প্রথমার্ধে শিল্প, রেল বিদ্যুৎ ও পানি যা কেন্দ্রীয় সরকারের অধিক ব্যয়ের খাত সেসব প্রাদেশিক সরকারের অধীনে ন্যাস্ত করা হয়। এসব হল পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন, পাকিস্তান রেলওয়ে বোর্ড এবং পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন সংস্থা। প্রাদেশিক  সরকারকে সংশ্লিষ্ট বিভাগ উন্নয়নের পরিকল্পনা নেয়া এবং এসব বাস্তবায়নের অধিকার দেয়া হয়। ৭০ শতাংশ বিক্রয় কর সহ কেন্দ্রীয় সরকারের ৫৪ শতাংশ ট্যাক্স রেভিনিউ এবং অন্যান্য ট্যাক্স এবং ডিউটির সম্পূর্ণটাই পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ করা হয়। (এইচ জহির, ১৯৯৪ : ৯২-৯৩)

তদুপরি ১৯৬৩-৬৪ সালে পাবলিক সেক্টর উন্নয়ন ব্যয় ৫০ শতাংশে বর্ধিত করা হয়। এ সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ এবং বামপন্থী ছাত্ররা পূর্ব পাকিস্তানকে অবহেলা করার অভিযোগ উত্থাপন করে এবং নতুন যুক্তির অবতারনা করে বলে যে, অধিক বরাদ্দই যথেষ্ট নয়, এটা হতে হবে মাথা পিছু গড় আয়ের উপর ভিত্তি করে এবং আরো বলা হয় যে, বৈষম্য নিরসনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে আইন আদালত যদি শক্তি প্রয়োগ করতে না পারে তাহলে সেটা হবে অর্থহীন। এতদ্সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের অনুকূলে সরকারী উদ্যোগ অব্যাহত থাকে।

১৯৫৮-৫৯ সালে উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ১৯৬৬ কোটি টাকা, পূর্ব-পাকিস্তানের জন্য ছিল ২৫.০৯ কোটি টাকা। ১৯৬৬-৬৭ সালে বরাদ্দ করা হয় পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ৯৫.৪০ কোটি টাকা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ৩৬.৩৩ কোটি টাকা। আইয়ুব শাসনামলে কেন্দ্রীয় বাজেটের অধিক পরিমাণ বরাদ্দ করা হয় পূর্ব পাকিস্তানের জন্য। কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্কের ব্যাপারে রেইজ ম্যান রোয়েদাদ পরিবর্তন করা হয় এবং প্রদেশের অর্থনৈতিক উৎস বর্ধিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৯৬২-৬৩ সালে পূর্ব পাকিস্তানের রুরাল ওয়ার্কস প্রোগ্রাম শুরু করা হয়। পশ্চিম পাকিস্তানে শুরু হয় এক বছর পর। এই কর্মসূচীর জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানের জন্য অধিক পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়। তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার জন্য ৫২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। এর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ করা হয় ২৭০০ কোটি টাকা পক্ষান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ করা হয় ২৫০০ কোটি টকা। শিল্প উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য ট্যাক্স হলিডে ব্যবস্থা চালু করা হয়। পূর্বপাকিস্তান এটা ভোগ করে ৪-৬ বছর। অপর দিকে পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পোদ্যোক্তরা ট্যাক্স হলিডে ভোগ করার সুযোগ পায় ২-৪ বছর। আশা করা হয়েছিল এ অবস্থা চলতে থাকলে ১৯৮৫ সালের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সব ধরনের বৈষম্য দুর করা সম্ভব হতো। (জিপি ভট্টাচার্য-১৯৭৩ : ১৫২-৫৩)

১৯৬৮-৬৯ সালে উন্নয়ন ঋণ বরাদ্দ হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ১,০৬০ মিলিয়ন টাকা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ৭৮০ মিলিয়ন টাকা। ১৯৬৯-৭০ সালের উন্নয়ন ঋণ বরাদ্দ হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ১২৯০ মিলিয়ন পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ৯১০ মিলিয়ন। একই রকম দেখা যায় এক্সপোর্ট ক্রেডিটের ক্ষেত্রে ১৯৬৫-৬৬ থেকে ১৯৬৯-৭০ অর্থবছর অবধি পূর্ব পাকিস্তান গ্রহণ করে ২১০ মিলিয়ন ডলার পশ্চিম পাকিস্তান গ্রহণ করে ১৯২ মিলিয়ন ডলার (এল এফ রাস ব্রুক উইলিয়াম, ১৯৭৩ : ১৫২, ৫৩)

অতি প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আমদানীর ক্ষেত্রে সাবসিডি দেয়া হত। যেমন পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সিমেন্ট আমদানীর ক্ষেত্রে সাবসিডি দেয়া হতো। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে আমদানীর ক্ষেত্রে সাবসিডি দেয়া হতো না। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অধিক দামে পূর্ব পাকিস্তানের পণ্য বিক্রি করার সুযোগ দেয়া হত। যেমন পূর্ব পাকিস্তানের চা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ৭গুণ বেশী দামে পশ্চিম পাকিস্তানে বিক্রি হত। (অমৃতবাজার পত্রিকা, কোলকাতা ২৪ মে, ১৯৭৪) একাত্তরে যুদ্ধকালে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব পাবলিক এ্যাফেয়ার্সের চেয়ারম্যান আর পি কাপুর এর বক্তব্যে সবকিছু পরিস্কার হয়ে যায়। তিনি লিখেছেন- বাংলাদেশের ঘটমান পরিস্থিতির যৌক্তিক ব্যাখ্যা হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানীদের শোষণের ধুয়া তোলা হয় সেটা সর্বৈব অন্যায় এবং পরিস্থিতির অতি সহজ এবং লঘু ব্যাখ্যা।’ (আর পি কাপুর : ১৯৭১)

ওরা জানতো বিচ্ছিন্ন হলে কি ভয়ঙ্কর মূল্য দিতে হবে
একাত্তরের যুদ্ধকালে কোলকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উপর আলোকপাত করে ভবিষ্যৎবাণী করা হয় যে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভায়াবল অর্থাৎ টেকসই হবে না। অন্যদিকে বৈরি ভারতের অর্থনীতিবিদরা পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সমৃদ্ধ করার ব্যাপারে পাকিস্তানের অবদানকে স্বীকারই করেন না। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মাসখানেক আগে পশ্চিম বাংলার সিনিয়র অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে বলেন যে, ১৯৭১ সালের আগেকার অবস্থানও মর্যাদা বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে অর্জন করতে সক্ষম হবে না এবং বাংলাদেশীদের উদ্দেশে তিনি এই বলে উপদেশ দেন যে, তাদেরও অনগ্রসতার সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। (বাংলাদেশ ইকনমিক প্রবলেম এন্ড পার্সপেকটিভ) পাকিস্তানোত্তর এই বাংলাদেশে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেকটি মানুষের ঘরে ঘরে অর্থনৈতিক হতাশা ও বিপর্যয় আসতে দেরী হয়নি।

একাত্তরে গৃহ যুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রথম বছরেই বাংলাদেশ ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থনৈতিক সাহায্য পেয়েছিল। এতে বাংলাদেশের লাভ হয়েছিল ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটাই সবকিছু নয়। পাকিস্তানোত্তর বাংলাদেশ ২৩ বছরে পেয়েছে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এইড হিসেবে। অখণ্ড পাকিস্তান যে বৈদেশিক সাহায্য পেয়েছিল তার চার গুণ হল বাংলাদেশের এসব প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা। তদুপরি তথাকথিত শোষণ এবং পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পদ পাচারের অভিযোগের প্রশ্নতো আর নেই। তা সত্ত্বেও মুজিবের সোনার বাংলা আজ অবধি মরিচিকা হয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ণ প্রশাসন নিরীক্ষণ করে দিলাওয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ প্রশাসনের অধ্যাপক উইলিয়াম ডব্লিউ বয়ার উপসংহার টেনে লিখেছেন, পাকিস্তান আমলে এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক ভাল অবস্থায় ছিল। (ইভিনিং জার্নাল দেলাওয়ার) এমনকি ৮০’র দশকের শেষ দিকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন ৬০ এর দশকের পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প উৎপাদনের ৮৬ শতাংশের মত। (সি বাক্সটার এবং এস রহমান হিস্ট্রিকাল ডিকসনারী অব বাংলাদেশ ১৯৮৯ : ৬০-৬১) একাত্তরে সসস্ত্র সংঘাত শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী কূটনৈতিক আনওয়ারুল করীম চোধুরী মার্কিন কূটনীতিককে কোলকাতায় বলেছিলেন যে, বিশ্ববাজারের ক্রমহ্রাসমান পাটের চাহিদার প্রেক্ষিতে নিজস্ব অর্থনীতি নির্মাণের সামর্থ্য বাংলাদেশের সামান্যই অবশিষ্ট থাকবে। এটা দুর্বল এবং অস্থিতিশীল হতে বাধ্য। (আরখান, দি আমেরিকান পেপারস সেকরেট এন্ড কনফিডেন্সিয়াল ইনডিয়া পাকিস্তান বাংলাদেশ ১৯৬৪-৭৩) আমেরিকার নিজস্ব মূল্যায়নও অনুরূপ। আমেরিকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- ‘কেমন করে রাষ্ট্রটি সময়ের দীর্ঘ পরিক্রমায় তার মৌলিক চাহিদা পূরণ করবে। বাহিরের বড় অঙ্কের সাহায্য প্রদান করে হলেও এর অর্থনীতির উন্নতি বিধান করা উচিত।’

যখন বিচ্ছিন্নতা অথবা তথাকথিত স্বাধীনতার উন্মাদনা চরমে সে সময় কোলকাতার একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক জনৈক নেতৃপর্যায়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীর চোখ খুলে দেন এই বলে যে, বিভিন্ন উপলক্ষে আমি কয়েক বার পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বালাদেশ) সফর করেছি। সেখানকার মুসলিম মধ্যবিত্তের জীবন যাপনের মান দেখে আমি ইর্ষান্বিত হয়েছি। অনেক অধ্যাপক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী এবং অফিসারদের গাড়ী বাড়ীর মালিক হতে দেখে আমি হতবাক হয়েছি। তাদের অহরহ বিদেশ ভ্রমনের গল্প শুনে আমি ইর্ষা অনুভব করেছি। আপনি কি বলতে পারেন বাংলাদেশের মুসলমানরা তাদের উন্নত মানের সমৃদ্ধ জীবনের হাতছানি উপেক্ষা করে কেন স্বাধীনতা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল?

এর জবাব মিলেছে একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী বুদ্ধিজীবির পক্ষ থেকে : ভারতের পশ্চিম বাংলার সাথে তুলনা করা হলে দেখা যাবে আমরা পূর্ব বাংলার মধ্যবিত্তরা পাকিস্তান আমলে অনেক উন্নত ও বিলাস বহুল জীবন যাপন করেছি মুজিব নগর (কোলকাতা) থেকে ফেরার পর এটা আমরা অনুভব করেছি।
করাচী লাহোর ইসলামাবাদের বড় বড় মানুষরা কোলকাতা সফরের অনুমতি দিত না ভারত বৈরিতার কারণে, এই আশঙ্কায় যে পশ্চিম বাংলার সংস্কৃতি আমাদের বিভ্রান্ত করবে। এই কারণে আমরা পশ্চিম বাংলার সাথে আমাদের অবস্থার তুলনা করতে পারিনি। অন্যদিকে তারা আমাদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর, ছাত্র রাজনীতিবিদ ও অফিসারদের প্রায়ই পশ্চিম পাকিস্তান সফরের আয়োজন করতো পাকিস্তানের সংহতির নামে। পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্য বিত্তদের সাথে তুলনা করে আমরা নিজেদের অবহেলিত ও বঞ্চিত মনে করতাম। আমরা ছিলাম পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ, এই প্রেক্ষিতেই আমাদের অধিকাংশকে মুক্তি যুদ্ধ তাড়িত করেছে। (এম আর আখতার মুকুল, ১৯৮৪ : ১৬৮-৬৯)

নেতৃস্থানীয় আওয়ামী লীগ এমপি এবং শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত বন্ধু এম এ মুহাইমেন এর বক্তব্যও অনুরূপ। তিনি বলেন- ‘সীমান্ত পেরিয়ে আমরা পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যবিত্তবা উপলব্ধি করলাম, আমাদের অর্থনীতি এবং জীবন যাপনের মান কত উন্নত। পশ্চিম বাংলার মধ্যবিত্তের তুলনায় আমরা কত সুখী ও সমৃদ্ধ। এমনকি সে সময় অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারে টিভি এবং ফ্রিজ রয়েছে অথচ সীমান্তের ওপারে ৮০ শতাংশ মধ্য বিত্তের ঘরে এসব নেই। (দুই দশকের স্মৃতি, ১০৯)

এটা সত্য নয় যে, পূর্ব পাকিস্তানীদের পশ্চিম বাংলা ভ্রমণে বাধা ছিল। শুধুমাত্র ১৯৬৫ সালে পাক ভারত যুদ্ধের প্রেক্ষিতে জরুরী আইন বলবত থাকার সময় ছাড়া সবসময় পশ্চিম বাংলা অথবা ভারত সফরে বাধা ছিল না। কোলকাতার চিকিৎসকদের অবাধে ঢাকা সফরের উক্তিই পশ্চিম বাংলা সফরের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত উক্তিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। বাস্তবতার নিরিখে বিছিন্নতাবাদী পঞ্চম বাহিনীর মোহভঙ্গ হলেও নিজেদের ভুল পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তির অবতারণা করছে অন্যকে দোষারোপ করে। আমরা বিশ্বাস করি না যে এম আর আখতার মুকুল একাত্তরের আগে পশ্চিম বাংলায় পা রাখেননি। তিনি বহুবার পশ্চিম বাংলা সফর করেছেন। কিন্তু তার বোধোদয় হয়নি। এক দুর্নিবার মোহ তার মত অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে ভারতে। হতে পারে সেটা আবেগ জনিত কারণে অথবা প্রাপ্তি যোগের কারণে। যদি অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া অপরিহার্য হয়ে থাকে তাহলে পশ্চিম বাংলার ক্ষেত্রে সেটা আরো অপরিহার্য ছিল। ১৯৭২ সালে আনন্দ বাজার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসুর অভিযোগ সম্বলিত এক সংবাদে বলা হয়েছে, সেখান থেকে কেন্দ্র ৫০০ কোটি টাকা আয় করলেও দিল্লী পশ্চিম বাংলাকে ৫০ কোটি টাকা প্রদান করে। এমন অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোলকাতার বুদ্ধিজীবি ও রাজনীতিকরা দিল্লী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা  স্বপ্নেও ভাবেনি কেন?

(বইটির pdf version download করুন এখানে)

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh