Home EBooks দুই পলাশী দুই মীরজাফর অধ্যায় ১২: যুক্ত ফ্রন্ট গঠনের নেপথ্যে

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ১২: যুক্ত ফ্রন্ট গঠনের নেপথ্যে Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:22

যুক্ত ফ্রন্ট গঠনের নেপথ্যে
প্রায় ২শ’ বছর বৃটিশ হিন্দুর যৌথ ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত হয়ে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত পূর্ববাংলার মানুষ আবেগপ্রবণ হয়ে উঠে। যৌক্তিক মানসিকতাকে উন্মাদনা ঘিরে ধরে। আর উন্মাদনা সৃষ্টির জন্য কোন নীতি অথবা কৌশলের প্রয়োজন পড়ে না। আবেগময় বক্তব্য, ভিত্তিহীন গুজব এবং অকল্পনীয় মিথ্যাচারই এর জন্য যথেষ্ট। এসবের অনুশীলন শুরু হয় পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম প্রভাত থেকে। দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমিউনিস্ট কর্মীরা এ কারণেই এ জাতির আবেগ নিয়ে খেলবার সুযোগ পায়।

দেশপ্রেমিক ইসলামী শক্তি ভাষা আন্দোলনের সূচনা করলেও আন্দোলনের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে এর নিয়ন্ত্রণ এসে পড়ে কমিউনিষ্টদের হাতে। তৎকালীন হিন্দুস্থানে কমিউনিস্টদের উপর দলন পীড়ন অব্যাহত থাকলেও দিল্লী পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিষ্টদের পৃষ্ঠপোষকতা দান করে শুধুমাত্র পাকিস্তানকে ধ্বংস করার জন্য। কমিউনিষ্ট নেতৃত্বের মূলে হিন্দু নেতৃবৃন্দ থাকার কারণে হিন্দুস্থানী সাহায্য অবারিত হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায়ে তারা রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পুরোমাত্রায় সক্রিয় হয়ে উঠে। প্রথমতঃ তারা বাঙালী জাতীয়তাবাদ কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক ধারার সূচনা করল পাকিস্তান থেকে বাংলাভাষীদের মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে। দ্বিতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে মুসলিম লীগকে পরাজিত করে রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করতে চাইল। নির্বাচনকে সামনে রেখে নেপথ্য থেকে তারা মুসলিম লীগ বিরোধী ফ্রন্ট গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করল। ‘এ পরিস্থিতিতে কমিউনিস্ট পার্টির সম্মুখে নতুন কর্তব্য এসে হাজির হল। কারণ যুক্তফ্রন্ট গঠনের নেপথ্যে মূল কাজটি সম্পাদন করে যাচ্ছিল কমিউনিষ্ট পার্টি। প্রকাশ্য রাজনীতিতে কার্যত নিষিদ্ধ এই পার্টি যুক্তফ্রন্ট গঠনে প্রধান ভূমিকা পালন করে তার মতাদর্শ প্রভাবিত ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন গণতন্ত্রী দল ও আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে কর্মরত শুভানুধ্যায়ীদের দ্বারা।' (মোহাম্মদ হান্নান : বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, পৃঃ ২৫)

কমিউনিস্ট পার্টি মূলত ছাত্র সংগঠনসমূহের মাধ্যমে রাজনৈতিক মেরুকরণ প্রক্রিয়া শক্তভাবে শুরু করে। ছাত্ররা কোথাও ঠান্ডা মাথায় রাজনীতিকদের যুক্তি দিয়ে প্রভাবিত করে, কোথাও চাপ প্রয়োগ করে আবার কোথাও ভীতি প্রদর্শন করে যুক্তফ্রন্ট গঠনের তাগাদা দিতে থাকে। রাজনীতিতে শক্তি প্রদর্শনের নতুন ধারার সূচনা হয় সেই সময় থেকে। রাজনীতিকরা ছাত্রদের পথনির্দেশ করার বদলে রাজনীতিকরাই পরিচালিত হতে থাকে লঘুচেতা ছাত্রদের ধারা মত। বলতে গেলে তখন থেকেই শুরু হয় এই অশুভ প্রবণতা। ‘দলগতভাবে কৃষক শ্রমিক পার্টি এবং এ কে ফজলুল হক যুক্তফ্রন্ট গঠনের বিরোধী ছিলেন। ছাত্ররা এ ব্যাপারে এক বিরাট বিক্ষোভ মিছিল সংগঠিত করে এবং শেরে বাংলার বাসভবন ঘেরাও করে রাখে। শেষ পর্যন্ত ফজলুল হক যুক্তফ্রন্টের ব্যাপারে তার মতামত পরিবর্তন করলে ছাত্ররা তাকে কাঁধে নিয়ে উল্লাস করতে করতে ফিরে আসে।’ (প্রাগুক্ত পৃষ্ঠা, ২৫)

সাধারণ দৃষ্টিতে দেখতে গেলে মনে হবে যুক্ত ফ্রণ্ট সরকার বিরোধী একটি জোট, মুসলিম লীগের ব্যর্থতার উপর যারা রচনা করতে চেয়েছিল সাফল্য এবং সুখ সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত। কিন্তু নেপথ্য থেকে যারা যুক্তফ্রন্ট গঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। তাদের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল সাংগঠনিক শক্তি মুসলিম লীগকে ধ্বংস করা, পাকিস্তানের আদর্শিক চেতনা থেকে জনগণকে বিচ্ছিন্ন করা এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে প্রকট করে তোলা। কালক্রমে সমস্যা ও সংকটের ভারে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত পাকিস্তানকে ম্রিয়মান করে তোলা। যে কারণে ‘যুক্তফ্রন্টে নেজামে ইসলাম দলকে গ্রহণ করার ব্যাপারে ফ্রন্টের মূল সংগঠকদের আপত্তি ছিল। ফজলুল হক নতুন জটিলতার অবতারণা করেন। তিনি দাবী করেন ফ্রন্টে নেজামে ইসলামকে নিতে হবে। এ দলকে ছাড়া তিনি যুক্তফ্রন্টে যাবেন না। বস্তুত যে লক্ষ্য উদ্দেশ্য নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন হতে যাচ্ছিল, তাতে নেজামে ইসলামকে নেয়ার ব্যাপারে নৈতিক প্রশ্ন জড়িত ছিল। কিন্তু শেরে বাংলা ফজলুল হককে ছাড়াও যুক্তফ্রন্টের মূল উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। ফলে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সঙ্গে জড়িত দলগুলো নেজামে ইসলামকে নিতে শেষ পর্যন্ত রাজী হল।

কিন্তু নেজামে ইসলাম যুক্তফ্রন্টের সদস্য হয়েই প্রথম কমিউনিষ্ট পার্টি সম্পর্কে আপত্তি তুললে শেরে বাংলা ফজলুল হক তাকে সমর্থন করেন। ফলে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী লড়াই সম্পর্কে জটিলতার উপাখ্যানের অবতারণা হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগের মওলানা ভাসানী, খেলাফতে রাব্বানী পার্টির আবুল হাশিম গণতন্ত্রী দলের মাহমুদ আলী প্রমুখ কমিউনিস্ট পার্টিকে জোটে নেয়ার পক্ষে জোর প্রচেষ্টা চালান। (প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৫)
এমনি টানাপোড়নের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি যুক্তফ্রন্ট থেকে দূরে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তফ্রন্টকে টিকিয়ে রাখে। কোন ঠুনকো অজুহাতে ফ্রন্ট ভেঙ্গে গেলে কমিউনিস্ট পার্টির সমস্ত নেপথ্য পরিকল্পনা ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এ কারণে কমিউনিস্টরা কোন বিতর্কের অবতারণা না করে নীরবে সরে গেলেন। কিন্তু ফ্রন্টের উপর তাদের অদৃশ্য কর্তৃত্ব কখনোই খর্ব হয়নি। যুক্তফ্রন্টের সাথে সংশ্লিষ্ট দেশপ্রেমিক যারা ছিলেন তাদের দূরদর্শিতার অভাব এবং চিন্তার সীমাবদ্ধতার কারণে কমিউনিস্ট পার্টি এবং পঞ্চমবাহিনীর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য আঁচ করতে পারলেন না। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। যুক্তফ্রন্ট ২১ দফা কর্মসূচী নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগ তার সীমাবদ্ধতার কারণে অঙ্গীকার পূরণ করতে না পারায় জনগণের মধ্যে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সেটাকে পুরোপুরি কাজে লাগাল যুক্তফ্রণ্ট। স্বাধীনতা উত্তর মুসলিম লীগের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সংগঠন প্রসারিত না হয়ে সংকুচিত হয়ে পড়ে।

সীমাবদ্ধ সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে সর্বদলীয় ঐক্যবদ্ধ আক্রমণের মোকাবেলা করা মুসলিম লীগের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠেনি। পঞ্চমবাহিনী, হিন্দু জনগোষ্ঠী এবং কমিউনিস্ট পার্টি যা চেয়েছিল, নির্বাচনী ফলাফল তার চেয়েও চমকপ্রদ হয়েছিল। যারা মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে সংগঠিত হয়েছিল তাদের মধ্যে আগে থেকেই ছিল অন্তর্বিরোধ। স্বাভাবকিভাবে ক্ষমতার ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে কখনো নেপথ্যে, কখনো প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

হক সাহেবের মতিভ্রম
১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। যুক্তফ্রন্টের চমকপ্রদ বিজয় ফজলুল হককে দারুণভাবে উৎসাহী করে তুলে। এই অভূতপূর্ব বিজয়ের পেছনে যে শক্তিসমূহ সক্রিয় ছিল তিনি তাদেরকে সন্তুষ্ট রেখেই সম্ভবত রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অনেকটা সুবিধাবাদীর মত। এ ধরনের সুবিধাবাদী চরিত্রের প্রতিফলন তার অতীত কর্মকাণ্ডেও দেখা গেছে। ক্ষমতা হাতে পেয়েই ফজলুল হক পশ্চিম বাংলা সফরে গেলেন সেখানে তাকে মোহিত করার মত বিপুল সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল। এটা যে ছিল ব্রাহ্মণ্য চক্রের সাজানো নাটক, সেটা তিনি বুঝলেন না। আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠলেন। তার সংবর্ধনার জবাবে তিনি বললেন-
‘রাজনৈতিক কারণে বাংলাকে বিভক্ত করা যাইতে পারে। কিন্তু বাংলার শিক্ষা সংস্কৃতি এবং বাঙালীত্বকে কোন শক্তিই কোন দিন ভাগ করিতে পারিবে না। দুই বাংলার বাঙালী চিরকাল বাঙালীই থাকিবে।’ ফজলুল হকের এই উক্তি যেন উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা সরদার প্যাটেলের উক্তির পুনরাবৃত্তি। ভারত খন্ডিত হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে সরদার প্যাটেল বিলাপ করেন এই বলে- Today the partition of India a settled fact and yet it is an unreal fact. The partition would remove the poison from the body politic of India... India is one an indivisible. One cannot devide the sea or split running water of a river. (G. W. Chawdhury: Pakistun Relation with India, Page: 84)

শেরে বাংলা এর মধ্যে আর এক ধুয়াশার সৃষ্টি করেন। ‘নিউইয়র্ক টাইমস সংবাদদাতা মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলার সহিত সাক্ষাৎকারের বিবরণীতে বিচ্ছিন্নতা-বাদের আভাস দান করেন। মিঃ কালাহানের এক প্রশ্নোত্তরে শেরে বাংলা নাকি বলিয়াছিলেন ‘পূর্ববাংলা স্বাধীনতা ঘোষণা করিবে।’ (অলি আহাদ জাতীয় রাজনীতি : ২১৬)

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার জন্য কমিউনিষ্ট এবং পঞ্চম বাহিনী চক্র কর্ণফুলী পেপার মিলে বাঙালী অবাঙালী দাঙ্গার সৃষ্টি করে। এর উদ্দেশ্য অন্য একটি ছিল পাকিস্তানের একমাত্র পেপার মিলকে অচল করে দেয়া। এশিয়ার সর্ববৃহত পাটকল আদমজী জুটমিলে একইভাবে দাঙ্গার সূচনা করা হয়। এতে প্রায় দেড় হাজার শ্রমিকের মৃত্যু হয়। যদিও যুক্তফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ কেন্দ্রীয় সরকারকে দায়ী করে, কিন্তু সমকালীন পর্যবেক্ষকদের ধারণা ছিল উল্টো। শুরু থেকেই এদেশের শ্রমিকদের উপর বামপন্থীদের প্রাধান্য ছিল। বাংলাভাষী শ্রমিকদের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির যেমন প্রভাব ছিল অবাঙালী শ্রমিকদের মধ্যে তাদের প্রভাব ছিল আরো বেশি। রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের জন্য তারা পরিকল্পিতভাবে দাঙ্গার সৃষ্টি করে। পাকিস্তানকে বিশৃংখল করে তোলার জন্য হিন্দুস্থানও ইন্ধন যোগাতে কার্পণ্য করেনি। আবার শেখ মুজিবকে মন্ত্রীসভায় না নেয়ার জন্য ফজলুল হকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার জন্য শেখ মুজিবও এর পেছনে পরোক্ষ মদদ দিয়ে থাকতে পারেন।

যাই হোক পাকিস্তান থেকে পূর্ববাংলাকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে পঞ্চমবাহিনী তৎপর হয়ে উঠে। এর পেছনে কমিউনিস্টদের তৎপরতা ছিল সবচেয়ে বেশি। বিচ্ছিন্নতার ধ্যান ধারণা কোলকাতার বর্ণবাদী হিন্দুরা পূর্ব বাংলায় পাচার করে। কমিউনিষ্ট নেতৃত্বে হিন্দু নেতৃবৃন্দের প্রাধান্য থাকায় তাদের মাধ্যমে বর্ণবাদী হিন্দুরা তাদের সাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণায় মার্কসবাদী দর্শনের রঙ ছড়িয়ে পূর্ববাংলার আবেগপ্রবণ তরুণদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলে। দৃষ্টান্ত হিসেবে দেবেন সিকদারের কথা বলা যায়- ‘দেবেন সিকদারের ১৯৫৬ সালের স্বাধীনতার দাবীর প্রশ্নটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে হয়তো, তবে এ ব্যাপারে কোন বিতর্ক নেই যে, দেবেন সিকদার বরাবরই প্রথম থেকে বাংলার পূর্ণ স্বাধীনতার বিষয়টি পার্টিতে তুলেছেন এবং কর্মী মহলে প্রচার করেছেন। (মোহাম্মদ হাননান, বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, পৃঃ ৪৬)
‘১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রীয় কমিটির যে সম্মেলন কোলকাতায় আয়োজন করা হয়েছিল তাতে কুমার মৈত্র বাবু বাংলার স্বাধীনতার প্রস্তাব তুলেছিলেন।’ (দেবেন সিকদার উপমহাদেশে কমিউনিস্ট বিভ্রান্তি, পৃঃ ১১০)

পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম নেতা মওলানা ভাসানীও পিছিয়ে থাকলেন না। ১৯৫৭ সালে কাগমারীতে সাংস্কৃতিক সম্মেলন করলেন বিদেশী এবং বিজাতীয় মনিষীদের নামে অসংখ্য তোরণ নির্মাণ করে সংশ্লিষ্ট জাতিসমূহের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। সমকালীন পর্যবেক্ষকদের ধারণা কোন বিদেশী শক্তির ইংগিতে এবং তাদের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। এই সম্মেলনে সোহরাওয়ার্দীর উপস্থিতিতে ভাসানী পাকিস্তান থেকে পূর্ববাংলাকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচ্ছন্ন ইংগিত দিলেন। বললেন- ‘পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন আদায় না হলে আসসালামু আলাইকুম।’

মওলানা ভাসানীর ভারসাম্যহীন উক্তি প্রসঙ্গে নেজামে ইসলাম দলের সভাপতি মওলানা আতাহার আলী বলেন- ‘জনাব ভাসানী পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের মধ্যে বিদ্বেষ ও তিক্ততার প্রচারণা চালাইয়া ও পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান ইসলামী জামহুরিয়া হইতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ভয় দেখাইয়া ক্ষান্ত হন নাই, লেনিন গেট, গান্ধী গেট, সুভাষ গেট প্রভৃতি নামে তোরণ নির্মাণ করিয়া পাকিস্তানকে কি ধাঁচে গড়িয়া তুলিতে চান তাহার প্রমাণ দিয়াছেন। সমকালীন দৈনিক আজাদের সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করা হয়- ‘পাকিস্তান সম্পর্কে কোন পাকিস্তানীর মুখে পাকিস্তান বিচ্ছেদের মারাত্মক কথা যে এমন হালকাভাবে উচ্চারিত হতে পারে ইহা কে কবে ভাবিতে পারিয়াছিল?... পাকিস্তানের প্রতি ইহা রাষ্ট্রদ্রোহের উক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। (দৈনিক আজাদ, ১২ ফেব্রুয়ারী, ১৯৫৭)

যখন প্রত্যেকটি দল এবং অদূরদর্শী নেতৃবৃন্দ জনগণের আবেগে সুরসুড়ি দিয়ে আঞ্চলিক মনোভাব জাগিয়ে তোলার ব্যাপারে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছিল। সেই সময় ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে স্বায়ত্তশাসন দাবীর প্রস্তাব নেয়া হয়। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যে প্রস্তাবটি তিনিই তুলেছিলেন এবং আওয়ামী লীগের বিরোধিতা সত্বেও শেখ মুজিব তা সমর্থন করেছিলেন। স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব-উত্থাপনের মধ্যে দোষের কিছু নেই। কিন্তু এর নেপথ্যে যারা ছিলেন তাদের উদ্দেশ্য তো ভিন্ন ছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের রূপকার কমিউনিষ্ট পার্টির একটি রাজনৈতিক চিঠিতে (১৫ই জুলাই ’৬২) তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠে। এতে বলা হয়- ‘এই রাষ্ট্রের অন্তর্গত বিভিন্ন আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের আন্দোলণ যত জোরদার হইবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শগত ভিত্তিও তত দুর্বল হইবে।’ (বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, পৃঃ ৬৮)
পাকিস্তানের সংহতিতে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ প্রধান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এক সমাবেশে বিষয়টি উত্থাপন করে বলেন : ‘পূর্ব পাকিস্তানীদের মধ্যে প্রাদেশিকতার মনোভাব উস্কে দিয়ে কিছু ব্যক্তি নায়ক হতে চাচ্ছেন এবং এর ফলে পশ্চিম পাকিস্তানীদের মনে এমন ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে পূর্ব পাকিস্তানীরা তাদের সাথে একত্রে থাকতে চায় না।’ (সাপ্তাহিক বিচিত্রা ২৩ আগস্ট, ১৯৬৫)

কংগ্রেস নেতা মনোরঞ্জন ধর পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থান করে ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে পাকিস্তান ধ্বংস প্রক্রিয়ার আঞ্জাম দিতে থাকেন। উচ্চাভিলাষী এবং অদূরদর্শী মুজিবকে তারা তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য বেছে নেন। মুজিবের সামনে তুলে ধরা হয় এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। ১৯৫৬ সালে মুজিবের সাথে মনোরঞ্জন ধরের আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে কংগ্রেস-আওয়ামী লীগ গোপন চুক্তি হয় যা পঞ্চশীলা নামে পরিচিত। এ চুক্তি অনুযায়ী আওয়ামী লীগ কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হয়ে পৃথক নির্বাচন পদ্ধতি বাতিল করবে এবং সংবিধানের ইসলামী চরিত্র হনন করে তাকে ধর্ম নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক করতে হবে। এই সাথে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য সব ব্যাপারে সমান অধিকার নিশ্চিত করবে। (জ্যোতিসেন গুপ্ত হিসট্রি অব ফ্রিডম মোভমেন্ট ইন বাংলাদেশ) এই গোপন চুক্তির পর থেকে হিন্দু জনগণ এবং হিন্দুস্থানের সমর্থন ও সহযোগিতার দ্বার মুজিবের জন্য অবারিত হয়। তাকে সামনে রেখেই হিন্দুস্থান পাকিস্তানের চূড়ান্ত ভাঙন খেলার দিকে পরিস্থিতি এগিয়ে নিয়ে চলে। এদিকে পৃথক নির্বাচন বাতিল হওয়ায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এখানে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিণত হয়।

পাগলা-গারদে পরিণত হল পরিষদ কক্ষ
স্বার্থান্ধ সংকীর্ণ রাজনীতিকদের সমন্বয়ে গঠিত মুসলিম লীগ বিরোধী যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই দেশের মানুষকে হতাশ করল। জনগণের প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির যোগ হল না। বর্ণচোরা রাজনীতিকরা স্বমূর্তি ধারণ করলেন। দেশের মানুষের স্বার্থ সমুন্নত করার জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ নেয়া হল না। নির্লজ্জ দালালীতে মেতে উঠল সকলে। শুরু হল ক্ষমতার জন্য অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং নির্লজ্জ  প্রতিযোগিতা। ভাঙ্গা-গড়া চলতে থাকল সমানে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে গেল। খাদ্য সংকট তীব্র হয়ে উঠল। প্রশাসন ভেঙে পড়ল। একদিকে দুর্ভিক্ষের হাহাকার অন্যদিকে চলল ক্ষমতা দখলের নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা। তেজারতের পণ্য হয়ে উঠল রাজনীতিকরা। ক্ষমতার হাতবদল নিত্যনৈমিত্তক ব্যাপার হয়ে উঠল।

ক্ষমতাপাগল রাজনীতিকরা পরিষদ কক্ষকে পাগলা গারদে পরিণত করল। ২২ জুলাই স্পীকারকে পাগল সাব্যস্ত করেও প্রস্তাব গৃহীত হল। ডেপুটি স্পীকার শাহেদ আলী দায়িত্ব নিলেন। কিন্তু তাতেও স্বার্থান্ধ ক্ষমতা পাগলদের উন্মত্ততা থামল না। যদিও ফটো সাংবাদিকরা পরিষদ কক্ষের উন্মুক্ত অবস্থার চিত্র ধারণ করেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে শাহেদ আলীকে হত্যা করা হল ২৩শে সেপ্টেম্বরে। ডেপুটি স্পীকার শাহেদ আলী হত্যা প্রসঙ্গে তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য জনাব হাশিম উদ্দিন আহমদ অতি সম্প্রতি দৈনিক ইনকিলাবে সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে তিনি বলেন- ‘ডেপুটি স্পীকার শাহেদ আলী ছিলেন শান্ত স্বভাবের লোক। অপর দিকে স্পীকার আবদুল হাকিম ছিলেন শক্ত লোক। কারো ইচ্ছা অনিচ্ছায় সংসদ চালাতেন না। আবদুল হাকিমকে ষড়যন্ত্র করে আওয়ামী লীগের সদস্যরাই সরিয়ে দেয়। শাহেদ আলী কে এস পির লোক হলেও শান্ত স্বভাবের কারণে ক্ষমতাসীনরা তাকেই পছন্দ করে স্পীকারের আসনে বসায়। এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এসেম্বলিতে। শাহেদ আলী  এসেম্বলিতে ঢোকার সময় শেখ মুজিব ও মোহন মিয়া ধস্তাধস্তি করছিল। শাহেদ আলীকে ঢোকার সময় জিজ্ঞেস করলাম কেন এসেছেন? জবাবে শাহেদ আলী বললেন- আপনাদের দেখতে এসেছি। বিরোধী দলের সদস্যদের বিরোধিতায় শাহেদ আলী ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। খুব সম্ভব ভীতির কারণে তিনি আওয়ামী লীগের সদস্যদের বিরুদ্ধে কিছু বলার চেষ্টা করছিলেন ও কৃষক শ্রমিক পার্টি (কে এস পি) সদস্যদের কিছু বলার চেষ্টা করেন। বাজেট নাকি অন্য কোন বিষয়ে বলতে গেলে আওয়ামী লীগ সদস্যরা ভীষণ ক্ষেপে যান শাহেদ আলীর উপর। একটা পেপার ওয়েট নিক্ষিপ্ত হয় শাহেদ আলীর কপালে। কে মেরেছিল আন্দাজ করতে পারলাম না, উনি কপালে হাত চেপে ধরেছিলেন। তবে সেদিন শেখ মুজিব হাউসকে শান্ত করার পরিবর্তে গরম করেছিলেন সবচেয়ে বেশি। প্রথমেই দেখলাম চেয়ার নিয়ে স্পীকারের দিকে তেড়ে যেতে। মুজিবের অন্য সাঙ্গ পাঙ্গরা সাথে ছিল, পুরো অধিবেশনে ভীষণ হট্টগোল লেগে গেল। লাউড স্পীকার বন্ধ। পরে দেখলাম শাহেদ আলীকে রক্তাক্ত অবস্থায় পুলিশ তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তার কয়েকদিন পরে শাহেদ আলী পাটোয়ারী মারা গেলেন। (দৈনিক ইনকিলাব ২২ এপ্রিল, ১৯৯২)

সবকিছু দেখে সাধারণভাবে মনে হয় এসব ঘটনা ক্ষমতা প্রেমিকদের অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত। কিন্তু যারা এসব অপকান্ডের মাধ্যমে দেশকে হতাশার দিকে নিয়ে চলছিল তারা কিন্তু কাজ করছিল সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ছক ধরেই। উপমহাদেশের মুসলমানদের কাংখিত পাকিস্তান ছিল একটি ভুল পদক্ষেপ, এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন তারা। যুক্তফ্রন্ট শাসনামলে তারা আংশিক ভাবে সফলও হয়েছিলেন। তথাকথিত প্রগতিবাদীদের সপক্ষীয় লেখক ডক্টর এম এ হান্নান তার গ্রন্থে লিখেছেন- ‘১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পূর্ববাংলার রাজনৈতিক জীবনে এক ভয়ঙ্কর দুঃসহ যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। এর পেছনে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র ছিল এ সম্পর্কে কোন বিতর্ক নেই। কিন্তু তৎকালীন রাজনীতিবিদদের ছেলেমিপনা এবং দায়িত্বহীনতা সেদিন জাতিকে যেভাবে দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে নিপতিত করে দেয় তাতে একমাত্র প্রতিক্রিয়াশীলদের ঘাড়ে দোষ চাপালে আসল ঘটনা চাপা দেয়া হয় এবং বলা চলে সে সময় তাদের কাণ্ডজ্ঞানহীনতা ছিল প্রতিক্রিয়াশীলতারই নামান্তর। (বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, পৃঃ ৪৯)

সমকালীন রাজনৈতিক নেতা এবং দলসমূহের দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ড এবং  আত্মস্বার্থপরতার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে সামরিক আইন জারি হল, সামগ্রিক হতাশার মধ্যে আশার আলো দেখল মানুষ। পাকিস্তানের বিরোধিতা এবং সামরিক আইনের তীব্র সমালোচনা করেও জনাব এম এ হান্নান তার গ্রন্থে স্বীকার করেছেন- ‘তাই একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে প্রথম সামরিক আইন জারীর সংবাদ মানুষ শুধু মেনেই নিল না তারা এ থেকে অতিরিক্ত আশাবাদীও হয়ে উঠল। সারা দেশে কথিত দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সামরিক শাসন, সাধারণেরা ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবেই গ্রহণ করল। পাশাপাশি রাজনীতিবিদ ও ছাত্র নেতাদের নির্বিচার গ্রেফতার ও নির্যাতনকে মানুষ এ থেকে আলাদা করে দেখতে চাইল না।’ (প্রাগুক্ত, পৃঃ ৪৪)

 

বিচ্ছিন্নতাবাদী বাম তৎপরতার সাথে আওয়ামী নেতৃবৃন্দ
সামরিক বিপ্লবের সাথে সাথে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বেআইনী ঘোষিত হওয়ায় পরিস্থিতি অত্যন্ত শান্ত বলেই মনে হয়েছিল। দেশের পরিস্থিতি পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা সত্বেও অদৃশ্য প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রয়াস চলছিল সর্বত্র। ছাত্ররা সাংস্কৃতিক সংগঠনের আড়ালে তাদের প্রচারাভিযান এবং সাংগঠনিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছিল। বিশেষ করে কমিউনিস্টদের  তৎপরতায় প্রাণসঞ্চার হয়েছিল বেশি করে। এর কারণ এরা গোপন তৎপরতায় ছিল সিদ্ধহস্ত। এছাড়াও এদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং আদর্শিক লক্ষ্য থাকার কারণে নিয়মিত প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে দক্ষ রাজনৈতিক কর্মী সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এরাই সময়ের স্রোতধারায় এক সময় আবেগপ্রবণ ও মেধাশূন্য আওয়ামী লীগ কর্মীদের রাজনৈতিক গুরুতে পরিণত হয়। এরাই তরুণদের মধ্যে বিপ্লবের মন্ত্র দিতে থাকে। এদের প্ররোচনায় সামরিক বিপ্লবের পরবর্তী মাসে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার জামালপুরে ইস্টবেঙ্গল লিবারেশন পার্টি গঠিত হয়। কতিপয় আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ কর্মী সমন্বয়ে গঠিত এই গোপন সংগঠনের মূল লক্ষ্য ছিল সসস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে পূর্ববাংলাকে মুক্ত করা। ডিসেম্বরে নেত্রকোনা এবং টাঙ্গাইলে এর বিস্তৃতি ঘটে।

১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারীতে ব্রহ্মপুত্র নদীতে একটি বড় নৌকায় সংগঠনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫৯ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় এ পার্টি তার প্রথম শাখা খোলে। এরপর পার্টির নেতৃস্থানীয় কর্মীরা ভারতে চলে যায়। অস্ত্র ও অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভারত থেকে তারা কিছু পোস্টার ও প্রচারপত্র ছাপিয়ে আনে। এগুলি প্রধানত রাজনৈতিক নেতা ও প্রদেশের বিভিন্ন বার লাইব্রেরী, স্কুল ও কলেজের নামে ডাকে পাঠানো হতো। শেরেবাংলা এ, কে, ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ এদের তৎপরতা সম্বন্ধে অভিহিত ছিলেন। শেখ মুজিবের সাথে লিবারেশন ফ্রন্টের কর্মীরা যোগাযোগ রাখতো এবং শেখ মুজিব তাদের অর্থ সাহায্য করতেন তার একাধিক প্রমাণ পাওয়া যায়। (স্বাধীনতার দলিল অষ্টম খণ্ড, পৃঃ ৩১)

অন্য এক সূত্রে জানা যায়, এদের পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন সোহরাওয়ার্দীর সহকর্মী আবুল মনসুর আহমদ। ১৯৫৯ সালে এইসব অতি বিপ্লবীরা সোহরাওয়ার্দী এবং ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে এবং পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনার কথা বলে। দু’জনেই এ ব্যাপারে নিরুৎসাহী মনোভাব প্রদর্শন করে। কিন্তু আবুল মনসুর আহমদের সহযোগিতায় তারা ভারতীয় কূটনীতিক বি এম ঘোষের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং দিল্লীতে প্রধামন্ত্রী পণ্ডিত নেহেরুর সাথে কথা বলে। নেহেরু এ দেশের তরুণদের উৎসাহিত করলেও এজন্যে বৈষয়িক সাহায্য সহযোগিতা দেয়ার ব্যাপারে অঙ্গীকার করেননি। তবে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ তাদেরকে প্রচুর পরিমাণে প্রচারপত্র ছাপিয়ে দেয় এবং গোয়েন্দা বিভাগের সহযোগিতায় নিরাপদে সীমান্ত অতিক্রমের ব্যবস্থা করে। কিন্তু ফেরার পথে তারা তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানার কথা জানতে পারে। কয়েকজন গ্রেফতারও হয়। (মেজর রফিকুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট)

আটককৃত তরুনদের জবানবন্দী অনুসারে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে অভিযুক্ত করা হয়। কেন্দীয় গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের ভিত্তিতে ১৯৬২ সালের ৩০শে জানুয়ারী সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করা হয়। এই গ্রেপ্তারীর প্রতিবাদে ১লা ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেরিত পুলিশ কর্মকর্তার প্রতিবেদনে বলা হয়- ‘১৯৬১ সালের শেষার্ধ থেকে বে-আইনী ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হয়। সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী এ ব্যাপারে দুই দলের মধ্যে মধ্যস্থতা করেন। আওয়ামী লীগ থেকে শেখ মুজিব ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং কমিউনিষ্ট পার্টি থেকে মনি সিংহ ও খোকা রায় এসব গোপন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। আন্দোলনের প্রশ্নে কয়েক দফা কার্যক্রমের খসড়া তারা অনুমোদন করেন। ঠিক হয় আইয়ুবের প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্র জারী হওয়ার সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রদের দিয়ে প্রথম আন্দোলনের সূত্রপাত হবে এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীরা সম্মিলিতভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে দেবে।’
আন্দোলনের রূপরেখা ও কর্মসূচী প্রণয়ন করেছিল কমিউনিস্ট (পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি। বিচিত্রা ঈদ সংখ্যা, ১৯৭৭)

বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব কর্মসূচীতে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান দাবীকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি বৈঠকে বলেন- ‘ওদের সাথে আমাদের আর থাকা চলবে না। তাই এখন থেকেই স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

‘কমিউনিষ্ট পার্টি অবশ্য নীতিগতভাবে এ ব্যাপারে একমত ছিলেন। তারা মনে করতেন এ দাবীর মধ্যে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রশ্নটি নিহিত রহিয়াছে। ভবিষ্যতে পূর্ব পাকিস্তানে একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র গড়িয়া উঠা আমরা অস্বাভাবিক বা অসম্ভব মনে করি না।’ (খোকা রায়, সংগ্রামের ৩ বছর, পৃঃ ১৮২)

লাহোর প্রস্তাবের সংশোধন এবং এক পাকিস্তানের প্রস্তাবক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পঞ্চাশ দশকে পূর্ব পাকিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী চেতনার বিকাশে মর্মাহত হলেও এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাকে ঘিরেই বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পাকিস্তান ধ্বংসের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তিনি এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেন না কেন? যে শেখ মুজিবকে সোহরাওয়ার্দী ‘ইলিটারেট গ্রাজুয়েট’ হিসেবে অভিহিত করতেন, যে মুজিব সম্পর্কে তিনি বলতেন- ‘শেখ মুজিব যদি ঘটনাচক্রে দেশের সর্বোচ্চ নেতা হয় তাহলে সে প্রথম দেশ ধ্বংস করবে পরে তার নির্বুদ্ধিতার জন্য সে নিজেকেও ধ্বংস করবে।’ (কনসেপ্ট, ১৯৮৯), অপরিনামদর্শী শেখ মুজিব সম্পর্কে সঠিক ধারণা পোষণ করা সত্বেও সোহরাওয়ার্দী তাকে শুরু থেকেই প্রশ্রয় দিয়েছিলেন, তার অগ্রগতির সোপান রচনা করেছিলেন, তার সব অপকর্মে বৈধতার প্রলেপ দিয়েছেন এবং তার মাথার উপরে ছায়া বিস্তার করে রেখেছিলেন। কিন্তু কেন?

এর কারণ একটিই সেটা হল রাজনৈতিক সুবিধাবাদ। তার নিস্পৃহতার কারণে বিচ্ছিন্নতাবাদী চেতনা এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছিল যে, তিনি এর বিরুদ্ধে কঠোর হলেই তাকে অনেক নেতা ও কর্মীকে হারাতে হত। তিনি সর্বশেষ বার্তায় বিচ্ছিন্নতার ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার আহবান জানালেও তার দলে এর কোন প্রতিক্রিয়া হয়নি। তিনি মরে বেঁচে ছিলেন। বিশাল জন সমর্থনের সম্মান নিয়ে তিনি আজো বেঁচে আছেন। আর এই সোহরাওয়ার্দীই যদি আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতেন তাহলে হয় তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদের সহযোগী হতে হতো অথবা তার অনুসারীদের দ্বারাই তিনি প্রত্যাখ্যাত হতেন।

প্রয়োজন হল একটি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব
পাকিস্তান বিরোধী ভিন্ন চিন্তার উদগাতা মূলত কমিউনিস্ট পার্টি হলেও তারা এগুতে চাচ্ছিল অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপে এবং সুপরিকল্পিতভাবে ধারাবাহিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে। তারা পূর্ববাংলাকে বিচ্ছিন্ন করার মহাপরিকল্পনা নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপে এদেশের রাজনীতির উপর প্রভাব বিস্তার করে চলছিল। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মের মন-মানসিকতা বিষিয়ে তুলেছিল। সব রকম ঝুঁকি এড়িয়ে এমনভাবে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছিল যাতে পাকিস্তান সরকারের আক্রোশ তাদের উপর এসে না পড়ে। তাদের প্রয়োজন ছিল একজন লঘুচেতা আনাড়ী অদূরদর্শী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যাকে দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে সমুদয় কাজ করানো সম্ভব হবে। প্রথম তারা ভাসানীকে ব্যবহার করার চেষ্টা নেয়। তাকেই বামপন্থীরা রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। ঝানু কমিউনিষ্ট নেতৃবৃন্দ তার উপর কখনোই আস্থা রাখতে পারেননি। এর মূল কারণ তার ধর্মীয় অনুভূতি। এ ছাড়াও দিল্লীর স্বার্থের পক্ষে ভাসানীকে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না এটা ভাল করেই জানতেন কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ। তারা এটুকু ভাল করেই বুঝতেন যে, মওলানা ভাসানীর প্রশ্নাতীত দেশপ্রেম তাকে হিন্দুস্থানের ক্রীড়ানক হতে বাধা দিবে। এমনকি আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে তিনি বেঁকেও বসতে পারেন। সোহরাওয়ার্দীকে কমিউনিষ্টরা কোন কোন বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে সক্ষম হলেও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে তার মত দূরদর্শী নেতাকে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। যে কারণে উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের দিক থেকে কুচক্রীরা তাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল দেশপ্রেমশূন্য আত্মস্বার্থপর অদক্ষ মাঝারী পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব। পঞ্চাশের দশকে রাজনৈতিক কর্ম প্রবাহের মধ্য দিয়ে বাবুচক্র এবং বামপন্থীরা সেই প্রত্যাশিত ব্যক্তিকে আবিষ্কার করে, যার মধ্যে ছিল উচ্চাভিলাষ এবং দুর্নিবার ক্ষমতার মোহ। বামপন্থী, বাবুচক্র এবং কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীরা মুজিবকেই লক্ষ্য অর্জনের কেন্দ্রবিন্দু করার উদ্যোগ নেয়। মুজিবকে সাধারণ মানুষের গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য ব্যাপক প্রচার প্রোপাগান্ডার উদ্যোগ নেয়া হয়। সে সময় এদেশের মিডিয়াসমূহ বামপন্থীদের দখলে থাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এবং শেখ মুজিবের ভাবমূর্তি গড়ে তোলার কাজটি সহজভাবে সম্পন্ন হয়। কমিউনিষ্ট এবং বাবুচক্র পাকিস্তানকে ধ্বংস করার দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন পর্যায়ক্রমে শুরু করলেও ক্ষমতালোভী শেখ মুজিব ও তার সহযোগীরা ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দেয়ার পর অপরিপক্ক বিচ্ছিন্নবাদের পরিকল্পনা আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। যেটাকে কমিউনিষ্ট পার্টি বিপদজনক মনে করতো।

স্বায়ত্তশাসন দাবীর আড়ালে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন
কমিউনিস্ট পার্টির ভাষায়- ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের দাবী একটি হটকারী দাবী, তাই বর্তমানে আমরা পরিপূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবী উত্থাপন করিব।... কিন্তু যাহারা স্বাধীন পূর্ববাংলা দাবী উত্থাপন করিবেন আমরা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকিব। (খোকারায়, সংগ্রামের তিন দশক, পৃঃ ১৮২)
মনিসিং ও অমল সেন দুটি ভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেন- ‘সত্যকথা বলতে কি আমরা ভাবিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার বিষয়টি এত দ্রুত আগাবে। তবে আকাঙ্খা ছিল এবং বিশ্বাসও ছিল।’
‘১৯৬২ সালের ১লা মার্চ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান নতুন সংবিধান জারি করেন এবং সংবিধান মোতাবেক এপ্রিল মাসের ২৮ তারিখ জাতীয় পরিষদ নির্বাচন ও মে মাসের ৬ তারিখে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় নির্বাচন এবং সংবিধান বিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি চলতে থাকে। সোহরাওয়ার্দী সংবিধান বাতিলের পক্ষপাতি ছিলেন। তিনি নির্বাচনকেও নাকচ করেননি। অথচ রাজনীতিকদের একাংশ সরকার বিরোধী আন্দোলনের নামে দেশকে গভীর সংকটের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের স্বরাষ্ট্র (রাজনৈতিক) দপ্তরের (১৪ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৬২) প্রতিবেদনে বলা হয়- কিছু নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা বিশেষতঃ কমিউনিস্টরা এবং অন্যান্য উগ্রপন্থীরা গন্ডগোল সৃষ্টি করে আইন শৃংখলা পরিস্থিতিকে গুরুতরভাবে ঘোলাটে করার জন্য বদ্ধপরিকর। সংবিধান বিষয়ে লেশমাত্র ধারণা না থাকা সত্ত্বেও, কমিউনিস্টরা এবং আওয়ামী লীগের সেই অংশ বিশেষ দাবী তুলতে আরম্ভ করেছে যে, সংবিধান একেবারে গ্রহণযোগ্য নয়, তা বাদ দিতে হবে। মনে হয় যে, তাদের কর্মপন্থা হবে ছাত্রদের উস্কিয়ে দিয়ে তাদের মাধ্যমে মিছিল বের করা, রাষ্ট্রপতির ছবি পুড়িয়ে নষ্ট করে তাকে অপমান করা অর্থাৎ প্রকৃত সরকারী কর্মকর্তাদের এতদূর উত্যক্ত করা যে শেষ অবধি যাতে শক্তি ব্যবহারের কথা হয় এবং তখন সেই শক্তি প্রয়োগের ঘটনাকে ভিত্তি করে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলা।’

সরকার গোয়েন্দা সংস্থা রিপোর্টের ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা লক্ষ্য করে অত্যন্ত সতর্ক হয়ে উঠে। সাধারণ মানুষের যদিও এ ব্যাপারে কোন রকম ভ্রুক্ষেপ ছিল না। কিন্তু দেশপ্রেমিক নেতৃবৃন্দ এ ব্যাপারে নির্বিকার ছিলেন এমনটি বলা যাবে না। সকলেই কম বেশী পরিস্থিতি আঁচ করেছিলেন যথাসময়ে। যেমন- ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপে উদ্বিগ্ন পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাউন্সিল) সভাপতি খাজা নাজিমুদ্দিন ২৭শে নভেম্বর (১৯৬২) রাত্রিতে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল সভায় ভাষণ দানকালে মন্তব্য করেন- ‘পাঁচ বৎসর কাল ঢাকায় অবস্থানকালে বিভিন্ন স্তরের লোকজন যাহার অধিকাংশই আমার বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মী আমার সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছেন। তাহাদের নিকট হইতে আমি জানিতে পারিয়া ব্যথিত হইয়াছিলাম যে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিছিন্ন হইবার ব্যাপারে কানাঘুষা চলিতেছে। দু’র্ভাগ্যবশত পশ্চিম পাকিস্তানীদেরও একটি অতিক্ষুদ্র অংশ এই মতের সমর্থক। (অলি আহাদ, জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫, পৃঃ ৩৩২)

বিচ্ছিন্নতাবাদে মার্কিন ইন্ধন
চীন ভারত যুদ্ধের কারণে ভারতে মার্কিনীদের ঢালাও সাহায্যের প্রেক্ষিতে পাকিস্তান মার্কিনীদের প্রতি বিরূপ হয়ে উঠে। চীনের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক স্থাপনের কারণে আমেরিকাও পাকিস্তানের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়। পাকিস্তানে মার্কিন বিমান ঘাঁটি তুলে দেয়া হয়। ফলে মার্কিনীরা পাকিস্তানের প্রতি আরও ক্ষুব্ধ হয়। আইয়ূব সরকারকে বিপর্যস্ত করার উদ্দেশ্যে গণআন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আমেরিকা তার আভ্যন্তরীণ লবিকে প্রয়োজনীয় মদদ দিয়ে সক্রিয় করে তোলে। সমাজতান্ত্রিক চীনের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন এবং রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের সৌজন্যে তাদের অভ্যন্তরীণ লবীগুলোকে সরকার প্রশ্রয় দিতে থাকে। জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগের সক্রিয়তার প্রেক্ষিতে সমাজতান্ত্রিক দলগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সরকার বিরোধিতায় পরস্পরের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। অন্যদিকে লবি বহির্ভূত নির্ভেজাল দেশপ্রেমিক শক্তিসমূহ আন্দোলনে পিছিয়ে রইলো না। মোটের ওপর মার্কিন মদদপূষ্ট হয়ে আওয়ামী লীগ শক্ত অবস্থান নিতে সক্ষম হয়। পাকিস্তানের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন বৈরিতা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে আওয়ামী লীগকে অনুপ্রাণিত করে।

‘১৯৬৩ সালেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ঘোষণা করেন যে, পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত মার্কিনী সাহায্য হইতে পূর্ব পাকিস্তানীদের অংশ পূর্বাহ্নেই নির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া হইবে। ইহার ফলে পূর্ব পাকিস্তানীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের চাইতে অধিকতর সহানুভূতিশীল মনে করিবার ইন্ধন পাইয়া গেল। সুকৌশলে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানী জনতাকে উস্কানী দান করাই ছিল উপরোক্ত মন্তব্যের লক্ষ্য। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব এই সময়ে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব চীন সোভিয়েতের সহিত ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে সাম্রাজ্যবাদী সামরিক জোটের প্রতি উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। কেন্দ্রীয় সরকারকে বেকায়দায় ফেলিবার জন্যই মার্কিন সরকার নানাভাবে প্রচেষ্টা চালাইতে থাকে। এই প্রচেষ্টায় শেখ মুজিব দাবার ঘুঁটি হইতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেন নাই। শক্তিশালী দোসর হিসেবে তাহার সহিত যোগ দেয় দৈনিক ইত্তেফাক। পক্ষান্তরে আইয়ুব সরকার কর্তৃক পুনঃ পুনঃ লাঞ্ছিত হওয়া সত্ত্বেও শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের সংহতি, একাত্বতা ও অখণ্ডত্ব রক্ষায় সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। কোন প্রকার প্রলোভন প্ররোচনা তাহাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট ও বিচলিত করিতে পারে নাই।’ (প্রাগুক্ত পৃঃ ৩৩২)

সংহতির পক্ষে সোহরাওয়ার্দী
১৯৬২ সালে গ্রেপ্তারের পর কারাগার থেকে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবকে লেখা এক পত্রে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেন- ‘পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হলে পূর্ব পাকিস্তান আক্রান্ত হবে, পদানত হবে এবং ধ্বংস প্রাপ্ত হবে। সোহরাওয়ার্দী কখনই পাকিস্তান থেকে পূর্ব বাংলাকে বিচ্ছিন্ন করার কথা কল্পনাও করেননি। তার কাছে পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হওয়ার ধারণা ছিল অচিন্তনীয় অসম্ভব এক সমীকরণ। পত্রে তিনি লেখেন- ‘পূর্ব পাকিস্তানকে হিন্দুস্থানের গোলামীতে আবদ্ধ করার কথা একজন মুসলমান কি কখনো চিন্তা করতে পারে?’ তিনি আরো বলেন- ‘ভারত  বর্ষের মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমির জন্য পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে। এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে আমরা লড়াই করেছি। তিনি সু-নির্দিষ্ট করে বলেন- পাকিস্তান এক এবং অভিভাজ্য। এই জন্য আমরা জীবনবাজি রেখেছিলাম।’ (ডক্টর সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, দি ওয়েষ্টেজ অব টাইম পৃঃ ২৩৮)

আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতির সপক্ষে থাকা সত্ত্বেও তার মানস সন্তান শেখ মুজিব তার উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য পাকিস্তান বিরোধী চক্রের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন। নিখিল পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক উত্তরণের সম্ভাবনা যাচাই করে শেখ মুজিব হতাশ হয়েছিলেন। তার অর্থ কড়ি, বিদ্যাবুদ্ধি, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সামাজিক অবস্থান কোনটিই ছিল না- যা রাজনৈতিক উত্তরণের জন্য একান্তভাবে অপরিহার্য। এ সবের বাইরে তার কিছু গুণাবলী ছিল যা তার ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে। প্রথমতঃ তার ছিল দুঃসাহস এবং ঝুঁকি নেবার মত মানসিক শক্তি। দ্বিতীয়তঃ তিনি ছিলেন আবেগময় বক্তা। অসংখ্য মিথ্যাচার এবং কাল্পনিক সম্ভাবনার আলো দেখিয়ে হ্যামিলনের বংশীবাদকের মত তরুণ সমাজকে সম্মোহিত করার দক্ষতা তার মধ্যে ছিল। এছাড়াও তার সাংগঠনিক শক্তিরও কোন রকম ঘাটতি ছিল না। এ কারণে প্রথম পর্যায়ে শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দীর হাত ধরে রাজনীতির বেশ কিছুটা পথ অগ্রসর হলেন। অতঃপর যখন তার নিজস্ব প্রভাব বলয় সৃষ্টি হল তখন থেকে তিনি ভিন্ন আঙ্গিকে ভাবতে শুরু করলেন। কংগ্রেস নেতা মনোরঞ্জন ধর, মনিসিং প্রমুখ নেতৃবৃন্দ অর্থাৎ কমিউনিষ্ট এবং বাবুচক্রের সাহচর্যে নতুন সূত্রের সন্ধান পেলেন। পাকিস্তান বিরোধী চক্র মুজিবের মধ্যে খুঁজে পেল তাদের ইপ্সিত লক্ষ্য অর্জনের প্রয়োজনীয় উপাদান। দুটো অভিন্ন লক্ষ্য এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়। মুজিব দেখলেন  পূর্ববাংলাকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হলে তিনি, একমাত্র তিনিই হয়ে উঠবেন একচ্ছত্র নেতা। আর এ ব্যাপারে হিন্দুস্থান তাকে মদদ যোগাবে তাদের নিজস্ব স্বার্থে। অর্থ সম্পদের ঘাটতি হবে না কখনো। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ভারত তার ভাবমূর্তি গড়ে তুলবে। এছাড়াও পূর্ববাংলার দু’শতাব্দীর সীমাহীন বঞ্চনাকে পাকিস্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে আবেগপ্রবণ জনগণকে উদ্দীপ্ত করা যাবে অতি সহজে। শেখ মুজিব তার রাজনৈতিক গুরুকে না জানিয়েই হিন্দুস্থানের পেতে রাখা ফাঁদে পা দিলেন। এটাকেও তিনি তার রাজনৈতিক উত্তরণের জন্য যথেষ্ট মনে করলেন না। অন্যদিকে ইউসুফ হারুন ভ্রাতৃদ্বয়ের মাধ্যমে আমেরিকা অর্থাৎ সিআইএর এজেন্ট হিসেবেও রাজনৈতিক ময়দানে কাজ শুরু করলেন। আমি আগেই বলেছি, আমেরিকাও চাচ্ছিল আইয়ুব সরকারকে শায়েস্তা করতে। মুজিবের মাধ্যমে সিআইএ তার কার্যক্রম শুরু করে। আপাতত মুজিবের জন্য আমেরিকা এবং ভারতের মদদ সোনায় সোহাগা বলে পরিগণিত হল। এর ফলেই শেখ মুজিব প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন অব্যাহত রাখতে সক্ষম হলেন। জাতীয়তাবাদী বামপন্থী এবং হিন্দু এলিটদের সম্মিলিত প্রয়াসে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পুরোটাতেই পাকিস্তান বিরোধী চক্রের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হল। ১৯৪৮ সাল থেকে ভারতীয় দূতাবাস এদেশী বুদ্ধিজীবীদের উপর যেভাবে প্রভাব বিস্তার করে আসছিল সেটা ইতিমধ্যে পোক্ত হয়ে উঠেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা Two economy theory বিশ্লেষণ করার পর পূর্ব পশ্চিমের মানসিক ব্যবধান দ্রুত বাড়তে থাকে। বিশ্লেষণে পূর্ব পশ্চিমের অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকটভাবে উপস্থাপন করা হয়। অবিশ্য এটা করা হয় ১৯৪৭ সালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় না এনে। অধ্যাপকদের এই বিশ্লেষণে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতায় আর একমাত্রা যুক্ত হয়। ষড়যন্ত্রকারীরা যৌক্তিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে তাদের তৎপরতা চালানোর সুযোগ পায়।

সোহরাওয়ার্দী কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে দেখলেন দেশের রাজনৈতিক শূন্যতা এবং রাজনীতিকদের বিভ্রান্তিকর পদচারণা। অনেক ভেবেচিন্তে তিনি ভিন্ন রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। সংবিধান বাতিলের আন্দোলনের প্রস্তুতি পর্যায়ে সংবিধান গণতন্ত্রায়নের আওয়াজ তুলে দেশের বিভ্রান্তিকর উচ্ছৃংখল রাজনীতিকে গঠনমূলক আন্দোলনের দিকে ধাবিত করতে চাইলেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী বেশীদূর অগ্রসর হতে পারলেন না। মরণ ব্যাধি তাকে দেশান্তর করল। তিনি চিকিৎসার উদ্দেশে লন্ডন গমন করলেন। সোহরাওয়ার্দীর অনুপস্থিতির কারণে এন ডি এফ অর্থাৎ জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের রাজনৈতিক তৎপরতা স্তিমিত হয়ে পড়ে। দেশ নিক্ষিপ্ত হয় ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও বিচিছন্নতাবাদের কুটিল আবর্তে। সোহরাওয়ার্দী চেয়েছিলেন জাতীয় ভিত্তিক সার্বজনীন আবেদন নিয়ে রাজনীতি করতে, চেয়েছিলেন এর মাধ্যমেই আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান। কিন্তু তার সহকর্মী শেখ মুজিব চেয়েছেন সুদূরপ্রসারী জাতীয় ভাবনা পরিত্যাগ করে তার রাজনৈতিক উত্থানে জন্য আঞ্চলিকতাকে উৎকটভাবে ব্যবহার করতে। সোহরাওয়ার্দী চেয়েছিলেন এনডিএফ এর মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য। কিন্তু শেখ মুজিব চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগ পুনর্জীবিত করে ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে খন্ডিত করতে। সোহরাওয়ার্দীর ছিল সুদূরপ্রসারী ভাবনা, শেখ মুজিবের ছিল নগদ প্রাপ্তির আকাঙ্খা। এর ফলে ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে মেতে উঠলেন মুজিব। ষড়যন্ত্রের রাজনীতির সাথে জড়িত করতে চাইলেন তার রাজনৈতিক গুরু সোহরাওয়ার্দীকে। কিন্তু শেষ অবধি শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দীকে ব্যবহার করতে সক্ষম হননি।

১৯৬৪ সালে সোহরাওয়ার্দী চিকিৎসার জন্য লন্ডনে থাকাকালে শেখ মুজিব তার সাথে সাক্ষাত করেন। পূর্ববাংলাকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার আন্দোলনের জন্য অনুমোদন চাইলে সোহরাওয়ার্দী বিক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং যশোহরের মিয়া আবদুর রশিদের মাধ্যমে প্রেরিত এক চিঠিতে ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে দলীয় নেতৃবৃন্দকে সাবধান করে দেন। এ ছাড়াও শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবনের প্রস্তাবের মধ্যেও সোহরাওয়ার্দী জাতীয় স্বার্থ বিরোধী এক গভীর ষড়যন্ত্র আঁচ করতে সক্ষম হন। ‘তাই জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে একনিষ্ঠ সোহরাওয়ার্দী তাহার রোগশয্যা পার্শ্বে দন্ডায়মান শেখ মুজিবর রহমানের আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে তাহাকে নির্দেশ দান করেন। ইহা সহজেই অনুমেয় যে, শেখ মুজিবর রহমান তা হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করিতে পারেন নাই।’ (অলি আহাদ, জাতীয় রাজনীতি, পৃঃ ৩৩৭)

সেই একই লন্ডন সফরে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার আন্দোলনে ফিডেল ক্যাষ্ট্রোর সহযোগিতার জন্য কিউবার দূতাবাসের সাথেও যোগাযোগ করেন। (আফসান চৌধুরী স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রস্তুতি পর্ব সাপ্তাহিক বিচিত্রা, পৃঃ ৩৩৭)

এককালের আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মিঞা আব্দুর রশিদ “দৈনিক মিল্লাত”-এ ০৫-১২-১৯৮৯ইং তারিখে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর জীবনের শেষ দিনগুলো” নামে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেন। তার সংগে আওয়ামী লীগ প্রধান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর লণ্ডনের ১১ নং “ব্রুক ল্যান্ড রাইস হিল” বাসায় যে কথা হয়েছিল তা এখানে হুবহু উল্লেখ করছি।

“পরবর্তীতে গঠিত DAC-NDF এবং PDP এর নেতৃবৃন্দ তাঁর (সোহরাওয়ার্দী) নেতৃত্বে একটি Common platform গঠন করে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য মিঞা আব্দুর রশিদকে লন্ডনে পাঠান। নভেম্বর মাসের শেষ কোন একদিন সকালে বিমান থেকে নেমে সোজা সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কামরার সামনে পৌঁছলে তিনি ভিতরে সোহরাওয়ার্দীর হুংকার শোনতে পান। তাই মিঞা সাহেব ভিতরে না ঢুকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকনে কিছুক্ষণ। যে নেতাকে তিরস্কার করা হয়েছে সেই নেতা (শেখ মুজিব) কামরা থেকে বের হয়ে গেলে তিনি (মিঞা আব্দুর রশিদ) ভিতরে ঢুকেন। ঢুকার সংগে সংগেই তাকে সোহরাওয়ার্দী সাহেব বলতে থাকেন : This scoundrel wants to destroy the country and I couldn’t be a party to that. I must go back to Dhaka to save my country from the Indian conspiracy. You must be careful, he will not only destroy your country but he will destroy all of you. (দৈনিক মিল্লাত: তারিখ ০৫-১২-১৯৮৯ ইং)

এককালে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মিঞা আব্দুর রশীদকে উদ্দেশ্য করে লন্ডনের ১২নং ব্রুকল্যান্ড বাসায় যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন মুজিব সম্পর্কে, তার নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী একই মন্তব্য ও সাবধান বাণী যুব নেতাদের জন্য রেখেছিলেন রাজ বিরোধী পুস্তকের ১৮৩/১৮৪ পৃষ্ঠায় রাজ বিরোধী আশরাফুদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী পাকিস্তানের আনুগত্যের সিদ্ধান্ত ছিল চূড়ান্ত। জীবন সায়াহ্নে ১৯৭০ সালের নির্বাচন কালের সেই প্রচণ্ড গণজোয়ারের মুখুমুখি এসে দাঁড়িয়েছেন আশরাফুদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী। আশরাফের বাড়ীর চার পাঁচ মাইলের মধ্যে জনসভা দেশের ছেলেরা তাকে রুখে দাঁড়ালো। ছাব্বিশটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্যে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে তাকে। নইলে জনসভা করতে দেওয়া হবে না, উত্তেজিত ছেলেদের উচ্ছৃংখলতায়। তথাকথিত বাংগালী জাতীয়তাবাদের এক দুশমনকে তারা আজ যেন পেয়ে গেছে.... একথা বলে মাইকের সামনে দাঁড়াল ও অসংযত বিদ্রুপ ধ্বনিতে ....বাধা প্রাপ্ত হলেন নেতা। এ বিচ্ছৃংখলার মধ্যে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলেন আশরাফ কিছুক্ষণ। হঠাৎ নিকটেই একটা ঢিল পড়লো। সংগে সংগেই প্রচণ্ড ধমক- ফেটে পড়লো আশরাফ। শোন, তোমাদের প্রশ্নের জবাব দু’মিনিটে আমি দিয়ে দিচ্ছি। ভবিষ্যতের জন্যে লিখে রাখ আমার কথাগুলোঃ (১) ইসলামের মাজহাব একটি। তা হচ্ছে মুসলিম। (২) পূর্ব্ব দিকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে ভারতীয় সীমান্ত। তোমাদের নেতা ও তোমরা সে দিকেই চলতে শুরু করেছ। তোমরা বুঝ আর না বুঝ, আমি পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি তোমরা কোথায় যাচ্ছ। আমি ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্ট কুমিল্লা টাউন হল প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে পাকিস্তান জাতীয় পতাকাকে তসলিম জানিয়ে ছিলাম। আজও আমি সেখানেই আছি। খোদা হাফেজ” (রাজ বিরোধী পৃষ্ঠাঃ ১৮৩/১৮৪, আশরাফুদ্দিন চৌধুরী)

যাই হোক, অব্যাহত কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি আর এক ষড়যন্ত্র বিকশিত হচ্ছিল। তথাকথিত ইনটেলিকচুয়ালদের ড্রইংরুমের সীমাবদ্ধ চত্বর পেরিয়ে সর্বত্র পল্লবীত হচ্ছিল ধীরে ধীরে। পর্দার অন্তরাল থেকে জাতীয়তাবাদ পা পা করে এগিয়ে আসছিল রাজনৈতিক মঞ্চের দিকে। এই জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ বৃটিশ শাসনামলে দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধিতা করে এসেছে। শুরু থেকে শেষ অবধি এরাই জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে মুসলিম লীগের সাথে একাত্ম না হয়ে স্বতন্ত্র স্রোতধারা প্রবাহিত করার চেষ্টা করে। এরা ছিল উপমহাদেশে হিন্দু প্রভুত্বের ছায়াতলে অবস্থানে বিশ্বাসী। এরা হিন্দু সংস্কৃতি ও হিন্দু মনমানসিকতার সাথে চিন্তা চেতনার দিক দিয়ে একাকার হয়ে গিয়েছিল। সাতচল্লিশে দেশ বিভাগের পর অর্থাৎ দ্বিজাতি তত্ত্বের বাস্তবায়ন হলে এরা রাজনৈতিক দিক দিয়ে হয়ে পড়েছিল দেউলিয়া। এদের কর্মতৎপরতা ড্রইংরুমের সীমাবদ্ধ চত্বরে বন্দী হয়ে পড়েছিল। এইসব জাতীয়তাবাদী খোঁড়া রাজনীতিকদের আগামী দিনগুলো নিক্ষিপ্ত হয়েছিল অনিশ্চয়তার অন্ধকারে। আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ অনেকেই মুসলিম লীগে শামিল হয়ে মুক্তির নিঃশ্বাস নেবার চেষ্টা করছিলেন।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, জিন্নাহর মৃত্যুর পর নবাব জমিদার সামন্তশ্রেণী ও আমলাদের হাতের খেলনা হয়ে গণ সংগঠন মুসলিম লীগ রাজনীতিতে কুয়াশা আর ঘোলা পানির আবর্ত সৃষ্টি করে। এই ঘূর্ণাবর্তে পাক খেয়ে জীবনমৃত জাতীয়তাবাদীরা তাজা হয়ে ওঠে। গা ঝাড়া দিয়ে ময়দানকে মাতিয়ে তোলার প্রয়াস নেয়। পর্দার অন্তরাল থেকে বাবুচক্র তাদের সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করে। ওদিকে সোহরাওয়ার্দীর প্রতি সরকারও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের আচরণ তাকে নতুন দল গঠনে উদ্বুদ্ধ করে।

মুসলিম লীগ নেতা মওলানা ভাসানী আসাম থেকে হিজরত করে তার প্রত্যাশিত পাকিস্তানে এলেও বৃটিশ যুগের বিদ্রোহী মানসিকতা পরিবর্তন করতে পারেননি। শীর্ষ স্থানীয় মুসলিম লীগের কর্মকাণ্ড তাকে আরও অস্থির উদভ্রান্ত করে তোলে। তিনি সদ্য স্বাধীন দেশে বিদ্রোহের আগুন না ছড়িয়ে গঠনমূলক ধীর পদক্ষেপে জাতীয় নেতৃত্বের যথাযথ পরিবর্তন আনতে পারতেন। তা না করে তিনি মুসলিম লীগ বিরোধী পাল্টা এক সংগঠন গড়ে তোলার ব্যাপারে অতি উৎসাহী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

গঠন হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ। চিহ্নিত জাতীয়তাবাদীরা মুসলিম লীগ বিরোধী এই মোর্চার নিরাপদ আশ্রয়ে মাথা গুঁজে তাদের পুরানো সাবেকী মানসিকতা নিয়ে। জনাব সোহরাওয়ার্দীর চিন্তা চেতনা ও মন-মানসকিতা আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী ও একপেশে ছিল বলে মনে হয় না। তিনি তার নতুন সংগঠনের মাধ্যমে দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। যদিও এক সময় তার জাতীয়তাবাদী ধ্যান-ধারণা ছিল। যে কারণেই তিনি একদিন যুক্তবাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার আজন্ম লালিত যুক্তবাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কায়েদে আযম তার হাত সম্প্রসারিত করলেও রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর হিন্দু নেতৃবৃন্দ তার প্রস্তাবিত যুক্তবাংলার পরিকল্পনাকে ধ্বংস করে দেয়। এর পরেই তিনি তার জাতীয়তাবাদী ধ্যান ধারণাকে গঙ্গার জলে বিসর্জন দেন। তার জীবনের অত্যন্ত বাস্তব অথচ তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে সম্ভবত পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রধান হিসেবে তিনি তার সংগঠনের নাম পরিবর্তন করতে চাননি। তিনি জাতীয়তাবাদীদের তথাকথিত ভাষায় ‘অসাম্প্রদায়িকীকরণ’ অর্থাৎ মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ নামকরণের বিরোধী ছিলেন। পক্ষান্তরে সংগঠনের সাম্প্রদায়িক চরিত্র পরিবর্তনের প্রবক্তা ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।

১৯৫৫ সালের ২১-২৩ মে সদরঘাটে অবস্থিত রূপমহল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের অধিবেশনে সংগঠনের নাম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রোপিত হয়েছিল ধ্বংসের বীজ। সোহরাওয়ার্দীর উপলব্ধি সম্ভবত এমনই ছিল যে সংগঠনের নাম পরিবর্তন হলে আগামী একদা এই সংগঠন পাকিস্তান ধ্বংসপ্রয়াসী হিন্দু কুচক্রীদের ক্রীড়নকে পরিণত হবে। জনাব সোহরাওয়ার্দী সংগঠনের নামের সাথে মুসলিম শব্দটি বাদ না দেয়ার ব্যাপারে ছিলেন অবিচল। কিন্তু কর্মীদের মনোভাব লক্ষ্য করে অনেক ভাবনা,অনেক চিন্তার পর ২২ মার্চ ভোর চারটায় তিনি তার আপত্তি প্রত্যাহার করেন। পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ প্রমাণ করে যে, সোহরাওয়ার্দীর আশঙ্কা মোটেও অমূলক ছিল না। আওয়ামী লীগ শুধুমাত্র এদেশী হিন্দুদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়, তা নয়। ৫০ দশকেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়ে দিল্লীর দালালীতে উন্মত্ত হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে দেশকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ হিন্দুস্তানের হাতে তুলে দিয়ে আজ অবধি জাতীয় স্বার্থ বিরোধী সব রকম অপকাণ্ডে নিয়োজিত রয়েছে।

মওলানা ভাসানীর আবেগ ছিল, উদ্দাম কর্মস্পহা ছিল, দুঃস্থ গণমানুষের জন্য ছিল অপরিসীম দরদ ও অন্তহীন সমবেদনা। তার উন্নাদনা ছিল কিন্তু তাতে প্রজ্ঞার যোগ ছিল না। দূরদর্শিতা ও ভারসাম্যের অভাবেই ভাসানীর কর্মকাণ্ড ভায়োলেন্সমুখী হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে এই একমাত্র অনুভূতিপ্রবণ জনদরদী নেতাকে সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টরা তাদের আত্মরক্ষার বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে। মওলানা ভাসানী আমরণ অক্লান্ত পরিশ্রম করেও জাতিকে মুক্তি, প্রগতি ও সমৃদ্ধির দোর গোড়ায় আনতে ব্যর্থ হন। আমৃত্যু তিনি বুকভরা শূন্যতা নিয়ে অসীম আকাশের দিকে তাকিয়ে বিষের বাঁশী বাজিয়ে গেলেন। গেয়ে গেলেন ভাঙার গান। আর জাতির জন্য রেখে গেলেন একরাশ হতাশা।

আসামের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্যার সদরুল্লাহকে পাকিস্তানে এসে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার জন্য সরকারীভাবে আমন্ত্রণ জানান হলে উত্তরে তিনি বলেন, মওলানা ভাসানী-রাজনৈতিক আবহাওয়াকে যেভাবে উত্তপ্ত করে চলেছে সে উত্তাপ নিরসনের ক্ষমতা আমার নেই। পাকিস্তানকে ধ্বংস করার জন্য ভাসানীর উপস্থিতিই যথেষ্ট।

যাইহোক, পাকিস্তান ধ্বংস-প্রয়াসী হিন্দুরা এবং কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রীরা আওয়ামী লীগ তথা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে জেঁকে বসে। অন্যদিকে সাহিত্যের নামে সংস্কৃতির নামে আর্টের নামে সমগ্র জাতিকে এমনই অন্ধমাতাল করে রাখা হয় যেন এদেশের মানুষেরা তার নিজস্ব আদর্শ ও আপন জাতীয় সত্তার গভীরে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে সমস্ত বাংলাদেশী অতল জলের আহ্বানে ডুবতে থাকে মহাসমুদ্রের গভীরে।

পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা দার্শনিক কবি ডঃ আল্লামা ইকবাল উপমহাদেশে সামগ্রিক মুসলিম নেতৃত্বের দুর্বলতা আঁচ করেছিলেন অনেক আগে। ১৯৩২ সালে ২১ শে মার্চ লাহোর অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম সম্মেলনে এ প্রসঙ্গে দ্ব্যর্থহীনভাবে তিনি বলেনঃ “আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, বর্তমানে যারা রাজনৈতিক সংগ্রামে ভারতীয় মুসলমানদের কার্যকলাপের পথ নির্দেশ করছেন বলে মনে করা হয়, তাঁদের রাজনৈতিক চিন্তাধারার মধ্যে এখনও এক ধরনের বিশৃংখলা রয়েছে। এ পরিস্থিতির জন্য অবশ্য জাতির ওপর দোষারোপ করা চলে না। দেশের যেসব বিষয়ের সাথে মুসলিম জনগণের ভাগ্য জড়িত রয়েছে তার জন্য আত্মত্যাগের মনোভাব তাদের মোটেও নেই।...জাতিকে যে পথ নির্দেশ দেয়া হয় তা সবসময়ে স্বাধীনভাবে পরিকল্পিত নয়। তার ফল হচ্ছে সংকট মুহূর্তে আমাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাঙ্গন। এই কারণেই এসব প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক সংহতির জীবন ও শক্তির পক্ষে অপরিহার্য প্রয়োজনীয় ধরনের শৃংখলা সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারে না।’

৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আরও তীব্র আরও প্রকট আকার ধারণ করে। রাজনীতিতে তখন ত্রিমুখী ধারা প্রবল হয়ে উঠে। শীর্ষ নেতারা জাতীয় স্বার্থ ভুলে পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত হয়। হক ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রিক রাজনৈতিক নেতা ও তাদের কর্মীদের মধ্যে কতিপয় ক্ষুধার্ত শৃগালের অর্ধমৃত লাশ নিয়ে টানা হেচরার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। হতবাক দেশপ্রেমিক জনতা অনাহুত আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। নেপথ্য কুচক্রী, সমকালীন উমিচাঁদ, জগৎ শেঠদের ঘরে ঘরে তখন উৎকট আনন্দ। পরিষদ ভবনে স্পীকার শাহেদ আলীকে হত্যা করে নেতৃবৃন্দ ফ্যাসীবাদী কর্মকাণ্ডের চেয়েও ভয়াবহ বর্বতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। নেতৃবৃন্দের এই দ্বন্দ্ব সংঘাত আর হানাহানির ফাঁকে হিন্দু বুর্জোয়া এবং এ দেশী পঞ্চমবাহিনী সম্মিলিতভাবে ৯শো কোটি টাকার সম্পদ হিন্দুস্থানে পাচার করে দেয়। সরকারী নথিপত্র থেকে জানা যায়, প্রত্যেক বছর এ দেশে উৎপাদিত ১০ লক্ষ টাকা মূল্যের খাদ্যশস্য সীমান্ত অতিক্রম করে ওপার বাংলার গুদামে জমা হতো। সমগ্র দেশে কালোবাজারীর এত বিস্তৃতি ঘটেছিল যে, সামরিক বিপ্লবের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সাগরে অভিযান চালিয়ে সাড়ে ৪ টন সোনা উদ্ধার করা হয়। ক্রাইম বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই পরিমাণ সোনা প্রত্যেক মাসে বিদেশে পাচার হত। বাংলাদেশের পাটের ষাট শতাংশ ব্যবসা কোলকাতার মারোয়ারীদের হাতে ছিল। তারা কালোবাজারীর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার পাট এদেশ থেকে টেনে নিত। নৌবাহিনীর Close door operation রাজনৈতিক চাপের মুখে ব্যর্থ হয়। দেশের খাদ্যশস্য মওজুতদারী কবলিত হওয়ায় সাধারণ মানুষ দুর্ভিক্ষের হাহাকারে নিপতিত হয়। দুর্ভিক্ষাবস্থা ও খাদ্য সংকট এমন তীব্র আকার ধারণ করে যে এর মোকাবিলা করার জন্য সেনাবাহিনীকে ময়দানে নামতে হয়। ‘ওজারতির ২ বছর’ গ্রন্থে জনাব আতউর রহমান খান একথা স্বীকার করেন। পূর্ব পাকিস্তানের চোরাচালান নির্মূলের জন্য তিনি সামরিক কর্তৃপক্ষের সাহায্য গ্রহণ করেন।
(বইটির pdf version download করুন এখানে)



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh