Home EBooks দুই পলাশী দুই মীরজাফর অধ্যায় ১৩: বিচ্ছিন্নতাবাদে বিদেশী ইন্ধন

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ১৩: বিচ্ছিন্নতাবাদে বিদেশী ইন্ধন Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:23
বিচ্ছিন্নতাবাদে বিদেশী ইন্ধন
১৯৬৫ সালে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী কায়েদে আযমের বোন মিস ফাতেমা জিন্নাহর বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের বিজয় যেমন আইয়ুব খানকে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর করেছিল অনুরূপভাবে বিরোধী দলকে ঘিরে ধরেছিল নৈরাশ্য। বিরোধী দলের ব্যর্থতার মূল কারণ হিসেবে তারা মনে করতে শুরু করল আইয়ুব খানের প্রচলিত মৌলিক গণতন্ত্রকে। নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য তাদের ক্ষোভ মৌলিক গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত হল। ওদিকে আইয়ুব খানের সাফল্য তাকে এতই অভিভূত করে ফেলেছিল যে আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর দৃষ্টিপাত করার কোন প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেন না। বৈদেশিক নীতিকে সুসংহত করার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পদচারণা শুরু করলেন। এ সময় প্রেডিডেন্ট আইয়ুব একসাথে পিকিং, মস্কো, ওয়াশিংটন সফরের পকিল্পনা নেন। সাফল্যের সাথে এবং ব্যাপক প্রচারণার মধ্য দিয়ে পিকিং ও মস্কো সফর সম্পন্ন হলেও প্রেসিডেন্ট নিক্সন প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের ওয়াশিংটন সফর কর্মসূচী অসৌজন্য-মূলকভাবে বাতিল করে দেওয়ায় এতে দেশে বিদেশে আইয়ুবের মর্যাদা বৃদ্ধিই পেয়েছিল। প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের ওয়াশিংটন সফর কর্মসূচী অসৌজন্যমূলকভাবে বাতিল করে দিলে পর এতে দেশে বিদেশে আইয়ুবের ব্যাপারে ওয়াশিংটন নিরুত্তাপ হয়ে পড়ে। ওয়াশিংটনের সাথে পাকিস্তান সরকারের সম্পর্কের জেল্লা হারালেও বিরোধী দলের সাথে সিআইএর সখ্যতা বৃদ্ধি পায়। প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের রাজনৈতিক বিপর্যয় ত্বরান্বিত করার জন্য সিআইএ তৎপর হয়ে উঠে। ‘১৯৬৩ সালেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ঘোষণা করেন যে, পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত মার্কিনী সাহায্য হইতে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ পূর্বাহ্নেই নির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া হইবে। ইহার ফলে পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের চাইতে ওয়াশিংটনকে অধিকতর সহানুভূতিশীল মনে করিবার ইন্ধন পাইয়া গেল। সুকৌশলে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানী জনতাকে উস্কানী দান করাই ছিল উপরোক্ত মন্তব্যের লক্ষ্য।... কেন্দ্রীয় সরকারকে বেকায়দায় ফেলিবার জন্য মার্কিন সরকার নানাভাবে প্রচেষ্টা চালাইতে থাকে। (অলি আহাদ, জাতীয় রাজনীতি, পৃঃ ৩৩)

১৯৬৫ সালে জানুয়ারীর নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের নিরঙ্কুশ বিজয় এবং মার্চে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট আইয়ূবের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনীতিক পদচারণার ফলে এক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা পাকিস্তান ভারতের সমকক্ষতা অর্জন করলেও আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে আইয়ুবের অমনোযোগিতার কারণে আমেরিকা এবং ভারত উভয়েই এ ব্যাপারে সক্রিয় হয়ে উঠে। তারা আইয়ুব সরকারের দুর্বলতা অন্বেষণ করে তাকে ঘায়েল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এ ব্যাপারে উভয়েই দাবার ঘুঁটি হিসেবে সমানভাবে ব্যবহার করে শেখ মুজিবকে। অন্যান্য দলগুলোর উপরে আমেরিকার যে প্রচ্ছন্ন প্রভাব ছিল সেটাকে কাজে লাগাতেও আমেরিকা পিছিয়ে রইল না।

পাকিস্তান সরকারের উপর আমেরিকার আশীর্বাদ না থাকায় এবং আইয়ুব প্রশাসনের উপর মার্কিন বৈরিতা ও অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে উঠার ফলে ভারতের জন্য এক অপূর্ব সুযোগ এসে উপস্থিত হয়। পাকিস্তানের উভয় অংশে ভারত ছোটখাট সীমান্ত সংঘর্ষের সূচনা করে। পরবর্তীতে এক পর্যায়ে পাকিস্তানের উপর এক ভয়াবহ যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। সেই সময় আমেরিকা যুদ্ধ আক্রান্ত পাকিস্তানের দিকে ফিরেও তাকায়নি। পাকিস্তান তার শক্তি সামর্থ্য দিয়ে বিরোচিত প্রতিরোধ করে। আমেরিকা পাকিস্তানে সমরাস্ত্র এবং প্রয়োজনীয় খুচরো যন্ত্রাংশ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে পাকিস্তানকে বিজয়ের দোর গোড়ায় এসেও পিছিয়ে আসতে হয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আইয়ুব খান তাসখন্দ ঘোষণায় স্বাক্ষর দান করলেন। চীনের চাপের মুখে হিন্দুস্থান পূর্ব পাকিস্তানের দিকে চোখ তুলে তাকাল না। যুদ্ধ শেষ হল। যুদ্ধোত্তর দেশ পুনর্গঠন এবং আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে যখন আইয়ুব খান মনোযোগী হতে চাইলেন। সে সময় আইয়ুবের কর্তৃত্বের উপর যুদ্ধের প্রভাবের ব্যাপারে বলতে হয় যে, বহু সেনাবাহিনীর অফিসার এমন কি কিছু জেনারেলও এই যুদ্ধ চীনা সাহায্য নিয়ে চালিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতি ছিলেন। সুকর্নোর  ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানকে সাহায্য করতে রাজী ছিল। সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসাররা অনুভব করল যে, আইয়ুব খান বাইরের চাপের মুখে যুদ্ধবিরতি ও পরবর্তীতে তাসখন্দ চুক্তি করেছেন এবং নিজের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্তকরেছেন।... আইয়ুব তার সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক ভিত্তি নিয়ে তার নিজের ও শাসক এলিটদের কায়েমী স্বার্থকে বাদ দিয়ে চীনা সাহায্যে একটা গণযুদ্ধ চালাতে পারতেন না।... তাসখন্দ বৈঠকে কথিত জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়ার জন্য আইয়ুবের ভাবমর্যাদা অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে-যাকে ভূট্টো ১৯৬৯ সালের রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় আইয়ুব বিরোধী ব্যাপক আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন। (অখণ্ড পাকিস্তানের শেষদিনগুলো, জি ডব্লিউ চৌধুরী, পৃঃ-৩০) সে সময় বিদেশী চক্র তাদের প্রভাবিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে ভিন্ন খেলায় মেতে উঠল।

সর্বপ্রথম মাঠে নামলেন মওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী ও জামায়াতে ইসলামী। যুদ্ধোত্তর পর্যায়ে আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনের সূচনা করে জামায়াতে ইসলামী। শেখ মুজিব ৬ দফা কেন্দ্রিক বিচ্ছিন্নতার ধোঁয়া তোলার কারণে, পরবর্তীতে কারা অন্তরীণ থাকার কারণে এবং এই সাথে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের প্রতি সরকারের কঠোরতা অবলম্বনের কারণে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক ময়দানে প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে দাঁড়ায়। এককভাবে জামায়াতে ইসলামী আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে থাকে দীর্ঘদিন ধরে। আর সব দল ছিল শুধুমাত্র নেতা সর্বস্ব। আইয়ুবের বৈদেশিক নীতি একান্তভাবে ওয়াশিংটনমুখিতা পরিহার করায় মওলানা ভাসানী আইয়ুবকে পরোক্ষ সহযোগিতা দান শুরু করেন।

একমাত্র জামায়াতে ইসলামীর নিবেদিত প্রাণ কর্মীরা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য এবং জনমত সৃষ্টির জন্য ময়দানে তৎপর হয়ে উঠে। তাসখন্দ চুক্তির বিরোধিতা দিয়েই আন্দোলনের শুভ সূচনা হয়। পূর্ব পশ্চিম উভয় অংশের জনগণ তাসখন্দ ঘোষনাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। জামায়াতে ইসলামী সাধারণ মানুষকে একথা বোঝানোর চেষ্টা নেয় যে আইয়ুব খান ডিক্টেটর হওয়ার কারণে তাসখন্দ ঘোষণায় স্বাক্ষরের আগে বিরোধীদলসমূহের সঙ্গে বোঝাপড়ার প্রয়োজন মনে করেনি। বিদেশী চাপের মুখে নিশ্চিত বিজয় জেনেও রণাঙ্গন পরিহার করে।

তাৎক্ষণিকভাবে না হলেও জনমনে এর প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ধীরে ধীরে আন্দোলনের পালে হাওয়া লাগতে শুরু করে। জামায়াতে ইসলামী জনগণের আবেগ এবং ক্ষোভকে আন্দোলনের শক্তিতে পরিণত করার উদ্যোগ নেয়। ওদিকে যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে জাতীয়তাবাদী শক্তি ও বামপন্থী চক্র ভিন্ন প্রক্রিয়ায় জনগণকে বিক্ষুব্ধ করার প্রয়াস নেয়। তারা সঙ্গোপণে একথা ছড়িয়ে দেয় যে, যুদ্ধকালীন সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার দিকে পশ্চিম পাকিস্তানীরা ফিরে তাকায়নি। পাকিস্তানের সমর শক্তি শুধুমাত্র পশ্চিম পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিধানে ব্যস্ত থেকেছে। তারা পূর্ব পশ্চিমের বৈষম্যটা প্রকট করে তুলে ধরে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা জনিত সমস্যা এদেশের বুদ্ধিজীবী এবং তরুণ সমাজের মনে দারুণভাবে রেখাপাত করে। ধীরে ধীরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণের মন মানসিকতায় জাতীয়তাবাদীদের প্রচারণা ক্রিয়াশীল হতে থাকে। যদিও জাতীয়তাবাদীদের সাংগঠনিক তৎপরতা ছিল না, তা সত্বেও বিচ্ছিন্ন এবং বিক্ষিপ্তভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টির আঞ্জাম দিতে থাকে তারা। যদিও যুদ্ধোত্তর পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার প্রশ্নে আইয়ুব খান যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেছিলেন তা সত্ত্বেও জনগণের ক্ষোভ নিরসনের মত খুব বেশী কিছু করতে সক্ষম হননি। পত্র পত্রিকাসমূহে বামপন্থীদের প্রাধান্য থাকায় দেশের সংহতির বিরুদ্ধে পরিকল্পিত এবং সূক্ষ্ম প্রচারণা প্রকটভাবে চলতে থাকে। তাসখন্দ ঘোষণার প্রেক্ষিতে জনগণ এবং সেনাবাহিনীর অসন্তোষের প্রতিধ্বনি হতে থাকে বিরোধীদল সমূহের রাজনৈতিক দলসমূহের চলমান প্রক্রিয়ার মধ্যে। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ লাহোরে সর্বদলীয় সম্মেলন আহব্বান করেন। জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট নেতা জনাব নূরুল আমীন লাহোর সম্মেলনের পূর্বে ঢাকায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে যুদ্ধ বিরোধী মনোভাব প্রকাশ করে শাসনতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের আহবান জানান।

মুজিবের চাতুরীপূর্ণ অবস্থান
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবর রহমান লাহোর সম্মেলনে যোগ দেন। ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত লাহোর সম্মেলনে সাংবিধানিক সমস্যা নিরসনের জন্য ৬ দফা পেশ করেন। সাংবাদিকরা তাকে ৬ দফা বিশ্লেষণের জন্য ঘিরে ধরে। তিনি করাচীতে ৬ দফা বিশ্লেষণ করার আশ্বাস দেন। সম্মেলনে সমবেত নেতৃবৃন্দের সম্মুখে ৬ দফার যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করতে না পারায় তিনি বেকায়দায় পড়েন এবং সম্মেলন ত্যাগ করেন। করাচীতেও তিনি অনুরূপ বেকায়দায় পড়েছিলেন। ১১ ফেব্রুয়ারী তিনি ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং সাংবাদিকদের নিকট লাহোর সম্মেলনে প্রস্তাবিত দফাগুলো প্রকাশ করেন। লাহোর এবং করাচীতে শেখ মুজিব ৬ দফার যৌক্তিকতা বিশ্লেষণে ব্যর্থ হয়ে তার মেধাশূন্য কর্মীদের বাহবা নেয়ার জন্য নতুন একটা গল্পের অবতারণা করেন। তিনি বলেন, করাচীতে তাকে হত্যার প্রয়াস চলেছিল বলেই তাকে দ্রুত পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসতে হয়। কথাটা দারুণভাবে বিকিয়ে ছিল সেই সময়।

আওয়ামী লীগের চিন্তাশীল ব্যক্তিদের অনেকে ৬ দফাকে সহজভাবে নিতে পারেনি। আবার অনেকেই দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। শেখ মুজিব আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ না করেই ৬ দফা উত্থাপন করেন। ৬ দফা শেখ মুজিবের উদ্ভাবিত ফর্মূলা নয়, আইয়ূব শাসনকে বিপর্যস্ত করার জন্য কোন বৈদেশিক শক্তি শেখ মুজিবের উপর ভর করে তাকে দিয়েই ৬ দফা উত্থাপন করে। 
৬ দফার প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের ভাঙন আশঙ্কা করে শেখ মুজিব আবেগপ্রবণ তরুণদের পুনর্গঠিত করার ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৩ এপ্রিল শেখ মুজিব ছাত্র নেতৃবৃন্দকে তার বাসভবনে একান্ত সাক্ষাৎকারে আমন্ত্রণ জানান। ‘শেখ মুজিব এদিন ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের কাছে আওয়ামী নেতাদের রাজনৈতিক চরিত্র সম্পর্কে হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন- ‘এদের অধিকাংশই মুসলিম লীগ থেকে এসেছে, (শেখ মুজিব নিজেও মুসলিম লীগ থেকে এসেছেন) হতাশ হয়েছে সুযোগ সুবিধা না পেয়ে। তাদের দিয়ে ৬ দফার আদর্শ বাস্তবায়ন করা যাবে না। আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের অধিকাংশ পাকিস্তানপন্থী বলে শেখ মুজিব এদিন তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জেলায় জেলায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দখল করার জন্য ছাত্রলীগের তরুণ নেতাদের নির্দেশ দেন এবং ৬ দফার ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করতে বলেন। (বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, পৃঃ ১৮০)

পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ১৬ বছর পর এক সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক বলেন- ‘... ৬ দফা কর্মসূচী ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধু ছাত্র লীগের তৎকালীন সভাপতি মাজহারুল বাকী ও আমাকে ডাকলেন...। তিনি ছয় দফা আন্দোলন ব্যাখ্যা করলেন। বললেন, সাঁকো দিলাম ওপার যাবার জন্য। তখন আমি প্রশ্ন করলাম এত বড় সংগ্রাম, কে আমাদের এই সংগ্রামে সাহায্য করবে? তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আমেরিকা তোদের বিরোধিতা করবে চীন তোদের সমর্থনে আসবে না। ভারত তোদের বন্ধু। আর একটা পর্যায়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন তোদের সাহায্য করবে। ১৯৬৬ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারী তারিখে সম্ভবত আমাদের সাথে এই বৈঠক হয়। (সাপ্তাহিক মেঘনা, ৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৭)
অধ্যাপক মোজাফফরও একই কথা বলেছেন, ৬ দফা পরিকল্পনা পেশের সময় শেখ মুজিব তাকে এবং রুহুল কুদ্দুসকে ডেকে বলেছিলেন- ‘আসলে ৬ দফা নয়, এক দফাই ঘুরিয়ে বললাম শুধু। (ডক্টর মোহাম্মদ হান্নান, পৃঃ ১৮৬)

৬ দফার ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া
একটুখানি রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা যাদের মাথায় ছিল তারা ঠিকই বুঝেছেন ৬ দফার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। মওলানা ভাসানী ছয় দফার বিরোধিতা করেছেন। জামায়াতে ইসলামী ৬ দফার বিরুদ্ধে ছিল। এমনকি আওয়ামী লীগের মধ্যেও যারা ছিল দেশপ্রেমিক তাদের অনেকেই ৬ দফার প্রতিক্রিয়ায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন অথবা দলত্যাগ করেন। সরকারের কাছেও ৬ দফার উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার। শুধু দেশের সাধারণ মানুষ ধুমাশায় আচ্ছন্ন ছিল।

সে সময় পাকিস্তানের সংহতিতে বিশ্বাসী দলসমূহ এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে ছিল যেখান থেকে তাদের ফেরানো সম্ভব হয়নি। এরা ৬ দফা বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও  তাদের রাজনীতি ৬ দফার জন্য পথ পরিষ্কার করছিল। আওয়ামী লীগ ও বামচক্র সে সময় ঠুনকো অজুহাতে হরতাল অবরোধ চালাতে শুরু করে। এদের সাথে তাল রেখে পাকিস্তানের সংহতিতে বিশ্বাসীরাও ভিন্ন আঙ্গিকে আন্দোলনের কর্মসূচী দিতে থাকে। এতে কিন্তু লাভ হয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের। আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। ৬ দফা গতিশীল হওয়ার আগে একে শক্তিহীন করার উদ্যোগ নেয় সরকার শেখ মুজিবকে গ্রেপ্ততার করে।

জনাব পি এ নাজির লিখেছেন- ‘এরপর শুরু হল আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবর রহমানের গ্রেফতারের পালা। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে মনে হয়েছিল দারুণ অবিবেচনা প্রসূত কাজ। একবার ছেড়ে দেয়া হয় আর একবার গ্রেপ্তার করা হয়, আবার ছেড়ে দেয়া হয়। উপর মহলে যারা এই অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন তারা কি সুকৌশলে শেখ মুজিবকে জনপ্রিয় করে তুলতে চাচ্ছিলেন আমার মত অনেকেরই মনে এ প্রশ্ন দোলা খেতে দেখেছি। এই গ্রেপ্তারীর প্রক্রিয়াটা শুরু হয় রাজধানী ঢাকা থেকে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল সাধারণ নিয়মে এই গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারী করা হতো না। উঁচু মহলে সিদ্ধান্ত নেয়া হতো সরাসরি পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের মাধ্যমে। নির্দেশ দেয়া হত গভর্ণর হাউজ থেকে।' (পি এ নাজির, স্মৃতির পাতা থেকে, পৃঃ ২৩৯)

মোনয়েম খান সম্ভবত এইভাবে পঞ্চমবাহিনীর তৎপরতা প্রতিরোধ করে পাকিস্তানের অনিবার্য ধ্বস রুখতে চেয়েছেন। জনাব অলি আহাদ বলেছেন- ‘দেশের আনাচে কানাচে ছয় দফার বাণী পৌঁছাইয়া দেওয়ার প্রয়াসে শেখ মুজিবর রহমান বিভিন্ন জেলা সদরে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দিতে লাগিলেন। ক্ষিপ্ত গভর্ণর মোনয়েম খান বক্তৃতার কোন কোন অংশকে আপত্তিকর নির্ধারত করিয়া পেনাল কোডের বিভিন্ন ধারায় বিচারের জন্য তাহাকে গ্রেপ্তারের আদেশ দেন। ঢাকার পল্টন ময়দানে বক্তৃতার জন্য খুলনা হইতে ঢাকা আগমন পথে একুশে এপ্রিল যশোহর জেলা শহরে গ্রেপ্ততার, যশোহর দায়রা জজকর্তৃক জামিন মঞ্জুর। ময়মনসিংহে বক্তৃতার অপরাধে পুনঃ সিলেট জেল গেইটে গ্রেপ্তার এবং ময়মনসিংহ দায়রা জর্জ কর্তৃক জামিন মঞ্জুর প্রাপ্ত হন। এইভাবে শেখ মুজিব পুনঃপুনঃ গ্রেপ্তার এবং দৈনিক ইত্তেফাকের নিরবচ্ছিন্ন প্রচার অভিযান পূর্ব পাকিস্তানের সর্বশ্রেণীর শ্রমিক, মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী চাকুরিজীবী ব্যবসায়ী, শিল্পপতি মহলে তীব্র আলোড়ন ও যুগান্তকারী আবেদন সৃষ্টি করে। (অলি আহাদ, জাতীয় রাজনীতি, পৃঃ ৩৩)

ছোটখাট অব্যাহত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি এবং অন্যান্যরা ওয়ার্ম আপ হল। বৃহত্তর কর্মসূচী নেয়ার প্রারম্ভে ৬ দফার দাবীতে আওয়ামী লীগ সর্বাত্মক হরতালের ডাক দিলো। সেদিন রাজধানীর পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ ও মারমুখী ছিল এবং আওয়ামী ও বামপন্থী ছাত্র জনতা সমগ্র ঢাকা জুড়ে ভয়ঙ্কর তান্ডব সৃষ্টি করে। সে দিনের পরিস্থিতি সংক্রান্ত বিস্তৃত আলোচনার অবতারনা না করে সংক্ষেপে একথাই বলা যায়।

৭ই জুন ঘটনার প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা কারারুদ্ধ হয়েছিল। ১৫ই জুন তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৬ই জুন দৈনিক ইত্তেফাকের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। এরপর ৬ দফার আন্দোলন নিস্প্রভ হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদিকা মিসেস আমেনা বেগম ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদিকার দায়িত্ব নিয়ে আওয়ামী লীগের নেভা দীপ জ্বেলে রাখার প্রয়াস নেন।

ষাটের দশকের প্রথম পর্যায়ে বামপন্থীদের সৃষ্ট ছাত্র আন্দোলন যে অরাজক এবং বিশৃংখল পরিস্থিতির সূচনা করে তাতে দেশপ্রেমিক ছাত্র জনতার মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। তারা অনুসন্ধান করতে থাকে এমন একটি সংগঠন যারা দেশপ্রেম এবং আদর্শবাদের উজ্জীবন ঘটাতে চায়। আমি নিজেও এ ব্যাপারে তৎপর হয়ে উঠি। অনুসন্ধান করতে থাকি অনুরূপ সংগঠন।

ইসলাম পন্থীদের সুসময়

জাতির হতাশা এবং আদর্শিক শূন্যতার দুঃসময়ে আত্মবিশ্বাসে উদ্দীপ্ত কিছু মানুষের মধ্যে দেখা গেছে ঘরে ঘরে আলো জ্বালাবার অকৃতিম প্রয়াস। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রসংঘ প্রচলিত রাজনীতির বাইরে ভিন্ন এক ঐশী চেতনা বিতরণ করেছে। দেশপ্রেমিক এবং সমাজ কাঠামো পরিবর্তন প্রয়াসীরা এদের পতাকাতলে জড়ো হতে শুরু করে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম ইসলামী ছাত্র সংঘের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর ফলে এই সংগঠন দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকে। পয়ষট্টির হিন্দুস্থানের আগ্রাসী হামলার পরবর্তী পর্যায়ে ইসলামী ছাত্র সংঘের পালে হাওয়া লাগে। সংঘের জন্য প্রয়োজন ছিল রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা। কিন্তু সেটা হয়নি। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রসংঘ প্রচলিত রাজনীতির সাথে তাল দিতে গিয়ে গোল পাকিয়ে ফেলে। নেতৃত্বের সুদূরপ্রসারী ভাবনা না থাকার কারণে দ্রুত সাংগঠনিক সম্প্রসারণ নিরীক্ষণ করে তারা অতি আশাবাদী হয়ে উঠে। এরা মনে করে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবকে ক্ষমতাচ্যুত করলেই তারা রাজনৈতিক অবস্থান নিতে সক্ষম হবে। আমি আগেই বলেছি ৭ই জুনের পর আন্দোলনের তৎপরতা থমকে দাঁড়ায়। আওয়ামী শিবিরে ভাঙনের ঢেউ লাগে। ইসলামপন্থীদের জন্য তখন ছিল দারুণ সু-সময়। রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা যত প্রলম্বিত হত ততই ইসলামী আন্দোলনের পথ সুগম হতে পারতো। কিন্তু না, সেই সুদূরপ্রসারী ভাবনার ধারে কাছে গেলনা ইসলামী নেতৃত্ব। তারা আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে বেশী সোচ্চার, সবচেয়ে বেশী তৎপর হয়ে উঠলেন। জামায়াতে ইসলামী ১৯৬৬ সালের শুরু থেকে তাসখন্দ ঘোষণা কেন্দ্রিক আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সূচনা করে। পরবর্তী পর্যায়ে পয়ষট্টির যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তাহীনতার যুক্তি দেখিয়ে আওয়ামী লীগ সূচনা করে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, যে আন্দোলন ৬ দফা পর্যন্ত গড়ায়। যার অর্থ দাঁড়ায় বিচ্ছিন্নতা।

৭ই জুনের পর ৬ দফার প্রবল হাওয়া ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন তাদের নিরলস তৎপরতা দিয়ে সুদূর প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়। আন্দোলনকে সম্প্রসারিত করার জন্য জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে পিডিএম (পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট), পরবর্তী পর্যায়ে আন্দোলনের আরো ব্যাপ্তি আনার জন্য ডাক অর্থাৎ ডেমোক্রেটিক এ্যাকশান কমিটি গঠন করা হয়। এই দুই অবস্থানে জামায়াতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ওদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে ১৯৬৬ সালের ১৮ই জুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টো পদত্যাগ করেন। এর আগে মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে তিনি অপসারিত হয়েছিলেন। ৬৭ সালের নভেম্বরে ভূট্টো পিপলস পার্টি গঠন করেন।

আগড়তলা ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন
১৯৬৭ সালের শেষ দিকে অর্থাৎ ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে পূর্ব পাকিস্তানকে কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার অপরাধে কিছু সংখ্যক সামরিক ও বেসামরিক অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ডিসেম্বরের ৩১ তারিখে ন্যাপ এবং আওয়ামী লীগকে বিচ্ছিন্নতাবাদী দল ঘোষণা করে। ঢাকা শহরে গ্রেপ্তারের গুজব ঘুরপাক খেলেও সরকার এ ব্যাপারে মুখ খুলেনি। ’৬৮ সালের ৬ই জানুয়ারী প্রকাশিত এ সংক্রান্ত সরকারী প্রেসনোটে ২৮ জন গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়। প্রশাসনের সাথে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা জনাব পি এ নাজির আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলার পটভূমিতে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অবস্থা বর্ণনা করেছেন তার গ্রন্থে। তিনি বলেন- ‘কিন্তু এরই মধ্যে পাকিস্তানের রাজনীতিতে ঘটল একটি বিস্ফোরক ঘটনাঃ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। ঢাকা গুজবের শহর বলে এমনিতেই নাম আছে তার উপর এমন একটা ঘটনা সংক্রান্ত গুজবের বন্যায় সবকিছু ভেসে গেল... বাতাস ক্রমশ ভারী হয়ে উঠল। সরকারী বড় কর্তাদের দিকে তাকালে তাদের চেহারায় যে অভিব্যক্তি ফুটে উঠল তাতে মন হল কোথায় যেন একটা কিছু অঘটন ঘটেছে। সবাই হঠাৎ কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন। কাউকে কাউকে বেশ আতঙ্কিত মনে হচ্ছিল। ‘এ সময় হঠাৎ প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের ঢাকা আগমনের খবর এলো। যথারীতি তার সফর সংক্রান্ত করণীয় বেশ গম্ভীর। এরই মধ্যে একদিন রাত ১১টার দিকে প্রেসিডেন্ট হাউজের রমনা পার্কের পাশে গেলাম। সেখানকার পরিবেশ দেখে রীতিমত অবাক হলাম। বসার কামরায় অনেক হোমরা চোমরাকে দেখলাম। নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন, কিন্তু সবাইকে মনে হচ্ছিল ভীষণ গম্ভীর এবং চিন্তিত। লাট সাহেব (মোনয়েম খান) একবার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু আমাকে দেখার পরও তিনি আমাকে চিনতে পারলেন বলে মনে হল না। এরকম একটা অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে যখন ভাবছি ফিরে যাব কিনা, হঠাৎ করে ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলীর লিডার সবুর খান ভিতর থেকে বাইরে এলেন এবং আমাকে দেখে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে একটা সিগারেট অফার করলেন। তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে এক কোনায় চলে গেলেন। কোন ভূমিকা ছাড়াই তিনি বললেন, নাজির সাহেব, ভিতরের অবস্থা খুবই উত্তপ্ত। প্রেসিডেন্ট আমাদের সবাইকে বিশেষ করে মোনয়েম খানকে চার্জ করেছেন যে পূর্ব পাকিস্তানের সিনিয়র অফিসারদের অনেকে আগড়তলা মামলার সাথে জড়িত। গভর্নর সাহেব অবশ্য জোরের সাথে এর প্রতিবাদ করেছেন। বলেছেন যেই রিপোর্ট দিয়ে থাকুন তা বানোয়াট। এতে প্রেসিডেন্ট আরো ক্ষিপ্ত হয়ে বলেছেন যে তিনি কোন বানোয়াট মিথ্যা রিপোর্টের ভিত্তিতে কথা বলছেন না। তিনি যা বলেছেন তার সমর্থনে রয়েছে দলিল দস্তাবেজ। তারপর প্রেসিডেন্ট দোতালার এক কামরা থেকে একটা রিপোর্ট আনিয়ে তার হাতে তুলে দেন। এ রিপোর্ট পড়ার পর মোনয়েম খান নিশ্চুপ হয়ে যান।

আমি সবুর খান সাহেবকে বললাম, স্যার আপনি নিশ্চয় পিন্ডি থেকে এ রিপোর্ট সম্পর্কে জানেন। যদি আপত্তি না থাকে দয়া করে বলবেন কি কোন কোন অফিসারের নাম আছে এ লিষ্টে। তিনি কোন রকম দ্বিধা না করে তিন চারজন অফিসারের নাম বললেন এবং দু’ তিনজন প্রাক্তন অফিসারের নাম উল্লেখ করলেন। (পি এ নাজির : স্মৃতির পাতা থেকে, পৃঃ ২৪৫-৪৬)
১৮ জানুয়ারী (’৬৮) এক সরকারী প্রেসনোটে বলা হয়, রাষ্ট্রদ্রোহী ষড়যন্ত্রে শেখ মুজিবর রহমানকে গ্রেপ্ততার করা হয়েছে। ১৯৬৬ সালের ৮মে থেকে শেখ মুজিবর রহমান কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন। ১৭ জানুয়ারী গভীর রাতে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে স্থানান্তরিত করা হয়। অভিযুক্তের ব্যাপারে দৈনিক পাকিস্তানে বলা হয়- ‘এরা আগড়তলায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর লেঃ কর্নেল মিশ্র এবং মেজর মেমনের সাথে দেখা করেছিলেন। তাদের সাক্ষাতের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ। আগড়তলা ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তারের প্রেক্ষিতে জনগণের মধ্যে এমন ধারণা ছড়িয়ে দেয়া হয় যে, মোনয়েম খান এবং কতিপয় কেবিনেট মন্ত্রী ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বাঙ্গালীদের স্বাধিকার আন্দোলনের নায়ক শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করেছে। মুজিব-এর হুমকিকে সবচেয়ে ফলপ্রসূভাবে মোকাবেলার জন্য মোনয়েম খান ও তার সহযোগীরা ভারতীয় মদদপুষ্ট ষড়যন্ত্রে মুজিবকে জড়িয়েছে। গুজবে আরো বলা হয়, মুজিবকে রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করার জন্য মোনয়েম খানের প্ররোচনায় প্রেসিডেন্ট আইয়ুব আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অবতারণা করেন। কিন্তু এ ধারণা জনাব জি ডব্লিউ চৌধুরী তার লেখায় বাতিল করে দেন। তিনি বলেন- ‘কিন্তু মুজিবের গ্রেপ্তারের এ রকম ব্যাখ্যা আমি দৃঢ়তার সাথে বলব সত্য নয়। ১৯৬৯ সালে আমি পাকিস্তান মন্ত্রীসভায় যোগ দেয়ার পর যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল তখন আমি এ ব্যাপারে সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা রিপোর্টগুলো সযত্নে পড়ে দেখি। এ রিপোর্টগুলো অনুসারে যেগুলোর প্রতি একজন সিনিয়র বাঙ্গালী গোয়েন্দা অফিসার জোর সমর্থন জানিয়েছিলেন যার সততা ও ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে আমি সন্দেহ পোষণ করিনি এবং যিনি বাংলাদেশে মুজিব সরকারের একটি বড় পদ অধিকার করেন।

মুজিবকে নিম্নের উপাত্তের ভিত্তিতে দোষী করা হয়ঃ
ঢাকায় ভারতীয় মিশনের মিঃ ওঝা মুজিবের একজন ঘনিষ্ঠ অনুসারীর সাথে পূর্ব নির্ধারিত বৈঠকে মিলিত হতেন। আর এ অনুসারী বর্তমানে আওয়ামী লীগের এক গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল আছেন; যিনি মুজিব পরিবারের একজন সদস্যের মত ছিলেন এবং তার ঢাকার বাসায় প্রায় থাকতেন। ওঝার সাথে মুজিবের লোকজনের মেলামেশা গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন সাবধানতার সাথে লক্ষ্য রাখতেন এবং তার ঘোরা ফিরার ছবিও ছিল। মুজিবের লোক পুরানো ঢাকার এক অজ্ঞাত জায়গায় ওঝার সাথে দীর্ঘ আলাপ আলোচনা, দেখা সাক্ষাতের পর আঁকাবাকা পথ ঘুরে ঢাকার ধানমন্ডীতে মুজিবের বাড়ী যেত। মুজিবের স্ত্রী যদিও ছিলেন একজন অশিক্ষিতা মহিলা, তিনিও ১৯৬৬ সালে মুজিবের গ্রেপ্তারীর পর রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। মুজিবের স্ত্রী ও তার ঐ অনুসারী উভয়েই ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে যেখানে মুজিব অন্তরীণ ছিলেন সেখানে নিয়মিত মুজিবের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতেন। জেলের বাঙ্গালী অফিসার ও স্টাফদেরকেও তাদের সহানুভূতিপূর্ণ মনোভাবের জন্য ধন্যবাদ জানাতে হয়। যার ফলে অন্তরীণ অবস্থায়ও মুজিব যে কোন রাজনৈতিক পকিল্পনা ও ষড়যন্ত্র আলোচনা করতে মোটেই অসুবিধার সম্মুখীন হতেন না। গোয়েন্দা বিভাগের লোকদের মতানুসারে এটাই ছিল মুজিবের আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলায় জড়ানোর ভিত্তি। কিন্তু জনগণ যাদের এই ভিতরের কাহিনী কখনো বলা হয়নি তারা স্বভাবতই মুজিবের গ্রেপ্তারে ক্রোধোন্মত্ত ছিল। তারা সংগতভাবে প্রশ্ন করতো যে মুজিব জেলে আবদ্ধ অবস্থায় থেকে কিভাবে ষড়যন্ত্রের অংশীদার হতে পারেন। (জ ডব্লিউ চৌধুরী, অখন্ড পাকিস্তানের শেষ দিনগুলো, পৃঃ ৩২-৩০)

১৯৬৮ সালের শুরুতে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হন। রোগাক্রান্ত অবস্থায় তিনি দুটো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পেশোয়ারের বেদারের মার্কিন সামরিক যোগাযোগ কেন্দ্রটি বন্ধ করার জন্য মার্কিন সরকারকে নোটিশ দেন। অন্যটি হল পাকিস্তানের জন্য রুশ অস্ত্র আমদানীর লক্ষ্যে কোসিগিনের সাথে আলাপ করেন। এতে যুক্তরাষ্ট্র দারুণভাবে বিরূপ হয়ে উঠে এবং প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের বিদায় ঘণ্টা বাজানোর জন্য সিআইএকে নির্দেশ দেয়। ১৯৬৫ সালের পর থেকে মার্কিন সাহায্য কমে যাওয়ায় পাকিস্তান সরকারকে অনেক পরিকল্পনা কাটছাট করতে হয়েছিল। ১৯৬৭-৬৮ সালে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বহুলাংশে কমে যায়। যখন উন্নয়নের দশক উদযাপনের হিরিক চলছিল দেশব্যাপী এই সময় আমেরিকা অর্থনৈতিক সাহায্যের ব্যাপারে তার হাত গুটিয়ে নেয়। অর্থনৈতিক স্থবিরতার মধ্যে উন্নয়ন দশকের ব্যঞ্জনা সাধারণ মানুষের মনে রেখাপাত করতে পারেনি। ষাটের দশকে বিপুল অগ্রগতি হওয়া সত্বেও সাধারণ মানুষের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়নি। সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ জমলেও আন্দোলনের কথা কখনো তারা ভাবেনি। তারা আইয়ুব প্রশাসনকে বিকল করে দেয়ার জন্য তৎপর হয়ে উঠে। তারাই উন্নয়ন দশকে বিরূপ হয়ে বিদ্রোহের আগুন ছড়াতে থাকে। এদিকে ভূট্টো ও পীরজাদা আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন শুরু করার জন্য গোপন চুক্তিতে পৌছেন। অন্যদিকে আমেরিকা ও ভারত তাদের নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের পতন ত্বরান্বিত করার জন্য তাদের লবিগুলোকে সক্রিয় করে তুলে এবং আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য সবরকম বৈষয়িক সাহায্যের দ্বার অবারিত করে। জি ডব্লিউ চৌধুরী লিখেছেন- ১৯৬৯-৭০ সালে পাক ভারত সম্পর্ক ছিল খারাপ এবং বরাবরের মতই উত্তেজনাপূর্ণ। ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় হতে পূর্ব পাকিস্তানের চরম বিস্ফোরন্মুখ পরিস্থিতিতে ভারতের সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে বেসামরিক ও সামরিক গোয়েন্দা রিপোর্ট অব্যাহতভাবে ইয়াহিয়ার দপ্তরে আসছিল কিন্তু সেসবের প্রতি যথাযোগ্য মনোযোগ দেয়া হয়নি। একটি বন্ধু রাষ্ট্র ভারতীয় সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে অনুরূপ বর্ণনাই দিচ্ছিল। কিন্তু ইয়াহিয়া খান খুবই বিলম্বে ব্যাপারটা বুঝতে পারেন।’

ততদিনে পানি অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। আমি আগেই বলেছি ভুট্টোর পশ্চিম পাকিস্তানের জনপ্রিয়তার ভিত্তি ছিল তাসখন্দ ঘোষণার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের সাথে কথিত মতবিরোধ এবং যুদ্ধকালীন সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেশে এবং দেশের বাইরে ভারত বিরোধী জোরালো বক্তব্য। পাকিস্তানের শক্তি সামর্থ বিবেচনা সাপেক্ষে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব অনিচ্ছা সত্বেও স্বাক্ষর দান করেছিলেন। কিন্তু এটা ভূট্টোর মনঃপূত হয়নি। মনপূত হয়নি পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের। বিদেশী সাহায্য ছাড়াই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতি ছিলেন সেনাকর্মকর্তাদের অনেকে।

সেনাবাহিনীতে আইয়ুবের যে বিশাল ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছিল তাসখন্দ ঘোষণার পর সেটা আর অবশিষ্ট থাকেনি। পীরজাদা ভূট্টোকে স্পষ্টই জানিয়ে দেন যে সরকার উৎখাতের গণআন্দোলনে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব সেনাবাহিনীর সমর্থন পাবেন না। এরপর ভূট্টো অত্যন্ত দুঃসাহসী হয়ে উঠেন। পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে এমন ধারণা প্রকট হয়ে উঠে যে জোয়ানদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত জাতীয় মর্যাদা প্রেসিডেন্ট আইয়ুব তাসখন্দ ঘোষণার মধ্য দিয়ে ভূলুণ্ঠিত করেছেন। বিদেশী চাপের মুখে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব নতি স্বীকার করেছেন। এই ধারণা জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপক প্রচারণা থেকে সৃষ্টি হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে সুপরিকল্পিতভাবে জামায়াতে ইসলামী যে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল ধূর্ত শৃগালের মত চূড়ান্ত মুহূর্তে ভূট্টো সেসবের সম্পূর্ণটাই দখল করে নিল। পূর্ব পশ্চিম উভয় অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল জামায়াতে ইসলামী, অতঃপর অন্যান্য দল সম্মিলিতভাবে। তারা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ ধরে এগুচ্ছিলেন। ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়ায় নয় গঠনমূলক প্রক্রিয়ায় আইনানুগ পন্থায় ধাপে ধাপে অগ্রসর হচ্ছিলেন।

’৬৮ সালের ৭ নভেম্বর পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার বিরোধী তীব্র আন্দোলনের অশনি সংকেত বেজে উঠে একটি অতি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। রাওয়াল পিন্ডি গর্ডন কলেজের ৭০ জন ছাত্র নভেম্বরের প্রথম দিকে লান্ডিকোটালে বিদেশী মালামাল ক্রয় করে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বিধিসম্মতভাবেই ছাত্রদের কেনা বিদেশী মালামাল বাজেয়াপ্ত করে। এই তুচ্ছ ঘটনাকে নিয়ে ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করে। ভূট্টো ছাত্রদের উৎসাহিত করেন। ৭ নভেম্বর ছাত্ররা পুলিশের উপর হামলা চালায়। পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে রাওয়ালপিন্ডিতে একজন ছাত্র নিহত হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিম পাকিস্তানে গণ আন্দোলনের বিস্ফোরণ হয়। ভূট্টো ছাত্রদের উপর পুলিশী বাড়াবাড়ির নিন্দা করে যেমন জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন তেমনি ছাত্ররাও আন্দোলনে উৎসাহিত হয়ে উঠেছিল। ১০ নভেম্বর (’৬৮) পেশোয়ারে ভাষন দানকালে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের জীবন নাশের চেষ্টা হয়। ১৩ নভেম্বর ভূট্টোকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিরোধীদল এবং ক্ষমতাসীনদের প্রত্যাশার বাইরে আন্দোলন উচ্চকিত হয়ে উঠে। রাজনীতিতে এয়ার মার্শাল আসগর খান এবং জাষ্টিস মোর্শেদ এই দুই আগন্তকের পদার্পণ আন্দোলনের নতুন মাত্রা যোগ করে।

সে সময় বিরোধী দলীয় জোট পিডিএম এর উদ্যোগে মিটিং মিছিলে বাংলাদেশ সোচ্চার হয়ে উঠেছিল কোনরকম বিশৃংখল পরিস্থিতির সৃষ্টি না করেই। জামায়াত ছাড়া আরো ৫ দল পিডিএম এর সংগে সংশ্লিষ্ট থাকলেও বিশৃংখল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি। জামায়াত এবং ইসলামী ছাত্রসংঘের বিপুল সংখ্যক কর্মী সংশ্লিষ্ট থাকার কারণে পিডিএম এর আন্দোলন সুশংখলভাবে চলছিল এবং ক্রমশ গতিশীল হয়ে উঠেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের ছাত্র আন্দোলন সোচ্চার হয়ে উঠলে আন্দোলন থেকে দূরে থাকা মওলানা ভাসানী ময়দানে এসে উপস্থিত হলেন।

এরপর থেকে পূর্ব পাকিস্তানের আন্দোলন ভিন্ন রূপ নিল। নিয়মতান্ত্রিকতা উপেক্ষিত হল। আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীর নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ হ্রাস পেতে শুরু করল। ক্রমবর্ধমান ভায়োল্যান্স আন্দোলনকে গ্রাস করল। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর এক খেলা সংঘটিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ ১১ দফা প্রনয়ণ করে। মূলত ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে এটা প্রণীত হয়েছিল। ১১ দফা ভিত্তিক দেশব্যাপী আন্দোলন পরিচালনার উদ্দেশ্যে ১৯৬৯ সালের ৫ই জানুয়ারী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। আওয়ামী লীগের ৬ দফা বামপন্থীদের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মূল দাবী এবং ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু দাবী ১১ দফায় সন্নিবেশিত হয়েছিল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হয় ১৯৬৮-৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে সরকার সমর্থিত ছাত্র সংঠন এনএসএফ এর প্রাধান্য ও শক্তিশালী অবস্থান থাকা সত্ত্বেও তারা কিভাবে ১১ দফার আন্দোলনে শরীক হল এটা অনেক পর্যবেক্ষককে হতবাক করে দেয়।

এমনও তো হতে পারে অনেকের মত এরাও সে সময় ভারতীয় দূতাবাস অথবা তাদের এজেন্টদের কাছে অর্থের বিনিময়ে বিবেক বন্ধক রেখেছিল। পিডিএম এর উদ্যোগ পরিচালিত দীর্ঘ দিনের আন্দোলন যখন একটা পর্যায়ে এসে পড়ল এবং যখন বেগবান হল, তখন বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী চক্র পিডিএম এর গতিশীল আন্দোলনের স্রোতে ১১ দফা আকস্মিকভাবে ভাসিয়ে দেয়। শুরুতেই ১১ দফা গতিশীল হয়ে উঠে। এই সাথে পত্র পত্রিকার প্রচারণাযুক্ত হয়ে সমগ্র দেশ ১১ দফায় একাকার হয়ে যায়। হাওয়া উল্টো দিকে বইতে শুরু করে। জামায়াতের দীর্ঘ দিনের পরিশ্রম হাইজ্যাক করে নেয় বামপন্থী-জাতীয়তাবাদী পঞ্চমবাহিনী চক্র। তৎকালীন শিক্ষাঙ্গনে উদীয়মান শক্তি ইসলামী ছাত্র সংঘ এটাকে মেনে নিতে পারল না। ইসলামী ছাত্র সংঘ তালাবায়ে আরাবিয়া ও ছাত্রশক্তিকে সংগে নিয়ে হাওয়ার বিপরীতে দাঁড়াল। কিন্তু শেষ অবধি কুলিয়ে উঠলো না। কেননা সংবাদ পত্রের সবগুলোই ছিল বামপন্থী ও জাতীয়বাদীদের দখলে। তারা আইয়ুব বিরোধী সর্বদলীয় আন্দোলন ৬ দফার পক্ষের স্রোতে পরিণত করল। বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্রের নায়ককে পরিণত করল জাতীয় হিরোতে। আগড়তলা ষড়যন্ত্রের মূল নায়ক শেখ মুজিব কারাগার থেকে বেরিয়ে এলো মহা নায়ক হয়ে। উগ্রবাদী আন্দোলনের তোড়ে ভেসে গেল জামায়াত ও পিডিএম এর সবধরনের প্রয়াস। আন্দোলনের সাথে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র যুক্ত হয়ে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবকে বিদায় হতে হল। দুই পাকিস্তানে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আর একটিও রইল না। পাকিস্তানের দুই অংশে দুই উগ্রবাদী নেতা শেখ মুজিব ও জুলফিকার আলী ভূট্টোর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হল। যদিও জেনারেল ইয়হিয়ার নেতৃত্বে সামরিক শাসন জারি করে রাজনৈতিক সন্ত্রাস আপাতত দূর করা হল। এ সত্বেও ষড়যন্ত্র থেমে থাকল না। বিচ্ছিন্নতাবাদী পঞ্চমবাহিনীর এমন একটা বিরতির প্রয়োজন ছিল তাদের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের জন্য, ষড়যন্ত্রকে বৈধতার মোড়কে উজ্জীবিত করার জন্য। প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের ক্ষমতা ত্যাগের পরবর্তী ঘটনা প্রবাহে দেখা যাবে কিভাবে পঞ্চমবাহিনী ছলচাতুরী বানোয়াট পরিসংখ্যান ও রাজনৈতিক ধোকা দিয়ে জাতিকে বোকা বানিয়ে সর্বনাশের বৃত্ত রচনা করে পাকিস্তানকে মর্মান্তিকভাবে টুকরো করেছেন। কিভাবে সমৃদ্ধ বাংলা গড়ে তোলার বদলে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করেছে, কিভাবে তারা হিন্দুস্তানের ক্রীড়নক হয়ে দিল্লীর আশা আকাঙ্খা পূরণ করেছে, পরবর্তী অধ্যায়ে আমি সেই বিষয়টির উপর আলোকপাত করব।

(বইটির pdf version download করুন এখানে)


Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh