Home EBooks দুই পলাশী দুই মীরজাফর অধ্যায় ১৪: মুজিবের প্রতারণার ফাঁদে ইয়াহিয়া

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ১৪: মুজিবের প্রতারণার ফাঁদে ইয়াহিয়া Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:24
মুজিবের প্রতারণার ফাঁদে ইয়াহিয়া
পাকিস্তান আন্দোলন চলা কালে মাওলানা ভাসানী তার প্রিয় নেতা এবং সর্বভারতীয় মুসলিম জনগণের প্রাণ প্রিয় নেতা কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে সাক্ষাত করতে যান। যখন তিনি কায়দে আযমের মুখোমুখি হলেন তখন গভীর আবেগে ডুকরে কেঁদে ফেললেন। তিনি কায়েদে আযমকে বাংলার অসহায় মুসলমানদের ভবিষ্যতের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করার জন্য অনুরোধ করলেন। কায়েদে আযম তাকে আশ্বাস দিয়ে বিদায় দিলেন। তখন সম্ভবত চৌধুরী মুহাম্মদ আলী পাশে ছিলেন, তাকে কায়েদে আযম বললেন- এই আবেগ প্রবণ মানুষটা থেকে সাবধান থাকবেন। আবেগ তাড়িত হয়ে এই লোকটা এমন কিছু করতে পারে যা জাতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম নেতা মাওলানা ভাসানীর ব্যাপারে কায়েদে আযমের মন্তব্য একেবারে অমূলক ছিলো না। আবেগ তাড়িত হয়ে তাৎক্ষণিক যা কিছু দরকার তিনি তাই করেছেন ভবিষ্যতের ভাবনা না ভেবেই।

ভারত বিভাগের পর পাকিস্তানের প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলিম লীগের নেতৃত্বের মধ্যে জনগণের মুক্তির সম্ভাবনা না দেখে তিনি তৎকালিন নেতৃত্বের প্রতি বিরূপ হয়ে মুসলিম লীগ ত্যাগ করে প্রথমত আওয়ামী লীগ, পরবর্তীতে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। দেশপ্রেম এবং রাজনৈতিক আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও তার ছিল সীমাবদ্ধতা। এই সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি আঁচ করতে পারেননি কমিউনিজমের অনিবার্য পরিণতি। সম্ভবত গরীব ও খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য কমিউনিজমের মানবিক আবেগ তাকে আকর্ষণ করেছিল। উপমহাদেশের হিন্দু নেতৃবৃন্দের পরিচালিত কমিউনিস্ট পার্টির পাকিস্তান কেন্দ্রিক ষড়যন্ত্রের গভীরতাও তিনি সময়মত বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তিনি বুঝেননি আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের অন্তিম ঠিকানা। এ কারণে একজন খাঁটি মুসলমান হয়েও আঞ্চলিকাতাবাদী ও কমিউনিস্টদের প্রেরণা এবং পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়েছিলেন।

জাতীয়তাবাদীরা তাকে ব্যবহার করে অনেকটা পথ অতিক্রম করেছিল। তিনি কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রীদের নিজের পক্ষপুটে আশ্রয় দিয়েছিলেন অথচ এদের অখণ্ড পাকিস্তান কেন্দ্রিক ন্যূনতম লক্ষ্যও ছিল না। পাকিস্তান আন্দোলনে মাওলানা ভাসানীর অবদান কারো চেয়ে কম ছিল না। তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ড মাওলানা ভাসানীকে বিরূপ করে তুলেছিল। তার বক্তব্যে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এটা সত্য। কিন্তু পাকিস্তানের ধ্বংস প্রয়াসী হিসেবে তাকে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। সময়ের সাথে তাল রেখে তিনি যা কিছু করেছেন এর জন্য মূলত দায়ী তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের গভর্নর আহসান। ইয়াহিয়া মন্ত্রী সভার সদস্য এবং একজন খ্যাতিমান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জনাব জি ডব্লিউ চৌধুরী তৎকালিন পরিস্থিতিতে ভাসানী সর্ম্পকে বলেছেন- ‘ভাসানী আমাকে বলেছিলেন, যদি সরকার মুজিবকে বাংলাদেশের ৬ দফা প্রচারে স্বাধীনতা দেয় তা হলে তার স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান বলা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকবে না।’

যাই হোক শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের তৎপরতা এবং দেশী বিদেশী মিডিয়াসমূহের অপপ্রচারের কারণে ইসলামপন্থী ও ডানপন্থী এবং পাকিস্তানের সংহতিতে বিশ্বাসী সংগঠনসমূহ পাকিস্তানের দোসর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়। এর ফলে চলমান পরিস্থিতিতে তাদের বক্তব্য এবং তাদের তৎপরতা সবকিছুই জনগণের গ্রহণ যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। এ কারণে মুজিবের ধ্বংসাত্মক কর্মতৎপরতা প্রতিরোধে মাওলানা ভাসানীর বিকল্প কেউ ছিলেন না। গভর্নর আহসান নিবুর্দ্ধিতার কারণে অথবা কোন অদৃশ্য সুতোরটানে ভাসানীর সাথে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার বোঝা পড়ার ক্ষেত্রে সচেতন ভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেন। তিনি প্রেসিডেন্টের কাছে মাওলানা ভাসানীকে গুরুত্বহীন করেছিলেন শুধু তাই না- মাওলানার অনুগামীদের প্রতি তিনি প্রত্যক্ষ নিপীড়ন চালিয়েছেন। গভর্নর আহসান কনফিডেন্সিয়াল রিপোর্টে মাওলানা ভাসানী এবং পিকিং পন্থী নেতৃবৃন্দকে রাষ্ট্র বিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। গভর্নর আহসান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে সব সময় এই ধারণা দিয়েছিলেন যে শেখ মুজিব অখণ্ড পাকিস্তানে বিশ্বাসী এবং তিনি কখনই পাকিস্তান ভাংবেন না। গভর্নরের বক্তব্যে আশ্বস্ত হয়ে ইয়াহিয়া আওয়ামী লীগের বিচ্ছিন্নতাবাদী বল্গাহীন প্রচারণায় বাধ সাধেননি। শেখ মুজিবও ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনার সময় প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন। ইয়াহিয়া মুজিবকে বিশ্বাস করেছেন, তার প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্বারোপ করেছেন এবং তার প্রতি সাহায্য সহানুভূতির হাত সম্প্রসারিত করেছেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের সংহতিতে বিশ্বাসী দলসমূহের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করেছেন। শেখ মুজিবের প্রতি ইয়াহিয়া সরকারের সহানুভূতি ও দুর্বলতার কারণে সামরিক সরকারের নাকের ডগায় শেখ মুজিব বিচ্ছিন্নতাবাদের আগুন গ্রাম বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়।

এই সাথে অল ইনডিয়া রেডিও থেকে প্রচারিত এপার বাংলা ওপার বাংলা অনুষ্ঠানে বাকচাতুরী ও মিথ্যার বুনোট দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে চলছিল। মস্কোর রেডিও পিস এন্ড প্রগ্রেস এবং বিবিসি শেখ মুজিব ও তার দলের আত্মঘাতী আবেগকে আর একবার গতিশীল করে তোলে। এই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল মিঃ ব্লাডের মুজিবের প্রতি সহানুভূতি মুজিবকে উদ্দাম করে তোলে। অবশেষে মুজিব নির্বাচনের বহু আগেই বাংলার মানুষের একমাত্র দরদী হিসেবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের একক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।
এবার পশ্চিম পাকিস্তানের দিকে চোখ ফেরানো যাক। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের কোন একক নেতৃত্বের প্রাধান্য ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানে মুসলিম লীগের প্রভাব ও প্রাধান্য দুটোই বর্তমান ছিল। কিন্তু মুসলিম লীগ ছিল ত্রিধা বিভক্ত। তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে মুসলিম লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে বিজয় কেতন উড়াতে সক্ষম হতো। কিন্তু ত্রিধা বিভক্ত মুসলিম লীগ শেষ অবধি জনগণের মধ্যে সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে জামায়াতে ইসলামীর প্রাধান্য থাকা সত্ত্বেও জামায়াত সাধারণ জনগণের মনের গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়নি। এর একমাত্র কারণ জামায়াতের প্রতারণামূলক এমন কোন সস্তা শ্লোগান ছিল না যা জনগণকে উন্মাতাল করে তুলবে। জামায়াতে ইসলামী নিম্ন মধ্যবিত্ত সচেতন জনগোষ্ঠীর ক্ষুদ্রাংশ। আদর্শিক সংগঠন হওয়ার কারণে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বিশেষ প্রক্রিয়া অবলম্বন করায় জামায়াত তখন পর্যন্ত দ্রুত সম্প্রসারণশীল গণ সংগঠনে পরিণত হয়নি। জামায়াতে ইসলামী শাসক এলিট শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতা কোন সময় পায়নি। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত এই এলিট শ্রেণীর প্রতিনিধি জনগণ থেকে দূরত্বের অবস্থান করেও আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনের মধ্যদিয়ে জনপ্রিয় গণনেতায় পরিণত হলেন। কতিপয় সস্তা শ্লোগান যেমন তাসখণ্ড চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানের হারিয়ে যাওয়া গৌরব পুনরুদ্ধারে এবং ইসলামী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্ভট অঙ্গীকার করে সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তানকে আলোড়িত করে ফেললেন। সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানের আলেমদের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পশ্চিম পাকিস্তানে রাজনৈতিক অপশক্তির উত্থান ত্বরান্বিত করে।

ইয়াহিয়ার অঙ্গীকার
১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ ক্ষমতা গ্রহণ করেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের অঙ্গীকার করেছিলেন। মূলত তার অঙ্গীকার ছিল তিনটিঃ
১. নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর।
২. প্রাপ্ত বয়স্ক ভোটে নির্বাচন। মৌলিক গণতন্ত্রীদের দ্বারা নয়।
৩. দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র তৈরি হবে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের দ্বারা।
অবশেষে নির্বাচনকে সামনে রেখে ১৯৭০ সালের ৩১ মার্চ অখণ্ড পাকিস্তানের জন্য ৫টি মূলনীতি সম্বলিত কাঠামো ঘোষণা করা হয়। যা লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার অর্থাৎ এলএফও নামে অভিহিত।
*পাকিস্তানকে অবশ্যই ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
*অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সাপেক্ষে দেশটিকে একটি গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র পেতে হবে।
*আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে শাসনতন্ত্রে অবশ্যই তুলে ধরতে হবে।
*দেশের দুই অংশের মধ্যকার বৈষম্য দূর করতে হবে- বিশেষত অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে।
*কেন্দ্র ও প্রদেশগুলোর মধ্যে ক্ষমতা অবশ্যই এমনভাবে বণ্টন করতে হবে যাতে প্রদেশগুলো সর্বাধিক পরিমাণ স্বায়ত্বশাসন পায়। কেন্দ্রকে আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষাসহ ফেডারেল দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট  ক্ষমতা প্রদানের সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ হয়।

গভর্নর আহসানের দুরভিসন্ধি ও বিচ্ছিন্নতাবাদের পালে হাওয়া
আমি আগেই বলেছি বিছিন্নতাবাদের প্রবল স্রোতে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারার মত একমাত্র ব্যক্তিত্ব তখন ছিলেন মাওলানা ভাসানী। এই ভাসানীর সাথে ইয়াহিয়ার দূরত্ব রচনা করেছিলেন গভর্নর আহসান, শুধু মাত্র মুজিবকে নির্বিঘ্ন করার জন্য। এটা কি গভর্নর আহসানের প্রতিভার দুর্বলতা না কি তিনিও ছিলেন আন্তর্জাতিক চক্রের সাথে সম্পৃক্ত।

১৯৭০ সালের নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে পূর্ব পাকিস্তানের সমুদ্র উপকূলে ধ্বংস যজ্ঞের পর গভর্ণর আহসান এমন একটা কাণ্ড করেন যাতে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ আরো বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া চীন সফরে ছিলেন। তিনি রাওয়ালপিণ্ডি ফেরার পথে ঢাকায় যাত্রা বিরতি করেন। কিন্তু গভর্ণর আহসান ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে সঠিক ধারণা না দিয়ে পত্র পত্রিকার বিবরণকে অতিরঞ্জিত হিসেবে বর্ণনা করেন। ফলে ইয়াহিয়া বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপ না করে পিণ্ডি ফিরে যান। তখন এর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হয়। বিচ্ছিন্নতা-বাদীরা এই প্রসঙ্গ অবতারণা করে কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে জনমনকে বিষাক্ত করে তুলে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এই প্রচারণা শেখ মুজিবের পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দুরভিসন্ধি সাধারণ বাঙালী অতি মাত্রিক যৌক্তিক বলে বিবেচনা করতে থাকে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার ভুল অথবা গাফিলতি উপলব্ধি করে পুনরায় ঢাকায় আসেন এবং দুর্গতদের সংকট নিরসনে ব্যাপক সাহায্য সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করেন। কিন্তু এত করেও তিনি উদ্ভূত ক্ষতির সামান্য পরিমাণ পুষিয়ে নিতে পারেননি। যদিও দুর্গতদের জন্য আওয়ামী লীগের কোন অবদানই ছিলনা। এমন কি জামায়াতে ইসলামী দুর্গতদের জন্য যতটুকু করেছিল তার ধারে কাছেও ছিল না। আওয়ামী লীগ শুধুমাত্র মিডিয়ার আনুকূল্য পেয়ে ৭০ এর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রাজনৈতিক ফায়দার সবটুকু লুটে নেয়।

ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবের পর প্রত্যেকটি দলই নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে অনুরোধ করলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দও নির্বাচন স্থগিত রাখার অনুরোধ জানালেন। মাওলানা ভাসানী প্রস্তাব দিলেন যদি ইয়াহিয়া খান নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি বাদ দিয়ে তার সমস্ত প্রশাসনকে দুর্গতের জন্য ত্রাণ কার্যে নিয়োজিত করেন এবং তখন যদি নির্বাচনে স্থগিত রাখার প্রশ্নে মুজিব চ্যালেঞ্জ করেন তাহলে তিনি এবং তার দল ইয়াহিয়াকে সমর্থন দিবেন মুজিবকে নয়। অন্যান্য দলও এ ব্যাপারে ইয়াহিয়াকে সমর্থন দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নড়াচড়া দেখে মুজিব ঘোষণা দিলেন যদি নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়- তাহলে সংঘর্ষে ১০ লক্ষ লোক নিহত হবে। মুজিবের দেরি সইছিল না। কারণ কৃত্রিম ভাবে সৃষ্ট জনমতের উত্তাপ থিতিয়ে যাবার সম্ভাবনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন মুজিব। যে কারণে হুমকির পর হুমকি দিয়ে ইয়াহিয়াকে ভীত করে দেয়। শেষ অবধি ইয়াহিয়া মুজিবকে সন্তুষ্ট করার জন্য নির্বাচন স্থগিত না রেখে দারুণভাবে রাজনৈতিক ভুল করলেন, যে ভুলের মাশুল দিতে অখণ্ড পাকিস্তান ভেঙে গেল। মুজিবকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য নুরুল আমিনসহ ১১ জন জাতীয় নেতাকে পর্যন্ত সাক্ষাৎ দিলেন না ইয়াহিয়া খান।
জি ডব্লিউ চৌধুরী লিখেছেন- ‘১৯৭০ সালের আগস্ট নাগাদ সরকার মুজিবের আসল মতলব সম্বন্ধে নির্ভরযোগ্য খবর পান। জেনারেল আকবরের (পাক্ষিক) রিপোর্টসমূহ গোয়েন্দা সার্ভিস পূর্বপাকিস্তানে আঞ্চলিক প্রধান ছিলেন একজন বাঙালি, তিনি ইয়াহিয়াকে যথেষ্ট ইংগিত দেন যে মুজিবের কৌশল মনে হচ্ছে বাঙালিদের একচ্ছত্র নেতা হওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচনকে ব্যবহার করা, তারপর তিনি দাঁত খিঁচাবেন। ইতিমধ্যে এক বিদেশী সাংবাদিক সম্ভবত এন্থনি ম্যাসকারেনহাস যার সংগে মুজিবের গভীর সম্পর্ক ছিল তাকে তিনি একটি সাক্ষাৎকার দেন। এতে তিনি তার চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে বাঙালিদের পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন এবং এতে নয়াদিল্লীর সাথে তার গোপন যোগসূত্রের কথাও বলা হয়েছে। এই সাক্ষাৎকারটি তাৎক্ষনিকভাবে প্রকাশ না করার জন্য সেই বিদেশী সাংবাদিককে শেখ মুজিব নিষেধ করেন। কিন্তু কোন এক সূত্রের  মাধ্যমে গোয়েন্দা সংস্থা পুরো রিপোর্টটি হাতিয়ে নিতে সক্ষম হয়। ইয়াহিয়া হয়তো এ ব্যাপারে মুজিবকে চ্যালেঞ্জ করতে পারতেন। দক্ষ রাজনীতিকদের মত সময়োচিত সাহসি পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে ইয়াহিয়ার পিছুটান ছিল বরাবরই।

নভেম্বরে চীন সফরকালে ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডব এবং পরবর্তী প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে মুজিবের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা থেকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে বাধ্য হয়ে বিরত থাকতে হয়েছিল। নির্বাচনোত্তর ৬ দফা এবং বিচ্ছিন্নতার পক্ষে মুজিব যখন শক্ত অবস্থান নিলেন তখনকার পরিস্থিতি ছিল ইয়াহিয়ার জন্য বিব্রতকর।

নির্বাচনের পর মুজিব ও ভূট্টো
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। এই নির্বাচনকে অনেকেই মনে করেন অবাধ ও নিরপেক্ষ। তৎকালীন মিডিয়া ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদের পক্ষে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিরঙ্কুশ বিজয় হওয়ার কারণে নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়ে উঠল। প্রকৃতপক্ষে এ নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ ছিল না। নির্বাচনের পূর্বে শুধু ঢাকায় নয় দেশের সর্বত্র সন্ত্রাস চালিয়েছিল আওয়ামী লীগ। তারা অনাহুত সংঘাত সৃষ্টি করে জামায়াত কর্র্মীদের রক্তাক্ত ও ক্ষত বিক্ষত করে। এমনকি নির্বাচনের দিন জামায়াত ও অন্যান্য দলের পোলিং এজেন্টদের বুথ থেকে বের করে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ কর্মীরা। কিন্তু প্রশাসন ছিল নীরব। অনেক স্থানে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্যান্য দলীয় সমর্থকদের পোলিং বুথে আসতে দেয়া হয়নি। এমনকি তারা পোলিং অফিসারদের সহযোগিতায় অজস্র জাল ভোট দিয়ে বাক্স  ভর্তি করে। ভোট গ্রহণের সাথে জড়িত অধিকাংশ প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসাররা নিরপেক্ষ ছিলেন না, তথাকথিত জাতীয়তাবাদের উন্মাদনায় আক্রান্ত ছিলেন তারা।

নির্বাচন হল এভাবেই। আওয়ামী লীগ ভয়-ভীতি প্রদর্শন এবং শক্তি প্রয়োগ করে সাফল্যের সবটুকু তার ঘরে তুলে নিতে সক্ষম হল। পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন হাতিয়ে নিল আওয়ামী লীগ এবং কাষ্টিং ভোটের ৭৪ শতাংশ অর্জন করল তারা। পশ্চিম পাকিস্তানে অনুরূপ ভূট্টোর দল পিপলস পার্টি ১৩৮টি আসনের মধ্যে ৮১টি আসন লাভের সৌভাগ্য অর্জন করে।

পূর্ব পাকিস্তানের শেখ মুজিব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভুট্টো উভয়েরই চারিত্রিক বৈশিষ্টের মধ্যে তেমন উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল না। দুই নেতাই পাকিস্তানের অশিক্ষিত ভোটারদের কাছে নেতিবাচক আবেদন রেখে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একজন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক মনোভাব জাগ্রত করে অন্যজন ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে  জঙ্গী মনোভাব জাগ্রত করে জন প্রিয়তার শীর্ষে আরোহণ করে। এদের কারো মধ্যে গঠনমূলক ইতিবাচক দৃষ্টি ভঙ্গী ছিল না। একজনের ছিল ইউটোপীয় ধ্যান-ধারণা সমৃদ্ধ তথাকথিত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার লঘু আবেদন, অন্যজনের ছিল হাজার বছর ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার এবং তাসখন্দে হারান জাতীয় সম্মান পুনঃ প্রতিষ্ঠার বাগাড়ম্বর। মুজিব ভূট্টো উভয় নেতার বাস্তবতা বিবর্জিত অঙ্গীকার অশিক্ষিত সাধারণ মানুষ আন্তরিকতার সাথে বিশ্বাস করল। এই বিশ্বাসই প্রতিশ্রুতিশীল দল সমূহের সর্বনাশ ডেকে আনল, সর্বনাস ডেকে আনল অখণ্ড পাকিস্তানের । এই দুই নেতা এবং দুটো দল এক যোগে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দিল এবং রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ল সমগ্র জাতি।

নির্বাচনের পর মুজিব ভূট্টো উভয়েই বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থানে দু’জনের একজনও ছিলেন না। সমকালীন পর্যবেক্ষক মহল উভয় নেতাকেই পাকিস্তান বিরোধী কোন বিশেষ চক্রের ক্রীড়নক বলে ভাবতে শুরু করে। ঊন্নিষশত বাহাত্তরের মার্চে কোলকাতায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় রূপদর্শীর কলামের বিবরণ ঐ ধারণাকে বদ্ধমূল করেছে। এতে লেখা হয় -‘আমার কাছে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে যা থেকে বলা যাবে মুজিব ভূট্টো উভয়েই ছিলেন ভারতের এজেন্ট। পাকিস্তানের উভয় নেতা ভারতের ছক অনুসারে তাদের আচরণ করেছেন।’

(বইটির pdf version download করুন এখানে)

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh