Home EBooks দুই পলাশী দুই মীরজাফর অধ্যায় ১৫: বৈষম্য দূরীকরণে ইয়াহিয়ার উদ্যোগ

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ১৫: বৈষম্য দূরীকরণে ইয়াহিয়ার উদ্যোগ Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:25
বৈষম্য দূরীকরণে ইয়াহিয়ার উদ্যোগ
ক্ষমতাসীন হওয়ার পরই সামাজিক সুবিচারের প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কিছু অঙ্গীকার করেছিলেন। হয়তোবা সেটা ছিল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রয়োজনে। জি ডব্লিউ চৌধুরীর অখণ্ড পাকিস্তানের শেষ দিনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী যেমন তিনি বলে ছিলেন, ‘পরিকল্পিত সামাজিক ইনসাফের দাবি করে পৃথক করা যায় না। যে বিরাট ব্যবধান সমাজের নানা অংশকে পৃথক করে রেখেছে তাকে সংকুচিত করতে হবে এবং যা ভারসাম্যহীনতা, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও অসন্তোষের পথ দেখায় তা দূরীভূত করতে হবে।’ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার এই আকাঙ্খা পূরণ তৎকালিন আর্থিক ও সামাজিক পটভূমিতে সম্ভব ছিল না। ১৯৬৯ সালের মে মাসে আমেরিকার সেক্রেটারী অব স্টেট পাকিস্তান সফরে এলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বর্ধিত অর্থনৈতিক সাহায্যের আবেদন জানিয়ে সাড়া পাননি। এতদসত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে ১৯৭০-৭৫ মেয়াদের চতুর্থ পাঁচসালা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়েছিল আওয়ামী লীগের বিরোধিতার মুখে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখার জন্য এবং বৈদেশিক সাহায্যের প্রবাহ অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য এই পরিকল্পনা প্রণয়ন অপরিহার্য ছিল। পরিকল্পনা কমিশনের প্রতি ইয়াহিয়া খানের নির্দেশ ছিল প্রথমতঃ সামাজিক সুবিচারের প্রতি অধিকতর গুরুত্বারোপ এবং দ্বিতীয়তঃ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা।

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানী অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ ও সুপারিশক্রমে শেষ অবধি জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল যে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তাতে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩৯৪০ কোটি টাকা, পশ্চিম পাকিস্তনের জন্য বরাদ্দ হয় ৩৫৬০ কোটি টাকা। সর্বমোট বরাদ্দের ৫২.৫ শতাংশ পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে এবং ৪৭.৫ শতাংশ পশ্চিম পাকিস্তানের ভাগে। এতেও মন্ত্রী পরিষদের বাংলাভাষী সদস্যরা সন্তুষ্ট হতে পারেনি। এর প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পরিকল্পনা কমিশনের উদ্দেশে বলেন- ‘মন্ত্রী পরিষদে আমার বাঙালি সহকর্মীরা আমার কাছে উল্লেখ করেছেন যে ১৯৭০-৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দে আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে না। তা যদি হয় তাহলে আমি এর পক্ষ নিতে পারি না।’ প্রেসিডেন্টের এই প্রতিক্রিয়ার ফলে পরবর্তীতে পরিকল্পনা কমিশন ঘোষণা করে যে, আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার জন্য ৭৫০ থেকে ১০০০ কোটি টাকার সম্পদ পশ্চিম  পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে স্থানান্তর করা হবে। পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন বরাদ্দ তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ৩৭ শতাংশ থেকে ৫২.৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। ১৯৭০-৭১ সালের বার্ষিক পরিকল্পনায় পূর্ব পাকিস্তানের বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। ইয়াহিয়া খান এ ব্যাপারে আরো বরাদ্দের কথা ব্যক্ত করেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকার যথেষ্ট সংখ্যক প্রকল্প তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। অথচ পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন তখন বাঙালিদের দ্বারা পরিচালিত হতো। এটা ছিল তাদের দুর্বলতা ও অযোগ্যতা। পূর্ব ও পশ্চিমের অতীত বৈষম্য দূর করার মানসিকতা ইয়াহিয়ার মধ্যে প্রবল ছিল। এ ব্যাপারে পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যেও কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়নি।
এতদ্সত্ত্বেও একাত্তরের ঘুর্ণিঝড় পূর্ব-পকিস্তানে মরণ আঘাত হানলই। ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানে মহাকালের বিপর্যয়কর এবং মর্মান্তিক রক্তাক্ত পরিণতি দ্বিজাতি তত্বকে অনেকটা ম্লান করে দিল। কিন্তু কেন? কেনর উত্তর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে দোষারোপ করে অথবা মুজিবের ওপর দেবত্ব আরোপ করে মিলবে না। এর জবাব নিহিত রয়েছে পাকিস্তান আন্দোলনের ধারাবাহিক ইতিহাসের মধ্যে, এটা ছিল হিন্দুস্থানের দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার চূড়ান্ত পরিণতি। এটা ছিল ব্রাহ্মণ্য চক্র প্রযোজিত অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠা নাটকের শেষাঙ্ক।

আগড়তলা যড়যন্ত্র মামলা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন কি একাত্তরের রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে সূচিত হয়েছিল? এর জবাব আমি এই গ্রন্থে এর আগে দিয়েছি। এর প্রক্রিয়া শুরু হয় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েকমাস আগে। এর পেছনে ছিল হিন্দুস্থানের সক্রিয় ষড়যন্ত্র। তথাকথিত স্বাধীনতার পর অনেকেই একথা অকপটে দৃঢ়তার সাথে এবং নিলর্জ্জভাবে স্বীকার করেছেন।
১৯৭২ সালে ৮-৯ এপ্রিল শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে অকপটে বলেন যে, সর্বপ্রকারে সাহায্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তার জন্য ভারতের সাথে পূর্বেই তার চুক্তি ছিল। সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ভারত সাহায্য ও আশ্রয় দেবে- এসব চুক্তি তিনি পূর্বেই সম্পন্ন করেছিলেন।  আওয়ামী লীগ ও বাকশাল নেতা আব্দুর রাজ্জাক সাপ্তাহিক মেঘনার (১৯৮৭) সাথে এক সাক্ষাৎকারে অনুরূপ বক্তব্য দিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুসারে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়েছিল ৫০ দশকের শেষ দিকে। আগড়তলা মামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি এর সত্যতাকে স্বীকার করেন অকপটে। তার ভাষায়, এরপর আমাদের সময়কার উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা। তিনি ১৯৬২ সালে একটা ডেসপারেট মুভ নিয়ে আগড়তলা গিয়ে এরেস্ট হয়ে যান। তখনও ব্যাপারটা ম্যাচিউর হয়নি। রেজাই আলী নামে এক ভদ্রলোক তাকে কুমিল্লা, কুমিল্লা থেকে নোয়াখালী সীমান্ত হয়ে আগড়তলা যেতে সাহায্য করেন। আগড়তলা থেকে দেশে ফিরে ঢাকায় এসে তিনি ধরা পড়েন।

‘এর কিছুদিন পর দেখলাম ওদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নামও আছে। তিনি আগে থেকে জেলে ছিলেন।’ আগড়তলা ষড়যন্ত্র উদঘাটিত হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। কয়েকজন সাক্ষীর সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, শেখ মুজিব এই ষড়যন্ত্রের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। আগড়তলা ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা ছিল, কমান্ডো কায়দায় অতর্কিত আক্রমণ করে সামরিক ইউনিটসমূহের অস্ত্রাগার দখল করে অকেজো অথবা ধ্বংস করে দেয়া। এই উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে ১৯৬৭ সালে ১২ জুলাই ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিনিধিদের সংগে হিন্দুস্থানী প্রতিনিধিদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। একই বছর ডিসেম্বরে ষড়যন্ত্রকারীদের কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়। এদের একজনের দেয়া তথ্যে জানা যায় যে, হিন্দুস্থান বিপ্লবীদের অর্থ ও অস্ত্র সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়াও চূড়ান্ত মুহূর্তে দিল্লী পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের যোগাযোগের আকাশ ও সমুদ্র পথ বন্ধ করে দেবার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল।

হিন্দুস্থানের সবুজ সংকেত
‘মেঘনার তীর থেকে টেমসের কিনারে’ গ্রন্থে লিখেছেন, হিন্দুস্থান ষড়যন্ত্র-কারীদের দেয়া তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে একটি ফকার ফ্রেন্ডশিপ বিমান হাইজ্যাকের নাটক অবতারণা করে। দিল্লীর নির্দেশমত ভারতীয় চর কর্তৃক এই বিমানটি হাইজ্যাক করে লাহোরে অবতরণ করান হয়। হ্যাইজ্যাককারীরা তাদের দাবির ব্যাপারে আলাপ আলোচনার সময় সুযোগ না দিয়ে বিমানটিকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়। পাকিস্তান বিমানের ক্রু এবং যাত্রীদের ভারত প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করে দেয়। এ সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, হিন্দুস্থানের উপর দিয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিমান চলাচল বন্ধ করার একটা ছুঁতো দাঁড় করানোর লক্ষ্যে হিন্দুস্থানী এজেন্টরা এই ঘটনার অবতারণা করেছিল। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সংকট সৃষ্টি না করে এই ঘটনার মাধ্যমে হিন্দুস্থান পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এই সবুজ সংকেত দিয়েছিল যে, ভারত তাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
এই সংকেত মুজিবকে অত্যন্ত দুঃসাহসী করে তুলে। সে সময় গার্ডিয়ান পত্রিকা (২৪ ফেব্রুয়ারী, ১৯৭১) মুজিবের দুঃসাহসের কারণ এই ভাবে প্রকাশ করে- ‘তিনি (মুজিব) বলেছেন, জনসাধারণ আমাকে ভালবাসে, সুতরাং আমাকে স্পর্শ করবেন না। তিনি এ কথা বলেছেন কারণ তিনি জানেন যে পূর্ব পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সৈন্য সংখ্যা এত কম যে, তারা বড় রকমের কিছু করার সাহস পাবে না। আর যেহেতু হিন্দুস্থানের উপর দিয়ে বিমান চলাচল বন্ধ, কাজেই সৈন্য সংখ্যা বাড়ানোও অসম্ভব।’

১৯৭১ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক প্রকাশিত শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে- ‘দিল্লী ভারতের উপর দিয়ে বিমান চলাচল বন্ধ করে ক্ষান্ত হলো না পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাহায্যের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর বহু সৈন্যকে পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তের কাছাকাছি আনা হল। জেট জঙ্গী বিমান ও পরিবহন বিমান সীমান্তের কাছাকাছি বিমান বন্দরে জড়ো করা হলো। পশ্চিম বাংলায় ৫ ডিভিশন সৈন্য সমাবেশ করা হল। এর আগে পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে মোতায়েনকৃত বি এস এফ এর কয়েকটি ব্যাটোলিয়ানের সাথে আরো কয়েকটি ব্যাটেলিয়ান যুক্ত করা হল। এই ভাবে প্রায় ২৫টি ব্যাটেলিয়ান পূর্ব পাকিস্তানের  ভিতরে ঢুকতে পারে এ কারণে বি এস এফ এর চিহ্ন মুছে ফেলা হল। জীপ ও অন্যান্য যানবাহনের রঙ বদলে দেয়া হল। দিল্লী থেকে বিমান যোগে বি এস এফ সৈন্য আনা হল সব বি এস এফ কোর্স বাতিল করা হল। পুলিশ বিভাগের সব ছুটি বাতিল করা হল।

হিন্দুস্থানী এলাকার উপর দিয়ে পাকিস্তানী বিমান চলাচল বন্ধ করার সাথে সাথে সমুদ্রপথেও বাধার সৃষ্টি করল দিল্লী। এপ্রিলে (৭১) হিন্দুস্থানী নৌঘাঁটি দোয়ারকার ৭০ মাইল পশ্চিমে ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি জাহাজ ওসমান এন্ডুরেন্স নামে একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে বিব্রত করে। জাহাজটি হাজীদের বহন করছিল। হিন্দুস্থানের দক্ষিণ সীমান্তে অনুশীলনের নামে উপকূল থেকে ১২৩ মাইল দূর পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে থাকে। এইভাবে তারা পাকিস্তানী বেসামরিক বিমানকে আরো দক্ষিণে যেতে বাধ্য করে।’

ইয়াহিয়ার সদিচ্ছার অভাব ছিল না
আগড়তলা ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত থাকা সত্ত্বেও শেখ মুজিব ও তার দলের সাথে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কখনও কোনভাবে অসম্মানজনক আচরণ করেননি। মুজিবকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য অন্যান্য অখণ্ড পাকিস্তানে বিশ্বাসী দলসমূহের ওপর তিনি অবিচার করেছেন। লিগাল ফ্লেম ওয়ার্ক অর্ডার অর্থাৎ এল এফ ও এর সীমা লঙ্ঘন করা সত্ত্বেও মুজিব ও তার দলের প্রতি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি, এমন কি এ ব্যাপারে হুঁশিয়ারীও উচ্চারণ করেননি।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া শেখ মুজিবকে শুভেচ্ছা বার্তা দিয়ে অভিনন্দন জানালেন। সীমালঙ্ঘন করার জন্য ইয়াহিয়ার শাসনামলে যারা বন্দী হয়েছিলেন শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ ইয়াহিয়া তাদের মুক্তির নির্দেশ দিলেন। নির্বাচন ঘোষণার পর শেখ মুজিব সীমা অতিক্রম করতে শুরু করলেন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য চাপ বৃদ্ধি করলেন।
শুধু মাত্র ক্ষমতা হস্তান্তর নয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানী গণ প্রতিনিধিদের মধ্যে সমঝোতা এবং পারস্পরিক বোঝা পড়া। কিন্তু ক্ষমতা পাওয়ার জন্য মুজিব অসহিষ্ণু হয়ে উঠলেন। হিংসা বিদ্বেষ আবেগ উন্মাদনা এবং সহিংসতা ছড়িয়ে পরিবেশকে দূষিত করে ফেললেন।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবকে ইসলামাবাদ সফরের আমন্ত্রণ জানালেন। কিন্তু মুজিবের এ ব্যাপারে কোন প্রতিক্রিয়া না দেখে বাধ্য হয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকায় এলেন। ১২ জানুয়ারী মুজিবের সাথে ইয়াহিয়ার ৩ ঘণ্টা স্থায়ী বৈঠক হল। কিন্তু মুজিব তার অঙ্গীকার মত সাড়া দিলেন না। শেখ মুজিব তার প্রতিশ্রুতি মত খসড়া শাসনতন্ত্র প্রনয়ণে রাজী হলেন না। কথাও ছিল দফা কিঞ্চিত পরিবর্তন করে অখণ্ড পাকিস্তানের উপযোগী শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করবেন। ইয়াহিয়াকে মুজিব জানিয়ে দিলেন- শাসনতন্ত্র প্রণয়নের দায়িত্ব তার, ইয়াহিয়ার দায়িত্ব হচ্ছে সংসদ ডাকা। শেখ মুজিবের অভদ্র, অকূটনৈতিক আচরণ, তার ধৃষ্টতা এবং অসৌজন্যমূলক কর্ম-কাণ্ড পাকিস্তানের সেনা প্রধান হয়েও ইয়াহিয়া হাসিমুখে সহ্য করলেন এবং ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সম্মুখে মুজিবকে পাকিস্তানের ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী বলে অভিহিত করলেন।

জি ডবলিউ চৌধুরী তৎকালিন পাকিস্তানের বাস্তব অবস্থার নিরিখে বলেছেন- ‘পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করতে বহু সেনাবাহিনী, অফিসারবৃন্দ, সিনিয়ার কর্মকর্তারা বড় রকমের ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত ছিলেন। সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসারবৃন্দ এবং দূরদর্শী জেনারেলদের কাছে পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদ কোন অস্পষ্ট ও অবাস্তব ধারণা ছিল না। বরং তাদের কাছে পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পাকিস্তানের বহু দেশপ্রেমিক জনগণের ন্যায় এর আদর্শ ও পতাকা যে কোন মূল্যে রক্ষা করা ছিল খুবই প্রিয়। তারা ঐ সব মূল্যবোধ ও আদর্শ রক্ষা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন।’

২৭ জানুয়ারী জুলফিকার আলী ভূট্টো ঢাকায় এলেন। শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ব্যাপারে প্রতিনিধিত্বশীল দুই দলের দুই নেতার সমঝোতার ওপর নির্ভর করছিল ইয়াহিয়ার ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া। ৩ দিন ধরে আন্তরিক পরিবেশে তাদের আলাপ আলোচনা হল। শেষ অবধি শেখ মুজিব ভূট্টোকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিলেন যে তিনি ৬ দফার পরিকল্পনা থেকে এক ইঞ্চিও সরে দাঁড়াবেন না।
ভূট্টোও দ্ব্যর্থহীনভাবে বললেন যে, তিনি এবং তার দল ৬ দফা পরিকল্পনার গোপন দুরভিসন্ধি বিচ্ছিন্নতার পরিকল্পনায় সম্মত হতে পারেন না। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মিডিয়া ভূট্টোর বক্তব্য থেকে দুরভিসন্ধির গন্ধ আবিস্কার করলেও ৬ দফার অন্তর্নিহিত লক্ষ্যের কথা কোথাও আলোচিত হল না। সর্বাধিক স্বায়ত্বশাসন দেওয়ার জন্য যখন প্রেসিডেন্ট এবং জেনারেলরা প্রস্তুত, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের সব ব্যবস্থা যখন পাকাপোক্ত, এমনকি বৈষম্যজনিত অতীতের ক্ষতিসমূহ পূরণের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের আয়োজন যখন চূড়ান্ত, এমন কি যখন সমগ্র পাকিস্তানের ভাগ্য বিধাতা বাঙালীরা, তখন মুজিব তার স্বভাবসুলভ পুরানো মেজাজ আকড়ে ধরে থাকলেন। তার একগুয়েমী ও আপোষহীনতা সমগ্র জাতিকে সংঘাতের দিকে টেনে নিয়ে চলল।

মুজিবের আপোষহীনতা ও অনমনীয়তার কারণে জেনারেলরা ভুট্টোর দিকে ঝুকে পড়ল, এর ফলে ভূট্টো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। জাতীয় পরিষদের বৈঠকের তারিখ ঘোষণার পর ভূট্টোর প্রতিক্রিয়ার মধ্যদিয়ে সেই শক্তির বহিঃপ্রকাশ প্রকট হয়ে ওঠে। তিনি হুঙ্কার দিয়ে বলে ছিলেন- ‘যতক্ষণ পর্যন্ত মুজিব ও তার মধ্যে শাসনতন্ত্রের ব্যাপারে বোঝা পড়া না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত বৈঠক বসতে দেয়া হবে না। এমনকি এ প্রেক্ষিতে সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তানে গণআন্দোলন ও বিপ্লব ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয় তার পক্ষে থেকে।

ফেব্রুয়ারীতে উপমহাদেশে একটি ঘটনা ঘটল, ঘটনা ছোট। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনাটি ছিল একটি ঝড়ের পূর্ব সংকেত। এই ঘটনাটি জানিয়ে দিল ভারত পাকিস্তানকে টুকরো করার ব্যাপারে কতদূর অগ্রসর হবে। ঘটনাটি ছিল দিল্লীর প্ররোচনায় একটি ভারতীয় বিমান ছিনতাই নাটক। এর উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য বিমান ছিনতাইকে গ্রহণযোগ্য অযুহাত হিসেবে দাঁড় করানো। পাকিস্তান সরকারের বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে এর রহস্য উন্মোচিত হয়। ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের কতিপয় ভারতীয় অনুচর কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবীতে একটি বিমান ছিনতাই করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। এই ছিনতাই নাটকের সূত্র ধরে দিল্লী পাকিস্তানী বিমানের জন্য ভারতীয় আকাশ সীমা নিষিদ্ধ করে দেয়, এর ফলে পাকিস্তানকে সিংহল হয়ে তিন হাজার মাইল আকাশ সীমা অতিক্রম করে দেশের উভয় অংশের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। ছিনতাই সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথে মুজিব বিবৃতি দেন, এটা ক্ষমতা হস্তান্তর স্থগিত করার জন্য পাকিস্তান সরকারের ষড়যন্ত্র।’ মুজিব পরোক্ষভাবে ভারতীয় পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেন। অন্যদিকে আরএক লঘুচেতা নেতা জুলফিকার আলী ভূট্টো ভারতীয় অনুচর ছিনতাই-কারীদের জাতীয় বীর হিসেবে অভিহিত করলেন। এর অর্থ দাঁড়াল তিনি ভারতীয় পদক্ষেপে এক ধরনের বৈধতার প্রলেপ দিলেন। পর্যবেক্ষক মহল বুঝে নিলেন দুই প্রান্তের দুই নেতা মেধাশূন্য দেউলিয়া শুধু নয় ভারতীয় চক্রান্তের ক্রীড়নক।

ভূট্টোর অব্যাহত হুমকির প্রেক্ষিতে পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস পার্টি বহির্ভূত অন্যান্য সদস্যরা আসন্ন বৈঠকে যোগদানে অস্বীকার করলো। এতে ভুট্টোর অবস্থান আরো শক্ত হয়ে উঠল। চূড়ান্ত অবস্থায় বৈঠক স্থগিত ছাড়া ইয়াহিয়ার জন্য কোন বিকল্প পথ আর খোলা রইল না। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠার সম্ভাবনার কারণে তাদের সন্তুষ্ট করার মত তিনি একটি বক্তব্যের খসড়া তৈরী করলেন। কিন্তু বিবৃতিটি প্রকাশ করা হল না জেনারেল পীর জাদার চক্রান্তে। ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য বৈঠক স্থগিত রাখার ঘোষণা প্রচার করা হল অতি সাধানরণ ভাবে। ৩ মার্চের নির্ধারিত বৈঠক মূলতবী ঘোষণার সাথে সাথে ঢাকা শহর অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল। প্রতিটি এলাকা থেকে জনগণ পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে দিতে পল্টন এলাকায় সমবেত হতে শুরু করল। প্রত্যেকটি মানুষের হাতে লাঠি লোহার রড। ভাঙচুর দোকান পাট লুট  হতে শুরু হল। শেখ মুজিবের অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু হল লুটপাটের মধ্য দিয়ে, অবাঙালীদের দোকান পাট ঘরবাড়ী লোপাট হওয়া শুরু হল। সরকারকে সেনাবাহিনী নামাতে হল। লুটেরাদের উদ্দেশে গুলী চালাতে হল। কিন্তু লুট-পাট এবং আন্দোলন বন্ধ হল না বরং আরো প্রবল হয়ে উঠল।

পূর্ব পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় শাসনের অচলাবস্থা
মার্চের শুরু থেকে পূর্ব পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসন বিকল হয়ে পড়ল। পুরো প্রশাসন মুজিবের নিয়ন্ত্রণে এসে গেল। রেডিও টিভি থেকে শুরু করে সব কিছু তখন মুজিবের নিয়ন্ত্রণে। মুজিব সরকারী আধা সরকারী অফিসসমূহ বন্ধ ঘোষণা করলেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান শাসনের জন্য ত্রিশটির অধিক নির্দেশ জারি করলেন। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে টেলিফোন, টেলেক্স ও বেতার যোগাযোগ বন্ধ ঘোষণা করলেন। আর পাকিস্তানী পতাকা নয় বাংলাদেশী পতাকা উড্ডীন হল ঘরবাড়ী এবং অফিসে।

পাকিস্তানের অস্থিত্ব রক্ষার শেষ প্রয়াস নিয়ে ইয়াহিয়া ঢাকায় এলেন ১৫ মার্চ। মুজিব উস্কানীমূলক বিবৃতি দিলেন। বিবৃতিতে বলা হল-‘জনগণের বীরোচিত সংগ্রাম এগিয়ে চলছে... বাংলাদেশের জনগণ, বেসামরিক সরকারী কর্মচারী, অফিস ও কারখানার কর্মচারী, কৃষক ও ছাত্রসমাজ এটা নিশ্চিতভাবেই প্রদর্শন করেছে যে, তারা আত্মসমর্পণের চেয়ে বরং মৃত্যুকে বরণ করবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার উৎসাহ উদ্দীপনা নির্বাপিত করা যাবে না। সুতরাং সংগ্রাম নতুন উদ্দীপনাসহকারে চলবে যতক্ষণ না আমাদের মুক্তির লক্ষ্য আদায় হয়।’

একাত্তরের মহানায়ক শেখ মুজিব তখন ছিলেন ভারতীয় অর্থানুকূল্যে সংঘটিত উগ্রাবাদী জঙ্গী ভারতপন্থী দ্বারা পরিবেষ্টিত। এদের প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করত জঅড (রিসার্চ এণ্ড এ্যানালাসিস উইং)। এই গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শে শেখ মুজিব কর্ণেল ওসমানীকে বিদ্রোহী শক্তি সমূহের দায়িত্ব দেন। কিছু সেনা কর্ম-কর্তা ওসমানীর সাথে যুক্ত হন। তিন সপ্তাহের অব্যাহত আন্দোলন পাকিস্তান সরকারকে চ্যালেঞ্জ করার ব্যাপারে মুজিবকে প্রেরণা যুগিয়ে ছিল। ওদিকে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস এর বাংলাভাষী অফিসার ও জোয়ানরা, পুলিশ ও আনসাররা মুজিবকে সমর্থন দেয়ার ব্যাপারে ছিল ঐক্যবদ্ধ। অন্যদিকে পাকিস্তানের জেনারেলরা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছিলেন। মুজিব বিচ্ছিন্নতার পথ পরিহার না করলে কি ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছিল আর্মী হেড কোয়ার্টারে।

২০ মার্চ পর্যন্ত আলোচনার অগ্রগতি হতে থাকে। ফারল্যান্ড মুজিবকে সতর্ক করে দেয়। মুজিব কিছুটা নমনীয় হলে ঢাকাস্থ ভারতীয় কনস্যূলেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। দূতাবাস সূত্রে মুজিবকে সাহায্য সহাযোগিতার আশ্বাস দেয়া হল। ওদিকে রুশ সাহায্য ও সমর্থন মুজিবকে শক্ত অবস্থান নিতে তাগিদ দেয়। মুজিবের ওপর চাপ বৃদ্ধি করে ভারতপন্থী উগ্রবাদী তরুণরা। দুটো শক্তির ঐশ্বর্যে লালিত হয়ে শেখ মুজিব হতাশ হয়ে পড়লেন তখন, যখন তিনি জানতে পারেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার পেছনে নেই। মুজিব ইয়াহিয়ার সাথে সমঝোতার দিকে অগ্রসর হয়েও পিছিয়ে আসেন তার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ভারত এবং তার আন্দোলনের শক্তি আপোষহীন তরুণদের চাপের মুখে। তার সীমাহীন গর্জনের আড়ালে তাকে ঘিরে ধরে এক অসীম অসহায়ত্ব। ইয়াহিয়া খানের সংগে এক বৈঠকে তিনি বলেই ফেলেছিলেন- ‘আমি যদি আপনার কথামত কাজ করি তাহলে ছাত্র নেতারা আমাকে গুলি করবে। আর যদি আমি ছাত্র নেতাদের কথামত চলি তাহলে আপনি আমাকে গুলি করবেন। বলুন তো আমি কি করি।’ শেখ মুজিব তার নেতৃত্বের অসহায় ও করুণ অবস্থাই ফুটিয়ে তুলেছিলেন তার উপরোক্ত মন্তব্যের মধ্য দিয়ে (অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা, পৃ-১২)

১৬ মার্চ থেকে শেখ মুজিব ও দায়িত্বশীল আওয়ামী নেতৃবৃন্দের সাথে ইয়াহিয়ার আলোচনা শুরু হয়। ২০ মার্চ আলোচনা হয় ২ ঘন্টা ১০ মিনিট। আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের মুজিব বলেন, আলোচনার অগ্রগতি হয়েছে। এতে দেশের মানুষ অনেকটা আস্বস্ত হয়।

২১ মার্চ হাওয়া উল্টো দিকে প্রবাহিত হল। মুজিব ও তাজুদ্দিন ইয়াহিয়ার সাথে এক অনির্ধারিত বৈঠকে মিলিত হন। মুজিবের উপস্থিতিতে তাজুদ্দিন ইয়হিয়াকে জানিয়ে দেন- আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সভার ব্যাপারে সম্মত হতে পারে না। আওয়ামী লীগ চায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে পৃথকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক। আওয়ামী লীগের বক্তব্য পরিষ্কার, পাকিস্তান ভেঙ্গে ফেলা। ইয়াহিয়া নিরাশ হলেন। তিনি অখন্ড পাকিস্তানের সেনা প্রধান হিসেবে পাকিস্তান ভেঙ্গে ফেলার দায়িত্ব নিতে পারেননি। অবশেষে তিনি জানিয়ে দিলেন, দেশ ভাঙার কোন হুমকি চ্যালেঞ্জ বিহীন থাকতে পারে না।
বলতে গেলে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহের শেষে পকিস্তানের সামরিক সরকারের সাথে আওয়ামী লীগের বোঝাপড়া ও সমঝোতার ব্যাপারে যাবতীয় সংলাপের অবসান হয়। চতুর্থ সপ্তাহের শুরুতে দীর্ঘ সংলাপের উপসংহার রচিত হচ্ছিল নেপথ্যে। যেমন প্রস্তুতি চলছিল ক্যান্টনমেন্টে অনুরূপ প্রস্তুতি অব্যাহত ছিল আওয়ামী মঞ্চে। সার্বিক বিচারে জাতি ছিল সম্মোহিত। আওয়ামী লীগ ছাড়া আর সব রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীরা ছিল নীরব। তারা এক অনিবার্য ধ্বংসাত্বক পরিণতি অবলোকনের জন্য ছিল অপেক্ষমান।

২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে আওয়ামী লীগ বলতে গেলে চূড়ান্ত বিদ্রোহের পতাকা উড়িয়েছিল। রেডিও টিভি পত্রপত্রিকা ও অন্যান্য মিডিয়াসমূহে প্রচারিত হল বিদ্রোহের জয়োল্লাস। ধানমন্ডিতে কর্নেল ওসমানীর নেতৃত্বে সশস্ত্র মার্চপাস্ট করিয়ে আওয়ামী লীগ অনিবার্য যুদ্ধের ঘোষণা জানিয়ে দিল। উচ্ছৃংখল জনতার বর্বর হামলা শুরু হল অবাঙালি জনবসতির উপর। এমনকি বিচ্ছিন্ন হামলার শিকার হল সেনাবাহিনীর সদস্যরাও। অসহযোগ আন্দোলনের ফলে সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্ট চত্বরে বন্দী হয়ে পড়ল। এমনকি তাদের খাদ্য পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হল। এত কিছুর পরেও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া শেখ মুজিবের শুভবুদ্ধিসঞ্জাত নির্মল সিদ্ধান্তের প্রতীক্ষায় রইলেন তৃষ্ণার্ত চাতকের মত। ২৪ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানের গণপ্রতিনিধিরা পাকিস্তানকে রক্ষার জন্য শেখ মুজিবকে অনুরোধ করলেন। কিন্তু ইতিবাচক সাড়া পেলেন না। পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে চেষ্টা তদবির যখন ব্যর্থ হল, বোঝাপড়ার মত সব পথ যখন রুদ্ধ হল যখন আর কোন বিকল্প অবশিষ্ট রইলো না, তখন অনাকাঙ্খিত সশস্ত্র পথের অর্গল খুলে গেল স্বাভাবিক নিয়মে।

ক্যান্টনমেন্টে আবদ্ধ সেনাবাহিনীর পক্ষে বাইরের ঘটনাপ্রবাহ সঠিক ভাবে আঁচ করা সম্ভব ছিল না। তাদের প্রতি সহানুভূতিশীলদের সাথেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এর ফলে সেনা অভিযানের ব্যাপারে তারা তাদের শক্তি প্রয়োগের সীমা নির্ধারণ করতে পারছিল না।

২৫ মার্চ গভীর রাতে শেখ মুজিবকে তার ধানমন্ডির বাস ভবন থেকে সেনাবাহিনী তাদের হেফাজতে তুলে নেয়। সেই সাথে ঢাকার কৌশলগত অবস্থান গুলোতে সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। পাক বাহিনীর সামরিক অভিযান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোন বিবরণ আজো প্রকাশি হয়নি। যা কিছু প্রকাশ হয়েছে সে সব ছিল ভারতীয় সাংবাদিকদের বানোয়াট বিবরণ। এদের সূত্র ধরে বৃটিশ সাংবাদিকরা সংবাদ প্রেরণ করেছে। ভারতীয় সাংবাদিকদের কাল্পনিক বানোয়াট বিবরণগুলোই বিশ্বময় আবর্তিত হয়েছে কাল্পনিক ভিত্তিহীন বানোয়াট বিবরণ গুজবের মত ছড়িয়ে বিশ্ব জনমতকে প্রভাবিত করার জন্য। তবে এটা সত্য যে পাক বাহিনী প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। ঢাকা চট্টগ্রাম রাজশাহী সর্বত্র প্রতিরোধ ব্যুহ ভেদ করে পাক সেনাদের অগ্রসর হতে হয়েছিল। জি ডব্লিউ লিখেছেন- ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন মিলিটারী অপারেশন শুরু করে তখন তারা যে তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল তা হতে এটা সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলেস এবং পূর্ব পাকিস্তান পুলিশ ফোর্সের সাহায্যে আওয়ামী লীগ কর্র্তৃকও একটি প্রতিরোধ পকিল্পনা সংগঠিত হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের বা বর্তমান বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল সমগ্র এপ্রিল মাসব্যাপী এবং কিছু এলাকা মে মাসের প্রথম দিক পর্যন্ত বিদ্রোহী বা মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিরোধী বাহিনীর কাছ থেকে বিভিন্ন এলাকা দখল ও মুক্ত করেছিল। স্পষ্টতই এরূপ প্রতিরোধ স্বতস্ফুর্ত কিংবা অসংগঠিত হতে পারে না।’

(বইটির pdf version download করুন এখানে)

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh