Home EBooks দুই পলাশী দুই মীরজাফর অধ্যায় ১৭: প্ররোচিত যুদ্ধাবস্থা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ১৭: প্ররোচিত যুদ্ধাবস্থা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:27
প্ররোচিত যুদ্ধাবস্থা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ
মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। শুরু থেকেই ক্যান্টনম্যান্ট এলাকা ছাড়া সর্বত্র আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। সিভিল প্রশাসনে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। পূর্ব-পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসন চলছিল মুজিবের নির্দেশে। যদিও আওয়ামী লীগ তাদের আন্দোলনকে বলতো অহিংস, প্রকৃত পক্ষে তাদের আন্দোলন ছিল ভয়ঙ্কর ভায়োলেন্সপূর্ণ। অবাঙালীদের উপর মনস্তাত্বিক আক্রমণ থেকে শুরু করে হত্যা লুণ্ঠন চলেছিল নির্বিচারে। ২৬ মার্চ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যে ঢাকার উপর সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর সেনাবাহিনী আওয়ামী লীগের প্রতিরোধ ভেঙে অগ্রসর হতে থাকে। মে মাসের শেষ নাগাদ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ সমগ্র দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ জনগণকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ভারতে পলায়ন করে। সাথে নিয়ে যায়- ট্রেজারী ও ব্যাংক লুণ্ঠন করা বিপূল পরিমান অর্থ। পরবর্তীতে প্রাণ ভয়ে পলায়ন করে সাধারণ মানুষের কিছু অংশ দিল্লী সৃষ্ট পূর্ব পাকিস্তানের সংকটের সম্ভাব্য উদ্বাস্তুদের জন্য পূর্ব থেকে নির্মাণ করা ভারতের উদ্বাস্ত শিবিরগুলোতে স্থান নেয়। এদের সংখ্যা প্রকৃতপক্ষে ছিল ২০ লাখ, যদিও হিন্দুস্তানের দাবী অনুসারে পূর্বপাকিস্তানের উদ্বাস্তুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রা সহমর্মিতা সমবেদনা এবং মহানুভূতিতে পূর্ণ ছিল না।  না থাকার পেছনেও যথেষ্ট কারণ ছিল। অগ্রসরমান সেনাবাহিনী দেখেছে আওয়ামী লীগের পাশবিক নির্মমতা এবং সসস্ত্র প্রতিরোধ। তারা পথেঘাটে পড়ে থাকতে দেখেছে আওয়ামী লীগের নিপীড়নে নিষ্পেষিত অবাঙালী ও বাঙ্গালী সৈনিকদের লাশ। এর ফলে তারা সহমর্মী হওয়ার বদলে নির্মম হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের উপর এক ধরনের প্রতিরোধ স্পৃহা তাদের মধ্যে ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। হিন্দুস্থানের পেতে রাখা ফাঁদে পা দিয়েছে এবং তারা যেখানে প্রতিরোধ হয়েছে সেখানে প্রতিরোধ ভেঙ্গে দিয়ে অগ্রসর হয়েছে।

তৎকালীন যুদ্ধাবস্থা সম্পর্কে নিরোদ সি চৌধুরী লিখেছেন-‘ভারতীয় এবং বৃটিশ সাংবাদিকরা যে প্রতিরোধ কাহিনী সৃষ্টি করে চলেছে তার চেয়ে চরম বোকামী আর হতে পারে না। সামরিক অভিযানে বর্ষা জনিত বাধাকে ঘিরে যেসব কল্পকাহিনী প্রচার করেছেন তারা, তার নজির খুঁজে পাওয়া মুস্কিল। যারা এসব কথা প্রচার করছে পূর্ববংগের বর্ষাকাল সম্বন্ধে তাদের কোন ধ্যান ধারনাই নেই। তারা জানতনা যে যখন চাকাওয়ালা যানবাহনের এতটা প্রচলন ছিল না, তখন পূর্ব বাংলায় বর্ষাকালেই হচ্ছে যাতায়াতের সবচেয়ে সুবিধাজনক সময়। আর সেজন্যই সব বিবাহিত মেয়েরা বর্ষাকালেই বাপের বাড়ী বেড়াতে যেত এবং পূজার আগে ঘরে ফিরে আসত। রেল কিম্বা স্টিমার যোগাযোগ ব্যবস্থা বর্ষায় ব্যহত হয় না। তাছাড়া বর্ষা যদি কোন অসুবিধা সৃষ্টি করেই থাকে তাহলে উভয়ের জন্যই করেছে। তাছাড়া বিমান হামলা বর্ষার জন্য খুব কমই বাধা পেতে পারে।

এসব সামরিক আঁচ আন্দাজের মূল লক্ষ্য হল পাকসেনারা যে ভূমিকা নিতে চাইছে না তাদেরকে সেই ভূমিকায় নামাবার জন্য উৎসাহ যোগান। এবার আমরা বৃটিশ প্রেস, ভারত সরকার, ভারতীয় নাগরিক এবং বিশেষ করে পশ্চিম বঙ্গের লোকদের দিকে একটু নজর ফেরাই। প্রথমেই বলতে হয় আমি এত দায়িত্বহীন সাংবাদিকতার কথা কল্পনাও করতে পারি না। আলোচনা ভেঙ্গে যাবার আগে থেকেই বৃটিশ সাংবাদিকরা যেভাবে বিচ্ছিন্নতার সম্ভাবনা বা অবশ্যম্ভাবী বলে জোরে সোরে প্রচার করতে শুরু করলো তাতে নিশ্চয়ই পূর্ব বঙ্গের নেতারা উৎসাহিত বোধ করছেন আর অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার এবং সামরিক বাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছেন। এর পর দুইজন প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়া অন্য সকলেই ভারতীয় আজগুবি গুজবের উপর ভিত্তি করে রিপোর্ট পাঠাতে থাকলো। কাল্পনিক শক্তিশালী প্রতিরোধের বিষয় এমন কি তারা এও প্রচার করলেন যে, পাকসেনাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছে এবং এমন অবস্থায় তারা বাঙ্গালীদের কাছে আত্মসর্ম্পন করতে যাচ্ছে যে কোন মুহূর্তে। মাঝে মাঝে তুমুল যুদ্ধের কথাও তারা তাদের রিপোর্টে প্রচার করেছে। গত কয়েক দিন যাবৎ যশোরে পাঞ্জাবীদের হত্যার এক বিভৎস কাহিনী তারা বেশ জোরে সোরে প্রচার করল এবং বলল যে, পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস্ স্থানীয় জনসাধারণের সহযোগিতায় ঐ শহরের কিছু অংশ দখল করে নিয়েছে। তাদের দায়িত্বহীনতা চরম সীমায় পৌঁছল এই কাল্পনিক রিপোর্টিং-এর মাধ্যমে। কারণ তারা একবারও ভেবে দেখলনা যে, পাকিস্তান সরকারের উপর এই রিপোর্টের কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে। এ সম্বন্ধে আমার সবচেয়ে সংশয় ছিল। যারা এইসব ভুয়া খবরগুলো পাঠাচ্ছিল তারা হয় সংশ্লিষ্ট পক্ষের কেউ, না হয় তারা পেশাগত ভাবে গুজব সৃষ্টিকারী।

ইংল্যাণ্ডে বসে যে সামান্য খবরা-খবর পাচ্ছি তাতে মনে হচ্ছে বাঙ্গালী হিন্দুরা পূর্ব বঙ্গের ঘটনা প্রবাহে তাদের চরিত্রের দুটো জঘন্য দুর্বলতাকে বেশ উৎসাহ নিয়ে লালন করে চলেছে- প্রথমতঃ তাদের লড়াই অন্যের সাফল্যের সাথে লড়ে যাচ্ছে দেখে পৈশাচিক আনন্দবোধ আর দ্বিতীয়তঃ তাদের হীনমন্যতা আর আত্ম প্রতারণার অনুভূতি। পূর্ব বঙ্গে গণপ্রতিরোধের সাফল্যের বানোয়াট খবরা খবর প্রচার করে সহযোগী বাঙ্গালী হিসেবে আমাদের বোঝা উচিত ছিল যে, এতে পূর্ব বঙ্গের অসহায় মানুষগুলোকে আরো দুর্ভোগ ও দুর্দশার দিকেই ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। মানসিক তৃপ্তি আর পৈশাচিক উল্লাস মানবতা বিবর্জিত মনোবৃত্তিরই বহিঃপ্রকাশ। পূর্ব বঙ্গের সাফল্যজনক গণ প্রতিরোধের কল্পকাহিনী শিক্ষিত মানুষের বিবেক, তার বুদ্ধিমত্তার করুণতম ব্যর্থতাই প্রকাশ করে। (দি হিন্দু স্ট্যানডার্ড, কোলকাতা, ১৩ এপ্রিল ১৯৭১)

ছোট ছোট আক্রমন প্রতিরোধ ও ঘাত-সংঘাতের মধ্য দিয়ে বর্ষা মওসুম পেরিয়ে গেল। কিন্তু ভারতের প্রত্যাশা পূরণ হল না। ভারত আশা করেছিল বর্ষা মওসুমে মুক্তি যুদ্ধ চূড়ান্ত রূপ নিবে। দিল্লী মনে করেছিল ভারতীয় সমরাস্ত্র সজ্জিত মুক্তি যোদ্ধাদের প্রবল আক্রমনের মুখে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পনের বাধ্য হবে কেননা পূর্ব পাকিস্তানের আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনুকুল এবং পশ্চিম পাকিস্তানীদের জন্য ছিল সম্পূর্ণ প্রতিকুল। এ কারণে পাকবাহিনীর পতন অবশ্যম্ভাবী মনে করাটা দিল্লীর জন্য অমূলক ছিল না। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা দাঁড়াল তাদের প্রত্যাশার বিপরীত। পাক বাহিনীর অবস্থান আরো দৃঢ় এবং মজবুত বলে পরিগণিত হল। এতে ইন্দিরা সরকার দারুণভাবে বিচলিত হয়ে পড়ল। তারা অনুভব করল দুর্নীতি অসদাচরণ ও ভোগ বিলাসে লিপ্ত আওয়ামী লীগের প্রতি প্রবাসী বাঙালীদের আনুগত্য দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এমন আশঙ্কাও প্রকট হয়ে উঠল যে, যুদ্ধ দীর্ঘ স্থায়ী হলে আওয়ামী লীগ তাদের একক নেতৃত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হবে না। তখন মুক্তি যোদ্ধাদের মধ্যে দুটো সুসংগঠিত শক্তি বিদ্যমান ছিল। দুটোর একটি হল চরমপন্থী রাজনৈতিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ বিপ্লবীরা অন্যটি হল বিদ্রোহী সেনাবাহিনী, ইপি আর মুজাহিদ পুলিশ ও আনসাররা। এদের কারোই ভারত সরকারের উপর দায়-বদ্ধতা ছিল না। একারণে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সময়ের আবর্তনে এক সময় মুক্তি যুদ্ধের নেতৃত্ব এই দুটো শক্তির দখলে এসে যাবে। ভারত সরকারের দুরভিসন্ধি আওয়ামী লীগের সাথে গোপন আঁতাত এবং দিল্লীর বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্র সম্মোহিত মুক্তি যোদ্ধা জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। এর ফলে চলমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠবে।

সবচেয়ে বড় কথা পূর্ব পাকিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আবহ সৃষ্টি করার ফলে এবং ভারতীয়দের এ ব্যাপারে সম্পৃক্ত করার কারণে যে গোলমেলে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রাবল্যে ভারতের বিভিন্ন জাতি সত্তার স্বাধীনতা সংগ্রাম তাৎক্ষনিকভাবে ঝিমিয়ে পড়ে। ভারত আশঙ্কা করল মুক্তি যুদ্ধ দীর্ঘ মেয়াদী হলে ঝিমিয়ে পড়া ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নতুন করে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠবে। তখন মুক্তি যুদ্ধ পুর্ব পাকিস্তানের মাটিতে নয় সমগ্র উত্তর পূর্ব ভারত, কাশ্মীর ও পূর্ব পাঞ্জাবে ছড়িয়ে পড়বে। দিল্লী দেখল তার সামনে রয়েছে দুটো পথ খোলা, হয় পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিস্পৃহ হতে হবে নয়তো মুক্তি যুদ্ধের প্রক্সি যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে। সার্বিক পরিস্থিতি বিচার বিশ্লেষণ করে দিল্লী জুলাই মাস নাগাদ যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিলেও আর এক আশঙ্কা থেকে ভারত চোখ ফিরিয়ে রাখতে পারেনি। চীন সফরের পর হেনরি কিসিঙ্গার ওয়াশিংটনে ভারতের রাষ্ট্রদূতকে ইংগিত দিয়েছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তান আক্রান্ত হলে চীন হস্তক্ষেপ করবে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মধ্যস্থতায় দুই বৈরী শক্তি চীন ও মার্কিন সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। এর ফলে চলমান পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা  অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে থাকার সম্ভাবনাও অধিক বলে মনে করল দিল্লী। চীন মার্কিন ঘনিষ্ট সম্পর্কের কারণে দিল্লীর পাকিস্তান ভাঙ্গার স্বপ্ন অনেকটা ম্লান হয়ে পড়ে। এ সত্বেও দিল্লীর নেতৃত্ব ২৩ বছর ধরে যে স্বপ্ন দেখে আসছিল যে ষড়যন্ত্র যে পরিকল্পনা সম্ভাবনাময় করে তুলতে সূচনা পর্ব থেকে পাকিস্তানকে বিব্রত করে এসেছে, আজ সেই জাত শত্রু পাকিস্তানের ধ্বংস পরিকল্পনার চূড়ান্ত মুহূর্তে দিল্লী তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেকে পিছু হটে আসবে এমনতো হতে পারে না। একারণে দিল্লী দেশে বিদেশে অন্নেষণ শুরু করল তার মিত্র এবং তার লক্ষ্য অর্জনের শক্তিশালী সঙ্গী।

ওদিকে চীন এবং আমেরিকা সংযমও সমঝোতার পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে পরামর্শ অব্যাহত রাখছিল। কিন্তু এদুটোই ছিল ইয়াহিয়ার নাগালের বাইরে। কারণ ভারত মুক্তি যুদ্ধের তৎপরতা বৃদ্ধি করে দেয়ায় সেনাবাহিনীর উপর হামলা ও অন্তর্ঘাত বৃদ্ধি পেল। এমন বৃদ্ধি পেল যে সেনাবাহিনী সংযম অবলম্বন করার অর্থ হল মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। এমতাবস্থায় সৈনিকদের উপর চাপিয়ে দেয়া ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শনের আদেশ উপদেশ কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় যুদ্ধ এড়ানোর জন্য, পাকিস্তানের গৃহ যুদ্ধ আপোষ রফার জন্য এবং ভারতকে সংযমী হওয়ার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াও রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করার জন্য অস্থির হয়ে উঠেন। এ কারণে জুলাই আগস্ট নাগাদ অন্তরীণ মুজিব নতূন এক সমঝোতা প্রক্রিয়ার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হন। সমঝোতার লক্ষ্যে মুজিবের সাথে আলাপ আলোচনা শুরু হল। এই সাথে মার্কিন কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সাথে সংলাপ শুরু হল। ওদিকে দেখা গেল সামরিক ট্রাইবুনালে মুজিবের বিচার শুরু হতে। একে ব্রোহীকে মুজিবের পক্ষের আইনজ্ঞ হিসেবে কাজ করার অনুমতি দেয়া হল। প্রকৃতপক্ষে এটা বর্হিবিশ্বের চোখে ধুলো দেয়ার জন্য একটা সাজান নাটক ছাড়া কিছু ছিলনা। এটা ছিল সমঝোতা প্রয়াসের একটা অংশ। অখণ্ড পাকিস্তানের শেষ দিনগুলোতে জি ডব্লিউ চৌধুরী  একথা লিখেছেন। সমঝোতা প্রয়াস নিয়ে কোলকাতার থিয়েটার রোডের প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় এবং পরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের  মধ্যে বিরোধিতার কথা প্রকাশ হয়ে পড়ে। প্রধান মন্ত্রী তাজুদ্দিন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদের মধ্যে ব্যবধান রচিত হয়। গুজব ছড়িয়ে পড়ে খন্দকার মোশতাক আহমদ নাকি গোপনে সি আই এর মাধ্যমে আমেরিকার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। অস্থায়ী সরকারের অলক্ষ্যে আমেরিকার মধ্যস্থতায় তিনি নাকি পাকিস্তান সরকার ও শেখ মুজিবের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে গ্রহণযোগ্য সমঝোতার উদ্যোগ নিয়েছেন। এতে আওয়ামী লীগের মধ্যপন্থী অংশেরও সমর্থন রয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে জেনারেল ইয়াহিয়া সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করায় গুজবটা সত্য বলে প্রতীয়মান হল অনেকের কাছে। মুক্তিযোদ্ধা মেজর শরিফুল হক ডালিম তার গ্রন্থে, যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি লিখেছেন, ‘ইয়াহিয়ার এ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মুজিবনগর সরকারের রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে ভীষণ আলোড়ন সৃষ্টি হল, নেতাদের অনেকেই তখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ করে কোন দিনই দেশ স্বাধীন করা যাবে কিনা এ বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করতেন। দিল্লী এর সবকিছু যথাসময়ে অনুধাবন করে মোশতাক আহমদকে সরিয়ে আব্দুস সামাদ আজাদকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পণ করে। এই সাথে পররাষ্ট্র সচিব মাহবুব আলম চাষীকে তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।  .... চক্রান্তের খবর পেয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজুদ্দিন ভারত সরকারের নির্দেশে এ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।’

এরপর ভারত সরকার পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য আরো বেশী তৎপর হয়ে উঠে। সমঝোতার এই মার্কিন উদ্যোগ বেশী দূর এগুতে পারেনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ ছাড় দিতে প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও। এ প্রসঙ্গে জি ডব্লিউ চৌধুরী লিখেছেন- তার পর ইয়াহিয়া আমাকে বললেন যে, তিনি তার সর্বশেষ সফলতার জন্য নিক্সনের উপর খুব বেশী নির্ভর করেছেন। তিনি ইরানের শাহের সাহায্যেরও উল্লেখ করেন। যখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, সম্ভাবনা কতটুকু? তখন তার জবাব ছিল, দুই ব্যক্তি বিরাট বাধার সৃষ্টি করেছে। সেই প্রতারক মহিলা (মিসেস গান্ধী) এবং সেই অসংযত উচ্চাভিলাষী ব্যক্তি (ভূট্টো)। তিনি স্বীকার করলেন যে, তার প্রথম ভুল ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পূর্বে মুজিবের কথায় এবং প্রতিশ্রুতিতে তার শর্তহীন বিশ্বাস এবং যখন তিনি ভুট্টোর দিকে ফিরলেন সে ক্ষেত্রেও তিনি নিরাশ হলেন। আমি তাকে মুজিবের চেয়ে ভূট্টোর প্রতি কম তিক্ত দেখলাম না। তিনি বললেন যে, অখণ্ড পাকিস্তানের ধ্বংস সাধনে এবং নিছক ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে ভূট্টো মুজিবের চেয়ে কম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন না। (অখণ্ড পাকিস্তানের শেষ দিনগুলি পৃঃ ১৮৫)

ইয়াহিয়ার সর্বশেষ উদ্যোগ
পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ এবং শেখ মুজিবের সাথে প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে সমঝোতা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পঞ্চমবাহিনীকে সঠিক পথে ফেরান সম্ভব হয়নি। ভারতের কাছে দায়বদ্ধ আওয়ামী লীগ তার দায় পরিশোধে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। এ কারণে,প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ভারতের সাথে একটা বোঝাপড়া করে পূর্ব পাকিস্তান সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত শ্রী জয় প্রকাশ অটলের মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর নিকট ৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা পেশ করেন। এর মধ্যে ছিল শেখ মুজিবের মুক্তি, বাঙালীর অখণ্ড পাকিস্তানের সাথে থাকতে চায় কিনা সেটা গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ, অনতিবিলম্বে অন্তবর্তী সরকার হিসেবে সর্বদলীয় সরকার গঠন এবং জাতি সংঘের তদারকিতে ভারত থেকে শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের আয়োজন। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী ইয়াহিয়ার এই গণতান্ত্রিক প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিলেন নির্মমভাবে। ইন্দিরা ইয়াহিয়াকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ১৯৭০ সালে গণভোট হয়েছে। নতুন করে গণভোট দরকার নাই। নিঃসন্দেহে এটা ছিল ইন্দিরা গান্ধীর জালিয়াতি। শেখ মুজিবের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল স্বায়ত্তশাসনের, স্বাধীনতার জন্য নয়। ৭০ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল অখণ্ড পাকিস্তানের ভিত্তিতে।

রুশ ভারত সখ্যতার পটভূমি
সেন্টো সিয়াটোতে পাকিস্তানের যোগ দেয়ার কারণে পঞ্চাশ দশকের পূরোটাই সোভিয়েট ইউনিয়ন পাকিস্তানকে বৈরী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। ৬০ দশকের শুরু থেকে প্রেসিডেন্ট আইয়ূব পররাষ্ট্র বিষয়ে নিরপেক্ষতা অবলম্বনের কারণে ক্রেমলিন পাকিস্তানের ব্যাপারে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী পোষন করতে থাকে এবং এক পর্যায়ে তার পাকিস্তান বিদ্বেষ কেটে যায়। রাশিয়া পাকিস্তানকে সম্মানিত দক্ষিণ প্রতিবেশী বলে অভিহিত করে।

ইরানের সাথে আমেরিকার মাখামাখি এবং ইরানকে মার্কিন সমরাস্ত্রের ভাণ্ডারে পরিণত করার কারণে রাশিয়া সর্তক হয়ে উঠে। ওদিকে চীনের সাথে রাশিয়ার বিরোধ এবং আমেরিকার সাথে চীনের বৈরী সম্পর্কের বরফ গলতে থাকায় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ব্যাপারে ক্রেমলিন আগ্রহী হয়ে ওঠে। আফগানিস্তান পর্যন্ত রুশ প্রভাব বলয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পাকিস্তানকে প্রভাবিত করে বেলুচিস্তানের গোয়াদর বন্দর পর্যন্ত পৌঁছান সম্ভব হলে ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তার করা রাশিয়ার জন্য সহজ হয়ে পড়বে।

একারণে ১৯৬৯-৭০ সালের দিকে আঞ্চলিক গোষ্টীবদ্ধকরণ পরিকল্পনা এবং এশীয় সম্মিলিত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন মরিয়া হয়ে ওঠে। এ পরিকল্পনার মূলে ছিল চীনকে বেষ্টন করে রুশ প্রতিরক্ষা ব্যুহ রচনা করা এবং এই অঞ্চলে আমেরিকার উপস্থিতি চ্যালেঞ্জ করা। চীন এবং আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক নিবিড় থাকার কারণে পাকিস্তান এই পরিকল্পনার সাথে একমত হতে পারেনি। অন্যদিকে ১৯৬৭ সালে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীনেশ সিং রাশিয়া সফর করেন এবং ক্রেমলিমের প্রস্তাবটিকে অভিনন্দন জানিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া দেন। এই সূত্র ধরে ভারতের পররাষ্ট্র নীতি সম্পূর্ণ ক্রেমলিনমুখী হয়ে ওঠে। এদিকে পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষায় মার্কিন উদ্যোগ আঁচ করে ভারত তার পাকিস্তান খণ্ডিত করার মহাপরিকল্পনায় পাশ্চাত্যের সহযোগিতার ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে পড়ে। এ কারণে চীন আমেরিকা বিরোধী পরাশক্তি শক্তি রাশিয়ার পক্ষপটে আশ্রয় নেয় ভারত।

ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারে রাশিয়ার প্রত্যাশা পূরণে পাকিস্তান ব্যর্থ হওয়ায় ক্রেমলিন পাকিস্তানের প্রতি বৈরী হয়ে ওঠে এবং পাকিস্তানকে উপযুক্ত শিক্ষা দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। এক পর্যায়ে দূই বৈরি শক্তি ক্রেমলিন ও ভারতের অভিলাষ এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়। যথা সময়ে দিল্লী ও ক্রেমলিনের মধ্যে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর হয় যা ছদ্মবেশী সামরিক চুক্তি বলে অভিহিত। এই চুক্তি ভারতকে দুঃসাহসিক করে তুলে। এরপর পূর্ব পাকিস্তানকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার জন্য যুদ্ধের ঝুকি নিতে বিলম্ব করেনি ভারত।

(বইটির pdf version download করুন এখানে)

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh