Home EBooks দুই পলাশী দুই মীরজাফর অধ্যায় ১৮: স্বাধীনতার দৃশ্যপট

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ১৮: স্বাধীনতার দৃশ্যপট Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:28
স্বাধীনতার দৃশ্যপট
পলাশী যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি এবং পূর্বপাকিস্তানের পতনোত্তর পরিস্থিতির মধ্য পার্থক্য মোটেও ছিল না। পলাশীর যুদ্ধে যারা সক্রিয় ছিল, যারা ইংরেজদের দুরভিসন্ধি আঁচ করে পরিস্থিতির মুকাবিলা করতে চেয়েছিল, তাদেরকে নিক্ষিপ্ত হতে হয়েছিল মীরজাফরের কারাগারে। বৃটিশদের নির্দেশ মত অথবা আত্মগোপন করতে হয়েছিল নির্যাতনমূলক উৎকট পরিস্থিতি থেকে আত্মরক্ষার জন্য। সেদিন শুধু তরুণ নবাবকে নির্মমভাবে নিহত হতে হয়নি, স্বাধীনতা ও সংহতির পক্ষে থাকা অসংখ্য দেশপ্রেমিককে আলিঙ্গন করতে হয়েছিল অমানবিক মৃত্যু। সিরাজের লাশ মাড়িয়ে নবাবের কোষাগার লুণ্ঠিত হল- যা ছিল বাংলার জনগণের সম্পদ। সেদিন ছিল পলাশী নাটকের শেষ পরিণতির মূল প্রযোজক বর্ণবাদী হিন্দু চক্র, শিখণ্ডি মীর জাফর ও তার সহগামীদের ঘরে ঘরে উৎকট আনন্দের উচ্ছলতা। হয়তোবা জনগণ ও উল্লসিত হয়েছিল নিছক ক্ষমতার পালাবদল মনে করে। অনুরূপ একই চিত্র আমরা প্রত্যক্ষ করেছি পূর্বপাকিস্তান পতনের পর এই বাংলার প্রতিটি জনপদে।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে পূর্বপাকিস্তানে পাকিস্তানী বাহিনীর পতন পর্যায় থেকে  এই অঞ্চলে যেমন সর্বব্যাপী লূণ্ঠন শুরু হল, অন্যদিকে তেমনি চলল হত্যাযজ্ঞ; আওয়ামী পরিভাষায় দালাল নিধন। এদেশী হিন্দু শুধু নয়- হিন্দুস্থানের প্রতিটি ঘরে সেদিন চলছিল দেয়ালীর মহোৎসব। একদিকে ছিল অবারিত উল্লাস অন্যদিকে কারবালার মাতম। চলছিল হত্যাযজ্ঞ, সত্যিকার দেশপ্রেমিকদের উপর নির্মম নিপীড়ন দালাল অপবাদের বোঝা চাপিয়ে। আওয়ামী পান্ডাদের ধর্ষণের দায় চাপিয়ে দেয়া হল সবটুকু পাক বাহিনীর উপর এবং ধর্ষিতাদের বেআব্রু করার জন্য বীরাঙ্গনার তিলক পরিয়ে কলঙ্কিত করা হল এদেশের তরুনীদের। দেশের মাটি আকড়ে থেকে ৯০ শতাংশ জনগণকে রক্ষা করার জন্য যারা আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, তাদেরকে লাঞ্ছিত করা হল এবং লুট করা হল তাদের সম্পদ। এদের অধিকাংশ হত্যাযজ্ঞের শিকার হল অথবা নিক্ষিপ্ত হল কারাগারে। কারাগার পূর্ণ করা হল দেশপ্রেমিকদের দিয়ে আর কারাগারে থাকা ক্রিমিনালরা আওয়ামী লীগের কল্যাণে মুক্ত আলোয় এসে আওয়ামী দুষ্কর্মের সহযোগীতে পরিণত হয়েছিল। একাত্তরের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে এদের সাথে আওয়ামী লীগের নাড়ীর যোগ অবশ্যই ছিল এবং আজ অবধি বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা যারা দেশপ্রেমিক, দেশের কল্যাণকামী রাজনীতিক ও সমাজকর্মী- তারা কোন অপরাধে নিপীড়নের শিকার হল? এরা স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি একথায় হয়তো বলা হবে। কিন্তু স্বাধীনতার প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সুস্পষ্ট বক্তব্য ছিল কি ছিল না। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ শুরু থেকে শেষ অবধি যে একটা গোলক ধাঁধার মধ্যে অবস্থান করছিল সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। আমি এ ব্যাপারে কিছু আলোকপাত করতে চাই। প্রথমত দেখা যাক আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ওয়াদা কি ছিল? যে ওয়াদার ওপর আস্থা রেখে জনগণ ভোট দিয়েছিল।

নির্বাচনী ওয়াদা ছিল পাকিস্তানের সংহতির সপক্ষে
শেখ মুজিবুর রহমান : “৬ দফা বাস্তবায়িত করা হবে। কিন্তু এর মাধ্যমে ইসলাম অথবা পাকিস্তানের জাতীয় সংহতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না”। (নারায়ণগঞ্জঃ ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৭০)
“এই নির্বাচন প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের সপক্ষে গণভোট”। (ঢাকাঃ ২৪ সেপ্টেম্বর; ১৯৭০)
৬ দফার অর্থ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার অধিকারকে নিশ্চিত করা। (সিলেট ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭০)
তাজুদ্দিনঃ ৬ দফা বাস্তবায়নের মধ্যে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির সম্পর্ক খুব বেশী। (নারায়ণগঞ্জ : ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৭০)
এ এইচ এম কামরুজ্জামানঃ জেনারেল সেক্রেটারী নিখিল পাক আওয়ামী লীগঃ “পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য”।  (রাজশাহী, ২১ জুন : ১৯৭০)
“পাকিস্তান ভেঙ্গে দেওয়ার কোন পরিকল্পনা নেই”। (লাহোর, ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৭০)
খন্দকার মোস্তাক আহমেদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী লীগঃ “শক্তিশালী পাকিস্তানের জন্য দাঁড়িয়েছি পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন পাকিস্তানের বুনিয়াদকে শক্তিশালী করবে”। (ফেনী ২০ মার্চঃ ১৯৭০)

স্বাধীনতার জন্য জনগণকে প্রস্তুত করা হয়নি
৭০ দশকের শেষ দিকে আওয়ামী লীগ লাহোর প্রস্তাবের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। কিন্তু এর মধ্যে স্বাধীনতার প্রচ্ছন্ন ধারণা রয়েছে এমনটি মনে করার যুক্তিসংগত কারণ নেই। তাছাড়া প্রচ্ছন্ন ধারণা দিয়ে স্বাধীনতার মত বিশাল কর্ম সম্পাদনে সমগ্র জাতিকে একই মঞ্চে টেনে আনা যায় না।

লাহোর প্রস্তাবে একাধিক রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছে এটা ঠিক, সেখানে পশ্চিম বঙ্গ আসাম নিয়ে একটি জোন বলা হয়েছে। এই অখণ্ড বাংলা একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হবে এতে কায়দে আযমের অসম্মতি ছিল না। হিন্দু নেতৃবৃন্দ ও বৃটিশদের ষড়যন্ত্রে বাংলাকে খণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হল, তখনই মুসলিম নেতৃবৃন্দ পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের সাথে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৪৬ সালে গণভোটের মাধ্যমে পাকিস্তানের দাবী স্বীকৃত হলে একই বছরে দিল্লীতে মুসলিম গণপ্রতিনিধি ও মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের সমন্বিত সম্মেলনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী উত্থাপিত এক প্রস্তাবে লাহোর প্রস্তাবকে সংশোধন করে এক পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং করা হয় পূর্ব বাংলার নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় এনে। তা না হলে জুনাগড়, হায়দ্রাবাদ, মলভদর, অথবা কাশ্মীরের ভাগ্য বরণ করতে হত এ অঞ্চলকে। গণভোটের মাধ্যমে অর্জিত গণপ্রতিনিধিদের দ্বারা স্বীকৃত অখণ্ড পাকিস্তান যেটার স্বপক্ষে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা ও শেখ মুজিবের রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে গেছেন সে সংহতির পক্ষে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল। যে সংহতির জন্য শেখ মুজিব স্বাধীনতা সংগ্রামকে এড়িয়ে যাওয়ার ঝুকি নিয়েছিলেন সেটা সমুন্নত করার প্রয়াস অপরাধ নয়। স্বাধীনতার প্রশ্নে আওয়ামী লীগের মধ্যে ছিল অস্বচ্ছতা। এ প্রসঙ্গে আবুল বাসার বলেছেন-
‘৭১ সালে যখন আমরা স্বাধীনতার জন্য জনগণকে প্রস্তুতি গ্রহণের কথা বলি, তখন ২৩ মার্চ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পাকিস্তান দিবস পালন করা হয় এবং আমাদেরকে তারা বিচ্ছিন্নবাদী বলে অভিহিত করে।’ মেজর জলিল স্পষ্টতই বলেছেন- ‘আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ দেশকে স্বাধীন করার কোন চিন্তা ভাবনাই করেননি, শেষ পর্যন্ত আলাপ আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের চিন্তাভাবনা করেছিলেন।’

এ প্রসঙ্গে তৎকালীন আওয়ামী লীগের এমপি জনাব এম এ মোহাইমেন ২৬ মার্চের পরে আগড়তলায় এক দারুণ বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন স্বাধীনতার প্রশ্নে। তিনি এইভাবে বিষয়টি বর্ণনা করেছেন- ‘শ্রমিক কৃষক আন্দোলন সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের অধিকারী প্রমোদ গুপ্তের জেরার মুখে আমি আর কোন উত্তর দিতে পারছিলাম না। তিনি বার বার প্রশ্ন করলেন, আওয়ামী লীগের ৬ দফা আন্দোলনের মূখ্য উদ্দেশ্য কি কার স্বার্থে আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছে? কি বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর এটা পরিচালিত হয়েছে। ৬ দফার মানে যখন প্রায় পূর্ণ স্বাধীনতা যা পাকিস্তান সরকার মানতেই পারে না। তেমন অবস্থায় আন্দোলন চালাতে গিয়ে নিরস্ত্র জনসাধারণকে রক্ষার কি ব্যবস্থা আমরা পূর্বহ্নে করেছি এবং না করে থাকলে এ সমস্ত প্রশ্নে তিনি আমাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুললেন। ... তাই কোন দৃষ্টিকোণ থেকে আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল, কি নীতির অনুসরণ করে আমরা বর্তমান অবস্থায় পৌঁছলাম সেই নীতির সারবত্তা ব্যাখ্যা করে আমি অনেক চেষ্টা করেও প্রমোদ দাস গুপ্তকে আমাদের গৃহীত নীতির যৌক্তিকতা বোঝাতে পারলাম না। এ ছাড়া পুরো ব্যাপার আমার নিজের কাছেও কুয়াশাচ্ছন্ন ছিল। (বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ পৃঃ ৬৭)

এই কুয়াশা ও ধুয়াশার অস্বচ্ছতাকে যারা আঁকড়ে ধরতে পারেননি বিবেকের তাড়নায় ও ইতিহাসের ইংগিতে যারা নিজস্ব পথ ধরে এগিয়ে ছিলেন তাদেরকে আওয়ামী লীগ দাঁড় করাল আসামীর কাঠগড়ায়। এ প্রসঙ্গে আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন- ‘মন্ত্রীরা প্রচলিত আইনে দালালদের শাস্তি দিতে না পারিয়া নিত্য নতুন আইন প্রণয়ন করিতেছেন। ছাত্র তরুণরা এটাকে যথেষ্ট বিপ্লবী না মনে করিয়া দাবি করিতেছেন আদালত-টাদালত আবার কি, ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে ধরা না ধরা দালালদের কাতার বন্দী করিয়া নিপাত কর।‘সম্ভাব্য দালালদের খোঁজে সরকার ও ছাত্র তরুণরা যে সময় ও অর্থ ব্যয় করিতেছেন, খাদ্য ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, শান্তি শৃঙ্খলার জন্য ঐ পরিমাণ সময় অর্থ ও শক্তি ব্যয় করিলে ঐসব সমস্যার কিনারা করা যাইত।’

আবুল মনসুর আহমদ আর একটু এগিয়ে বললেন- ‘আর জাতীয় ও সর্বদলীয় সরকার করিতে হইলে যারা স্বাধীনতা বিরোধী ছিলেন তাদেরও নিতে হইবে। স্বাধীনতা লাভের আগে পর্যন্ত স্বাধীনতার বিরোধিতা দেশদ্রোহিতা নয়, রাজনৈতিক মত বিভিন্নতা মাত্র। ভারত স্বাধীন হইবার আগে পর্যন্ত অনেক ব্যক্তি ও পার্টি স্বাধীনতার বিরোধিতা ও ইংরেজ সরকারের সমর্থন করিয়াছিলেন। ভারত স্বাধীন ও পাকিস্তান হাসিল হইবার পর ঐ কারণে কেউ দণ্ডিত হয় নাই। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আগের দিন পর্যন্ত বাংলার স্বাধীনতা ও পাকিস্তানের অখণ্ডতা ছিল রাজনৈতিক মতপার্থক্যের প্রশ্ন, এখন সেটা হইয়াছে আনুগত্যের প্রশ্ন। মত বিভিন্নতা দন্ডনীয় নয় আনুগত্যের অভাবই দন্ডনীয়।’ (বেশী দামে কেনা কম দামে বেচা/ পৃঃ২২-২৩)

জনাব আব্দুল মোহাইমেনের ভাষায়- ‘সবচাইতে দুঃখের ও ক্ষতির কারণ হল তখন, যখন শেখ মুজিব বাংলাদেশ হওয়ার পরই ঘোষণা করলেন, ১৯৪৮ সাল থেকে তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। স্বাধীনতার পর পরই কে কত পাকিস্তান বিরোধী ছিল প্রমাণ করার জন্য যেন একটা মারাত্মক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। পাকিস্তান বিদ্বেষের পরিণাম তখন যেন স্বদেশপ্রেমের গভীরতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। শেখ মুজিবের সে দিনের উক্তি যে কত অসত্য ও ভিত্তিহীন ছিল ১৯৫৪ এবং ৫৫ সালে শিল্পমন্ত্রী থাকাকালিন তার ১৪ আগস্ট প্রদত্ত বক্তৃতাগুলির পুরানো রেকর্ড দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। (বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ/পৃঃ ৪০)

স্বাধীনতার প্রথম প্রভাত থেকে আওয়ামী লীগের আত্মঘাতী পদক্ষেপ অরাজনৈতিক বক্তব্য ও হটকারী সিদ্ধান্ত সমগ্র জাতির মধ্যে একটা ভেদরেখা টেনে দিয়েছে। সম্প্রসারণবাদী দিল্লীর প্ররোচনায় স্বাধীনতার পক্ষ বিপক্ষ শক্তি  হিসেবে জাতিকে বিভক্ত করে ফেলেছে। একদিকে যেমন জাতি পুনর্গঠনে জনগণের বিরাট অংশকে দালাল  হিসেবে চিহ্নিত করে নিষ্ক্রিয় রাখা হল অন্যদিকে অনুরূপ তরুণ সমাজকে পুনর্গঠনের ভাবনা থেকে দুরে সরিয়ে রাখা হল। পাকিস্তান বিরোধী প্রচারণার বিষ বাষ্প ছড়িয়ে পাকিস্তান পন্থী  হিসেবে চিহ্নিত করে সত্যিকার দেশপ্রেমিকদের মাঠ থেকে দুরে সরিয়ে রাখা হল সুকৌশলে। এসব করা হল সম্প্রসারণবাদী দিল্লীর প্ররোচনায়।

স্বাধীনতার পর নির্বিচার লুণ্ঠন
একদিকে যখন দেশ প্রেমিকদের ধাওয়া করছে আওয়ামী লীগ অন্যদিকে তখন চলছে লুণ্ঠন। মিত্রবাহিনী ভারতীয় বেনিয়া চক্র দেশী-বিদেশী লুটেরা এককভাবে অথবা যৌথ উদ্যোগে লুণ্ঠন শুরু করল। বাংলার মানুষ আবার দেখল ২১৪ বছর পর লুণ্ঠনের ভায়াবহতা। এ লূণ্ঠণ ১৭৫৭ সালে মুর্শিদাবাদ লুণ্ঠনকে ছাড়িয়ে গেল। লর্ড ক্লাইভ যেমন উমি চাঁদ জগৎশেঠ এবং মীর জাফরের সামনে বাংলার সম্পদ লুট করছিল, অনুরূপ লুট শুরু হল আওয়ামী লীগের স্বাধীন সরকারের সম্মুখে। কারো মুখে কোন কথা নেই। বরং ইন্দিরা গান্ধীর পদমূলে সবকিছু সমর্পণ করার জন্য তারা মানসিকভাবে তৈরী হয়েছিল। প্রতিবাদী হয়ে উঠল সেনাবাহিনীর একজন মেজর, নবম সেক্টরের প্রধান মেজর জলিল, ১৯৭২ সালে ফেব্রুয়ারী মাসে তাকে গ্রেফতার করা হল। ১১মার্চ ১৯৭২ বৃহত্তর বরিশালের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সেনাবাহিনীর তরফ থেকে মেজর জলিলের মুক্তির আবেদন জানান হয়। কিন্তু পুতুল সরকার ছিল প্রতিক্রিয়াহীন। ভারতের চাপের মুখে মেজর জলিলকে সামরিক আইনে বিচারের হুমকি দেয়া হয়। জনগণ ও সম্মিলিত মুক্তিযোদ্ধাদের চাপের মুখে পুতুল সরকার অবশেষ মেজর জলিলকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। সেই মেজর জলিল ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক বাংলার সম্পদ লুণ্ঠনের বিবরণ দিয়েছেন তার এক পুস্তিকায়। তিনি লিখেছেন-
‘দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা ডিসেম্বরের পরে মিত্রবাহিনী হিসেবে পরিচিত ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নব্য স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্পদ ও মালামাল লুণ্ঠন করতে দেখেছে। সে লুণ্ঠন ছিল পরিকল্পিত লুণ্ঠন, সৈন্যদের উল্লাসের বহিঃপ্রকাশস্বরূপ নয়। সে লুণ্ঠনের চেহারা ছিল বীভৎস বেপরোয়া, সে লুণ্ঠন ছিল একটি সচেতন প্রক্রিয়ারই ধারাবাহিক তৎপরতা। খুলনা শহরে লুটপাটের যে তান্ডব নৃত্য চলেছে তা তখন কে না দেখেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক সেই লুটপাটের খবর চারিদিক থেকে আসছিল। পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক পরিত্যক্ত গোলাবারুদসহ আরো মূল্যবান জিনসিপত্র ট্রাক বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। যশোর সেনানিবাসের প্রত্যেকটি অফিস এবং কোয়াটার তন্ন তন্ন করে লুট করছে। বাথরুমের মিরর এবং অন্যান্য ফিটিংসগুলো পর্যন্ত সেই লুটতরাজ থেকে রেহাই পায়নি। রেহাই পায়নি নিরীহ পথযাত্রীরা। কথিত মিত্রবাহিনীর এ ধরনের আচরণ জনগণকে ভীত সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল।' (অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা/ পৃঃ ৩৭)

ভারত অথবা আওয়ামী লীগ এই লুণ্ঠনের কথা কখনো স্বীকার করেনি। তবে ১৯৭৪ সালের ১২ মে দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকায় ছোট একটি সংবাদ বেরিয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল- ভারত সরকার আড়াইশ’ রেলওয়ে ওয়াগণ ভর্তি অস্ত্রশস্ত্র হিন্দুস্তানের পদলেহি বাংলাদেশের পুতুল সরকার স্থানান্তরিত করিয়াছে। দেরীতে হলেও অমৃত বাজার লুট অথবা লোপাটের কথা স্বীকার করেছে। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধক্রমে কথাটি যোগ দিয়ে বৈধতার আইনগত ভিত্তি দাঁড় করিয়েছে। যাইহোক বাংলাদেশ সরকার অর্থাৎ তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তার দায় পরিশোধ করেছে আনুগত্যের উপঢৌকন  হিসেবে পাকিস্তানের পরিত্যক্ত অস্ত্র সম্ভার হিন্দুস্থানের হাতে তুলে দিয়ে। দিল্লী তার সামরিক প্রয়োজনে এসব নিয়ে গেছে তাও নয়। বাংলাদেশকে শুধুমাত্র সামরিক দিক দিয়ে পঙ্গু অথবা দুর্বল করে রাখার জন্য এসব করা তার প্রয়োজন ছিল। অলি আহাদ লিখেছেন- ১৯৭১ সালে স্বর্ণের ভরি ১৭১ টাকা মানে অস্ত্রশস্ত্রের দাম ৪৫০ কোটি। বর্তমান স্বর্ণের ভরি ২৫,০০০ টাকা মূল্য মানে অস্ত্রশস্ত্রের দাম ধারায় ৩৬,০০০ হাজার কোটি টাকা। (জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫, পৃঃ ৪৩১)

১৬ই ডিসেম্বর পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র দু’সপ্তাহের ব্যাবধানে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম নববর্ষ এল। নব বর্ষের প্রথম প্রভাতে মনে হল গঙ্গার পানি উজানে বইছে। বাংলার জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় না এনে দিল্লীর মোহরাঙ্কিত মসনদে বসে তাজুদ্দিন দিল্লীকে খুশী করার জন্য বাংলাদেশের মুদ্রামান হ্রাস করলেন শতকরা ৬৬ ভাগ। একই সাথে ভারতে পাট বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলেন। আওয়ামী লীগের যোগ সাজশে পাট থেকে শুরু করে সোনা কাশা পিতলসহ যাবতীয় মূল্যবান সম্পদ বিদেশে পাচার হয়ে গেল।

ইতোমধ্যে শেখ মুজিব পাকিস্তান থেকে ফিরে এসেই ক্ষমতার হাল ধরলেন। তিনি তখন নিরষ্কুষ ক্ষমতার মহান অধিপতি, হয়তোবা ভারতের চাপের মুখে এমন কিছু পদক্ষেপ নিলেন যাতে পাচার প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ হল। এ সম্পর্কে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা এম এ মোহাইমেন লিখেছেন- ‘১৯৭২ সালের ২৭ মার্চ দিল্লীকে খুশী করার জন্য শেখ মুজিব ভারতের সাথে অবাধ বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করে। ওপেন বর্ডার ট্রেড আরম্ভ হল এবং অল্প দিনেই এটা বাংলাদেশের অর্থনীতির পক্ষে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা গেল। সীমান্ত শুল্ক ঘাঁটিতে এক পয়সাও জমা থাকলো না। এদিকে লক্ষ লক্ষ মন ধান চাল ও পাট পাচার হয়ে ভারতে চলে গেল। বাধা বিপত্তির ফলে পূর্বে যে প্রকার মাল সীমান্ত অতিক্রম করতো এখন তার দশ বিশ গুণ মাল ভারতে চলে গেল।’ (বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ-এম এ মোহাইমেন, পৃঃ ২৩)

এ ব্যাপারে আর একজন প্রবীণ নেতা ও আওয়ামী বুদ্ধিজীবী আবুল মনুসর আহমদ শেখ মুজিবের এই অদূরদর্শী পদক্ষেপ সম্পর্কে লিখেছেন- ‘এই সীমান্ত বাণিজ্যের বিধানটা যেন বাংলাদেশের পক্ষ হতে চোখ বন্ধ করিয়া সব করা হইয়াছে। বহু ত্রুটির মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ত্রুটি ১০ মাইল এলাকাকে সীমান্ত আখ্যা দেওয়া। এই চুক্তি যে বিপুল আয়তনের চোরাচালান বিপুল শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে সংঘবদ্ধ হইবার সুযোগ দিয়াছে তার কবজা হইতে বাংলাদেশ আজো মুক্ত হইতে পারে নাই। (আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর, পৃঃ ৫৯৮)

এদেশ থেকে ব্যাপক হারে বিরামহীনভাবে সম্পদ পাচার হল। বিনিময়ে এদেশ পেল কিছু কাগজের টুকরো অর্থাৎ জাল নোট, জাল নোটে ছেয়ে গেল দেশ। মুদ্রা পাচারের ভয়াবহতা এত তীব্র হয়েছিল যে সমকালীন অর্থমন্ত্রী জনাব তাজুদ্দিন স্বীকার করলেন যে, মুদ্রা পাচারের ফলে জাতীয় অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। এটা হয়েছিল কিভাবে। বাংলাদেশ সরকার তার বন্ধু দেশ ভারতের কাছে ৪২১৬ মিলিয়ন নোট ছাপানোর অর্ডার দেয়। অল্প দিনের মধ্যে সবাই জানতে পারল ১৫০০ কোটি টাকার জাল নোট বাংলাদেশে চালু রয়েছে। (অমৃত বাজার পত্রিকা ১৩ এপ্রিল ১৯৭৩)। অমৃতবাজার পত্রিকা বলেছে, রিজার্ভ ব্যাংক বাংলাদেশের কর্মকর্তারা ভয় করছেন যে ১২০০ মিলিয়ন ভারতে ছাপা নোট বাংলাদেশে চালু রয়েছে, আর এটা হয়েছে জালিয়াতির কারণে। ভাবতে অবাক লাগে ৪২১৬ মিলিয়নের জায়গায় ১২০০ মিলিয়ন জাল নোট বাংলাদেশের বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। উল্লেখযোগ্য যে ভারতের নাসিক ছাপনাখানায় যা ছাপার অর্ডার দেয়া হয়েছিল তার তিনগুণ নোট ছাপান হয়েছিল।

দৈনিক ইত্তেফাকের তৎকালিন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আখতার-উল আলম লিখলেন- ‘টাকা বদলের নামে বাংলার অর্থনীতিকে ফোকলা করে ফেলা হয়েছিল। বর্ডার বাণিজ্যের নামে বাংলাদেশকে পরিণত করা হয়েছিল ভারতের বস্তাপচা মালামালের বাজারে ও পাটের রাজা বাংলাদেশ হয়ে পড়েছিল পাটহীন। পক্ষান্তরে পাটহীন আগরতলায় স্থাপিত হয়েছিল গোটা পাঁচেক পাটকল। কোলকাতার পাটকলগুলি কয়েক শিফট চালিয়েও কুলাতে পারছিল না।’

দৈনিক ইত্তেফাকে (৫ই মে ৭৩) লেখা হল- ‘গত কয়েক বছরে ৪ হাজার কোটি টাকার বিদেশী সাহায্যের জাহাজ চোরা পাহাড়ে ধাক্কা খাইয়া ডুবিয়া গিয়াছে। অন্যূন ৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ পাচার হইয়া গিয়াছে। চট্টগ্রামগামী ত্রাণ সামগ্রীর জাহাজ অদৃশ্য ইঙ্গিতে কোলকাতার বন্দরে ভিড়তো এবং সেখানেই মাল খালাস হত। পানির দামে বিক্রয়লব্ধ অর্থ জমা হত নেতাদের একাউন্টে।’

শিল্প সেক্টর ধ্বংস করা হল
ভারতের প্রয়োজনে শিল্প সেক্টরকে ধ্বংস করা হল। পরিকল্পিত উপায়ে। ১৭৫৭ সালে সিরাজের পতন পরবর্তী ইতিহাস এবং স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রকৃতির মধ্যে পার্থক্য মোটেও চোখে পড়ে না। বৃটিশ বেনিয়ারা এদেশের শিল্প ছলে বলে কৌশলে ধ্বংস করেছিল বৃটিশ পণ্যের বাজার সৃষ্টির জন্য। তখন কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতায় বৃটিশরা ছিল না ছিল মীর জাফর। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনীতি অব্যাহত ধ্বংসের জন্য ভারতীয়দের থাকার প্রয়োজন হয়নি। শিখণ্ডি ও আশ্রিত সরকারের মাধ্যমে এদেশের সম্পদ লুট করা হয়েছে। এদেশের সন্তানদের দিয়ে এদেশের প্রশাসন দিয়ে শিল্প কারখানাগুলো অচল ও অকেজো করে দেয়া হয়েছে। এসব কিভাবে করা হয়েছে সে সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করব।

পূর্বপাকিস্তান শতাব্দীকাল ধরে ছিল কোলকাতার পশ্চাৎভূমি কাঁচামাল সরবরাহকারী। এখানে শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়নি কখনো। ফলে দেশ বিভাগের সময় পূর্ব-বাংলায় শিল্প স্থাপনা ছিল শূন্যের কোঠায়। অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠী অধ্যুসিত পূর্ব বাংলায় ছিল অদক্ষ জনগোষ্ঠী, শিল্প উদ্যোক্তার সংকট এবং পুঁজির ঘাটতি। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের অবস্থা অনুরূপ ছিল না। সেখানে বৃটিশ আমলেই অনেক শিল্প স্থাপনা গড়ে উঠেছিল। ফলে সেখানে ছিল দক্ষ শ্রমিক শিল্প উদ্যোক্তা এবং উদ্ধৃত পুঁজি যা শিল্প নির্মাণের জন্য অতি জরুরী।

দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান আমলে উন্নয়নের সব রকম সুযোগ সুবিধা অবারিত হলে পশ্চিম পাকিস্তানী অথবা ভারত থেকে আগত অবাঙ্গালী মুসলমানরা যেমন পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্প স্থাপনা গড়ে তুলেছিল অনুরূপ পূর্ব পাকিস্তানে শিল্প স্থাপনা গড়ে তুলল। নারায়ণগঞ্জে পৃথিবীর বৃহত্তম পাটকল গড়ে তুলেছিল অবাঙালী মুসলমান। এই সাথে শত শত শিল্প কারখানা পূর্ব পাকিস্তানে নির্মাণ করেছিল তারা। পাকিস্তানের নীতি কৌশলের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অভ্যন্তরীণ চাহিদা নির্ভর শিল্প স্থাপন দেশে উভয় অংশে গড়ে উঠে। এ কারণে পাকিস্তানের উভয় অংশের শিল্প স্থাপনা ছিল পারস্পরিক পরিপূরক। যেমন পূর্ব পাকিস্তানে ৭০-৮০টি বড় পাট কল স্থাপিত হলেও পশ্চিম পাকিস্তানে একটি পাটকলও নির্মাণ করা হয়নি। পূর্ব পাকিস্তানের চা শিল্প গড়ে উঠলেও পশ্চিম পাকিস্তানের চা শিল্প গড়ে তোলার চেষ্টা নেয়া হয়নি। এ কারণে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্প স্থাপনা ও অর্থনীতি ছিল পারস্পরিক পরিপূরক। অখণ্ড পাকিস্তানের মানচিত্র থেকে পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হলে স্বাভাবিকভাবে উভয় অংশ সংকটে পড়ে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অর্থনেতিক পরিস্থিতির উপর আলোকপাত করতে গিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছিল- ‘স্বাধীন হবার ফলে বাংলাদেশ শুধু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ বাজারই হারায়নি রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালনার উপযোগী একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা এবং প্রধান প্রধান আমদানি পণ্যের অভ্যন্তরীণ উৎসও হাতছাড়া করেছে।’

এর ফলে যা হবার তাই হল। এ অঞ্চলে আমদানী ও রপ্তানী বাণিজ্যের সবটুকু ভারত নির্ভর হয়ে পড়ল এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির সব সেক্টর ভারতের শোষণের নাগালের মধ্যে এসে গেল। পাট এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হওয়ার কারণে পাট শিল্পকে ধ্বংস করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হল সর্বপ্রথম। ভারত বাংলাদেশে তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে পাট শিল্প স্থাপনা ধ্বংসে মারাত্মক কর্ম-কাণ্ড চালাতে সক্ষম হয়েছিল স্বাধীনতার প্রথম পর্যায়ে। প্রথমে তারা পাট বিশেষজ্ঞদের অথবা এ সংক্রান্ত অভিজ্ঞ কর্ম-কর্তাদের প্রতিষ্ঠান ছাড়তে বাধ্য করে। যেমন জিএম করীম ছিলেন আদমজীর জেনারেল ম্যানেজার। তাকে প্রতিষ্ঠান ছাড়তে শুধু বাধ্যই করা হয়নি। ঢাকা ভার্সিটি হলে আটকে রেখে হত্যার উদ্যোগ নেয়া হয়। অথচ এই করীম সাহেবকে জীবনের নিরাপত্তা দিয়ে অতিরিক্ত সম্মানী ও মর্যাদা দিয়ে ভারত তার দেশে বিশেষজ্ঞ  হিসেবে নিয়োগ দেয়। এর ফল হল কি? আদমজীর মত বিশাল স্থাপনা রক্ত ক্ষরণ হতে হতে নিঃশেষ হয়ে গেল। পাট শিল্পের উৎপাদন গতি হারাল। এই সাথে হারাল পাট শিল্পের বিশ্ব বাজার। বাংলাদেশ সর্ববৃহৎ পাট উৎপাদনকারী দেশ হয়েও পাটের বিশ্ব বাজার নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতের মুঠোয় এসে পড়ল। আওয়ামী লীগের সাথে গোপন সমোঝতার মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের পাট বিদেশে রপ্তানীর সুযোগ পেল। পাট শিল্প অচল অথবা নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ায় পাট উৎপাদনকারী চাষীরা এদেশের উৎপাদিত পাট সীমান্তের ওপারে পৌছে দিয়ে এল। পাটের রাজা হয়ে গেল ভারত। পাট শিল্পকে ধ্বংস করার জন্য ৭১টি পাটের গুদামে আগুন লাগান হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে। এই অপকর্মের সাথে জড়িত ছিল আওয়ামী নেতারা। শুধুমাত্র ভারতে পাট পাচার করার উদ্দেশ্যে এসব করা হয়েছিল। আওয়ামী আমলের মাত্র কয়েক বছরে ভারতে পাট পাচার হয়েছিল ৫০ লক্ষ বেল। সোনালী আঁশপাট থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ বন্ধ হয়ে গেল। রাষ্ট্রায়াত্ব পাটকলগুলো লোকসান গুণতে গুণতে রুগ্ন শিল্পে পরিণত হল। পাটের রাষ্ট্রায়াত্ত্ব সেক্টরে দেনার পরিমাণ দাঁড়াল ২শত কোটি টাকা।

সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশের ৮০ শতাংশ চা বাগানের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেল। বেকার হয়ে পড়ল লক্ষ লক্ষ শ্রমিক। চা থেকে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের পথ রুদ্ধ হল। তাঁত শিল্পকে ধ্বংস করা হল পরিকল্পিতভাবে ভারতের বাজার সমুন্নত রাখার জন্য। ক্ষমতাসীনদের এবং এই সেক্টরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অর্থের জোগান দিতে লক্ষ লক্ষ কারিগর বেকার হয়ে পড়ল। চার লাখ হস্তচালিত তাঁতের মধ্যে কোনমতে টিকে রইল দেড় লাখ।

চিনি শিল্প লুটেরাদের আখড়ায় পরিণত হল, চিনিতে স্বনির্ভর দেশকে আমদানী করতে হল ৩২ কোটি টাকার চিনি। এইভাবে চামড়া শিল্পকেও সংকটাপন্ন করে তোলা হল। এইভাবে সার, নিউজ প্রিন্ট, টেক্সটাইল, লবণ, জ্বালানী সব সেক্টর আওয়ামী দুর্নীতিবাজদের কবলে পড়ে কৃত্রিম সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খেতে খেতে জনজীবনকে বিপন্ন করে তুলল। আট আনা কেজি লবণ খেতে হল ৬০ টাকা কেজি দরে। লবণের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ভারতীয় লবণে সয়লাব করে দেয়া হল।

বাংলার সম্পদ লোপাট করার জন্য চোরাচালানের দুয়ার উন্মুক্ত করেই ক্ষান্ত হলনা সোনার বাংলার সোনার সন্তানরা। পাকিস্তান ধ্বংস প্রক্রিয়ার মূল উদ্যোক্তা ভারতের দায় পরিশোধ করার জন্য আওয়ামী লীগ শিল্প বাণিজ্য এবং অর্থনীতির সব সেক্টরকে স্থবির করে দিল। এক অদৃশ্য ইংগিতে সোনার বাংলার সোনার সন্তানরা তাদের সোনালী স্বপ্ন বিকিয়ে দিল পানির দরে। মেজর রফিকুল ইসলামের ভাষায়- ‘স্বাধীনতার পর কি হল, এক সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা চলল বাংলার অর্থনীতিকে ধ্বংস করার। উৎপাদন কমে গেল, বেড়ে গেল শ্রমিক অসন্তোষ। অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ বেড়ে গেল। বেড়ে গেল গুপ্ত হত্যা। শিল্প কারখানা ধ্বংস হল। কোন অদৃশ্য অশুভ শক্তি যেন বাংলার মানুষকে নিয়ে রক্তের  হোলিখেলায় নেচে উঠল। ইতিহাসের জঘন্যতম অপরাধে লিপ্ত হল অনেকে। সেই সব সৌখিন দেশপ্রেমিক সবাই মিলে ছারখার করেছিল বাংলার মানুষের স্বপ্নসাধ। চোরাকারবারের লাইন ওরা আগেই ঠিক করে রেখেছিল। পুরোদেশ ছেয়ে গেল অবৈধ ব্যবসায়। প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হল জাদরেল সরকারী কর্মচারী ব্যবসায়ী আর কিছু রাজনৈতিক কর্মী। শক্তিশালী মহলের সমর্থন না হলে এ বিরাট আকারে এ অবৈধ ব্যবসা সম্ভব নয়। তাহলে কি এ কথা বলা যায় না যে কোন প্রকার প্রভাবশালী মহলের প্রচেষ্টায় ধ্বংস হয়েছে এদেশের অর্থনীতি।’

দেশটা পরিণত হল পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে। সর্বত্র শুরু হল হরিলুট। তৎকালিন আওয়ামী লীগের নীতিজ্ঞানসম্পন্ন নেতা এবং বুদ্ধিজীবী জনাব আব্দুল মোহাইমেন এ প্রসঙ্গে লিখেছেন- দু'দিনেই আরম্ভ হল লুট। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এডমিনিস্ট্রেটর পারচেজ অফিসার ম্যানেজারগণ প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক নেতাদের যোগসাজশে প্রায় প্রত্যেকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে লুট করতে আরম্ভ করল। ফলে দফায় দফায় জিনিসের দাম বাড়তে লাগল। এক একটি পাটকল ও বস্ত্রকলে দ্বিগুণ আড়াই গুণ শ্রমিক নিয়োজিত হল। শ্রমিক ভাতার ব্যাপারেও কারচুপির অন্ত রইল না। বহুস্থানে অস্তিত্বহীন শ্রমিকের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা মাহিনা নেওয়া হতে লাগল। পাটকলগুলিতে অপচয় হতে লাগল। সার্বিক অব্যবস্থার ফলে পাটের দর অসম্ভব কমে গেল।

বিশ্ববাজারে আমরা পাটের বাজার হারাতে লাগলাম। সেই স্থান দখল করল ভারত, বস্ত্রশিল্পের ব্যাপারে একই ব্যাপার ঘটেছে। তুলা কেনা ও সুতা বিক্রির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুট হল। জাতীয়করণকৃত বস্ত্র কলের এক একজন ম্যানেজারের মাসিক আয় ৫০ হাজারে এসে দাঁড়াল। অধিকাংশ সুতা কালো বাজার মারফত সরকারী মূল্যের উপর বেল প্রতি দেড় থেকে ২ হাজার টাকা অধিক মূল্যে তাঁতীদের হাতে পৌঁছাতে লাগল। বাড়ল তাঁতীদের দুর্গতি। জাতীয়করণ করতে গিয়ে জাতীয় অর্থনীতিকে লন্ডভন্ড করে দেয়া হল।’ (বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ পৃঃ ১৪)

শেখ মুজিবের সংগ্রামের মূলে যেমন দেশপ্রেম ছিল না অনুরূপ এদেশের মানুষের কড়ির কাঙাল হওয়ার মূলে কোন আকস্মিকতা ছিল না। ‘আওয়ামী লীগ জেনে বুঝে সচেতনভাবে জাতিকে স্বর্গের প্রলোভন দেখিয়ে টেনে এনেছিল অনিবার্য ধ্বংসের দিকে। লুণ্ঠনের সব ব্যবস্থা নীল নক্সা তাদের আগে থেকে তৈরী ছিল। তা না হলে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এর সাথে জড়িতদের দেশ প্রেম উধাও হয়ে যায়, কি করে। তারা আত্মঘাতী ধ্বংসের জন্য উন্মাতাল হয়ে যায়। পাকিস্তান আমলের সমৃদ্ধ প্রাণ চঞ্চল কারখানাগুলোতে আওয়ামী লীগ যেভাবে ধ্বংস ডেকে এনেছিল তার বর্ণনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা এম এ মোহাইমেন। তিনি লিখেছেন- ১৯৭২ সনে অবাঙালীদের পরিত্যক্ত শিল্প কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠনাগুলিকে সরকারী নিয়ন্ত্রণে এনে কোন প্রকার ইনভেন্ট্রী তৈরি না করেই যাকে তাকে পরিচালক বানিয়ে সেগুলি চালাতে দেয়া হল। ইনভেন্ট্রী তৈরী না করে চালাতে দেয়ার দরুন কারখানা চালু করার সময় তৈরি মালের স্টক কত ছিল তা জানবার উপায় রইল না। ফলে আরম্ভ হল লুট। তখন এক একটি কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকার তৈরি মাল ছিল। একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশব্যাপী যুদ্ধ চলার দরুন উৎপন্ন দ্রব্যাদি বিক্রি সম্ভব না হওয়ার কারণে বহু কারখানাতে প্রচুর উৎপাদিত মাল জমা হয়েছিল। ৭২ সালের প্রথম থেকেই এসব মাল লুট হতে আরম্ভ হল। লুট প্রথমে আরম্ভ করল ১৬ ডিভিশনের নামে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা। তারপর আরম্ভ করল পরিচালনায় যারা নিয়োজিত হয়েছিল তারা এবং তাদের সাঙ্গ পাঙ্গরা। এত সম্পদ বাঙালী যুবকরা কখনো এক সাথে দেখেনি। ফলে কিছু দিনের মধ্যেই লুটের একটি সর্বগ্রাসী বন্যায় তলিয়ে গেল দেশ। সে বন্যায় কোথায় ভেসে গেল বাঙালী যুবকদের দেশপ্রেম, মূল্যবোধ, স্বাধীনতা এবং চেতনা। তারপর আরম্ভ হল লুণ্ঠিত অর্থ নিয়ে কাড়াকাড়ি। (বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ/ পৃঃ ৩২)

শ্রমিক শ্রেণীকে প্রভাবিত করার জন্য মুজিববাদের অবতারণা
শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের উত্থানের মূলে রয়েছে শ্রমিক শ্রেণীর সক্রিয় ভূমিকা। কিন্তু যেভাবে শেখ মুজিব সমগ্র জাতিকে প্রতারিত করেছিলেন অনুরূপ একই পন্থায় প্রতারিত করেছেন শ্রমিক শ্রেণীকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি  হিসেবে তিনি সমাজতন্ত্রকে সামনে আনলেও তার নিজের এবং তার দল আওয়ামী লীগের চরিত্র ছিল পুঁজিবাদী। মূলনীতি  হিসেবে সমাজতন্ত্রকে বেছে নেয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিক শ্রেণীকে প্রতারিত করা যেমন করে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের শ্রমিক শ্রেণীকে প্রতারিত করেছিলেন ঠিক অনুরূপ পন্থায় অগ্রসর হলেন শেখ মুজিব। ক্ষমতাসীন হয়েই শেখ মুজিব সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ  হিসেবে ঘোষণা করলেন। সত্যিকার সমাজন্ত্রীরা প্রতারক মুজিবকে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের প্রত্যাশায় কমিউনিষ্ট পার্টি বলল মুজিব সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্রের পাশাপাশি মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার শ্লোগান তুলল। কিন্তু সমাজতন্ত্র কি এ জিজ্ঞাসা প্রবল হয়ে উঠলে বিশেষজ্ঞ হিসেবে তোফায়েল এগিয়ে এলেন, বললেন- ‘আব্রাহাম লিঙ্কন গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা দিয়েছেন কিন্তু সমাজতন্ত্র দিতে পারেননি। কিন্তু মুজিববাদে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র পাশাপাশি অবস্থান করছে। সুতরাং মুজিববাদই বিশ্বের তৃতীয় মতবাদ। সমগ্র জাতিকে তারা মনে করল অন্ধ অর্বাচীন বলে। হিন্দুস্থান প্ররোচিত তথাকথিত জাতীয়তাবাদের অন্ধ আবেগে উন্মাতাল জাতির এটা ছিল প্রাপ্য। ৭২ সালের ৬ জুন শেখ মুজিব সমাজন্ত্রের নতুন সংস্করণ দাঁড় করিয়ে বক্তব্য রাখলেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বললেন- সমাজতন্ত্র কায়েম করা হবে স্থানীয় অবস্থা ভিত্তিক। এটা ছিল সুবিধাবাদী চরিত্রের উদ্ভট বিশ্লেষণ। এর মধ্যে নিহিত ছিল শুভঙ্করের ফাঁকি। ফল হল বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের যাত্রা শুরু হল খেয়াল খুশী মেজাজ মর্জির আকা-বাঁকা পিচ্ছিল পথ ধরে। ১৯৭২ সালে ১ ফেব্রুয়ারী মুজিববাদকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য আওয়ামী লীগের শ্রমমন্ত্রী বললেন- শ্রম শিল্প প্রতিষ্ঠানের ৩০ শতাংশ শ্রমিকদের ৩০ শতাংশ মালিকদের ৪০ শতাংশ থাকবে সরকারের। এটা ছিল তাৎক্ষণিকভাবে মুজিববাদকে জনপ্রিয় করে তোলার মুখরোচক ঘোষণা। সাড়ে তিন বছর একক ও নির্বিরোধ ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় কোন দিনও ঘোষিত দৃষ্টিভঙ্গী কার্যকর করার কোন পদক্ষেপ  নেয়নি। ১৯৭২ সাল থেকে ৭৫ পর্যন্ত দুর্নীতির প্লাবন এনে সমৃদ্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেউলিয়া ও ফোকলা করে দেয়া হল। শ্রমিক শ্রেণীর ন্যূনতম অবলম্বন যখন ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে এসে উপনীত হল তখন বাঁচার তাগিদে গণতান্ত্রিক অধিকার ধর্মঘট এবং প্রতিবাদে সোচ্চার হল। আওয়ামী সরকার এর প্রতিক্রিয়ায় ৭২ সালের ২৮ মে ধর্মঘট নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। বাওয়ানীর শ্রমিকরা আন্দোলন মুখর হয়ে উঠলে সরকার কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করল। রাষ্ট্রপতির নোটে বলা হয়, এ ধরনের তৎপরতা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। আওয়ামী লীগের এধরনের গণ বিরোধী পদক্ষেপের জবাবে আওয়ামী লীগেরই অঙ্গ সংগঠন শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক বললেন, মিলটির পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান জনৈক এমসিএ। মিল ম্যানেজার এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারা চোরা পথে গোপনে লাখ লাখ টাকার সুতা যন্ত্রপাতি ও কাপড় আত্মসাত করে মিল শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। এই অভিযোগের ব্যাপারে কখনো কোন তদন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি। তৎকালীন পত্র পত্রিকার পাতায় পাতায় দুর্নীতির অসংখ্য ঠাসা খবর এখনো বিদ্যমান রয়েছে।

এমন কি কোন এক অদৃশ্য সুতার টানে কোন অন্তর্ঘাত নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবার সাহস করেনি আওয়ামী লীগ, যেমন ৭১টি পাটের গুদামে অগ্নি কাণ্ডের কোন প্রতিকার হয়নি। যেমন অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডে সারখারখানার কন্ট্রোল রুম বিধ্বস্ত হয়ে ৫০ কোটি টাকা ক্ষতি হলে তদন্ত কমিটি একে নাশকতা বলে উল্লেখ করে। এই নাশকতার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে আওয়ামী সরকারের কোন আগ্রহ দেখা যায়নি। ১৯৭২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর শ্রমনীতি ঘোষণা করা হল। বলা হল, শিল্পগুলো শ্রমিক সমবায়ের কাছে বিক্রি করা হবে। ১৯৭৪ সালে এক নির্ভরযাগ্য তথ্যে প্রকাশ হল মিলগুলোতে ২৫ হাজার শ্রমিক অতিরিক্ত রয়েছে। এই অতিরিক্ত শ্রমিক ছিল অদক্ষ দলীয় কর্মী যারা ঠ্যাঙারে বাহিনী  হিসেবে কাজ করেছে। শ্রমিক আন্দোলন নস্যাৎ করার জন্য এরা সন্ত্রাস করেছে। ৭২ সালের আগস্টে আদমজীতে সংঘর্ষ বারাবকুন্ডে শতাধিক শ্রমিক খুন, ৭৩ এর এপ্র্রিলে টঙ্গীতে এ সবের এরাই উদগাতা।

স্বজন প্রীতির প্লাবন
১৯৫৬-৫৭ সালে শেখ মুজিব শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি তার প্রিয়জন ও পার্টির লোকদের অবৈধ পন্থায় অনেক পারমিট, ব্যাংক লোন, ইনডেন্টিং লাইসেন্স এবং শিল্পকারখানা গড়ে তোলার অনুমোদন দেন। তখনই শেখ মুজিব ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে ব্লাকমার্কেটিং মওজুতদারী এবং আইন বহির্ভূত পন্থায় অর্থোপার্জনের নেশা আওয়ামী নেতা কর্মীদের পেয়ে বসেছিল। এদের কারণে সে সময়ও দুর্ভিক্ষ কড়া নেড়েছিল। অনিয়ম ও অর্থনৈতিক বিশৃংখলা নিয়ন্ত্রণের জন্য সেনাবাহিনীকে মাঠে নামতে হয়েছিল।

তখনকার পূর্বপাকিস্তানে আওয়ামী মূখ্যমন্ত্রী প্রশাসনকে দল নিরপেক্ষ রাখতে চেয়েও মুজিবের কারণে ব্যর্থ হন। মুজিবের প্রশ্রয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে থাকা অপশক্তি দলের সম্মুখ সারিতে এসে পড়ে। নিঃস্বার্থ ও সত্যিকার দেশপ্রেমিকরা ক্রমশ পিছু হটতে থাকে। তখন থেকে শুরু হয় আওয়ামী লীগের অস্ত্রের পথ ধরে এগিয়ে চলা এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে শেখ মুজিবের উত্থান। অবশেষে বাহাত্তরে এককভাবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে মুজিবও তার দলের সকলের পুরানো অভ্যাসের অনুশীলন ব্যাপকভাবে শুরু হয়। মুজিব নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সবকিছু দলীয় কর্মীদের হাতে তুলে দেয়। দলীয় কর্মীদের ঢালাও চাকুরিতে নিয়োগ, জাতীয়করণকৃত শিল্প প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অর্পণ করে জাতীয় অর্থনীতিকে ধূলিসাৎ করে দেয়া হয়। আওয়ামী নেতা-কর্মীদের প্রায় সকলে মধ্য স্বত্ব ভোগীতে পরিণত হয়। পরিণতিতে দেশটা বিশৃংখল শূন্য ভান্ডে পরিণত হয়। পাকিস্তানী নাগরিকদের ৬০ হাজার বাড়ি ও অন্যান্য পরিত্যক্ত সম্পদ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। লাইসেন্স পারমিট বিলি বণ্টন করা হয় এমন অসংখ্য দলীয় কর্মীদের মধ্যে যাদের ব্যবসার সাথে কোন ধরণের সম্পর্কই ছিল না। ৭৩ সালে ১১ই মে বাণ্যিজমন্ত্রী কামরুজ্জামান জানান, ২৫ হাজার আমদানীকারকদের মধ্যে ১৫ হাজার ভুয়া।

অনুগত স্বজনদের প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে আওয়ামী নেতৃবৃন্দের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হলে শেখ মুজিব অতীষ্ট হয়ে নির্দেশ জারি করলেন, চাকুরিতে নিয়োগ বদলি ও পদোন্নতির জন্য কেউ সুপারিশ করবেন না। এ নির্দেশ কোন কার্যকারী ভূমিকা না রেখে স্বজনপ্রীতির দুয়ারে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলো। যেমন ১১মার্চ সিগারেটের পারমিট সংক্রান্ত খবরে বলা হল, বাংলাদেশের টোবাকো কোম্পানীর ২৫ জন ডিষ্ট্রিবিউটর নিয়োগের জন্য কর্তৃপক্ষ ৩ হাজার সুপারিশ পত্র পেয়েছিলেন।

আওয়ামী লীগের ইসলাম বিদ্বেষ ও মুসলিম বৈরিতা
স্বাধীনতার প্রথম প্রভাত থেকে শুরু হল আওয়ামী লীগের ইসলাম বিদ্বেষ ও মুসলিম বৈরিতা। জাতীয় জীবনের সামগ্রিক অবস্থান থেকে ইসলামকে নির্বাসিত করার সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে কুরআনের আয়াত তুলে দেয়া হল। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল থেকে মুসলিম শব্দটি তুলে দেয়া হল। ইসলামিয়া কলেজের নাম রাখা হলো কবি নজরুল কলেজ, জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক আলী আহসান মুঘলদের সাম্রাজ্যবাদী আখ্যায়িত করে বললেন যে, তারা শত শত বছর ধরে বাংলাকে লুট করেছিল। তার মতে, পাকিস্তানীরাও এই কাজ করেছে। ভাইস চ্যান্সেলার হওয়ার পর তিনি অনুরোধ করলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম শব্দটি কেটে দিতে। অনুরোধ কার্যকরী করা হল।

ঢাকা উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের মনোগ্রামে লেখা ছিল ইকরা বিসমে রাববেকাললাজি খালাক, সেটাকে বাদ দেয়া হল। ঢাকার ইসলামিয়া কলেজের নামকরণ করা হয় বঙ্গবাসী কলেজ। কিন্তু রাজশাহীর ভোলানাথ হিন্দু একেডেমী হিন্দু একেডেমীই রয়ে গেল। হিন্দু দেবী মনষার প্রতীক শাপলা ফুলকে জাতীয় ফুলে পরিণত করা হয়। বঙ্গ ভঙ্গ রদের প্রেক্ষিতে লেখা রবীন্দ্রনাথের আমার সোনার বাংলা গানটিকে ‘জাতীয় সংগীতে পরিণত’ করা হল।

যে দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর বাংলাদেশের অস্তিত্ব নির্ভরশীল অথচ এই দ্বিজাতি তত্ত্বের মৃত্যু ঘোষণা করল আওয়ামী লীগ। দ্বি-জাতি তত্বের মৃত্যুর অর্থ কি দাঁড়াল? অখণ্ড ভারতের মধ্যে লীন হয়ে যাওয়া। এই সহজ কথাটা কি আওয়ামী লীগের বিজ্ঞ রাজনীতিকরা বোঝেন না? বোঝেন ঠিকই। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য সুতোর টানে বিবেক-বুদ্ধি দীল দেমাগ শৃংখল পরিহিত হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগের তর্জন গর্জনের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক ধরণের অসহায়ত্ব, চিন্তাশীলরা এটা অনুভব করেন।

রাজাকার আলবদরের নামে ইসলাম প্রিয় মানুষদের উপর সীমাহীন নিপীড়ন শুরু হল। বাংলার মানুষ দেখল নিপীড়িত হতে তাদের, যারা সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি এবং যারা ইসলামের প্রতিনিধিত্বকারী। স্বাধীনতার প্রাথমিক পর্যায়ে অধিকাংশ মসজিদ জনমানবহীন হয়ে পড়ল। মুসুল্লিরা মসজিদে যাওয়া বন্ধ করল। মসজিদে আযান দেয়া বন্ধ হয়ে গেল। এমনকি সালাম বিনিময়ের সাহসটুকুও মানুষের মধ্যে আর রইল না। অনেক মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে গেল। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ইমান আকীদা ও তাহজিব তমুদ্দুনকে পরিকল্পিতভাবে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার প্রচেষ্টা চলল সরকারী বেসরকারী পর্যায়ে। বাংলাভাষা ও সাহিত্য থেকে ইসলামী শব্দ প্রতিশব্দ ও পরিভাষাকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা চলল। ইতিহাসকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন শুরু হল। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে ধর্ম নিরপেক্ষতা আনা হল। আর ধর্ম নিরপেক্ষতার মূল টার্গেট হয়ে দাঁড়াল ইসলাম। সর্বস্তরে সর্ব পর্যায়ে ইসলাম বিরোধিতা চলল সমানে।

কমিউনিস্টরা ইসলাম বিরোধী পদক্ষেপসমূহ কার্যকরী করার ব্যাপারে সহযোগী শক্তি  হিসেবে সক্রিয় ছিল। লঘুচেতা মেধা বিবর্জিত আওয়ামী নেতৃত্বের পেছনে বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগিতা দিতে শুরু করল কমিউনিষ্টরা। তাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতায় প্রতিভাবান ও সম্ভাববনাময় তরুণদের কমিউনিস্ট রাষ্ট্রসমূহ সফর এবং শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল আগামী প্রজন্মকে পথ ভ্রষ্ট করে তোলা। মুজিব ও আওয়ামী লীগের এ ধরনের কর্ম-কাণ্ড তাদের চূড়ান্ত বিপর্যয় ত্বরান্বিত করেছে বলে অনেকের ধারণা। এন্থনি ম্যাসকারেনহাসের ভাষায়- ‘মুজিবের পতনের প্রধান কারণ ১৯৭২ সালে রচিত বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্মের মর্যাদা থেকে সরিয়ে দেয়া। ইসলামের মর্যাদার এই অবমাননা অনিশ্চয়তা সূচক প্রমাণিত হয়েছে। এক হাজার মসজিদের শহর বলে ঢাকা বরাবরই গর্ব করেছে এবং বাঙালীরা ঐতিহ্যগতভাবেই পশ্চিম পাকিস্তানীদের চেয়ে বেশী ধর্মানুরাগী। অপরদিকে বাঙালী মুসলমানরা উপমহাদেশে আলাদা মুসলিম রাষ্ট্রের পরিকল্পনা অবিচলিতভাবে সমর্থন করেছিল বলেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল। এই পটভূমিতে মুজিবের অনুসৃত ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাংলাদেশের জনগণের বৃহত্তর অংশকে আহত করেছিল।’

বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ
গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার পক্ষে আওয়ামী লীগ সোচ্চার ছিল শুরু থেকেই। ষাটের দশকে আইয়ুব খানের প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্স এর বিরুদ্ধে ছিল আওয়ামী লীগ। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণমুক্ত ও অবাধ করার ব্যাপারে ছিল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ওয়াদা। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়ে তার নৌকা চালিয়ে ছিল উল্টো দিকে। ক্ষমতাসীন হয়ে আওয়ামী লীগ নতুন করে যে প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্স জারি করেছিল সেটা আইয়ুবের অর্ডিন্যন্সের চাইতে জঘন্যতম ছিল। এর মূলে ছিল আওয়ামী লীগের মানসিক ভীতি। এই মানসিক ভীতিটা ছিল তাদের ব্যর্থতা। রাজনীতির অন্ধগলি চোরাপথ এবং ষড়যন্ত্রের সড়ক ধরে অকল্পনীয় মিথ্যাচার এবং অতি আশাবাদের ফিরিস্তি দিয়ে আওয়ামী লীগের উত্থান। অতঃপর সামান্য সময়ের ব্যাবধানে অকল্পনীয় ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে জনগণের মোহভঙ্গ হয় এবং বারুদে পরিণত হয় সমগ্র দেশ। আওয়ামী লীগ আঁচ করেছিল এ বারুদে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে একটি স্ফুলিঙ্গ। আর অসংখ্য স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করে থাকে সংবাদপত্র ও বাক স্বাধীনতা। এ কারণেই আওয়ামী লীগ কালাকানুনের বৃত্ত রচনা করে সংবাদ পত্রের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছে।

আওয়ামী লীগ সব সময় সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলত, কিন্তু বাস্তবে তাদের আচরণ ছিল স্ববিরোধী। একদিকে যখন আওয়ামী নেতৃবৃন্দ সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ব্যাপারে সোচ্চার কণ্ঠ সেই সময় ২২মে সাতক্ষীরায় একজন সাংবাদিকের গ্রেপ্তারের কথা জানা গেল। তার অপরাধ, তিনি একজন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যের সাথে বচসা করেছিলেন। ৭২ সালে ২১ জুন ‘হক কথার’ সম্পাদককে গ্রেপ্তার করা হয়। ৭ই সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে দেশ বাংলা অফিস জ্বালিয়ে দেয়া হয়। সাংবাদিক ইউনিয়ন এর জোর প্রতিবাদ জানায়। অক্টোবর (৭২) এক সরকারী নির্দেশে বলা হয়, সরকারী আধাসরকারী স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বেতার টিভি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের মতামত প্রকাশের পূর্বে সরকারী অনুমোদন নিতে হবে। পূর্বানুমতি ছাড়া তারা তাদের লেখা কোথাও ছাপাতে পারবে না।
৭২ সালের ২২ ডিসেম্বর তথ্যমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী সংবাদপত্র সেবীদের আশ্বস্ত করে বলেন- ‘সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্রের স্বাধীনতাতেও সরকার বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ করবে না। সরকার এসব সংবাদপত্রের আর্থিক দিকই দেখবে শুধু।’ অথচ এ কথা বলার ৯ দিনের মাথায় ঘটল এর বিপরীত ঘটনা।

৭৩ সালের ১ জানুয়ারী প্রেসক্লাবের সড়কে আওয়ামী লীগ সরকার দু’জন ছাত্রকে গুলি করে হত্যা করার প্রেক্ষিতে দৈনিক বাংলা একটি টেলিগ্রাম বের করে। এই অপরাধে দৈনিক বাংলার সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি হাসান হাফিজুর রহমান এবং সম্পাদক তোয়াব খান চাকরিচ্যুত হন। ৪ জানুয়ারী দৈনিক বাংলার শ্রমিক কর্মচারীরা শেখ মুজিবের কাছে চাকুরিচ্যুত দু’জন সাংবাদিককে চাকুরিতে পুনর্বহালের দাবি জানালে শেখ মুজিব পত্রিকাটি হাতে নিয়ে বলেন- ‘আমার কাগজে এসব কি লিখেছ? তোমাদের নীতি থাকে প্রেসক্লাবে ফলিও, নিজের ড্রইংরুমে ফলিও, আমার কাগজে এসব চলবে না।’ সবাই জানল সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। শেষ অবধি চাকুরিচ্যুত দুই সাংবাদিককে চাকুরিতে বহাল করা হয়নি।
১৩মে, ১৯৭৩ দৈনিক স্বদেশ বন্ধ করে দেয়া হয়। দৈনিক পয়গামের শ্রমিক কর্মচারীরা ঐ একই প্রতিষ্ঠান থেকে দৈনিক স্বদেশ প্রকাশ করতেন।

১৮ জুন প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্স বলে সরকার নবযুগ সম্পাদককে গ্রেপ্তার করে। এর আগে হক কথা, মুখপত্র, স্পোকসম্যান, লালপতাকা, গণশক্তি প্রভৃতি পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়। ১২ আগস্ট চট্টগ্রামের দেশবাংলা পত্রিকাটিকে সরকারী নির্দেশে জোর করে বন্ধ করে দেয়া হয় এবং এর সম্পাদককে রাষ্ট্রপতির ৫০ নম্বর আদেশ বলে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৪ আগষ্ট আওয়ামী লীগের তথ্যমন্ত্রী বুক উচিয়ে বলেন- ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আওয়ামী সরকারের ঈমানের অঙ্গ।’ কি দুঃসহ নির্লজ্জতা। ২৩ নভেম্বর সাপ্তাহিক ওয়েভ পত্রিকাকে আদালতের ইনজাংশন উপেক্ষা করে উচ্ছেদ করা হয়।

২৭ আগস্ট ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বলেন, সত্য প্রকাশে বাধার সৃষ্টি করা হচ্ছে। চোরাচালানীদের জন্য রাষ্ট্রপতির ৫০ নং ধারা বলে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করা চলবে না। এর জবাবে ২৮ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার প্রিন্টিং প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স (রেজিস্ট্রেশন এন্ড ডেক্লারেশন) ৭৩ নামে নতুন আর একটি গণবিরোধী কালাকানুন জারি করে। ১৯ সেপ্টেম্বর অর্ডিন্যান্সটি সংসদে পাস করিয়ে নেয়া হয়। একই সংসদ অধিবেশনে স্পীকার আব্দুল মালেক উকিল বলেন- ‘কাউকে নৈতিকতা ও সৌজন্যের পরিপন্থী আলোচনা বা সংবাদ পরিবেশন করতে দেয়া হবে না।’ হলিডে সম্পাদক এনায়েতুল্লা খানকে নিয়েও মালেক উকিল খিস্তি খেউর করেন। ২৩ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের এসব অশালীন উক্তির প্রতিবাদ করে ডিইউজে।

প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আওয়ামী নেতৃবৃন্দের সকলেই সমস্বরে বলতে থাকেন, ভারতের বিরুদ্ধে কাউকে কথা বলতে দেয়া হবে না। ভারতবিরোধী লেখা প্রকাশের জন্য বিভিন্ন পত্রিকার উপর নিপীড়ন শুরু হয়। সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রকাশের জন্য গণকণ্ঠের উপর বার বার হামলা হতে থাকে।

১৬ জানুযায়ী (১৯৭৪) ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের এক বিবৃতিতে বলা হয়- বিভিন্ন মহলের নিকট হতে সাংবাদিকদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ, ঘোষিত ও অঘোষিত নানা রকম হুমকির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই বলেই এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে।

১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে সংসদে বিশেষ ক্ষমতা আইন পাস করে আওয়ামী লীগ বিরোধীদল ও ভিন্ন মতপোষণকারী সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী দলনের ব্যবস্থা চূড়ান্ত করে। ১০ ফেব্রুয়ারী ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এক বিবৃতি প্রকাশ করে বলে, বিশেষ ক্ষমতা আইন পাস করে আওয়ামী লীগ সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উপর নয়া বিধি নিষেধ আরোপের ব্যবস্থা করেছে।’
এই আইনে সংবাদ প্রকাশে বাধা আরোপসহ যে কোন সংবাদ প্রকাশের জন্য এমনকি এই আইন রচনার পূর্বে প্রকাশিত কোন সংবাদের জন্যও ছাপাখানা মুদ্রাকর প্রকাশক রিপোর্টার এবং সম্পাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাবে। এই আইনের শর্তানুযায়ী সরকার দৃশ্য অদৃশ্য সত্য বা মিথ্যা যে কোন সংবাদ আইন শৃংখলাবিরোধী মনে করলে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

৭৪ সালের ১৭ মার্চ জাসদের জনসভাকে কেন্দ্র করে দৈনিক গণকণ্ঠ বন্ধ করে দেয়া হয়। গণকণ্ঠ সম্পাদক আল মাহমুদসহ বহু সাংবাদিক কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৯ জুন ঢাকার রাস্তায় সাংবাদিকদের ঠেঙান হয়। ১ জুলাই মওলানা ভাসানীর জনসভাকে কেন্দ্র করে গণকণ্ঠ অফিসে আর এক দফা হামলা চালান হয়। পুলিশ অফিসে এসে গণকণ্ঠের ফর্মা ভেঙে দেয়। মওলানা ভাসানীর প্রাচ্যবার্তা ও চট্টগ্রামের ইস্টার্ন একজামিনার বন্ধ করে দেয়া হয়।

১৯৭৩ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিলের জন্য আন্দোলন শুরু করে। ২৮ আগস্ট অর্ডিন্যান্সটি বাতিল ঘোষিত হয়। কিন্তু এরই মধ্যে একটি সংবাদকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের দৈনিক দেশবাংলাকে বন্ধ করে দেয়া হয়। এ ছাড়াও নিউজপ্রিন্ট ও বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করে সংবাদপত্র দলন অব্যাহত রাখা হয়। সরকার ২৮ জুলাই নিউজপ্রিন্ট নিয়ন্ত্রণ আদেশ জারি করে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবে সরকারের আশির্বাদবিহীন সংবাদপত্রগুলো মৃত্যু যন্ত্রণায় ধুঁকতে থাকে। জনৈক বিদেশী সাংবাদিক একটি প্রখ্যাত ম্যাগাজিনে রক্ষীবাহিনী সম্পর্কে সমালোচনা করার পর স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, রক্ষী বাহিনী বাংলাদেশে সরকারের কাছে প্রিয় আলোচ্য বিষয় নয়। নিরব হুকুম জারি হল, উক্ত সাংবাদিককে পুনরায় বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়া হবে না।

তৎকালীন সংবাদপত্র ও বাকস্বাধীনতার নাজুক পরিস্থিতি বর্ণনা করে পত্রিকাটিতে বলা হয়- ‘ঢাকায় অবস্থানরত একজন ভারতীয় সাংবাদিক যেমন বলেছেন, ঢাকার বিখ্যাত প্রেসক্লাবে যারা সবরকম বিষয়ে কথা বলতেন এখন তারা শুধু আবহাওয়া কানাডা এসব বিষয়ে কথা বলেন। অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ দমন করা ছাড়াও সরকার কঠোর ভাবে সাংবাদিকতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছেন যা বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির পক্ষে মোটেও শুভ নয়। হংকং নিউজ ম্যাগাজিনে মুজিবের বিরুদ্ধে লেখার কারণে জনৈক সাংবাদিককে বাংলাদেশের নিউজ এজেন্সী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। যারা বিদেশী সংবাদপত্রের খবরাদি প্রকাশ করবে তাদের অনুরূপ প্রতিশোধের সম্মুখীন হতে হবে। যেমন হয়েছেন বাংলাদেশে সিভিল লিবার্টির একজন প্রধান আইনজীবী। তিনি সোনার বাংলা সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছিলেন তা মুখরোচক ছিল না। হদিস পাওয়ার পর তাকে কারারুদ্ধ করা হয়েছে। সংবাদ সম্পর্কিত বাধানিষেধের ফলে বাঙালীরা আহতবোধ করছেন। এ ধরনের ব্যবস্থা অবলম্বনের সার্থকতা থাকত যদি বাংলাদেশের ভয়াবহ সমস্যার উপশম হত।’

অবশেষে ৭৫ এর ৩ জানুয়ারী জারি করা হল বিশেষ ক্ষমতা বিধি। ২৪ জানুয়ারী (৭৫) ঘোষণা করা হল একদলীয় শাসন। একই বছরের ১৬ জুন জারি করা হল সংবাদপত্র ডিক্লারেশন বাতিল অধ্যাদেশ। এই একটি অস্ত্র প্রয়োগ করে গণতন্ত্রের অপরিহার্য উপাদান সংবাদপত্রের স্বাধীনতা শুধু অপহরণই করা হলো না, ৪টি সংবাদপত্র ছাড়া বাকি সব পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল ঘোষণা করা হল। প্রায় ৪ শতাধিক পত্র পত্রিকা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ প্রমাণ করল যে, দলটি আসলে গণবিরোধী। স্বাধীনতার নামে গণতন্ত্রের নামে গণস্বার্থের দোহাই দিয়ে সত্যিকার স্বাধীনতাপিয়াসী জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে আদিম স্বৈরাচার।

মন্বন্তরের ছোবল
১৭৫৭ সালে সিরাজের পতনের পর শোষণ লুণ্ঠনের মধ্যদিয়ে সমগ্র বাংলা দুর্ভিক্ষাবস্থায় পৌঁছতে সময় লেগেছিল ১৩ বছর- যা বাঙলার ইতিহাসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর হিসেবে পরিচিত। এই মন্বন্তরে প্রাণ হারিয়েছিল সমগ্র জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ। কিন্তু পূর্ব বাংলার সর্বশেষ মন্বন্তর সংঘটিত হয়েছিল আওয়ামী শাসনের ৩ বছরের মাথায়। এ থেকে আন্দাজ করা যায় কি ধরনের শোষন লুট ও দুঃশাসন চলেছিল শেখ মুজিবের শাসনামলে। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী শাসনামলেও দুর্ভিক্ষাবস্থার সূচনা হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য দিয়ে সেটার মুকাবিলা করা সম্ভব হয়। সেই সময়ও চোরাকারবারি মজুতদার ও মুনাফা খোররা জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছিল আওয়ামী আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে। সেই কট্টর অভিজ্ঞতা সত্বেও আওয়ামী প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে যে ভুল করেছিল বাংলার জনগণ, তারই প্রায়শ্চিত্য করতে হয়েছে জাতিকে চুয়াত্তরের মন্বন্তরে।  পূর্বপাকিস্তানের পতনের পর একাত্তরোত্তর বাংলাদেশে বীভৎস লুণ্ঠন ও নারকীয় সন্ত্রাস চলেছিল এদেশের মানুষ দ্বারা জনগণের মধ্যে এক নবতর সম্ভাবনাময় স্বাধীনতার আবেশ সৃষ্টি করে। সেই আবেশ নিমিত্ত হয়ে সামগ্রিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে সমগ্র জাতি।

১৯৭২ প্রতিটি জনপদে পরিলক্ষিত হয়েছে দ্বিমুখী চিত্র, একদিকে ছিল ভারতের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ছোবল অন্যদিকে চলছিল ভাগ্য বিড়ম্বিত সংখ্যাগুরু জনগণের বেঁচে থাকার লড়াই। মুদ্রাস্ফীতির চাপ, বল্গাহীন শোষণ ও লুণ্ঠনের সাথে পাল্লা দিয়ে পিছিয়ে পড়ছিল খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষগুলো। ৭৪ এর আকালে লক্ষ লক্ষ কঙ্কালসার মানুষ ক্ষুৎপিপাসার যন্ত্রণা নিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে মহাকালের গর্ভে হারিয়ে গেল। পঞ্চাশের মন্বন্তর ম্লান হয়ে গেছে চুয়াত্তরের কাছে। চুয়াত্তরের আগস্টে বন্যা শুরু হল। এই সাথে শুরু হল মন্বন্তরের মর্মান্তিক কাহিনী। একদিকে চলছিল দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের হাহাকার করুণ ক্রন্ধন, অন্যদিকে তাদেরই মুখের গ্রাস নিয়ে আওয়ামী লুটেরাদের নির্বিকার লুণ্ঠন। লুট-পাট চলে বন্যা ও দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের ডাল, চাল খাদ্য সামগ্রী রিলিফ এবং কম্বল নিয়ে।

ডেইলী মেল পত্রিকায় জন পিলজার লিখেছিলেন- ‘এই দুর্ভিক্ষের আর একটি ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যান হল এই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর হিসেব মতে ৫০ লাখ মহিলা আজ নগ্ন দেহ। পরিধেয় বস্ত্র বিক্রি করে তারা চাল কিনে খেয়েছে।’

সরকারী শাসনযন্ত্রের অতি সাবধানতার মধ্যেও ২২ সেপ্টেম্বর ৭৪ বায়তুল মোকাররমে দুই শতাধিক উলঙ্গ, অর্ধ উলঙ্গ নারী পুরুষ অন্ন-বস্ত্রের জন্য মিছিল বের করেছিল। আর এ সময়ে মহাসমারোহে ৫৫ তম জন্মবার্ষিকীতে ৫৫ পাউণ্ড ওজনের কেক কাটেন শেখ মুজিব নিজেই। ২৩ সেপ্টেম্বর সারাদেশে ৪৩০০ লঙ্গরখানা খোলার ঘোষণা করা হয়। এ প্রসঙ্গে ১৩ নভেম্বর প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের এক নিবন্ধে লেখা হল- ‘সরকারী পরিকল্পনা বানচাল হয়ে গেছে। কেননা দুর্ভিক্ষপীড়িত লোকের সংখ্যা সরকার অনুমিত সংখ্যার ৩ গুণ বেশী হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগস্ট মাসে যখন সরকার লঙ্গরখানা খোলার পরিকল্পনা করেন তখন ধরে নেয়া হয়েছিল যে দেশে আনুমানিক ২০ লাখ লোককে খাওয়ানোর জন্য ৪ হাজার লঙ্গরখানা যথেষ্ট হবে।’

ডেইলি টেলিগ্রাফের পিটারগিল গ্রামবাংলার খেটে খাওয়া মানুষগুলোর অসহায় অবস্থা বর্ণনা করে লিখেন- ‘গ্রামবাংলার ছিন্নমূল মানুষেরা আজ ঢাকার পেশাদার ভিখারিতে পরিণত হয়েছে। পিতা শিশুদের নিয়ে রাস্তার চত্বরে নির্জীবের মত বসে আছে আর ফুপিয়ে কাঁদছে।’

দৈনিক ইত্তেফাকের একটি ছবিতে গ্রাম বাংলার দুর্ভিক্ষাবস্থার চিত্র প্রকট হয়ে প্রকাশ হয়েছে। ছবিটি ছিল কোন এক বাসন্তীর মাছ ধরা জাল দিয়ে লজ্জা নিবারণের প্রয়াস। দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা আরো প্রকট করে তুলেছিল একটি মর্মান্তিক সংবাদ। সংবাদটিতে বলা হয়, গাইবান্ধা প্লাটফর্মে একজন অসুস্থ মানুষ বমি করলে সেই বমি একজন ক্ষুধার্ত মানুষ ভক্ষণ করে ক্ষুধার জ্বালা নিবারণ করে।
আওয়ামী বিরোধীরা তো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে থাকে। অবশেষে আওয়ামী ঘারানার জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীরাও প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে। ৮ আগস্ট আবুল ফজলসহ চট্টগ্রামের ৮৪ জন শিক্ষকের বিবৃতি প্রকাশ হয়। এতে বলা হয়- ‘জাতির জীবনে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রতি এত অনাসক্তি, এত অবজ্ঞা, এত অদ্ভুত রকম ঔদাসীন্য কখনো দেখা গেছে বলে বিশ্বাস হয় না। নিজের প্রতি আস্থাহীন জাতি যে কি পরিমাণ জড় পদার্থে পরিণত হতে পারে, বর্তমান বাংলাদেশ তার জ্বলন্ত উদাহরণ। স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই একাত্মতা ত্যাগের সহজ শক্তির সেই প্রচন্ডতা পরবর্তীকালের সিদ্ধান্তহীনতায়, ভুল সিদ্ধান্তে, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তায় আর গুটি কয়েক লোকের লাগামহীন দুর্নীতির সয়লাবে সব ধুয়ে গেছে। দেশের নেতৃত্বের প্রতি এই জাতীয় দুর্দিনে আমাদের আকুল প্রার্থনা জাতি হিসেবে আমাদের শক্তিতে আস্থাবান হওয়ার পরিবেশ ফিরিয়ে দিন।’

সে সময় শুধুমাত্র খাদ্যশস্যের আকাল ছিল তাই নয়। নিত্য প্রয়োজনীয় সবকিছু দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছিল। যেমন আটানা কেজির লবণ ৬০ টাকা হয়েছিল, কাঁচা মরিচের কেজি হয়েছিল ৭০ টাকা। দুর্ভিক্ষের এই সুযোগে লবণ বিক্রি করে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বিশাল অংকের টাকা বাংলাদেশ থেকে হাতিয়ে নিল।

আওয়ামী লীগের দুর্নীতি দুর্গতদের খাদ্য ও রিলিফ সামগ্রী নিয়ে লুটপাটের খণ্ডিত চিত্র বিদেশী পত্রিকা শিকাগো ডেইলি নিউজ (২৩ জুন ৭৫) প্রকাশ করে। এতে লেখা হয়েছিল- ‘বিদেশী সাহায্য সামগ্রীর অধিকাংশ বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হয়। কম্বল, জামপার, টিনের খাদ্য, গুঁড়া দুধ সবকিছুই ঢাকার দোকানপাটে পাওয়া যায়। একটি দূতাবাসের হিসেব (দূতাবাসটি পশ্চিম দেশীয় নয়)। অনুযায়ী বিদেশী সাহায্যের ১৫ শতাংশেরও কম জনসাধরণের হাতে পৌঁছায়। শেখ মুজিবের ভাগ্নে শেখ মনিকে গত দুর্ভিক্ষের কথা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জোর দিয়ে বলেন, দোষ আমাদের সরকারের নয়। দোষ সেসব সরকারের যারা প্রতিশ্রুতি দিয়েও সময়মত খাদ্যশস্য পৌঁছে দেননি। শেখ মনি অবশ্যই উপাদেয় খাবার খায়। স্বাধীনতার পর একজন ক্ষমতাসম্পন্ন যুব রাজনৈতিক নেতা বলেছেন, তিনি দুটি সংবাদপত্রের সম্পাদক, দুটি গাড়ি ও দুটি দখল করা বাড়ির মালিক। মামা মুজিব ক্ষমতায় আসার পর শেখ মনি, যাকে বিদ্রুপকারীরা জাতীয় ভাগ্নে বলে অভিহিত করেন হঠাৎ করে অজস্র টাকার মালিক বনে গেছেন।’

অবশেষে মুজিবের গলাবাজির সম্মোহনী শক্তি যখন অকার্যকর ও নিস্তেজ হয়ে পড়ল, জনগণ যখন মনে করতে শুরু করল মুজিবের বক্তৃতা মানেই দ্রব্যমূল্যের আর একধাপ বৃদ্ধি, তখন তিনি জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য চাতুরীর আশ্রয় নিলেন। প্রথমেই তার আঘাতের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করলেন তাজুদ্দিনকে, তাকে মন্ত্রীত্ব ও কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে অপসারণ করলেন। মুজিবের ধারণা ছিল তাকে বাদ দিলেই জনগণের আস্থা ফিরে আসবে। কিন্তু লঘু চেতা মুজিবের জনপ্রিয়তার ধস নামা মোটেও কমেনি।

৩০ অক্টোবর লবণ মওজুতের জন্য আওয়ামী এমপি ডাঃ শামসুদ্দিনকে গ্রেপ্ততার করা হলে এতে মুজিবের প্রতি জনগণের ধারণার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। জনগণ এটাকে দেখেছে আই ওয়াস হিসেবে। বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজ আবার নড়ে উঠল।

১৯৭৪ সালে ১ নভেম্বর দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের জন্য আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় বায়তুল মোকাররমে। এই সমাবেশে মন্বন্তর পরিস্থিতি ও মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত ১৭টি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, এই মন্বন্তরের ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের ব্যাপকতা ও ভয়াবহতাকে অতিক্রম করছে এবং মন্বন্তর বন্যা অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে সৃষ্টি হয়নি। বরং এটা ছিল শাসক শ্রেণী ও তাদের সহযোগীদের গণবিরোধী নীতি ও কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষ পরিণতি। সমাবেশের প্রস্তাবে এই মন্বন্তরকে প্রায় দুর্ভিক্ষাবস্থা বলে বর্ণনা না করে একে মন্বন্তর বলে ঘোষণা করার দাবি জানানো হয়। প্রস্তাবে বৈদেশিক সাহায্যের এক শ্বেতপত্র ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।

এই দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা শুধু মাত্র জাতীয় অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছিল তা না, সামাজিক অবকাঠামো ধসিয়ে দিয়েছিল। বুভুক্ষার যন্ত্রণা নিবারণের জন্য কুলবধু অথবা নিষ্পাপ তরুণীদের অকাতরে দেহ বিক্রি করে খাদ্যোপকরণ সংগ্রহ করতে হয়েছে। বুভুক্ষ জননীরা সন্তানের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করতে না পেরে গলাটিপে হত্যা করে নিজ সন্তানকে। সমকালীন ফিনান্সিয়াল টাইম (৬ জানুয়ারী ১৯৭৫) পত্রিকাতে বলা হয়- শুধুমাত্র নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের দুর্নীতির মাধ্যমে যে আওয়ামী লীগ দেশকে ধ্বংস করছে তা নয়, ভয়াবহ খাদ্য পরিস্থিতি ও গ্রামবাংলার দুর্ভিক্ষ গ্রামের সামাজিক কাঠামোর উপরে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেক জেলায় বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে কৃষকরা তাদের জমি-জিরাত বিক্রি করে খাদ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছে। হিসেব করে দেখা গেছে যে, উত্তরাঞ্চলে এক লাখ বিঘা জমি হস্তান্তরের দলিল সম্পাদিত হয়েছে। এসব জমি প্রধানত আওয়ামী লীগের স্থানীয় চাঁইরা সস্তায় কিনে নিয়েছে।’

এত আলোচনার পর ও ৭৪ এর মন্বন্তরের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রকাশ হয়নি। এখানে যা কিছু বলা হয়েছে এটা মন্বন্তরের খণ্ডিত অসম্পূর্ণ চিত্র। বিষয়টি আলোচনার জন্য গ্রন্থ নয় মহা গ্রন্থের প্রয়োজন হবে। এখানে সেই অবকাশ নেই। তবে বিষয়টির উপর একটি ধারণা আগামী বংশধরদের মনে রেখাপাতের এই আলোচনা যথেষ্ট হবে বলে আমি মনে করি।

এইভাবে শেখ মুজিব ও তার দল অনেক প্রত্যাশার স্বপ্নময় পৃথিবী থেকে গোরস্থানের কিনারে এনে দাঁড় করাল জাতিকে। ১০ লক্ষ মানুষ আওয়ামী দুর্নীতির খেসারত দিল। এক টুকরো রুটির বিনিময়ে দুর্নীতিবাজ লুটেরাদের যৌন লালসা মেটাতে হল এ দেশের অসংখ্য কুলবধু এবং নিষ্পাপ তরুণীদের, সর্বস্ব হারিয়ে পথে নামতে হয়েছে কত অসংখ্য পরিবারকে। গ্রামবাংলার মেহনতি মানুষের হাতে উঠলো ভিক্ষার ঝুলি। সম্ভাবনাময় অসংখ্য শিশুকে আলিঙ্গন করলো হিমশীতল অকাল মৃত্যু। সর্বনাশা মম্বন্তর ও মহা-আকালে ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদে যখন আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছিল, বেওয়ারিশ লাশে যখন গোরস্থান উপচে পড়েছিল, সেই দুঃসহ দুরবস্থার সময় শেখ মুজিব মহাসমারোহে তার সন্তান শেখ কামালের বিয়ে দিয়েছিলেন, শেখ মুজিব রাজকীয় বিয়ের অনুষ্ঠানে বধু বরণ করেছিলেন হীরকের মুকুট দিয়ে। মহামন্বন্তরে বিপর্যস্ত জাতির সাথে কি বেদনাদায়ক মস্করা ছিল এটা অথচ একই আর এক দৃশ্য দেখেছি আমরা ষাটের দশকে। তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর ছিলেন শহীদ আব্দুল মোনয়েম খান। খাদ্য সংকট মেটানোর জন্য তখন বিপুল পরিমাণ ভুট্টা আমদানি করা হয়েছিল। গভর্নর বিকল্প খাদ্য হিসেবে ভুট্টাকে খাদ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সে সময় তিনি জগণের প্রতি আহ্বান জানালেন। শুধু বক্তব্য দিয়েই ক্ষান্ত না হয়ে নিজেও ভুট্টাকে খাদ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। গভর্নর মোনয়েম খান তার তৃতীয় কন্যার বিয়েতে অতিথি আপ্যায়ন করেছিলেন ভুট্টার রুটি দিয়ে। কিন্তু এর উল্টো চিত্র দেখেছি মন্বন্তরে দুঃসময়ে বাংলার দরদী ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিবকে হীরকের মুকুট দিয়ে বধুবরণ করতে। জাতির সাথে মুজিবের এই নির্লজ্জ তামাশা কোন দিনই ভুলবে না এদেশের মানুষ।

মুজিবের নির্বাচন প্রহসন

‘ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ’এর ডেভিড হার্ট লিখেছেন- '১৯৭২ সালের জানুয়ারীতে পাকিস্তানী জেল থেকে ফিরে এসে শেখ মুজিব তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে দেশবাসীর কাছে ৩ বছর সময় চেয়েছিলেন যে সময় তিনি তাদের কিছুই দিতে পারবেন না। হয়তো তাদের অনাহারে অর্ধাহারে থাকতে হবে। এক লক্ষ লোক যারা নেতার বক্তৃতা শোনার জন্য সমবেত হয়েছিল তারা জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনিতে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। কিন্তু শুভানুভূতির উল্লাস বছর না যেতে উবে গেল। তারা জানতে চাইল, ক্ষুধা অনাহার  জরা পুষ্টিহীনতা এবং রক্ষী বাহিনীর নামে পরিচিত বাছাই করা প্যারামিলিটারী দলের নির্মম দৌরাত্ম্যের জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামে “৩০ লাখ” লোক প্রাণ দিয়েছিল কিনা।’

বাংলার প্রতিটি মানুষের মনে যখন এ জিজ্ঞাসা প্রবল হয়ে উঠল তখন মুজিব হয়তো ভেবে থাকতে পারেন যে তিনি নির্বাহী ক্ষমতা হাতে পেলে বাংলার তাবৎ সমস্যার সমাধান করা তার পক্ষে সম্ভব হবে। অথবা আরো বেশী ক্ষমতার মোহ পেয়ে বসেছিল তাকে। প্রধানমন্ত্রী তাজুদ্দিনকে সরিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেন। এতে অবস্থার পরিবর্তন হল না। ক্রম হ্রাসমান আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা আরো দ্রুতগতিতে নিম্নগামী হতে শুরু করল।

ক্ষমতার প্রতি মুজিবের মোহ এবং আকর্ষণ ছিল তার রাজনীতির শুরু থেকে। পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হলেন। প্রেসিডেন্ট হয়ে দেখলেন তিনি ঠুটো জগন্নাথ। সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এতে তার নিজেকে ছোট মনে হল। তিনি আরো আরো অধিক ক্ষমতার অধিকারী হতে চাইলেন। যে কারণে তাজুদ্দিনকে প্রধান মন্ত্রীত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হল। সংসদীয় গণতন্ত্রে তিনি প্রেসিডেন্ট হলেও প্রকৃতপক্ষে তার ক্ষমতা ছিল অসীম। ১৯৭১ সালে যেমন তার অঙ্গুলি হেলনে সমগ্রজাতি উঠা বসা করতো, তখনো সেই অবস্থা বর্তমান ছিল। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হলেন। জনপ্রিয়তার দ্রুত অবক্ষয় তাকে ভাবিয়ে তুলল। তখনও শেখ মুজিবের ইমেজে ভাটা পড়েনি। তিনি বিজ্ঞ রাজনীতিকের মত নির্বাচন দিলেন। নির্বাচন দিলেন এই কারণে যে তার ইমেজ বর্তমান থাকতে যেন আওয়ামী লীগের ক্ষমতা ৫ বছর বেড়ে যায়। ৭৩ সালের ৭ মার্চ নির্বাচন ঘোষিত হল। নির্বাচনের মুখে ন্যাপ নেত্রী মতিয়া চৌধুরী ৩ মার্চ ঢাকার এক জনসভায় অভিযোগ তুলে বললেন- ‘গত এক বছরে অবাধ লুটতরাজ দুর্নীতি স্বজন প্রীতি আর রিলিফ চুরির রেকর্ড ভঙ্গ করে আওয়ামী লীগ এবার বঙ্গবন্ধুকে পুঁজি করে জনতার কাছে ভোট চাইতে এসেছে। একদিকে মুখে গণতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে অন্যদিকে ‘আজো আছে জোর লড়াই বঙ্গ বন্ধু অস্ত্র চাই’ বলে শ্লোগান দিয়ে আওয়ামী লীগ ভয়-ভীতি প্রদর্শন করছে।’

নির্বাচনে ৩০০টি আসনের ২৯১ টিতে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী ঘোষণা করা হল। ন্যাপ নেতা মোজাফফর আহমদের অভিযোগ হল, কমপক্ষে ৫০টি আসনে ন্যাপ ও অন্যান্য বিরোধী দল প্রার্থীকে পরাজিত করা হচ্ছে কারচুপির মাধ্যমে জোর করে।

মেজর জলিলের অভিযোগ ছিল মারাত্মক। তিনি বলেন-‘নির্বাচনের দিন গণ ভবনেই কন্ট্রোল রুম স্থাপিত হয়েছিল এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করেছেন। বিরোধী দলের প্রার্থীরা যখন ভোট গণনায় এগিয়ে যাচ্ছিলেন তখন প্রধান মন্ত্রীর নির্দেশেই অকস্মাৎ বেতার টেলিভিশনে এই সকল কেন্দ্রের ফলাফল প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয় এবং সন্দেহজনক দীর্ঘ সময় পর নিজেদের পছন্দমত হিসেব অনুযায়ী ভোটের সংখ্যা প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ভাসানী ন্যাপের ডক্টর আলীম আল রাজীও অনুরূপ সরকারের নির্বাচনী কার চুপির কথা জোরে সোরে উচ্চারণ করেছেন। শেখ মুজিবের ইমেজে অবক্ষয় তখনো তেমন হয়নি, এ কারণে আওয়ামী লীগের বিজয় তখনও নিশ্চিত ছিল। এসত্ত্বেও শেখ মুজিব কেন নির্বাচনে কারচুপির আশ্রয় নিয়েছিলেন এটা অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও কারচুপি করা হয়েছিল এটা নিশ্চিত।’

নির্বাচনে কারচুরি করার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এটা প্রমাণ করার জন্য যে, তখনো আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় ধস নামেনি। মূলত উদ্দেশ্য ছিল দেশের মানুষকে বোকা বানিয়ে বিশ্ব বিবেককে প্রতারিত করা। এ ছাড়াও ক্ষমতায় থেকে অথবা না থেকে নির্বাচনে কারচুপি করা আওয়ামী লীগের চিরাচরিত অভ্যাস। রাজদণ্ড হাতে নিয়ে এতটুকু না করা আওয়ামী লীগের প্রকৃতি এবং প্রবৃত্তি বিরুদ্ধ। ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯১টি আসন দখল করেও আওয়ামী লীগের ইমেজ ফিরে এলো না। বরং আরো ধস নামা শুরু হল। এমনকি শেখ মুজিবের ইমেজ এবং তার প্রতি মানুষের ভালবাসা শ্রদ্ধার অবক্ষয় শুরু হল তখন থেকেই।

কোলকাতার ফ্রন্টিয়ার পত্রিকায় লেখা হল- ‘এটা এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে যে সরকারের একচ্ছত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মোকাবিলা করা যায় না। অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশের দুঃখ-কষ্ট নব্য শাসকের সৃষ্ট শ্রেণীগত অসঙ্গতির ফল। কিন্তু বাংলাদেশের শাসক ও নব্য শাসকেরা অধিকতর অযোগ্য দুর্নীতিপরায়ণ ও লোভী। এরা রাতারাতি বড় হতে চায়। ধুরন্ধর ব্যক্তি উচ্চাশার টোপ ফেলেছিল যে স্বাধীন বাংলাদেশ অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যাবে এবং সরল মানুষরা তা বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু ভারতীয় হস্তক্ষেপের ফলে যারা বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসীন হল তাদের মত স্বার্থপর নেতৃত্ব কোন দেশে সত্যিকার জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের পর আর দেখা যায়নি। দেশটি যে অর্থনৈতিক ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে তা অবশ্যম্ভাবী ছিল। বন্ধু রাষ্ট্রগুলির সাহায্য সহযোগিতা বাংলাদেশের কোন কাজে আসেনি। আরামদায়ক বন্দীদশা থেকে শেখ মুজিব প্রত্যাবর্তনের পর দেশের অবস্থা মন্দ থেকে মন্দতর হয়েছে। হাজার হাজার লোক বন্যা দুর্ভিক্ষ ও বিকৃত গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে। জাঁকজমকের বিভ্রান্তিতে মুজিব যা করেছেন তাতে তার নিজের এবং তাদের দলের লোক ছাড়া কারো উপকার হবে না। হতে পারে গ্রামবাঙলার কিছু সরলপ্রাণ লোক তাকে জাতির পিতা  হিসেবে দেখে আর মনে করে যে একজন ভাল লোক ডিক্টেটরদের হাতে পড়ে গেছে। মুজিব সরল লোকদের এই আবেগের উপর নির্ভর করেছেন।’

বাকশাল গঠন ও গণতন্ত্রের অপমৃত্যু
একাত্তরে মুজিবের প্রতি ভালবাসার যে ভাবাবেগ সৃষ্টি হয়েছিল সেই আবেগ পুনরুদ্ধারের প্রয়াস শেখ মুজিব অব্যাহত রাখা সত্বেও সেটা আর ফিরে এলো না। শেখ মুজিব তার ব্যর্থতাকে ঢেকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। তার ব্যর্থ নেতৃত্বের ভাবমুর্তিকে ঘসে মেজে জনগণের গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে রাখতে ব্যর্থ হলেন। আওয়ামী নেতৃত্বের বিধিবদ্ধ নিয়ম হল নিজেদের ব্যর্থতাকে অন্যদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া। পাকিস্তান আমলে পাঞ্জাবীও পশ্চিমাদের উপর দোষারোপ করা হয়েছিল। অতঃপর একাত্তরে নিজেদের অপকর্মও চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল পাক সেনাদের উপর। তারপর সব অপকর্মের দায়িত্ব চাপান হল পাকিস্তানের সংহতিতে বিশ্বাসী দল, নেতা ও কর্মীদের ওপর। একাত্তরের পরবর্তীপর্যায়ে রাজনৈতিক দৃশ্যপটে যখন তাদের কেউ অবশিষ্ট রইল না, তখনও তার প্রয়োজন হলো কারো না কারো ওপর দোষারোপ করা। অবশেষে তারা সহকর্মীদের দোষারোপের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করল। চুয়াত্তরের অক্টোবরে শেখ মুজিব তার সব ব্যর্থতা অর্থনৈতিক রাজনৈতিক এবং সামাজিক সব বিপর্যয়ের দায় তাজুদ্দিনের কাঁধে চাপিয়ে তাকে দুরাত্মা রূপে চিহ্নিত করলেন। খুব জোরে সোরে প্রচারনা শরু হল তাজুদ্দিনের বিরুদ্ধে। পর্যবেক্ষক মহল অবাক বিস্ময়ের অপেক্ষা করতে থাকলেন শেখ মুজিবের নতুন কোন পদক্ষেপের দিকে। সেই নতুন নাটক মঞ্চস্থ হতে মোটেও বিলম্ব হলো না।

২৮ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ উল্লাহ জরুরী অবস্থা ঘোষণা করলেন মুজিবের নির্দেশে। ডেভিড হার্ট লিখেছেন- ‘সরকার কী কার্যক্রম গ্রহণ করতে যাচ্ছেন তা জরুরী ঘোষণায় স্পষ্ট করে বলা হয়নি। তবে জরুরী আইনে ন্যাস্ত স্পেশাল ক্ষমতার বলে শেখ মুজিব ও তার দল যাকে বিপজ্জনক মনে করবেন তাকে জেলে পুরতে পারবেন। আর এভাবে বাংলাদেশে আজও যতটুকু সরকার বিরোধিতা টিকে আছে তা সমুলে ধ্বংস করে দেয়া হবে।

এই বিশেষ ক্ষমতা আইনের দ্বারা প্রতিপক্ষ বিরোধী দলের ওপর শরু হল গ্রেপ্তারী অভিযান। প্রতিপক্ষের সব কিছু নির্মূল করে রাজ-সিংহাসন নিষ্কন্টক করতে চাইলেন। সিরাজ সিকদারকে গ্রেপ্তার ও হত্যা করা হল। হত্যার পর আঙুল উচিয়ে ক্রুর হাসি হেসে মুজিব সদম্ভে প্রকাশ করলেন আজ কোথায় সিরাজ সিকদার। অস্থায়ী ক্ষমতার দাপটের কি নিষ্ঠুর আনন্দ। কোথায় সিরাজ সিকদার বলার মধ্যে দিয়ে তার প্রতিপক্ষদের জানিয়ে দিলেন মুজিবের বিরোধীতা করার নির্মম পরিণতি। হিতৈশী এক নায়কের লেবাস পরে গণতন্ত্রী মুজিব শহরের গৃহকর্তাদের দেয়ালে অঙ্কিত রাজনৈতিক শ্লোগানগুলো মুছে ফেলার নির্দেশ দিলেন। সকাল ১০টায় সেক্রেটারিয়েটের গেট বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হল। রক্ষী বাহিনীকে ব্যবহার করা হল ঠ্যাঙানোর জন্য। মোসাহেবদের কণ্ঠে ধ্বনিত হল এক নেতা এক দেশ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ। এই শ্লোগান সম্বলিত প্লাকার্ড ফেষ্টুনে ভেসে গেল দেশ। মুজিবের মুখে অন্তহীন তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। তার ক্ষমতার ক্ষুধা আরো আরো তীব্র হয়ে উঠল। তার তোষামোদকারী পারিষদবর্গ তাকে ক্ষমতা আরো বেশী কুক্ষিগত করার জন্য প্ররোচিত করল। এই কারণে যেন মুজিবকে সামনে রেখে জনগণ এবং জাতীয় সম্পদকে আরো লুট করা সম্ভব হয়। মুজিব ক্ষমতা কুক্ষিতগত করার ব্যাপারে অনেক দূর এগিয়ে গেলেন। রাশিয়ার আদলে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন। চাইলেন একারণে যে তিনি ক্ষমতার শীর্ষ বিন্দুতে অবস্থান করে জনগণকে অকটোপাশের মত বেধে রাখতে পারবেন। এ উদ্দেশ্যে ১৯৭৫ সালের ১৮ জানুয়ারী এক দলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব সংসদীয় দলের সভায় উত্থাপন করা হল। অধিকাংশ সদস্য বিপক্ষে মত প্রকাশ করলেন।

সংসদে বিলটি উত্থাপিত হলে। নূরে আলম সিদ্দিকী বাকশাল গঠনের বিরোধিতা করে ৫৫ মিনিট বক্তৃতা রাখলেন। সংসদ সদস্যরা করতালি দিয়ে তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেন। এই বক্তব্যের পর কাউকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেয়া হয়নি। ২০ জানুয়ারী পরের অধিবেশনের শুরুতে মুজিব তার পরিকল্পনা ঘোষণা করলেন, শামসুল হক দাঁড়ালেন কিন্তু ফ্লোর পেলেন না। মুজিব বললেন, তোমরা আমাকে চাও কি চাও না একথা শুনতে চাই। মুজিবের বিরোধিতা করার দুঃসাহস তখন কারো ছিল না। এসত্ত্বেও এ বিলের বিরোধীতা করে তিনজন সংসদ সদস্য ওয়াক আউট করেন। আতাউর রহমান খান আগেই বেরিয়ে যান। প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন চীফ হুইপ শাহ মোয়াজ্জেম। বিলটি কণ্ঠ ভোটে পাস হয়ে যায়।

২৫ জানুয়ারী দুপুরে এক সংক্ষিপ্ত অধিবেশনে জারীকৃত চতুর্থ সংশোধনীতে বলা হয়- আইন প্রণয়নের অব্যবহিত পর যিনি রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি রাষ্ট্রপতি পদে থাকবেন না। রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হবে। শেখ মুজিবর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হবেন এবং রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণ করবেন এবং উক্ত আইন প্রবর্তন হলে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে বহাল থাকবেন যেন তিনি এই আইন দ্বারা সংশোধিত সংবিধানের অধীনে নির্বাচিত হয়েছেন।’ কি দারুন জালিয়াতি শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগের।

২৪ ফেব্রুয়ারী শেখ মুজিবর রহমান এক আদেশ বলে দেশে একটি মাত্র রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল গঠন করেন এবং নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন।
ঘোষণার ৩নং আদেশে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি অন্য কোন আদেশ না দেয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্য মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী উপমন্ত্রী সকলেই বাকশালের সদস্য বলে গণ্য হবেন।
২৬ ফেব্রুয়ারী মুজাফফার ন্যাপ এই সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানায়। ২৫ এপ্রিল আতাউর রহমান খান বাকশালে যোগদান করেন। ৪টি দৈনিকের ছাড়া, ৪শ পত্রপত্রিকা নিষিদ্ধ ঘোষিত হল এ সত্ত্বেও ৯টি দৈনিক ৯জন সম্পাদক বাকশালে যোগদানের জন্য আবেদন পেশ করে তাদের দৈন্যতা ও হীনমন্যতার স্বাক্ষর রাখলেন।

৬ জুন বাকশালের সাংগঠনিক কাঠামো ঘোষণা করা হল। দলের মহা সম্পাদক, তিন জন সম্পাদক এবং ১১৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির নাম ঘোষণা করা হল। শেখ মুজিব দেশের সব অশুভ শক্তিকে নিজের পক্ষপুটে ধারণ করে বাকশালের কঠিন শৃংখলে বেধে ফেলেন সমগ্র জাতিকে। বাংলাদেশ পরিণত হল গণতন্ত্রের বধ্য ভূমিতে। সুখ আর ঐশর্য্যরে স্বপ্লিল প্রত্যাশা নিয়ে বাংলার মানুষ বন্দী হয়ে পড়ল নিজের জন্মভূমিতে। ডেইলি টেলিগ্রাফের (২৭ জানুয়ারী ১৯৭৫) পিটার গিল লিখলেন- ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান তার দেশে পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের শেষ চিহ্নটুকু লাথি মেরে ফেলে দিয়েছেন। গত শনিবার ঢাকায় পার্লামেন্টের এক ঘণ্টা অস্থায়ী অধিবেশনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে শেখ মুজিবকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছে এবং এক দলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে ক্ষমতার্পণ করেছে। অনেকটা নিঃশব্দে গণতন্ত্রের কবর দেয়া হয়েছে।

বিরোধী দল দাবি করেছিল, এ ধরনের ব্যাপক শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের ব্যাপারে আলোচনার জন্য তিন দিন সময় দেয়া উচিত। জবাবে সরকার এক প্রস্তাব পাস করলেন যে, এ ব্যাপারে কোন বিতর্ক চলবে না। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৯ মাস যুদ্ধের পর বিধ্বস্ত কিন্তু গর্বিত স্বাধীন বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব এমপিদের বললেন যে, পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের অবদান। তিনি দেশের স্বাধীন আদালতকে ঔপনিবেশিক ও দ্রুতবিচার ব্যাহতকারী বলে অভিযুক্ত করেন। প্রেসিডেন্ট এখন খেয়াল খুশিমত বিচারকগণকে বরখাস্ত করতে পারবেন। নাগরিক অধিকার বিন্দুমাত্র যদি প্রয়োগ করা হয় তা প্রয়োগ করবে নতুন পার্লামেন্ট কর্তৃক নিযুক্ত স্পেশাল আদালত। এক্সিকিউটিভ অর্ডারের মাধ্যমে একটি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন শাসনতন্ত্র মুজিবকে ক্ষমতা দিয়েছে। এটাই হবে দেশের একমাত্র বৈধ পার্টি। যদি কোন এমপি যোগদান করতে নারাজ হন অথবা এর বিরুদ্ধে ভোট দেন, তাহলে তার সদস্যপদ নাকচ হয়ে যাবে। এহেন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ঢাকায় সমালোচনা বোধগম্য কারণেই চাপা রয়েছে। কিন্তু ৩১৫ সদস্যবিশিষ্ট পার্লামেন্টের ৮ জন বিরোধী দলীয় সদস্যের ৫ জনই প্রতিবাদে সভাকক্ষ ত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগের ১১ জন সদস্য ভোট দিতে আসেননি। তার মধ্যে ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর নায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী। শোনা যায় তিনি আওয়ামী লীগ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। শেখ মুজিবের নিযুক্তি ১৯৮০ সাল পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে পার্লামেন্ট বছরে মাত্র দু’বার স্বল্প মেয়াদে বসবে। ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও কাউন্সিল অব মিনিস্টার এর মাধ্যমে সরকার পরিচালিত হবে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং মনসুর আলী প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছেন। নতুন প্রেসিডেন্টের যে আদৌ প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই গত তিন বছরে যথেষ্ট প্রমাণিত হয়েছে। তার স্টাইল হচ্ছে ডিক্টেটর স্টাইল।’

রক্ষী বাহিনীর সন্ত্রাস
শেখ মুজিবকে যারা পুতুলের রাজা সাজিয়ে ছিল তারা আশঙ্কা করলো জনগণের সম্মোহন অথবা স্বপ্নের ঘোর এক সময় কেটে যাবে তখন বাংলাদেশকে নিয়ে দিল্লীর যে সুদূর প্রসারী ভাবনা ছিল সেই ভাবনাগুলোর ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠবে। একারণে পুতুলের রাজা শেখ মুজিবের নিরাপত্তার জন্য তার অন্ধস্তাবকদের নিয়ে একটি শক্তিশালী এলিট ফোর্স গড়ে তোলার উদ্যোগ নিল দিল্লী।

এনায়েতুল্লাহ খান লিখেছেনঃ 'একটি বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এই এলিট ফোর্স সৃষ্টির ইতিহাস আরো বিচিত্র। মুজিব বাহিনীর নেতৃবৃন্দের পরিকল্পনা অনুযায়ী শেখ মুজিবর রহমানের স্বহস্তে লিখিত পত্রের ওপর ভিত্তি করে এবং তারি উত্তরাধিকারীদের নেতৃত্বে এই রাজনৈতিক বাহিনী গঠন করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, দেরাদুনে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত এই বিশেষ প্রতিবিপ্লবী সংগঠন জেনারেল ওসমানী পরিচালিত মুক্তিবাহিনী এমন কি তাজুদ্দিনের নিয়ন্ত্রণেও ছিল না। জনৈক ভারতীয় সেনাবাহিনীর জেনারেল ওবানের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় এর সাংগঠনিক কাঠামো এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে একথাই নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সংগে এই বাহিনীর মৌলিক বিরোধ ছিল।’

বিপর্যয়কর অর্থনীতির অতি বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জনগণের আবেগ যখন থিতিয়ে আসে, যখন গণ অসন্তোষ ধূমায়িত হয়ে উঠে তখন মুজিব কেন্দ্রিক পৌত্তলিক রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য সেই কায়েমী স্বার্থবাদী অশুভ চক্র মুজিববাদী ধূয়া তুলে জনগণের আবেগকে নতুন করে উদ্দীপ্ত করার উদ্যোগ নেয়। অন্যদিকে মোহভঙ্গ আশাহত জনগণের রুদ্ররোষ থেকে নিজেদের এবং পুতুল রাজা শেখ মুজিবকে সুরক্ষার জন্য গড়ে তোলা হয় নতুন নতুন বাহিনী।

সেনাবাহিনী গড়ে তোলার আগ্রহ শেখ মুজিবের কখনো ছিল না, তাছাড়া এ ব্যাপারে দিল্লীর নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধে সেনাবাহিনীর সর্বাধিক অবদান থাকার কারণে এবং তাৎক্ষণিক বিদ্রোহ ও অন্যান্য উটকো বিড়ম্বনা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য সেনা বাহিনীর গঠন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হয়েছিল। মুজিবের লক্ষ্য ছিল সেনাবাহিনীকে ঠুঁটো জগন্নাথ করে রেখে পর্যায় ক্রমে একে অপ্রয়োজনীয় করে তোলা। এ কারণে দিল্লীর পরামর্শে সেনাবাহিনীর একটি সমান্তরাল বাহিনী গড়ে তোলা হল দেরাদুনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দলীয় কর্মীদের নিয়ে। এক বিদেশী সাংবাদিক লিখেছেন- ‘ভারতীয় জনৈক সমরনায়কের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে সৃষ্টি হয়েছিল কুখ্যাত নাৎসী বাহিনীর অনুকরণে রক্ষীবাহিনী। আসলে রুশ ভারত চক্রের হাতেই এই রক্ষী বাহিনীর মূল পরিচালনার দায়িত্ব ছিল। কিন্তু বাইরে বলা হয় শেখ মুজিবের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এই রক্ষীবাহিনী পরিচালিত।

সর্বোপরি স্বাধীনতার পর থেকেই মুজিব সেনাবাহিনীকে আঘাতের পর আঘাত করে আসছিলেন। শুরু থেকেই ভারতে ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তি বাহিনীর অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত রক্ষীবাহিনী বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াল। রক্ষীবাহিনী একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের প্রহরী, গোয়েন্দা পুলিশ ও বিকল্প সেনাবাহিনী ছিল। আয়ারল্যান্ডের ব্লাক এন্ড টেন্স ও জার্মানীর ব্রাউন শার্টের সঙ্গে এর তুলনা করা যায়। ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত রক্ষীবাহিনীতে ভারতীয় উপদেষ্টা ছিল। এরপরেও রক্ষীবাহনীর অফিসাররা ট্রেনিং-এর জন্য ভারতের দেরাদুনে যেত। রক্ষী বাহিনীর সংখ্যা ২০ হাজার দাঁড়িয়েছিল। লক্ষ্য ছিল আরো বেশী।

রক্ষী বাহিনীর সংখ্যার জন্য নয়, যে ভাবে সরকার তাদের প্রতি অনুগ্রহ দেখাত তাতেই সেনাবাহিনী ক্ষুব্ধ হয়েছিল। প্রচুর টাকা খরচ করা হত রক্ষীবাহিনীর ব্যারাক তৈরী করার জন্য। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের বেশীর ভাগই পেত রক্ষীবাহিনী। আর সেনাবাহিনীকে থাকতে হত সেকেলে অস্ত্রপাতি নিয়ে।’

১৯৭৩ সালের ২৭ জুলাই প্রেসিডেন্টকে দেয়া হয় নতুন ক্ষমতা। এই ক্ষমতায় জাতীয় রক্ষী বাহিনীর ডেপুটি লিডার এবং তার উপরস্থ সকল অফিসারকে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ছাড়া অপরাধ করেছে সন্দেহে যে কোন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের অধিকার দেয়া হয়। এর ফলে রক্ষী বাহিনীর দাপট সীমাহীন হয়ে ওঠে, রক্ষী বাহিনী কর্তৃক গণ নিপীড়নের মাত্রা উত্তরোত্তর বেড়ে চলে। এ সম্পর্কে কোলকাতার ফ্রন্টিয়ার পত্রিকা (ভলিউম বি নং-২) লিখেছিল- ‘বাংলাদেশের রাজনীতি এতটা একদলীয় হয়ে গেছে যে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্টের অভিযানের অস্ত্র হচ্ছে তার গুপ্ত পুলিশ ও আধা সামরিক মিলিশিয়া রক্ষীবাহিনী। গ্রাম বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এরা ত্রাসের রাজত্ব চালাচ্ছে। ময়মনসিংহ জেলার একটি থানাতেই (নান্দাইল) শত শত তরুণ চাষী ও ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছে। এই এলাকার গরীব চাষীদের মধ্যে সিরাজ সিকদারের বিশেষ প্রভাব ছিল এবং গত তিন বছরের শেষেও তারা কার্যত এ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে।

প্রতক্ষ্যদর্শীর হিসেব মতে গত জানুয়ারীতে এক ময়মনসিংহ জেলাতে অন্তত এক হাজার পাঁচশ’ কিশোরকে হত্যা করা হয়। এরা অনেকেই সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পাটির সদস্য ছিল। অন্যদের মার্কসবাদী ও লেলিনবাদী দলের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। এমন কি অনেক বাঙালী যুবক যারা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিল না তারাও সন্ত্রাস অভিযানে প্রাণ হারিয়েছে। রক্ষীবাহিনী কি করে সিরাজ সিকদার নামাঙ্কিত পোষ্টার পেরেক দিয়ে এটে লাশ সদর রাস্তায় ফেলে দিয়েছে তার বর্ণনা তাদের আত্মীয় স্বজনদের মুখে শোনা যায়। নিষ্ঠুরতার অভাব নেই। যারা সৌভাগ্যবশত রক্ষী বাহিনীর ক্যাম্প থেকে ছাড়া পেয়েছে তাদের মুখে মধ্য যুগীয় অত্যাচার পদ্ধতি অনুসৃত হতে শোনা যায়। অত্যাচারের সাধারণ হাতিয়ার লৌহদন্ড, সূচ, গরম পানি ও অন্যান্য গার্হস্থ সামগ্রী। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দল সম্পর্কে তথ্য উদঘাটনে এগুলো যথেষ্ট কার্যকরী। তাছাড়া এসব হাতিয়ার প্রয়োগের ফলে শরীরের যে ক্ষতি সাধিত হয় তার জের চলে সারা জীবন।’

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে আইন শৃংখলার অবনতি হয়েছিল চরম। সরকারী হিসেব অনুযায়ী ১৯৭২ সালের জানুয়ারী থেকে ৭৩ সালের জুন পর্যন্ত গুপ্তহত্যা হয়েছে ২০৩৫টি, অপহরণ হয়েছে ৩৩৭টি, ধর্ষণ হয়েছে ১৯০টি, ডাকাতি হয়েছে ৪৯০৭টি এবং আততায়ীর হাতে খুন হয়েছে ৪৯২৫ ব্যক্তি। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও শেখ মুজিব সৃষ্ট অপশক্তি, অসূরশক্তি ও অবৈধ অস্ত্র নির্বিচার ব্যবহার হয়েছিল।

এছাড়াও আওয়ামী শাসনামলের সাড়ে তিন বছরে রক্ষীবাহিনী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, লালবাহিনী, নীলবাহিনী ও অন্যান্য আওয়ামী গুন্ডাদের হাতে ২৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। রাজনৈতিক হত্যা হয়েছিল ১৯ হাজার। রক্ষীবাহিনীর নির্যাতনে পঙ্গু হয়েছিল ২৬শ’। গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিল ২ লক্ষ লোক। হাইজ্যাক ও ছিনতাই হয়েছিল ২২ হাজারটি। চুরি ডাকাতি, রাহাজানি ও ছিনতাই হয়েছিল ৬০ হাজারটি। অস্ত্র লুট হয়েছিল ১৫ হাজার। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল ১৫ হাজার। অবৈধ দখল হয়েছিল শিল্পকারখানা ঘরবাড়িসহ ১৩ হাজার। জমি দখলের পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার একর। এই ছিল আওয়ামী দুঃশাসনের কালো অধ্যায়। হত্যা লুট ধর্ষণ ছিনতাই অবৈধ দখল এবং গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল ৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত।  

(বইটির pdf version download করুন এখানে)


Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh