Home EBooks দুই পলাশী দুই মীরজাফর অধ্যায় ১৯: দুঃশাসনের যবনিকাপাত

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ১৯: দুঃশাসনের যবনিকাপাত Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:29

দুঃশাসনের যবনিকাপাত
শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে সোনার বাংলা স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। সেই স্বপ্নের ঘোর কেটেছিল বাংলাদেশের সূচনা পর্বে। হ্যামিলনের বাঁশির সুরে যেমন সম্মোহন ছিল অনুরূপ সম্মোহন ছিল মুজিবের ভাষণে। মুজিব আঞ্চলিকতার আবেশ ছড়িয়ে শোষণ বঞ্চনার কল্প কাহিনী দিয়ে সহজ সরল বাংলার মানুষকে যখন ক্ষুধা দারিদ্র আর সন্ত্রাসের দ্বার প্রান্তে টেনে আনলেন তখনই তাদের সম্মোহন কেটে যায়। কাটলেও নিরূপায় ছিল সকলে। পিছু হটবার সব পথ রুদ্ধ থাকার কারণে শয়তানকে আলিঙ্গন করে জপ করতে হয়েছিল এক নেতা একদেশ বঙ্গ বন্ধু বাংলা দেশ। শেখ মুজিব বাংলার লুণ্ঠিত শোষিত ক্ষুধার্ত মানুষকে দেবতার মত বলেছিলেন, তিন বছর কিছুই দিবার পারুমনা’। কোন বাদ প্রতিবাদ না করে তিন বছর অপেক্ষা করেছিল মানুষ। মুজিব তিন বছর বাংলার মানুষকে দিয়েছিলেন সন্ত্রাস বিশৃংখলা মৃত্যু ও ক্ষুধা। ১০ লক্ষ ক্ষুধিত মানুষ আলিঙ্গন করেছিল মৃত্যুকে। তবুও বাংলার জনগণ তলা বিহীন ঝুড়িকে আঁকড়ে ধরে উত্তম সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু তিন বছর পরে শেখ মুজিব তার সাড়ে সাত কোটি অনুরাগী ভক্তকে কি দিলেন? মুজিব তার জনগণকে সেটাই  দিলেন যা একজন আত্মসর্বস্ব নির্মম একনায়ক তার জনগণকে দিয়ে থাকে।

১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারী পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের শেষ চিহ্নটুকু লাথি মেরে গুড়িয়ে দিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মাত্র ১৩ মিনিটের মধ্যে শাসনতন্ত্র বদলে দিলেন। বাকশাল গঠন করলেন। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করলেন। সামরিক বেসামরিক সকলকে বাকশালে যোগদানে বাধ্য করলেন। বাকশালে যোগদান ছাড়া নির্বাচিত এমপিদের সদস্য পদ বাতিল করলেন। সুপ্রিম কোর্টের মৌলিক মানবাধিকার প্রয়োগের ক্ষমতা খর্ব করলেন। স্বাধীন চেতা রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের শায়েস্তা করার জন্য ৬১টি জেলায় গভর্ণর নিয়োগ করলেন বরকন্দাজী করার জন্য। মুজিব দেবতার প্রশংসা করার জন্য বাঁচিয়ে রাখা হল মাত্র চারটি পত্রিকা। ভারতীয় মেজর জেনারেল সুজান সিং উবান পরিচালিত রক্ষী বাহিনীকে শক্তিশালী করা হল জনগণকে ঠেকানোর জন্য। সেনাবাহিনীকে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করা হল। অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সামাজিক ভাবে বিধ্বস্ত জাতিকে গোলামীর জিঞ্চিরে আবদ্ধ করে শেখ মুজিব মস্কো ও দিল্লীর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য স্বাধীন বাংলার মহান অধিপতির মেকি লেবাস পড়ে ক্ষমতার রাজ প্রাসাদে প্রবেশ করলেন কিন্তু বেরিয়ে আসার পথ খুলে রাখলেন না।


ফারুক তার বন্ধু রশিদকে নিয়ে অভ্যুত্থানের যে পরিকল্পনা করেন তাতে সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল সেপ্টেম্বরের কোন এক সময়ে। কিন্তু অভ্যুত্থান সংঘটিত হল ১ মাস আগে। কিন্তু কেন? এই কেনর উত্তর খুঁজতে হলে ১৫ আগস্টের পূর্বাপর পরিস্থিতির দিকে চোখ ফেরাতে হবে। আমরা সমকালীন সংবাদের দিকে চোখ রাখলে দেখতে পাব বাঙলাদেশ সীমান্তে দুটো ভারতীয় হেলিকপ্টর বিদ্ধস্ত হওয়ার এবং এতে কয়েকজন ভারতীয় জেনারেল নিহত হওয়ার খবর, কেন কি উদ্দেশ্যে জেনারেলরা বাংলাদেশে আসতে চেয়েছিলেন?

ইন্দিরা গান্ধী ২৫ বছর চুক্তির শৃংখলে বাংলাদেশকে আবদ্ধ করেও স্বস্থি পাচ্ছিলেন না। গান্ধী থেকে শুরু করে নেহেরু প্যাটেল সবারই প্রত্যাশা ছিল পাকিস্তান একদা হিন্দুস্থানের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তান অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভায়াবল না হওয়ার কারণে সেখানকার জনগণ ভারতে অন্তর্ভুক্তির জন্য দাবী তুলবে। প্রায় দুটো যুগ অতিবাহিত হলেও তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি কখনো। ভায়াবল নয় এমন ভূখণ্ডকে পাকিস্তান ভায়াবল করে তুলেছিল। এ সত্ত্বেও ভারত পূর্ব পাকিস্তানে পঞ্চমবাহিনীকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ধারাবাহিক শোষণ লুণ্ঠনের মধ্যে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করে। স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশ দিল্লীর প্রত্যাশার কাছাকাছি এসে পৌঁছে। একারণে ১৫ আগস্ট (’৭৫) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মহাসমারোহে আয়োজিত মুজিবের অভিষেক অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে জেনারেলদের পাঠিয়েছিলেন। একটি নতুন পরিকল্পনায় শেখ মুজিবের সম্মতি আদায়ের জন্য। এ পরিকল্পনা অনুসারে বাংলাদেশ ভারতের মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং বাংলাদেশ হবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রদেশ। মুজিব হবেন ভারতের ভাইস প্রেসিডেন্ট।

কিন্তু মহান আল্লাহ ভারতের দীর্ঘ দিনের চূড়ান্ত পরিকল্পনা গুড়িয়ে দিলেন মুজিবের মর্মান্তিক পরিণতি রচনা করে। কর্নেল ফারুক কতিপয় জানবাজ তরুণদের নিয়ে রুখে দাঁড়ালেন। ভারতের পুরোপরিকল্পনা ভেস্তে গেল। ১৩৩৮ দিন পর পাল্টে গেল ইতিহাসের গতি। বাংলার সাদ্দাদ শেখ মুজিব নিহত হলেন। তিন জন ভারতীয় জেনারেল লাশ হয়ে ফিরে গেলেন তাদের দেশে। হিন্দুস্থানের সম্ভাব্য গোলামী থেকে নাজাত পেল বাংলাদেশ। ১৫ আগস্ট অভ্য্ত্থুানের দিন এক নিবিড় প্রশান্তি এবং আল্লাহর রহমত ও বরকতে আচ্ছন্ন হয়েছিল দেশ। মুহূর্তেই আইন শৃংখলা পরিস্থিতি বাজারের অগ্নি মূল্য সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেল। তিন বছর আট মাস ধরে জ্বলন্ত জাহান্নামের আগুনের লেলিহান শিখা নিভে গেল নিমেশে। সেদিন অগ্নি গহ্বরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা জাতি সত্যিকার আযাদীর নিঃশ্বাস ফেলেছিল। ধীকৃত মুজিবের পতনকে ফেরাউনের পতন বলে তখনকার সংসদের স্পীকার আব্দুল মালেক উকিল মন্তব্য করেন লণ্ডনে।

‘ইন্দিরা রচিত নাটকের শেষ দৃশ্যের মহড়া শরু হল দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের লাশের উপর দিয়ে। শুরু হল বাকশাল গঠনের প্রক্রিয়া। এক নেতা এক দেশ গঠনের প্রস্তুতি চলল সমগ্র জাতিকে ভারতীয় শৃংখলে আবদ্ধ করার জন্য। সেদিন ভারতের বরকন্দাজ ও ঠ্যাঙারে বাহিনীর সম্মুখে সমগ্র জাতি জিম্মি হয়ে পড়েছিল। তখন কোন নেতা ছিল না যে সংকট উত্তরণের জন্য শক্ত হাতে হাল ধরতে পারে; কোন দল ছিল না, যে দল মানুষের সংকটে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে জনগণকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিবে। সমস্ত নেতা, সমস্ত বুদ্ধিজীবী নতজানু হয়ে আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য লাইন ধরে হাজির হয়েছিল মুজিবের দরবারে। আর যাদের মধ্যে ইমানের কিছু মাত্র অবশিষ্ট ছিল তারা আত্মগোপন করেছিল। শাদ্দাদী জুলুম নিপীড়ন থেকে আত্মরক্ষার জন্য জাতি তখন দিশাহারা, নির্বাক কণ্ঠ অবরুদ্ধ। সর্বত্র দুঃশাসনের বিভীষিকা। বোবা কান্না ও অশ্রু বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ পরিণতির অপেক্ষায় অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে ছিল দেশের মানুষ। দিল্লীর দোসর ও দালালদের ঘরে ঘরে চলছিল উল্লাস। অদৃশ্যে অবস্থান করে সবকিছুর নিয়ন্ত্রা মহান আল্লাহ কোটি মানুষের নীরব কান্না সেদিন শুনেছিলেন, দিল্লীর প্রযোজনায় নাটকের শেষ দৃশ্য আর মঞ্চস্থ হল না। পনেরই আগস্ট শেষ রাতে বিদ্যুতের চমক দেখল সমগ্র পৃথিবী। শাদ্দাদের স্বপ্ন ভেঙে খান খান হল। একটা  বেদনাদায়ক কলঙ্কিত ইতিহাসের পরিসমাপ্তি হল। নদীর গতি প্রবাহিত হল উল্টো দিকে। শ্বাসরুদ্ধ জনগণ কেবলি নিঃশ্বাস নিতে শুরু করেছে কিন্তু তখনো মুক্ত মানুষগুলোর কণ্ঠ রোধের ষড়যন্ত্রগুলো থেমে থাকেনি। ১৩৩৮ বিনিদ্র রজনীর ধকলে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত জাতি গা ঝাড়া দেয়ার আগেই প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের ষড়যন্ত্র শুরু হল বঙ্গ ভবন থেকে সেনা ছাওনি পর্যন্ত।

মসনদের মোহ ছিলনা কর্নেল ফারুকের। একটি সফল বিপ্লবের কৃতিত্ব নেয়ার জন্য আত্মপ্রচারের ক্ষীণতম প্রয়াসও তার মধ্যে ছিল না। একজন মোমিন  হিসেবে মহান আল্লাহরই সন্তুষ্টির লক্ষ্যে তিনি বিপ্লবের ঝুকি নিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী  হিসেবে জাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। কিন্তু চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের দেশে সেটা সম্ভব হল না। সময়ের অভিযানে তাকে সরে যেতে হল দৃশ্যপটের বাইরে।

আগস্ট বিপ্লবের পটভূমি
শেখ মুজিবের বিশ্বাস ঘাতকতা সচেতন বিবেকের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। সকলেই বুঝে ফেলেছিল যে শেখ মুজিব সমগ্র জাতিকে স্বর্গীয় সুখের স্বপ্ন দেখিয়ে জাহান্নামের দ্বার প্রান্তে টেনে এনেছে দিল্লীকে সন্তুষ্ট করার জন্য। ৯০ শতাংশ মানুষ নিরূপায় হয়ে নিয়তির উপর নির্ভর করে সন্ত্রাস বিভিষীকা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যকে আলিঙ্গন করে বোবার মত নীরবে অশ্রু বিসর্জন করছিল। বাকী ১০ শতাংশ মানুষ আওয়ামী নৃশংসতাকে সহজ ভাবে গ্রহন করে মুজিববাদী পাশবিকতার সাথে একাকার হয়েছিল সুবিধাবাদী স্বার্থপরের মত। তবে শেখ মুজিবকে উৎখাতের ভাবনাও ছিল অনেকের মধ্যে।

সে সময় শেখ মুজিবকে উৎখাতের অন্তত ৫টি সম্ভাব্য চক্রান্তের তদন্ত শুরু করেছিল তৎকালীন গোয়েন্দা বিভাগ। বাকশালী অক্টোপাশ থেকে দেশকে বাঁচানোর জন্য সচেতন কিছু কিছু গ্রুপ নেপথ্যে তৎপর হয়ে উঠেছিল, যেমন মাওবাদী সর্বহারা পাটি ও অন্যান্য বাম গ্রুপ, জাসদ এমন কি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে কিছু রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি। এদের অনেকেই মার্কিন দুতাবাসের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু দূতাবাসের অনীহা অনেককে নিরাশ করেছিল। সবচেয়ে বড় কথা ক্যান্টনম্যান্টে শৃংখলার মধ্যে আবদ্ধ থাকা কতিপয় মেজরের অভ্যুত্থান প্রয়াস কারো রাডারে ধরা পড়েনি।

একাত্তরের বাংলাদেশে শেখ মুজিবের দুঃশাসন এবং সমকালীন ধারাবাহিক শোষণ লূণ্ঠন জুলুম ও অত্যাচারের প্রেক্ষাপটে একজন মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল ফারুকের মধ্যে তার নিপীড়িত নিষ্পেষিত ও ভাগ্যাহত জাতির জন্য এমন এক দারুণ ভাবান্তর হয়েছিল যে, পরিণতির কথা চিন্তা না করে তিনি একা হলেও শেখ মুজিবকে উৎখাতের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। তার ভাষায় ‘তখনকার বিরাজমান পরিস্থিতি এবং অবলুপ্ত সকল পন্থার প্রেক্ষিতে আমার এবং সকলের সামনে এক কথায় সমগ্র জাতির সামনে শুধুমাত্র একটি পথই খোলা ছিল, আর তা হচ্ছে- শেখ মুজিব যিনি আমাদের জনগণকে এবং জনগণের সকল কোরবাণী আর আশা আকাঙ্খা এবং স্বপ্নকে ভয়ঙ্করভাবে প্রতারণা করেছিলেন, সেই কথিত দেবতাকে ধ্বংস করা, অথবা ধ্বংস সাধনের চেষ্টা করা।’

এন্থনি ম্যাসকারেনহাস এ সম্পর্কে লিখেছেন-‘ইতিমধ্যে সেনাবাহিনীর অফিসারগণ নানা রকমের নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছেন। দেখা গেলো, তাঁরা বহু কষ্টে যে শত শত চোরাচালানী, খুনী এবং ডাকাতদের আটক করছেন, ঢাকা থেকে একটি টেলিফোন এলেই তারা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। এ ছিল এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। ফারুক আমাকে এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, যখনই আমরা কোন দুষ্কৃতকারীকে আটক করি, তখনই দেখা যায়, হয় আওয়ামী লীগের নয়তো আওয়ামী লীগের কোন ক্ষমতাসীন সমর্থকের লোক সে। ফলে উপরওয়ালাদের ইচ্ছে অনুযায়ী এদের ছেড়ে দিতে হতো। বিনিময়ে ঝামেলা পোহাতে হতো আমাদের।’

‘এটা ছিল এক ধরনের প্রহসন’-ফারুক বলেছিলেন। ঠিক এই সময়ে সেনাবাহিনীকে বলা হলো নক্সালদের উৎখাত করার জন্যে। এই নির্দেশের পেছনে যার হাত ছিল তিনি শেখ মুজিব। মুজিব আসলে চেয়েছিলেন নক্সালদের নামে সিরাজ সিকদার এবং কর্ণেল জিয়াউদ্দিন প্রমুখদের খতম করতে। ফারুক এ জাতীয় নির্দেশ পালনে উৎসাহী হলেন না।
ফারুক বলেছিলেন- ‘আমি মার্ক্সিস্টদের ব্যাপারে উৎসাহী ছিলাম না। আদর্শগতভাবে তারা হয়তো ভুল পথে ছিল- কিন্তু তারা দেশের খুব বেশি ক্ষতি করেনি।’

একবার টঙ্গীতে মেজর নাসির তিন ব্যক্তিকে আটক করেন। এরা তিনটি খুনের সঙ্গে জড়িত ছিল। নববিবাহিত এক দম্পতি তাদের গাড়িতে টঙ্গী যাওয়ার পথে মোজ্জাম্মেল নামে দুর্ধর্ষ আওয়ামী লীগার ও তার সহকর্মীরা তাদের উপর হামলা চালায়। গাড়ির ড্রাইভার এবং আরোহীকে মেরে তারা মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। তিনদিন পর রক্তাক্ত অবস্থায় মেয়েটির মৃতদেহ পাওয়া যায়। মেজরের হাতে ধৃত এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত মোজাম্মেল মেজর নাসিরকে তিন লক্ষ টাকার বিনিময়ে মুক্তি দেওয়ার অনুরোধ জানায়। কিন্তু নাসের তাদের কোর্টে চালান করেন। কিছু দিন পর তিনটি নৃশংস খুনের আসামী মোজাম্মেলকে জনসম্মুখে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।

এই ঘটনাটি সেনাবাহিনীতে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। ফারুক পরে জানান যে, আমরা তখন নিশ্চিত যে দেশ ধ্বংসের দিকে এগুচ্ছে এবং সে সময় আমি এতো উত্তেজিত হয়ে পড়ি যে তক্ষুণি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি শেখ মুজিবকে না মারা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। আমি তখন ক্যাপ্টেন শরিফুল হক (ডালিম)-কে বলেছিলাম, ‘শরিফুল চলো, মুজিবকে খতম করে দেই।’ তিনি বলেছিলেন, ‘ওই ঘটনার পর প্রমোশন, ক্যারিয়ার এসব ব্যাপারে আমার আর কোন মোহ ছিল না। শেখ মুজিবের প্রতি আমার মন বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলো। আমার তখন একটাই চিন্তা- কিভাবে এই সরকারকে উৎখাত করা যায়।’

এ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস লিখেছেন- '১৯৭৫ সালের ফ্রেয়ারীর মধ্যেই ফারুকের চূড়ান্ত পরিকল্পনা স্থির হল এবং একটি ক্যুর জন্য তিনি তৈরী হলেন। তখন মেজর রশিদ দেশের বাইরে ছিলেন।’
রশীদ যখন দেশে এলেন তখন ফারুক তাকে বললেন- ‘তোমাকে আমার প্রয়োজন। তুমি জাননা ঢাকায় কি ঘটেছে?’ দুই বন্ধু তখন শেখ মুজিবকে সরিয়ে দেয়ার দুঃসাহসিক পরিকল্পনার মধ্যে ডুবে গেলেন।’

অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য শেখ মুজিবের বিকল্প রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অনুসন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ফারুক রশিদ। ফারুক অবশেষে অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে জেনারেল জিয়ার সাথে যোগাযোগ করলে জিয়া পরিষ্কার নেতিবাচক জবাব দিয়েছিলেন। ফারুক আশা করেছিলেন দেশের কোটি কোটি নিরন্ন নিষ্পেষিত হতদরিদ্র নৈরাশ্যে ভেঙে পড়া মানুষের অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার জন্য দেশের গর্বিত সৈনিকেরা সাগ্রহে এগিয়ে আসবে। কিন্তু বাস্তবে ফারুকের এ প্রত্যাশা ম্লান হতে শুরু করল। ম্যাসকারেনহাস লিখেছেন- ‘মেজর হাফিজ এবং কর্ণেল আমিন আহমদ চৌধুরীর মত আরো অনেকে শেষ পর্যন্ত রণে ভঙ্গ দিলেন। কার্যত কেউ এগিয়ে এলেন না।’

ফারুক বলেন- ‘দেশের দুরাবস্থার দিকে তাকিয়ে আমি মরিয়া হয়ে উঠলাম। নিজের জীবন নিজেদের ভবিষ্যতের ভাবনা আমার মন থেকে একেবারে মুছে গেল। নিজের প্রতি কোন মায়া অবশিষ্ট রইলো না। শেষ পর্যন্ত একা হলেও মুজিবকে উৎখাতের কাজ আমাকেই করতে হবে। সবাই সরে গেলেও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আকাঙ্খা আমার কমলো না, বরং আরো দৃঢ় আরো মজবুত হল। কিন্তু তাৎক্ষণিক কৌশল  হিসেবে নীরবতা অবলম্বন করলাম। সামাজিক অনুষ্ঠানে আর পাঁচ জনের মত যাতায়াত শুরু করলাম। যাদের সাথে আমার এ সংক্রান্ত আলাপ হয়েছিল তাদেরকে প্রসঙ্গটি ভুলে যেতে বললাম।

এসবের কোন একটি অভ্যুত্থান অকার্যকর এবং বিফল হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ফারুক ছিলেন নির্বিকার। সীমিত শক্তি নিয়ে পাহাড়ের সাথে টক্কর দেবার দুঃসাহসিক অভিযানের নীলনক্সা যথাসম্ভব নিখুঁত করে তোলার চেষ্টা করলেন। এ প্রসঙ্গে ম্যাসকারেনহাস লিখেছেন- ‘ফারুকের ডায়েরীতে উল্লেখ ছিল যে ১৪ আগস্ট রাতে বেঙ্গল ল্যানসার এবং সেকেণ্ড ফিল্ড আর্টিলারীর পরবর্তী ট্রেনিং অনুষ্ঠিত হবে। দিনটি শুক্রবার। শুক্রবার দিনটি ফারুকের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তার জন্ম শুক্রবারে। তার জীবনে অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে এই দিনে। তিনি বিয়েও করেছেন শুক্রবারে, ধর্মীয় কারণেও শুক্রবার তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি মনে করেন শুক্রবার এবারও তার জন্য শুভ হবে কারণ ইসলাম ও দেশের স্বার্থে তিনি কাজ করে চলেছেন।’

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট শুক্রবার ভোর চারটা ৪০ মিনিট। সমগ্র ঢাকা নগরী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ফারুকের বাহিনী বাংলার ভাগ্যাহত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে আত্মনিবেদনের জন্য প্রস্তুত। মাত্র ২৮টি ট্যাঙ্ক ১২টি ট্রাক ৩টি জিপ ১০৫টি মি মি হাউইটজার ৪শ’ সৈন্য। ফারুক ঢাকার ম্যাপ বিছিয়ে অধিনায়কদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করে দিলেন। ঘণ্টার কাঁটা ৫ অতিক্রম করল। রাত্রির গাঢ় অন্ধকার ক্রমশ ফিকে হতে শুরু করেছে। সুবে সাদেক সমাগত। মসজিদের মিনার থেকে আযানের ধ্বনি সমস্বরে প্রতিধ্বনি হয়ে ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র ঢাকায়। যেন আযানই ছিল কুদরতের নির্দেশ। ট্যাঙ্কগুলো নড়ে উঠল এগিয়ে চলল অকুতোভয় সৈনিকরা।

অভিযানের মূল নায়ক ফারুকের নির্দেশ মত যে যার দায়িত্ব সম্পন্ন করার জন্য নির্ধারিত টার্গেটে পৌঁছে গেল সূর্যোদয়ের আগে। অপারেশন সফল হল। শেখ কামাল জামাল প্রতিরোধ করার কারণে মুজিব সপরিবারে নিহত হলেন। সপরিবারে নিহত হলেন সেরনিয়াবত এবং ফজলুল হক মনি। ৫ টার পর অভিযান শেষ হল। সকাল হওয়ার সাথে সাথে মুজিবের নিহত হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র দেশে। তেরশত আটত্রিশ রজনীর নিকশ অন্ধকারের বুক চিড়ে নতুন একটি সুর্য্যাদয় হয় সে সূর্য্য মুক্তির ১৫ই আগস্টের প্রভাত সমীরাণে নিয়ে এল বসন্তের আমেজ। মুজিব হত্যার সংবাদ সমগ্র দেশে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। দুর্নীতি ও দুষ্কর্মের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টা ধসে পড়ায় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের চিন্তা শক্তি রহিত হল। কিছু বুঝে উঠার আগেই তারা গণ আক্রোষ থেকে বাঁচার জন্য আত্মগোপন করল। রক্ষী বাহিনী হারিয়ে ফেলল মনোবল। অভিযানের প্রথম পর্যায়ে তাদের নিউট্রাল করা সম্ভব হল। উচ্চ পর্যায়ে কিছু কর্মকর্তা ছাড়া সামগ্রিকভাবে সমগ্র সেনাবাহিনী উল্লসিত হল। কোন প্রতিরোধ হলো না কোথাও। মুজিবের জন্য একটি প্রাণীও অশ্রু বিসর্জন করেনি সেদিন। দুপুরে মুজিবের শুন্য স্থান পূরণ করলেন খন্দকার মোস্তাক। সেনা প্রধান বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনী প্রধানরা মোস্তাকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেন। ১৩৩৮ রজনী পর নদীর স্রোত উল্টো দিকে প্রবাহিত হল। বাংলার অবলুপ্ত ও লুণ্ঠিত স্বাধীনতার পুনরুত্থান হল সেদিনই। দেশের স্থবির রাজনীতি স্পন্দিত হল। বিধ্বস্ত জাতি সত্ত্বার আত্মবিশ্বাস ও দেশপ্রেম পুনর্জ্জীবিত হল।

বাকশাল সরকারের ১৮জন মন্ত্রীর ১০জন এবং প্রতিমন্ত্রীর ৯জনের ৮জনই বিপ্লবোত্তর মোশতাক সরকারে যোগ দিয়ে আগস্ট বিপ্লবের সফল অভ্যুত্থানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করেন। অভ্যুত্থানের প্রথম দিনেই পাকিস্তান বাংলাদেশকে সমর্থন দেয়। স্বাধীনতার পর ইসলাম ও ইসলামের সত্যিকার অনুসারীদের প্রতি অব্যাহত নির্যাতনের কারণে সউদী আরব স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিলেও ১৫ আগস্ট বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পরের দিন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। চীনও আগস্ট বিপ্লবের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করল বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়ে। ২৫ বছরের চুক্তির সুবাদে বাংলাদেশে সেনা অভিযানের বৈধতা থাকা সত্বেও ভারত সে পথে পা বাড়াল না। এর নেপথ্য কারণ ছিল, সে সময় পিকিং বেতার এবং ভয়েস অব আমেরিকা আগস্টের অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। এই সাথে এই হুশিয়ারী উচ্চারণ করে, বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতিতে কোন বিদেশী হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করবে না এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য তারা প্রয়োজনীয় সব রকম পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব করবে না। একদিকে ভারতের সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করার জন্য চীন তার সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করে, অন্যদিকে পাকিস্তান ও তার সেনাবাহিনীকে সতর্কাবস্থার নির্দেশ দেয়। এসব কারণে দিল্লীকে তার সহযোগী শেখ মুজিবের পতনকে মেনে নিতে হয় কোন রকম প্রতিক্রিয়া না ব্যক্ত করে। অভ্যুত্থানের ১২ দিনের মাথায় জাপান ইরান ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ ৩৬টি রাষ্ট্র মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দেয়।

১৯৭৫ সালের ২২ আগস্ট খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতির ৯নং আদেশ বাতিল করে এক অধ্যাদেশ জারি করে। দুর্নীতিবাজ রেডক্রস চেয়ারম্যান গাজী গোলাম মোস্তফাকে তার দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে বিচারপতি বি এ সিদ্দিকীকে তার পদে নিযুক্ত করা হয়। একই দিনে দৈনিক ইত্তেফাককে তার মালিকদের নিকট হস্তান্তর করা হয়। সমস্ত পত্র পত্রিকা থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। ২৪ আগস্ট জেনালের ওসমানীকে রাষ্ট্রপতির নয়া সামরিক উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয় একই দিনে ভাসানী ন্যাপের মশিউর রহমান এবং জাতীয় লীগের অলি আহাদকে মুক্তি দেয়া হল। মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানকে জয়েন্ট চীফ অব ডিফেন্স এবং মেজর জেনারেল সফিউল্লাহর স্থলে জেনালের জিয়াউর রহমানকে আর্মী চীফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। বিমান বাহিনীর চীফ অব স্টাফ  হিসেবে নিযুক্ত হন এয়্যার ভাইস মার্সাল এম জি তোয়াব।

বাংলাদেশকে ৬১ জেলায় ভাগ করে প্রত্যেক জেলায় যে গভর্ণর নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন তার ৬১টি বরকন্দাজকে, বিপ্লবী সরকার সেটাকে বাতিল করে দেয়। বিপ্লবী সরকার আগের মত ১৯টি জেলা পুনঃ প্রতিষ্ঠা করে জেলা প্রশাসকের হাতে সংশ্লিষ্ট জেলার দায়িত্বভার অর্পণ করে। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে সাবেক উপরাষ্ট্রপতিসহ মুজিব সরকারের ৬ জন মন্ত্রী ১০ জন সংসদ সদস্য ৪ জন আমলা এবং ১২জন ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়। সামরিক বাহিনীর ৩৬ জন দুর্নীতিপরায়ণ অফিসারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। মুজিব আমলে আটক দলীয় নেতা ও কর্মীদের মুক্তিদানের জন্য রাজনৈতিক দল সমূহকে তালিকা পেশ করার আহ্বান জানান হয়।

১৫ আগস্টের বিপ্লবী তৎপরতার অধিনায়ক কর্নেল ফারুকের স্টেটমেন্ট
শয়তানের প্রতারণা ও ছলনা থেকে মহান আল্লাহর আশ্রয় ভিক্ষা চেয়ে আমার সকল প্রচেষ্টা, কর্মকাণ্ড ও প্রয়াসে মহান আল্লাহর নিকট সঠিক দিক-নির্দেশনা দানের বিনীত আবেদন রেখে এবং মানবিক দুর্বলতা ও জ্ঞানের অভাবপ্রসূত আমার সকল অনিচ্ছাকৃত আর অপরাপর ভ্রান্তি ও মিথ্যা অহংকারের জন্য মহান আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে সকল সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক পরম করুণাময় ও সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমাশীল দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছিঃ

কেন ১৫ আগস্ট ১৯৭৫?
শেখ মুজিব এবং তার সহকর্মীবৃন্দ আমাদের মুক্তি ও আত্মমর্যাদার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমরা অর্থাৎ বাংলাদেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে মরণপণ যুদ্ধ করেছিলাম মুক্তি অর্জন আর আত্মসম্মানবোধ প্রতিষ্ঠা করার জন্য। ইয়াহিয়া খানের পরিবর্তে শেখ মুজিব কিংবা ইন্দিরা গান্ধী অথবা অন্য কোন ক্ষুদে নবাবকে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করিয়ে সমাজের বিরাজমান অভিশাপ বয়ে বেড়ানো কিংবা আরো গভীরতর  সংকটে নিপতিত হওয়ার জন্য তো আমরা মুক্তি-সংগ্রাম করিনি।

কিন্তু শেখ মুজিবের ক্ষমতায় আরোহণের ফলে জাতি  হিসেবে কি পেয়েছিলাম আমরা।  আল্লাহর পরিবর্তে জবরদস্তিমূলকভাবে মুজিবকে বানানো হলো দেবতা আর আমাদের অস্তিত্বের স্পন্দন ইসলামের স্থলে আমরা পেলাম মুজিববাদ। কাঙ্খিত মুক্তি এলো না। গোলামের অবস্থান থেকে আমরা হয়ে পড়লাম নতুন এক শ্রেণীর ক্রীতদাস। আত্মমর্যাদাবোধ আমাদের অর্জন করতে দেয়া হলো না। তার পরিবর্তে করুণা আর উপহাসের পাত্র হয়ে বিশ্বসমাজে আমাদের পরিচিতি হলো ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে। সমগ্র জাতিকে যে ভয়াবহ আর জঘন্য প্রতারণার জালে আবদ্ধ করা হলো, তার সমুচিত জবাব কি ছিল? সেই বিশ্বাস-ঘাতকতার প্রেক্ষিতে স্বাধীনতা পিয়াসী চির সংগ্রামী জনগণের সামনে আত্মমর্যাদা আর সম্মান পুনরুদ্ধারের জন্য আর কোন পথ কি খোলা ছিল? স্বাধীনতা, মুক্তি, আর নতুন একটি জাতির আত্মমর্যাদাবোধের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা আর বেঈমানী যারা করেছে, তাদের কি পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে না?

মুজিব ভক্তরা যেভাবে প্রচার করতো শেখ মুজিব যদি তেমন কোন দেবতাই হতো তাহলে তার মৃত্যু হয় কিভাবে? অথবা মানবগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত কেউ তাকে কিভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে? আর শেখ মুজিব যদি দেবতা না হয়ে রক্ত মাংসের মানুষ হয়, তাহলে তো তাকে মানবতা আর আল্লাহর বিরুদ্ধে কৃত অপরাধের বিচারের সম্মুখীন হওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট প্রেরণ করা হয়েছে মাত্র। কোন মানুষেরই তো এমন কোন ক্ষমতা নেই যার উপর নির্ভর করে অন্য কোন ব্যক্তি অথবা কোন গোষ্ঠী নিজের জীবন কিংবা মৃত্যুর উপরে কোন এখতিয়ার, ক্ষমতা আর নিয়ন্ত্রণ আছে বলে দাবী করতে পারে।
আর পাঁচ জনের মত সাধারণ মানুষ হিসেবে অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করতে আমার কোন দ্বিধা নেই যে, অন্য কোন ব্যক্তির জীবন অথবা মৃত্যুর উপরে আমার কোন নিয়ন্ত্রণ  নেই। তবে অন্যান্য আর সব মানুষের মত আমার সত্তা আর আমার আত্মসম্মানবোধ সংরক্ষণের অধিকার আমারও আছে। স্বাধীনতা আর আত্মমর্যাদাবোধ ব্যতিরেকে মানব জীবন নিরর্থক এবং তা যদি না থাকে তাহলে মানুষ হিসেবে আশরাফুল মাখলুকাত সৃষ্টির সেরা হিসেবে বেঁচে থাকাটাই অসম্ভবের পর্যায়ে উপনীত হয়।

তখনকার বিরাজমান ভয়াবহ পরিস্থিতি আর অবলুপ্ত সকল পন্থার প্রেক্ষিতে আমার এবং যারা আমাকে ১৫ আগস্ট ’৭৫-এ প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন করেছিল আর যারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দোয়া করেছিল, তাদের সকলের সামনে এক কথায় সমগ্র জাতির সামনে শুধুমাত্র একটি পথই খোলা ছিল; আর তা হচ্ছে শেখ মুজিব যিনি আমাদের জনগণকে এবং জনগণের সকল কুরবানী আর আশা-আকাঙ্খা-স্বপ্নকে ভয়ংকরভাবে প্রতাণা করেছিলেন, সেই কথিত দেবতাকে ধ্বংস করা কিংবা কমপক্ষে ধ্বংস সাধনের চেষ্টা করা।

পনের বছর পর আজকে ব্যাপারটি কারো কারো কাছে খুব সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু নরকের অতল থেকে উৎসারিত শোচনীয়ভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন মুজিববাদের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে এমন পরিবর্তনের কথা চিন্তা করতেও সাধারণ মানুষতো দূরের কথা, অতি সাহসী বিপ্লবীরাও আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়তেন। আমদের জন্য বিষয়টি ছিল ভীতিকর এবং ব্যর্থতার আশংকায় ভরপুর- আমাদের বলগাহীন কল্পনাতে কিংবা স্বপ্নেও আমরা ভাবিনি আমরা সফল হতে পারবো। আমরা ধরে নিয়েছিলাম আমরা মরব এবং সে মৃত্যু হবে আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন মুক্তি ও স্বাধীন মানুষের গৌরবময় শাহাদাত। মুজিবী দুঃশাসনের পশুত্বের জীবন মেনে নিয়ে ক্রীতদাসের মত বেঁচে থাকার চেয়ে আমরা আমাদের নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য কোন পরিকল্পনাই করিনি। কারণ, আমরা জানতাম না অথবা চিন্তাও করিনি যে, মৃত্যুর অনিবার্য পরিণতিকে অতিক্রম করে আমরা জীবিত থাকব এবং আমাদের ভবিষ্যৎ বলে কিছু থাকবে। আমাদের সাহায্য করার জন্য, আমাদের পথ দেখানোর জন্য, আমাদের মনে সাহস সঞ্চয়ের জন্য আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলাম যদিও আমরা তখন নিশ্চিত ছিলাম না সর্বশক্তিমান স্রষ্টা আমাদের এই ক্ষুদ্র জাগতিক জীবনের দৈনন্দিন কর্মধারাকে প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন কিনা, কারণ জাতির সেই অসহায় দিনে আমরা আল্লাহ ব্যতিরেকে আর কারো দিকে সাহায্যের প্রত্যাশায় হাত পাতার কথা ভাবতেই পারিনি।

আমরা বিশ্বাস করি, হতাশার অতল তিমিরে নিক্ষিপ্ত জাতির আশাহীন একটি হেতু আর প্রচেষ্টা (cause)-কে সফল করার প্রয়াসে একমাত্র আল্লাহই পারেন সাহায্য করতে। সীমাহীন নৈরাজ্যজনক হেতু আর উদ্দেশ্যে (cause) আমরা ঝুঁকি নিয়েছিলাম আমাদের তখনকার বিবেচনায় সর্বোত্তম যে ফলাফল আমরা আশা করেছিলাম তা ছিল মুক্তির প্রয়াসে আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষের গৌরবময় মৃত্যু।

পনের বছর পূর্বের জাতির গৌরব ও শৌর্যমণ্ডিত সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত যা ঘটেছে তার জন্য কোন পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু দুঃশাসনের পরাকাষ্ঠা অপদেবতা মুজিবের পতন ঘটেছে। তার তৈরী পূজা পদ্ধতি অর্থাৎ মুজিববাদ আজ বেঁচে আছে শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় কয়েকজন মুজিবভৃত্য আর মুজিববাদের কারণে তখনকার দিনে উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত মুজিবী-পুরোহিতদের মনে। জাতির সাথে বেঈমানী করে বৈষয়িক ক্ষেত্রে উপকৃত, ভোগ দখলকারী কায়েমী স্বার্থবাদী সেসব হাতেগোনা বেনিফিসিয়ারী ব্যক্তিবর্গ এখন মুজিব কন্যার উপর দেবত্ব আরোপ করে নতুন এক দেবীরূপে প্রতিষ্ঠিত করে আরেকবার জাতিকে প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে লুণ্ঠন করার সুযোগ করে নিতে চায়।

ভবিষ্যত কোনদিকে ?
পনের বছর পূর্বের সেই ঘটনাবহুল দিন থেকে আমার সমস্ত বিশ্বাস আর সকল প্রকার আনুগত্য নিঃশর্তভাবে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য। আমার দেশের জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে সংগ্রামের পথে আমার জীবনকে নিয়োজিত করেছি। নিঃস্বার্থ কুরবানীর এই পথে পনের বছর পূর্বে একজন মানুষ হিসেবে আমি আমার আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছি এবং যতদিন আমি জীবিত থাকি সেই মর্যাদাবোধ সংরক্ষণের প্রচেষ্টা আমার থাকবে। এই পৃথিবীতে আল্লাহ যতদিন আমাকে রাখবেন, আমি আমার দেশের মানুষের মুক্তি অর্জন আর আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আল্লাহ এবং একমাত্র আল্লাহর এবাদত করে যাব। আমি জানি না আমি সফল হবো কিনা, সফলতা কিংবা ব্যর্থতা নিয়ে কোন পরিকল্পনাও করতে চাই না। কারণ, আমি বিশ্বাস করি ফলাফল নির্ধারণ করবেন মহান আল্লাহ। আমার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে সাধ্যাতীত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে পারছি।

১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ এমনই একটি গৌরবোজ্জ্বল দিন, যা আমার জন্য এবং বাংলাদেশের যন্ত্রনাবিদ্ধ নির্যাতিত মানুষের জন্য আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস স্থাপন আর সুখী-সুন্দর-শান্তিপূর্ণ-সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অসামান্য আলোকবর্তিকা হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। নির্লজ্জ শঠতা, প্রকাশ্য প্রবঞ্চনা আর সীমাহীন দুর্নীতির কুয়াশাচ্ছন্ন জীবনে এবং নিপীড়ন আর অবিচারের তমসাচ্ছন্ন ইতিহাসে একমাত্র এই দিনটিই হচ্ছে আশ্বাসের রূপালী রেখা। যারা মানুষকে দুর্যোগের মুখে ঠেলে দিয়ে নিজেদের দেবতা অথবা দেবীরূপে প্রতিভাত করতে চায়, তাদের জন্য এই দিনটি একটি সতর্ক সংকেত। তাদের জানা উচিত আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং নিপীড়ক আর মুনাফেক গোষ্ঠী সীমালংঘন করলে দ্বিতীয় কোন সতর্কবাণী ব্যতিরেকেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেন। সর্বোপরি, এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর সাহায্য মুক্তি আর আত্মমর্যাদাবোধ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগ্রামরত জাতির দ্বারপ্রান্তেই অপেক্ষা করছে।

আজকের দিনে বিরাজমান আশাহীন অস্থির পরিস্থিতি, অনিশ্চয়তার জালে আবদ্ধ যন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষের আহাজারি আর শঠতা, দুর্নীতি এবং সর্বোচ্চ আইন ও অবিচারের অভিশাপ আপাতঃদৃষ্টিতে সমাজকে পরিবেষ্টিত করতে চললেও মুজিবী দুঃশাসনের দিনগুলো ছিল আরো ভয়াবহ। সেই অভিশপ্ত দিন যাতে আর ফিরে না আসে এবং বিরাজমান জরাগ্রস্ত সমাজব্যবস্থা যাতে সর্বগ্রাসী ধ্বংসত্মক রূপ পরিগ্রহ করতে না পারে, তার জন্য সর্বপ্রথমে জাতির জীবন থেকে মুজিববাদ হোক, এরশাদবাদ হোক কিংবা আর অন্য কোন মতবাদ হোক- সবকিছু থেকে হৃদয়কে পরিচ্ছন্ন ও নিষ্পাপ করতে হবে। মুক্তি অর্জন আর আত্মসম্মানবোধ পুনঃজাগ্রত করার শক্তি ও সাহস অর্জনের নিমিত্তে একমাত্র আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে।

আমার জীবন, আমার মৃত্যু, আমার মুনাজাত, আমার কর্ম, আমার প্রয়াস, আমার কুরবানী- সবকিছু মিলিয়ে আমার সত্তা এবং-
-আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন দেবতা, দেবত্বলোভী ব্যক্তি, নিপীড়নমূলক পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যবস্থাকে আমি মানি না এবং আল্লাহ ব্যতীত আর কারো নিকট কিংবা অন্যকিছুর নিকট আমি মাথা নত করি না।
-আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহই একমাত্র সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। আল্লাহ আমার প্রভু ও জীবনের নিয়ন্ত্রক, আমার আশ্রয়দাতা ও রক্ষাকারী, নিশ্চিত ও শর্তহীনভাবে আমার অস্তিত্বের রক্ষক এবং আমার রিজিকের মালিক।
-আমি সাক্ষ্য দেই যে, হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) (আল্লাহ তাঁকে এবং তাঁর সঙ্গীদের শান্তি ও সম্মান প্রদান করুন) হচ্ছেন শেষ নবী এবং আল্লাহর রাসূল।
-আমি সাক্ষ্য দেই যে, পবিত্র কুরআন হচ্ছে মানুষের জন্য আল্লাহর বাণী এবং সর্বোচ্চ আইন।
(দৈনিক মিল্লাত বিশেষ ক্রোড়পত্রঃ ১৫ আগস্ট, ১৯৯১)

একাত্তরোত্তর দক্ষিণ এশিয়া: বাংলাদেশ
স্বাধীনতার স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ১৯৭০ সালের বহুল প্রচারিত পাকিস্তানী শোষণ সংক্রান্ত ধারণা তার গভীরতা হারিয়ে ফেলে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিস্তর ব্যবধানের কারণে। ৭০ দশকে স্বাধীনতার মূলনায়ক শেখ মুজিব ও তার অনুগামীদের প্রচারণা গণ মনে যে উন্মাদনার সৃষ্টি করেছিল সেটা স্বাধীনতার প্রথম পর্যায়ে তার শক্তি হারিয়ে ফেলে। মুজিব ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন যে স্বাধীনতার পর বাংলার জনগণ পাকিস্তানের অর্ধেক মূল্যে চাউল কিনতে পারবে। অথচ ১৯৭৪ সালে স্বাধীনতার তিন বছরের মধ্যে ১০ গুণ চড়া মূল্যে এখানকার মানুষকে চাউল কিনতে হয়েছে।’ শেখ মুজিবের বাংলাদেশ পশ্চিম পাকিস্তানী শোষণ ছাড়াই সবচেয়ে গরীব, স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হয়েছে। তাদেরই কল্যাণে টিআইবি এর রিপোর্ট অনুসারে বাংলাদেশ দুনিয়ার সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ বলে চিহ্নিত হয়েছে।

১৯৭১ সালে এখানকার মাথা পিছু গড় আয় ছিল ৪৭ ডলার ১৯৯২ সালে মাথা পিছু গড় আয় ২০২ ডলারে উন্নীত হলেও পাকিস্তানের মাথা পিছু গড় আয়ের অনেক নীচে। ১৯৬৯-৭০-এর দিকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে মাথা পিছু গড় আয়ের অনুপাত ছিল ২ : ১। এদেশে তথাকথিত পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ না থাকা সত্বেও এখানকার মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি, মাথা পিছু গড় আয়ের অনুপাত আগের মতই রয়ে গেছে। এখনো পাকিস্তানে ৫ লক্ষ বাঙালী পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত রয়েছে যাদের আয় বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের সাথে যুক্ত হচ্ছে। সিমেন্ট, কম্বল, সামরিক সরঞ্জাম এবং অন্যান্য অনেক কিছু আমদানী হচ্ছে, যদিও এসব ভারত থেকে আমদানী করা সম্ভব। ভারতের সামরিক বিশ্লেষক সুব্রানিয়ামের প্রত্যাশা ছিল যে স্বাধীন বাংলাদেশ নির্ভেজাল ধর্ম নিরপেক্ষ নীতি ও আদর্শের মধ্যে অবস্থান করবে। কিন্তু তার ধারণা সঠিক বলে প্রমাণিত হয়নি। বাংলাদেশ শেখ মুজিবের চাপিয়ে দেয়া ধর্ম নিরপেক্ষ নীতি থেকে সরে এসেছে-এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম। এখন ভারতকে সার্কের তিনটি মুসলিম রাষ্ট্রের মুখোমুখি হতে হবে।  বর্তমানে শুধুমাত্র কায়েমী স্বার্থবাদী চক্র ছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে পাকিস্তান বিদ্বেষ তেমন প্রকটভাবে নেই। পাক ভারত ক্রিকেট খেলা হলে বাংলাদেশের মানুষের সত্যিকার অনুভূতির প্রকাশ দেখা যায়।

পাকিস্তান
একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের মানচিত্র থেকে পূর্ব পাকিস্তান বিলীন হয়ে যায়, যার ফলে এর প্রতিক্রিয়া পশ্চিম পাকিস্তানে ভয়াবহ রূপ নেয়। সার্বিক সেনা কমান্ড ভেঙে পড়ে এবং তরুণ অফিসাররা জেনারেলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। সেনাসদর দপ্তরে ইয়ংটাক হিসেবে পরিচিত তরুণ অফিসাররা প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ এবং তার নিকটতম সহযোগী জেনারেলদের বিচারের দাবী করেন।

নতুন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভূট্টো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য টিভি ঘোষণার মাধ্যমে ১১ জন সিনিয়র জেনারেলকে তাদের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করেন। নেভীর পুরো কমাণ্ড বরখাস্ত করা হয়। সেনা অফিসাররা অপমানিত হতে থাকেন, যে কারণে উর্দী পরিহিত অবস্থায় কেউ জন সমক্ষে যেতে সাহস করতো না। কিন্তু ক্রমশ পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার যন্ত্রণা তিথিয়ে আসে। সেনাবাহিনীর সাথে বেসামরিক জনগণের সম্পর্ক আগের মত সৌভ্রাতৃত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খণ্ডিত পাকিস্তান শুধুমাত্র টিকেই রইল না ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে তার গর্বিত শির তুলতে শুরু করল। লাহোরে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী শীর্ষ সম্মেলন পাকিস্তানকে অন্ধকার থেকে আলোর দিগন্তে টেনে তুলল।

ভারতের সামরিক বিশ্লেষক কে সুব্রানিয়াম ১৯৭২ সালে ভবিষ্যত বাণী করেছিলেন- ‘পাকিস্তান পরাজিত হয়েছে এবং বিশ্ব রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে স্থায়ীভাবে বিদায় হয়ে গেছে। পাকিস্তান আর কখনই তেমন বিশাল বাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হবে না, ফলে পশ্চিম ফ্রণ্ট ভারতের জন্য আর কখনো হুমকি হয়ে উঠবেনা।’ কিন্তু সুব্রানিয়ামের এ ধারণার বিপরীত চিত্র দেখা গেল পাকিস্তানে। এখানে আগের তুলনায় অনেক বেশী সামরিক স্থাপনা গড়ে উঠল। অনেক বেশী আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হল। পাকিস্তান ভারতের জন্য হুমকি এ কথাটা কিছু দিনের জন্য অবাস্তব মনে হলেও পাকিস্তানের সামরিক শক্তি আবারো ভারতের জন্য হুমকি হয়ে উঠল।

১৯৭১ সালের যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে সুব্রানিয়াম বলেছিলেন, পাকিস্তান ভারতের প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে আর কখনো মাথা তুলতে সক্ষম হবে না এ কথাটা ভুল প্রমাণিত করেছে। পাকিস্তানের বিকাশমান সামরিক শক্তির ব্যাপারে দিল্লীর ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ। পূর্ব পাকিস্তানকে হারানোর পরও দেখা গেল ইসলামাবাদ তার আয়ের বিরাট অংশ সামরিক শক্তি পুনর্বিন্যাসে ব্যয় করছে অকাতরে।
পারমানবিক সম্ভাবনার ক্ষেত্রে সুব্রানিয়ামের বিশ্বাস ছিল খণ্ডিত পাকিস্তান তার প্রতিবেশীদের জন্য কখনো পারমানিবক হুমকি হয়ে উঠবেনা। কিন্তু পরবর্তীতে ভারতের সামরিক বিশ্লেষক এমনকি সুব্রানিয়াম স্বয়ং পাকিস্তানকে ভারতের জন্য পারমানবিক হুমকি বলে বিবেচনা করেন।

পাকিস্তান তার পূর্বাঞ্চল হারানোর পরও ১৯৭৯ সালের ১৯.৭ বিলিয়ন ডলার জিডিপি ১৯৯১-৯২ সাল নাগাদ ৪৮.০৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এর রপ্তানী আয় (পাট ছাড়াই) ১,২৬২ মিলিয়ন থেকে উন্নীত হয়ে ১৯৯২ সালে ৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে যা ভারতের রপ্তানী আয়ের এক তৃতীয়াংশ। পাকিস্তানের মাথা পিছু গড় আয় ১৯৭২ সালের ৯০ ডলার থেকে ১৯৯০ সালে ৪০৯ ডলারে উন্নীত হয়েছে। এই একই বছরে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাড়ায় ১ বিলিয়ন ডলার। সুব্রানিয়ামের ধারণা ছিল একাত্তরে পরাজিত পাকিস্তান ধর্ম নিরপেক্ষতার পথ ধরবে কিন্তু দেখা গেছে- তার ধারণা বিপরীত অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে।

ভারত
ভারতের ব্যাপারে সুব্রানিয়াম বিশ্বাস করতো যে সেখানে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা দূরীভূত হবে, কিন্তু ঘটেছে এর উল্টোটা। আদভানীর বিজেপি হিন্দুদের ধ্বংসের দেবী কালীকে সামনে এনেছে নবোদ্দমে ধ্বংস যজ্ঞের প্রস্তুতির জন্য। নির্ভেজাল হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বিজেপির অঙ্গীকারই সাম্প্রদায়িক বিষবাস্প ছড়িয়েছে ভারতে।

সুব্রানিয়াম পূর্ব পাকিস্তান সমস্যা সমাধানে সামরিক হস্তক্ষেপ করার জন্য ইন্দিরা গান্ধীকে ধন্যবাদ জানান এ কারণে যে, পূর্ব পাকিস্তান ভারতের প্ররোচনা ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় স্বাধীন বাংলাদেশের উত্থান হওয়ার কারণে নাগা মিজো ও অহমিয়াদের স্বাধীনতা আন্দোলনের পশ্চাৎ ভূমি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যবহৃত হবে না। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ২০ বছর পর সেই একই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি হতে শুরু করেছে যেমনটি বলা হত মিজো নাগাদের আশ্রয় হল পাকিস্তান। অনুরূপ আজকে বলা হচ্ছে বাংলাদেশ ভারতের বিদ্রোহীদের আশ্রয় ও প্রশয় দিয়ে আসছে। ভারত থেকে বাংলাদেশে উদ্বান্তুদের পুশ ব্যাক করে চলেছে। একাত্তরের পর ভারত প্রত্যাশা করেছিল যে, তাদের জন্য পূর্বাঞ্চলীয় হুমকি স্থায়ী ভাবে তিরোহিত হয়ে যাবে। ১৯৬৯ সালে যেখানে পূর্ব-পাকিস্তনে  ১ ডিভিশন সৈন্য অবস্থান করত সেখানে বর্তমানে বাংলাদেশের রয়েছে ৫ ডিভিশন সৈন্য এবং বিমান বাহিনীর যে শক্তি বর্তমান রয়েছে তার মোকাবিলায় ভারতের বিমান বাহিনীর ১১ স্কোয়াড্রন প্রয়োজন হবে।

স্বাধীনতার প্রথম দিন থেকে বাংলাদেশের জনগণের মন মানসিকতা ভারত বিরোধী হয়ে উঠে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের প্রতি এদেশের মানুষের যে দুর্বলতা ছিল স্বাধীনতার প্রথম দিনেই সেটা দূর হয়ে যায়, এর কারণ হল এদেশের হিন্দু এবং ভারতীয় হিন্দুদের ধৃষ্টতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচার-আচরণে এদেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। এছাড়াও ভারতীয় সেনাবাহিনীর নির্বিচার লুণ্ঠন পরিত্যক্ত অস্ত্র সস্ত্র ও সামরিক সাজ-সরঞ্জাম এমন কি শিল্প কারখানার যন্ত্রপাতি ভারতে স্থানান্তর করার কারণে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ ক্রমশ ভারত বৈরী হয়ে উঠে। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর টাইম ম্যাগাজিনে ভবিষ্যতবাণী করা হয়েছিল যে, স্বাধীনতার সহযোগী ভারতীয় সেনাবাহিনী অবশেষে দখলদার হিন্দু বাহিনীতে পরিণত হবে। এই ভবিষ্যৎ বাণী তখন সত্য বলে পরিগণিত হয়েছিল। ভারতীয় বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিয়ে ছিলেন, চীন এবং যুক্ত রাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাবে, তাদের এ ধারণাও মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। ভারত আমেরিকার যৌথ নৌ মহড়া এবং টেকনোলজি স্থানান্তর ইত্যাদি এখনো অব্যাহত রয়েছে।

সুব্রায়িনামের মতে পূর্ব পাকিস্তানের পতনের মধ্যদিয়ে আঞ্চলিক অথবা জাতিগত আন্দোলন থিতিয়ে যাবে, কিন্তু সেটা হয়নি। শিখরা স্বাধীন খলিস্তানের দাবীতে সোচ্চার, শ্রী নগর উপত্যকায় কাশ্মীরীদের জন্য স্বাধীনতার এই আওয়াজ প্রতিধনিত হচ্ছে। ইন্দিরা গান্ধী পূর্ব পাকিস্তানে আঞ্চলিকতার যে বীজ বপণ করেছিলেন সেটা পাকিস্তানকে তো টুকরো করেছে, সেই আঞ্চলিকতাবাদের নব দানব এখন ভারতের উপর ভর করেছে।

সুব্রানিয়ামের একটি বক্তব্য সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে সেটা হল, ভারত জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এমন একটা ইমেজ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে যে, বড় বড় পরাশক্তির নাকের ডগায় তাদের পছন্দ নয় এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভারত সক্ষম। পাকিস্তানকে টুকরো করতে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। কিন্তু তার জনগণের কল্যাণে তার গরীবী হটাও প্রকল্প এক মিলি মিটারও অগ্রসর করতে পারেননি। পাকিস্তান টুকরো হওয়ার ৩ যুগ পর ১৯৯১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ভারতের নির্লজ্জ ভূমিকার পুনর্মূল্যায়নের ব্যাপারে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের উচিত ছিল আবেগ বিবর্জিত পদক্ষেপ নেয়া। একাত্তরে কে কতটুকু লাভবান হয়েছে এটা বিচার বিশ্লেষণ হওয়া জরুরী।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল পাকিস্তানকে ভাঙবার জন্য যারা মূলত দায়ী তাদের একজনেরও স্বাভাবিক মৃত্যুও হয়নি। শেখ মুজিব সবংশে নিপাত হয়েছে, তাজুদ্দিন সোনার বাংলার সোনার সন্তানদের দ্বারা বেয়নেট বিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে। ভুট্টোর ভাগ্যে জুটেছে ফাঁসির দড়ি আর ইন্দিরা গান্ধী দেহরক্ষীর ব্রাশফায়ারে তলপেট ঝাজড়া হয়ে মারা যায়। চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমান তার উপরস্থ অবাঙালী আফিসারদের হত্যা করে যেভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন সেই চট্টগ্রামের মাটিতে তার অধস্তন অফিসারদের গুলিতে জিয়ার বুক ঝাঝরা হয়ে যায়, এটাই হল ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি। আর এখানেই ইতিহাসের শেষ নয়।

রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রবণতা
১৯৯১ সালের নির্বাচনের সময় পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য আসেন। এটা কোন স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পরও এই ধারা বিদ্যমান ছিল। নির্বাচনের পরও ঐ বিশেষ একটি মহল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবীতুলে বিদেশী শক্তির দ্বারস্থ হয়। এদেশের পঁচে যাওয়া বখে যাওয়া বুদ্ধিজীবীরা সরকারী ভূমিকার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা করে স্মারক লিপি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস, যুক্ত রাজ্যের হাইকমিশন এবং আরো কতিপয় আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের দূতাবাসসমূহে ধর্ণা দিতে দেখা গেছে। এরা বিশেষ একটি লবির সাথে সংশ্লিষ্ট এবং বিশেষ রাজনীতির ধারক। এরা সব সময় ঔপনিবেশিক শক্তির দালাল হিসেবে এদেশের রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে রাখতে চায়।

১৯৯৪ সালের অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার এক সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী নিনিয়েন স্টিফেন বৃটিশ কমন ওয়েলথ সেক্রেটারী এমেকার প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকায় এসে ১ মাস ৪ দিন ধরে আওয়ামী লীগ বিএনপি এবং আরো কোন কোন দলের নেতাদের, সেই সাথে এনজিও কর্তাদের নিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। বিদেশীদের ডেকে আনার ব্যাপারে তখনকার বিরোধী দল অনেক দূর এগিয়ে যায়। জনগণের কাছে ধরণা না দিয়ে আধিপত্যবাদী শক্তিসমূহের আশ্রয় কামনা করে। ১৯৯৬ সালে অনুরূপ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে বিএনপি বিরোধী দলের অবস্থানে থেকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে অধিপত্যবাদী শক্তিসমূহের দ্বারস্থ হয়।

বিগত ২৭ অক্টোবর রাত ১২টায় বিএনপি সরকারের ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ ৫ বছর পূর্ণ হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ আন্দোলন শুরু করে এর  দু’ঘণ্টা পূর্বে। আন্দোলনের রূপ ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ সহিংস ও ভয়াবহ। আন্দোলনের প্রথম দিনেই অন্তত ৬০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। সরকারী ও বেসরকারী সম্পত্তিও প্রচুর নষ্ট হয়েছে, আওয়ামী লীগ অবরোধ আন্দোলন দিয়ে ঢাকা শহরকে সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে চেয়েছে। প্রতিরোধ আন্দোলন চলেছে প্রায় এক মাস।

২৮ অক্টোবর ২০০৬ইং জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা চারদলীয় জোটের নেতা-কর্মীদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। রাস্তায় লাঠি পেটা করে হত্যা করে। বেশ কয়েকজনকে হত্যা করে লাশের ওপর নৃত্য করতে থাকে। এ দৃশ্য টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছে দুনিয়ার মানুষ। দুনিয়ার বিবেকবান মানুষই শুধু নয় আমিকার রাষ্ট্রদূত এ দৃশ্য দেখে চোখের পানি ফেলে ধিক্কার জানিয়ে ছিলেন আওয়ামী বর্বরতাকে। এখন বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি সকল গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে মার্কিন কর্তৃত্ব প্রকট। এইসাথে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। দেশের সবরকম সংকটের মূলে রয়েছে, সেইসব রাজনৈতিক দল যাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বিদেশী দূতাবাসসমূহের সাথে রয়েছে সেইসব বুদ্ধিজীবী, কথায় কথায় যারা বিদেশী কূটনীতিকদের সাথে সলা পরামর্শে ব্যাকুল হয়ে থাকে। বিদেশী কূটনীতিকরাও এসব মেরুদণ্ডহীন দালালদের নিয়ে খেলা করতে আনন্দ পায়।

আওয়ামী লীগের ধারণা, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, হাসান, আজিজ, জাকারিয়াকে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া, সব শেষে প্রেসিডেন্ট ডঃ ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পদ থেকে বিদায়; সব কিছু রাজ পথের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সুরাহা করতে পেরেছে। আওয়ামী লীগের ধ্বংসাত্মক আন্দোলন জ্বালাও পোড়াও ও হত্যা বিদেশী কূটনীতিকদের মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। তাদের এক তরফা চাপ ছিল প্রেসিডেন্টের উপর। প্রেসিডেন্ট চাপের মুখে বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর একটি দলের পক্ষ হয়ে বিবৃতি প্রদান ছাড়াও ২২ জানুয়ারীর নির্বাচনে তাদের পর্যবেক্ষক প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

কোন দেশের রাজনীতিতে কূটনীতিকদের নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ নেই
মিশন প্রধানদের বাসায় দলের নেতাদের চায়ের আমন্ত্রণ জানিয়ে শলা পরামর্শ উপদেশ অথবা নির্দেশ দান করা শুধুমাত্র বাংলাদেশই সম্ভব হয়েছে। পৃথিবীর অন্য কোথাও এমন নজীর আছে বলে মনে হয় না। প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারে এক যুগের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সেনা শাসন চলছে। নির্বাচনে বিজয়ী নেত্রী ওয়াংসান সুকীর কারাবরণ রয়েছে অব্যাহত, সেখানে কোন অবস্থায় কূটনৈতিক মিশনগুলো মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারছে না। এমনকি থাইল্যাণ্ডের সেনা শাসন নিয়েও বিদেশী রাষ্ট্র ভারতের অঙ্গ রাজ্য পশ্চিম বাংলার মূখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কোন এক ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার কারণে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের প্রধানকে ক্ষমা চাইতে হয়েছে। মূখ্যমন্ত্রী বলেছেন- আপনাদের কর্মকাণ্ড কূনৈতিক পাড়ায় সীমাবদ্ধ। রাষ্ট্রের কোন কাজ তদারকি করার দায়িত্ব আপনাদের ওপর বর্তায় না, এটা কূটনৈতিক শিষ্টাচার বর্হিভুত। দূতাবাস প্রধান তার দেশের রাষ্ট্র প্রধানকে জানালে রাষ্ট্র প্রধান বিষয়টি নিয়ে মনমোহন সিং-এর সাথে কথা বলেন, তাতে তাদের লাভ হয়নি কিছুই। মনমোহন সিং ও সোনিয়া গান্ধী উভয়েই জবাব দেন বুদ্ধদেব যা বলেছে সেটা রাষ্ট্রীয় ধৃরাষ্ট্র প্রধানের বলার কিছু থাকে না। কিন্তু আমাদের দেশের চিত্র সার্বভৌমত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, এরপর মিশন প্রধান ও সংশ্লিষ্ট ভিন্ন দেশ আমাদের অনৈক্যের সুযোগটা পুরোমাত্রায় নিচ্ছে। বিদেশী দূতাবাসগুলো কারণে অকারণে সংকটে অসংকটে যেভাবে আমাদের নেতৃবৃন্দ বিদেশী দূতাবাসগুলোতে ধর্ণা দেয় ক্ষমতা লাভের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য, তাতে মনে হয় বাংলাদেশকে সুন্দর ও সাবলীল ভাবে চালিয়ে নেয়ার যোগ্যতা কোন দলের কোন নেতৃবৃন্দেরই নেই।

ভারতের প্রত্যাশা ও বাংলাদেশের পানি সংকট
যখন যুক্ত বাংলার বিভাজন অনিবার্য করে তুলল ভারত তখন পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের জন্য সমকালীন মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ ও মুসলিম গণ প্রতিনিধিরা ১৯৪৬ সালে দিল্লীতে এক যৌথ অধিবেশনে মিলিত হলে সোহরাওয়ার্দী এক পাকিস্তানের প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে সেটা গৃহীত হয়। এই প্রস্তাব অনুযায়ী খণ্ডিত বাংলার একটি অংশ পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয়। পাকিস্তান তার সীমিত সামর্থ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে ভায়াবল করে তুলে। নেহেরু, গান্ধী, মাউন্টব্যাটেন মনে করত, পূর্ব পাকিস্তান ভায়াবল হবে না। হিন্দু নেতৃবৃন্দের সৃষ্ট সব ধরনের সংকট মুকাবিলা করে যখন পূর্ব পাকিস্তান সত্যিকার অর্থে ভায়াবল হয়ে উঠল তখনই পূর্ব পাকিস্তানকে বিচিছন্ন করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে দিল্লী। এদেশের পঞ্চমবাহিনীকে অপশক্তি তাদের ভাষায়। ব্যবহার করে পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ এ অঞ্চলকে এ দেশকে বিচ্ছিন্ন করে ক্ষ্যান্ত হল না ভারত, একে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করল। আজো সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। ভারতীয় নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের অগ্রগতির অন্তরায়, এ ব্যাপারে কিছুটা আলোকপাত হওয়া জরুরী।

বাংলাদেশের কাছে ভারতের অনেক প্রত্যাশা। ত্রিপূরা ও আসামের সাথে দ্রুত যোগাযোগের জন্য ভারত চায় একদিকে শিয়ালদহ জয়দেবপুর যাত্রীবাহী ট্রেন যোগাযোগ অন্য দিকে আখাওড়া রেলওয়ে লিঙ্ক। ভারত চায় বাংলাদেশী গ্যাস, এজন্য বাংলাদেশ থেকে ভারত পর্যন্ত গ্যাস লাইন এবং বিদ্যুৎ লাইন। আরো চায় চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে। এছাড়াও আরো অনেক প্রত্যাশা রয়েছে ভারতের। কিন্তু বাংলাদেশ ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সাবলীল করে তোলার ব্যাপারে ভারত স্বয়ং অসংখ্য বিঘ্ন সৃষ্টি করে রেখেছে। স্বাধীনতার প্রথম প্রভাত থেকে ভারত বাংলাদেশের সাথে অসম ঔপনিবেশিক আচরণ করার ফলে দুটো সার্বভৌম রাষ্ট্রের সম্পর্ক কখনই সাবলীল হয়ে উঠেনি। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনো অন্তরায় হয়ে রয়েছে বাণিজ্যিক ঘাটতি। বাংলাদেশী পণ্যের শুল্ক মুক্ত প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন, তিস্তা, পদ্মার পানি বণ্টন, আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প, ভারতের টিপাই মুখ বাঁধ সমস্যা সমাধানের কোন উদ্যোগ আজো নেয়া হয়নি। বাংলাদেশ ভারত বাণিজ্য অসম এবং ভারতের অনুকূলে। ভারত বাংলাদেশে যা রপ্তানী করে আমদানী করে অনেক কম। ভারতে বাংলাদেশের কিছু কিছু পণ্যের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন ধরনের ট্যারিফ এবং প্যারা ট্যারিফের কারণে ভারতের আমদানী কারকরা সেসব পণ্য আমদানী করতে উৎসাহ বোধ করে না। এ কারণে বাংলাদেশ তার পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশের দাবী জানিয়ে সেটা আদায় করতে পারেনি আজ অবধি। এর ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েই চলেছে। নব্বই এর শুরুতে বাংলাদেশে ভারতীয় রপ্তানী ছিল ১৪/১৫ কোটি ডলার, এখন সেটা ২০০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি পূরণের জন্য ভারতে বাংলাদেশী পণ্যের ব্যাপক রপ্তানী প্রয়োজন। কিন্তু সেটা হয়ে উঠছে না। ইতোমধ্যে অবাধ বাণিজ্যের কথা বলা হচ্ছে। যেটার পরিণতি মুজিব আমলের সীমান্ত বাণিজ্যের অনুরূপ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। ওদিকে বিশ্ব ব্যাঙ্ক  বলছে, ভারতের সাথে অবাধ বাণিজ্যে বাংলাদেশের তেমন লাভ হবে না। বিশ্ব ব্যাঙ্কের বক্তব্য হল, দুই দেশের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ভাল হবে। আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যের তুলনায় অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৩ গুণ, ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমশ ফোকলা হয়ে যাচ্ছে।

ভারত আজ উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে পণ্য সরবরাহের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট দাবী করছে অথচ বাংলাদেশ বাংলাবান্ধা ও নেপালের কাকর ভিটার মধ্যে যোগাযোগের ট্রানজিট সুবিধা পাচ্ছে না। তারা এখানে নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলছে। বাংলাদেশ তার জন্ম থেকে ভারতের পানি আগ্রাসনের সম্মুখীন। তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর ন্যায্য পানি বণ্টনের এবং দীর্ঘ মেয়াদি গঙ্গা পানি চুক্তির ওপর বাংলাদেশ গুরুত্বারোপ করলেও ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সদিচ্ছার অভাবে পানি সংক্রান্ত সমস্যা জটিল থেকে আরো জটিল হচ্ছে। ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার নদী কমিশনের বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে সর্বশেষ আলোচনায় ভারত জানায়, ৬টি নদীর (ধরলা, ধুধকুমার, মনু, খোয়াই, গোমতী ও মুহুরী) সমীক্ষা শেষ করতে চায়। এর অর্থ আর কিছু নয়, ভারতের সময় ক্ষেপনের কৌশল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া পানি সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য ভারত সফরে গেলে গজল ডোবায় এক তরফা পানি প্রত্যাহার করে দিল্লী তার সদিচ্ছা জ্ঞাপন করেছিল। এতে তিস্তা ব্যারেজের পানি কমেছিল অস্বাভাবিক ভাবে সেচ নির্ভর ১ লাখ ১২ হাজার হেক্টর জমি বিপর্যয়ের  মুখে পড়েছিল। গঙ্গার পানি বণ্টনের চুক্তির প্রথম কিস্তিতে ভারত বাংলাদেশকে ২৯ হাজার কিউসেক পানি কম দিয়েছে, হাড্রিঞ্জ ব্রিজের ১৫টি গ্রাডারের ৯টি পানি নয় বালির উপর দাঁড়িয়ে আছে। পানি সম্পদ মন্ত্রনালয় থেকে বলা হয়েছে, চলতি বছর অর্থাৎ ২০০৭ এর জানুয়ারী থেকে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে পানি বণ্টন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সিডিউল অনুযায়ী ভারত বাংলাদেশকে ২৯ হাজার ৫৫০ কিউসেক পানি কম দিয়েছে। এবার ১ লাখ ৭ হাজার ৫১৬ কিউসেক পানির প্রবাহ নিশ্চিত করার কথা ছিল। কিন্তু পানি সরবরাহ করা হয় ৭৭ হাজার ৯৬৬ কিউসেক। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাইড্রোলজি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ১০ বছর থেকে বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত। যৌথ নদী কমিশনের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। জিকে প্রজেক্টে এখন আর পানি নেই, পদ্মার বুকে এখন চাষাবাদ হচ্ছে।

ভারতের আন্তঃ নদী সংযোগ প্রকল্প ও টিপাই মুখ বাঁধ বাংলাদেশের পানি সমস্যা আরো প্রকট করে তুলছে। টিপাই মুখে বাধ নির্মাণের কারণে সুরমা নদীর পানি প্রবাহ গত দশ বছরে ৮০ শতাংশ কমেছে। আর সুরমা নদীর ভাটিতে কম পক্ষে ৩ কিলোমিটার মরে গেছে। আন্তঃ নদী সংযোগ প্রকল্পের কাজ শুরু হলে বাংলাদেশ মুখী পানি প্রবাহ শূন্যের কোঠায় এসে পৌঁছাবে।

হুমকির মুখে বাংলাদেশের নিরাপত্তা
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এদেশকে অকার্যকর করে তোলার ব্যাপারে দেশী-বিদেশী যড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। এদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন না হওয়া পর্যন্ত ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ভারতের হিন্দু নেতৃবৃন্দের মাথা ব্যথা। অখণ্ড ভারতের অবয়বে বাংলাদেশকে বিলীন করার স্বপ্ন এখনো হিন্দু নেতৃবৃন্দকে তাড়িয়ে নিয়ে ফিরছে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে বাহ্মণ্যবাদীরা বৌদ্ধদেরকে যেভাবে উৎখাত করেছে অনুরূপ পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে উপমহাদেশের মুসলমানদের ক্ষেত্রে। ব্রাক্ষণ্যবাদী সমাজ কাঠামোর মধ্যে বৌদ্ধবাদের জন্ম। বলতে গেলে বৌদ্ধবাদ ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিদ্রোহ। এটা ছিল তৎকালীন ঘুণে ধরা সমাজে প্রগতিশীল ব্যবস্থা। উপ-মহাদেশের নির্যাতিত জনগোষ্ঠী বৌদ্ধবাদে আশ্রয় নিয়ে মুক্তির নিঃশ্বাস নিতে থাকে এমনকি উপমহাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোও দখল করে বৌদ্ধবাদীরা। চতুর ব্রাহ্মণ্যবাদীর বৌদ্ধবাদ উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তারা প্রকাশ্য বিরোধীতাকে এড়িয়ে বৌদ্ধবাদীদের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়।

প্রথমত তারা বৌদ্ধবাদীদের মধ্যেকার অধৈর্যদের সন্ধান করে এবং তাদেরকে বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করা হয়। এমনকি মসনদে আরোহণের ব্যাপারেও মোহাবিষ্ট করা হয়। ধীরে ধীরে তাদেরকে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির ধারকে পরিণত করা হয়। অবশেষে বৌদ্ধবাদীদের দ্বিধাবিভক্ত করা হয়। মহাযান ও হীনযান এই দুই ভাগে বৌদ্ধবাদীরা বিভক্ত হয়ে পড়ে। ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি ও হিন্দু সংস্কৃতি যারা গলাধকরণ করেছিল তারা মহাযান হিসেবে পরিচিত। আর যারা নির্ভেজাল বৌদ্ধবাদ আকড়ে ব্রাহ্মণ্য ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিল তাদেরকে বলা হত হীনযান। মহাযানদের ব্রাহ্মণ্যবাদীরা প্রগতিশীল হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দান করে এবং তাদেরকেই বৌদ্ধবাদ উৎখাতে পঞ্চমবাহিনী হিসেবে ব্যবহার করে। যেমন করে মুসলিম শক্তিকে বিপর্যস্ত করার জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদী চক্র শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগকে পঞ্চমবাহিনী হিসেবে ব্যবহার করেছিল, প্রকৃতপক্ষে এরা মহাযানের ভূমিকা নিয়েছিল। আর যারা তাদের আদর্শকে সমুন্নত করতে চেয়েছিল এবং নিঃস্বার্থভাবে দেশ ও জাতির জন্য সংগ্রাম করেছিল তাদেরকে দালাল হিসেবে চিহ্নিত করে হত্যা নির্যাতন করেছিল এবং দৃশ্যপটের বাইরে ঠেলে দিয়েছিল। আজো ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বাংলাদেশের মানুষকে ছলেবলে কৌশলে এবং মিডিয়ার উপর প্রভাব বিস্তার করে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করে চলেছে। জাতিকে বিভক্ত করে ফেলেছে দুটো শিবিরে। একটি পক্ষ প্রকাশ্য অথবা নেপথ্যে তাদের অনুগত ভৃত্যের ভূমিকায় রয়েছে। এরা চায় বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিতে। অর্থাৎ এইসব পঞ্চমবাহিনী মহাযানদের দিয়ে অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার অসমাপ্ত কর্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতা
এ বছর অর্থাৎ ২০০৭ সালের ১০ জানুয়ারী নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘের উদ্যোগে কোলকাতায় বাংলাদেশ উপ হাইকমিশনের সামনে বাংলাদেশ বিরোধী কিছু দাবী দাওয়া বাস্তবায়নের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করে। ইংরেজী ও বাংলায় লেখা প্লাকার্ড ছিল তাদের হাতে। প্লাকার্ডগুলোতে লেখাছিল, প্রেসিডেন্ট ডক্টর ইয়াজউদ্দিন আইএসআই এর চর। বাংলাদেশ ভেঙে সংখ্যালঘুদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্র চাই। Bangladesh centre of Islamic terrorist, Destroy the terrorist Bangladesh. ইত্যাদি ধরনের শ্লোগান। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুভাষ চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে যাওয়া উদ্বাস্তুদের বাংলাদেশ সরকারকে ফেরত নিতে হবে। বাংলাদেশে বসবাসকারী ৩ কোটি সংখ্যালঘুদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। বাংলাদেশের ভোটার তালিকায় বাদ পড়া সংখ্যালঘুদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই বিক্ষোভ মিছিলের সময় পশ্চিম বঙ্গ সরকার কোলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপ হাইকমিশনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিলেও কেন্দ্রীয় সরকার ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র’এর আশির্বাদ রয়েছে এদের কর্মকাণ্ডের প্রতি। হিন্দু সন্ত্রাসীদের একটি সংগঠন ভারত সেবাশ্রম সংঘ এদের অনেক কর্মকাণ্ডে বৈষয়িক সহযোগিতা দিয়ে থাকে।

বাংলাদেশ বিরোধী এ ধরনের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে অনেক সংগঠন। যেমন : (১) স্বাধীন বঙ্গভূমি (বঙ্গ সেনা), (২) বিএলও (বঙ্গভূমি থেকে ভেঙে আনা অংশ), (৩) বাংলাদেশের রিফিউজি সমিতি, (৪) ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী সমিতি, (৫) ক্যাম্প, (৬) সোনার বাংলা ডেমোক্রেটিক পার্টি, (৭) স্বদেশীগণ জাগরণ মঞ্চ, (৮) বাংলাদেশ উদ্বাস্ত সংগ্রাম পরিষদ, (৯) অখণ্ড ভারত ঐক্য পরিষদ, (১০) বাংলাদেশ ভারত ভ্রাতৃত্ব মঞ্চ, (১১) বাংলাদেশ উদ্বাস্তু উন্নয়ন সংসদ, (১২) বাংলাদেশ সংখ্যালঘু বাঁচাও কমিটি, (১৩), গণতন্ত্র অধিকার রক্ষা সমন্বয় কমিটি, (১৪) গ্লোবাল হিউম্যান রাইটস ডিফেন্স, (১৫), অল ইনডিয়া রিফিউজি ফ্রন্ট, (১৬) হিন্দু বাঙালীগণ পরিষদ, (১৭) বিবেকানন্দ সাহিত্য পরিষদ, (১৮) নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘ।
প্রত্যেক বছর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস এলেই এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন তৎপর হয়ে ওঠে।

নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘের বাংলাদেশ বিরোধী সমাবেশের ৫দিন পর ১৫ জানুয়ারী কোলকাতার বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের সামনে পশ্চিম বঙ্গ রাম্য সিপিএস এর যুব সংগঠন ও ছাত্র সংগঠন বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। যুব সংগঠন নেতা আভাস রায় চৌধুরী বাংলাদেশ জরুরী অবস্থা জারি হওয়ার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এতে নাকি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হবে। এ কর্মসূচীর পেছনে রয়েছে পশ্চিম বঙ্গের বাম ফ্রণ্ট সরকার।

গত বছর (২০০৬) ১৬ ডিসেম্বর পশ্চিম বঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুরের হিলি থানার অদূরে ত্রিমোহনী বাজারে নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘের এক সমাবেশে স্বাধীন ভঙ্গভূমি প্রতিষ্ঠার দাবী জানান হয়। এর আগে ১১ নভেম্বর চব্বিশ পরগণা জেলার মুকুন্দপুরে বঙ্গ সেনাদের এক সমাবেশে নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক সুভাষ চক্রবর্তী বাংলাদেশের ৪ দলীয় জোট এবং শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের কর্মসূচী বাস্তাবায়নের লক্ষ্যে চাপ প্রয়োগের জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

বাংলাদেশে সংখ্যা লঘুদের নিরাপত্তা ও তাদের সু-রক্ষার অযুহাতে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৭টি জেলাকে নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের আওয়াজ তুলেছে লিবারেশন টাইগার অব বেঙ্গল। তারা এই ৩৭টি জেলাকে মনে করে তাদের জন্য অভয়ারণ্য। এই জেলাগুলো হলঃ পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, রংপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা কুষ্টিয়া, মেহেরপুর রাজবাড়ী, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরিয়তপুর, যশোর, নড়াইল, গোপালগঞ্জ, সাতক্ষীরা, খুলনা, বরিশাল, পিরোজপুর, বাগেরহাট, বগুড়া, পটুয়াখালী, ভোলা ও ঝালকাঠি। লিবারেশন টাইগার অব বাংলাদেশ মনে করে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৪ কোটির ওপর। এখানে বাস করে ৩ কোটি সংখ্যা লঘু। এদের নিরাপদ বসবাসের জন্য ৩৭টি জেলা সমন্বয়ে গঠিত স্বাধীন বঙ্গদেশ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন। এই লক্ষ্যে তারা বঙ্গদেশ মুক্তিপরিষদ গঠন করেছে। এদের সসস্ত্র শাখা হিসেবে কাজ করছে লিবারেশন টাইগার অব বেঙ্গল এরা হতে চায় শ্রী লঙ্কার এলটিটিই অর্থাৎ লিবারেশন টাইগার অব তালিম ইলম। শ্রী লঙ্কা আজ যে সঙ্কটাপন্ন এমন সংকট আমাদের জন্যও ডেকে আনতে চায় ব্রাহ্মণ্যবাদীরা। Bangladesh Mukti Parisad & Liberation tigers of Bengal What and Why?-নামক একটি বুকলেট এবং সংগঠনের প্যাডে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বরাবর একটি চিঠি কোলকাতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানায় এবং বাংলাদেশের উপ হাইকমিশনে পাঠান হয়। সংগঠনের প্যাডে সদর দপ্তরের ঠিকানা পাইকপাড়া ব্রাহ্মণ বাড়িয়া উল্লেখ করা হয়। লিবারেশন টাইগারের কমান্ডার ইনচীফ এবং মুক্তি পরিষদের প্রধান হিসেবে স্বাক্ষর করেন জনৈক দুর্গা চরণ। এসব কাগজপত্র বিভিন্ন দেশ এবং সার্কভুক্ত দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের কাছে পাঠান হয়। এমনকি জাতিসংঘ এবং কমলওয়েলথ মহাসচিবদের নিকট প্রেরণ করা হয়। বুকলেটে বঙ্গদেশে পুরো পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। বঙ্গদেশের রাজধানী কোথায় হবে পতাকা কেমন হবে জাতীয় সংগীত কেমন হবে সব কিছুর পরিষ্কার বর্ণনা রয়েছে।

বঙ্গভূমি গঠনের ষড়যন্ত্র
২০০৩ সালের ২৩ জানুয়ারী বীর বঙ্গ/বঙ্গভূমি রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়া হয়। সুপ্রিম রেভ্যুলিউশনারী কাউন্সিল এবং ১৭ সদস্যের একটি অন্তর্বর্তী প্রবাসী সরকার গঠন করা হয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ ও পূর্বের কিয়দাংশ নিয়ে এ রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়। এর সম্ভাব্য রাজধানী হবে পার্বত্য চট্টগ্রামের শক্তি গড়ে। তবে শক্তি গড়ের অবস্থান কোথায় সেটা সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। এর জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলা হলেও জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রবীণ তেড়াড়িয়া বলেন, ভারতে প্রবাসী এবং বাংলাদেশে অবস্থিত হিন্দু জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে বাংলাদেশ বিভক্তির মাধ্যমে একটি পৃথক হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের পক্ষপাতি। বাংলাদেশকে খণ্ড বিখণ্ড করার পরিকল্পনা প্রকৃতপক্ষে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের সকলের। একে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে চলছে ‘র’। এখন এসব ষড়যন্ত্র গুরুত্বহীন মনে হলেও আগামী একদা এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগ মহীরুহে পরিণত হবে না এমনটি বলা যাবে না। এ কারণে এসব বাংলাদেশের জন্য অশনি সংকেত।

সীমান্তে বিএসএফ-এর অপতৎপরতা
বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ-এর পরিকল্পিত অপতৎপরতা আজকের নয়। দীর্ঘ দিন ধরে এ অপতৎপরতা চলে আসছে। যখন থেকে বাংলাদেশ ভারতের আশ্রিত অবস্থান থেকে সোজা ও স্বনির্ভর হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে তখন থেকে এই অপতৎপরতা চলে আসছে। বাংলাদেশের বিডিআর এসব অপতৎপরতার জবাবও দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিনা উস্কানীতে নিরীহ বাংলাদেশীদের গুলী করে হত্যা নিত্যকার ব্যাপার। গত বছর ২০০৬ সালের আগস্টে জকিগঞ্জ সীমান্তে এরা বড় ধরনের একটি হামলা চালায়। বিডিআর জোয়ানরা বীরত্বের সাথে প্রতিহত করলেও বিভিন্ন সীমান্তে বিএসএফ তাদের তৎপরতা আগের চেয়ে অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সীমান্তে ভারতীয় গুপ্তচরদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা হলেও অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।

গত ২৯ নভেম্বর (২০০৬) বার্ষিক সংবাদ সম্মেলনে বিএসএফ এর মহা পরিচালক ভারত বাংলাদেশ সীমান্তকে প্রবলেম এরিয়া উল্লেখ করে সীমান্তে বিএসএফ ব্যাটেলিয়ান ৫০ থেকে ৬৬ তে উন্নীত করার কথা বলছেন। গত বছর ৩০ নভম্বের (২০০৬) ইন্ডিয়ান ওয়েব সাইট জানায় ভারতের দুই ক্যাম্পে দূরত্ব ১০ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ৩-৫ কিলোমিটার করা হয়েছে প্রতি ক্যাম্পে অন্তত ৫জন সদস্য থাকবে। সীমান্ত ফ্লাড লাইট দিয়ে আলোকিত করা হবে।

২০০৬ এ ভারত ইসরাইল চুক্তির পর ভারত সেনাবাহিনীর বিভিন্ন রেজিমেন্ট থেকে ৩১ হাজার সৈন্য নিয়ে ২৫টি স্পেশাল ফোর্স গঠন করেছে। ইসরাইলী প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত এবং তাদের অস্ত্রে সজ্জিত এ বাহিনী ভারতীয় সেনা অফিসারের নেতৃত্বে বিশেষ রুলস অব এনগেজমেন্টের অধীনে বাংলাদেশ সীমান্তে গুলী বর্ষণ, হত্যা, সীমান্ত অতিক্রম, সীমান্ত পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা, পুশ ইন ও ভূমি দখল ইত্যাদি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।

ইসরাইলীরা যেমন মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে মনে করে অনুরূপ হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রায় সকলেই মুসলমানদেরকে তাদের জাত শত্রু হিসেবে মনে করে। শত্রুর মিত্র এই ফরমূলা অনুযায়ী দুই মুসলিম বিরোধী শক্তি সংঘবদ্ধ হয়েছে মুসলমাদের বিনাশ করার জন্য। ফিলিস্তিনীদের উপর নিত্য নব নব পন্থায় নিপীড়ন চালানোর সুদীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা উপমহাদেশের মুসলমানদের উপর প্রয়োগ করার জন্য ইসলাইলীদের কাছে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ভারতের বিশেষ বাহিনী। আগামী একদা এই বিশেষ বাহিনী হয়তোবা চড়াও হতে পারে বাংলাদেশের উপর। বাংলাদেশ হতে পারে আর এক ফিলিস্তিন, তখনকার জন্য এখনি প্রস্তুতি নিতে হবে বাংলাদেশের। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানকার মেরুদণ্ডহীন রাজনীতিক ও বুদ্ধিহীন বুদ্ধিজীবীরা যারা পঞ্চমবাহিনীর ভূমিকা নিতে এবং পানির দরে জাতীয় স্বার্থকে বিক্রি করতে মোটেও কুণ্ঠিত হবে না।

(বইটির pdf version download করুন এখানে)



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh