eBooks

Latest Comments

উপসংহার Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:30
জাতির ক্রমবর্ধমান অধঃপতন নৈতিক অবক্ষয় ও স্বাধীনতা উত্তর প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিস্তর ব্যাবধান থেকে উৎসারিত গভীর হতাশা সমগ্র জাতিকে টেনে নিয়ে চলেছে সীমাহীন সংকটের দিকে। দেশের অতি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের বুদ্ধিজীবী চিন্তাবিদ রাজনীতিবিদ শিক্ষক সমাজসেবী সকলকে গ্রাস করেছে একই হতাশায়। আমাদের কারোই গন্তব্য জানা নেই, দুর্গতির অতল গহ্বরের দিকে চোখ বন্ধ করে আমরা এগিয়ে চলছি। টাইটানিক ডুবছে, ডুবছে এর নাবিক আরোহী সকলে।

ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন আল মুকাদ্দিমার দ্বিতীয় খণ্ডে লিখেছেন- জনগণের ওপর অর্থনৈতিক শোষণ ও নির্যাতন চালানো হলে তাদের সম্পদ উপার্জনের স্পৃহা নস্যাৎ হয়ে যায়। যখন স্পৃহা নষ্ট হয়ে যায় তখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শ্রম ও সাধনা থেকে তারা হাত গুটিয়ে নেয়। আর জনপদ যখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শ্রম বিমুখ হয়ে পড়ে তখন বাজারে মন্দা দেখা যায়। দেশের বাসিন্দা হয়ে ওঠে কর্ম বিমূখ এবং উজাড় হয়ে যায় নগর বন্দর আর জনপদ। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায় ১৭৫৭ সালে সিরাজের পতনের পর যে সীমাহীন শোষণ ও জুলুম চলে এর প্রতিক্রিয়ায় মাত্র ১ যুগের ব্যবধানে বাংলার মন্বন্তরে দেড় কোটি অর্থাৎ সমগ্র জনগোষ্ঠীর এক তৃতীয়াংশ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এই মৃত্যু ও ধ্বংসের অন্তরালে সক্রিয় ছিল ঔপনিবেশিক শক্তি ও তাদের দালালদের সীমাহীন শোষণ ও দুর্নীতি। একাত্তরোত্তর বাংলার পরিস্থিতির দিকে তাকালে একই চিত্র আমরা দেখতে পাব। একাত্তরোত্তর ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও তাদের সহযোগীদের নির্বিচার লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মাত্র ৩ বছরের মধ্যে মন্বন্ত্বরের মুখোমুখি হতে হয়েছিল এদেশের মানুষকে। ভিয়েতনাম আমাদের অনেক পরে স্বাধীনতা লাভ করেও তাদের অগ্রগতির পালে হাওয়া লাগাতে সক্ষম হয়েছে, মাহাথিরের গতিশীল নেতৃত্ব মালয়েশিয়াকে বিশ্বের উন্নত জাতিতে পরিণত করেছে। শুধুমাত্র আমরা স্বাধীনতার মেকি চেতনা থেকে প্রেরণা লাভের চেষ্টা করছি আর দুর্নীতির বিষাক্ত উদ্ভুত অবয়ব ধারণ করে মৃত্যু যন্ত্রণায় ধুকছি।

আমরা ২শ’ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকারী হয়ে সাবেকী কাঠামোর ক্ষয়ে যাওয়া খোলসটা আকড়ে মুক্তি ও প্রগতির পথ অন্বেষণ করছি। কিন্তু মরীচিকার মত উন্নতি ও প্রগতির স্বপ্ন ক্রমশ দুরে সরে যাচ্ছে। যতদিন যাচ্ছে ততই অধঃপতিত হচ্ছি। সর্বগ্রাসা দুর্নীতি জাতির সর্বনাশ ত্বরান্বিত করে চলেছে। দুর্নীতিবাজ ঔপনিবেশিক দালাল ও তাদের সহযোগীরা জনগণের সম্পদ অব্যাহত শোষণ এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় লুণ্ঠণের মধ্য দিয়ে এদেশের ৯০ শতাংশ মানুষকে দারিদ্র্য সীমার নীচে টেনে নিয়ে চলছে। সরকার পৃষ্ঠাপোকতা দান করে চলেছে সে সব লুটেরাদেরকে যারা সরকারকে ক্ষমতাসীন করেছে লুণ্ঠিত সম্পদের ক্ষুদ্রাংশ বিনিয়োগ করে। ক্ষমতাসীনরা যদিও জনগণের ভোটে নির্বাচিত তা সত্ত্বেও গণ স্বার্থের ব্যাপারে ভ্রুক্ষেপ হীন হয়ে দুর্নীতিবাজ লুটেরাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে চলেছে। লুটেরাদের স্বার্থ এবং ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতা বহির্ভূত নেতৃবৃন্দের স্বার্থের অভিন্নতা রয়েছে।

ইবনে খালদুন লিখেছেন- ‘জুলুম ব্যাপক অর্থবহ, যারা কোন অধিকার ছাড়া সম্পদ আহরণ করে তারা জালিম। যারা অন্যের সম্পদে অন্যায় হস্তক্ষেপ করে তারা জালিম এবং যারা মানুষের ন্যায্য অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করে তারাও জালিম। মালিকানা হরণ কারীরাও সাধারণত জালিম। এসবের খারাপ প্রতিক্রিয়া পড়ে রাষ্ট্রের উপর সামাজিক বিকৃতির আকারে। সর্বস্তরে জনগণের সম্পদ লোপাট ও সর্বাবস্থায় জনগনকে শোষণ করার অনিবার্য পরিণতি থেকে উদ্ভব হয়েছে ব্যক্তি সমষ্টি সমাজ ও রাষ্ট্রীয় বিকৃতি। আজ ব্যক্তি চেতনা ক্লেদাক্ত সংকীর্ণ এবং সার্বজনীন আবেদন ও ঔদার্য থেকে অনেক দূরে। সামষ্টিক চেতনায় বিরাজ করছে তীব্র প্রতিযোগিতা পরস্পরের ঘাড়ে পা রেখে আকাশ ছোয়ার আকাঙ্খা সামাজিক বিপর্যয়ের সূচনা করছে প্রতিনিয়ত। রাষ্ট্রীয় চেতানায় রয়েছে প্রভূত্বের দাপট, জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনের দুর্নিবার, আকাঙ্খা; আর প্রভূত্বের আসন নিরাপদ করার জন্য লুটেরা মাস্তান দুষ্কৃতকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা দানের অলিখিত কার্যক্রম। যে কারণে আজ ৯০ শতাংশ শোষিত বঞ্চিত লুণ্ঠিত মানুষ হতাশা ও বঞ্চনা নিয়ে নিরুপায় হয়ে নির্বিকার চিত্তে দুর্গতির শেষ সীমার দিকে এগিয়ে চলছে।

২০০২ সালের ডিসেম্বরে ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ অর্থাৎ টি আইবি এর রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশে ৭টি দুর্নীতিগ্রস্ত খাত বছরে ঘুষ বাবদ জনগণের কাছ থেকে মোট ৭ হাজার ৮০ কোটি টাকা আদায় করে। এই ৭টি খাতের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে পুলিশ বিভাগ। এই বিভাগ দুর্নীতি বাবদ বছরে আদায় করে ২ হাজার ৬৬ কোটি টাকা, অন্য খাতগুলির মধ্যে নিম্ন আদালত ১ হাজার ১শ ৩৫ কোটি টাকা, সরকারী হাসপাতালগুলো তথা স্বাস্থ্য খাত ১ হাজার ২শত ৫০ কোটি টাকা, শিক্ষা খাত ৯শত ২০ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ খাত ১৮২ কোটি টাকা, কর বিভাগ ১২ কোটি টাকা দুর্নীতি বাবদ আয় করে।’ টি আই বি এর আঞ্চলিক চ্যাপ্টার গুলোর দুর্নীতি বিষয়ক জরিপে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। জরিপে বাংলাদেশের ৭টি খাতের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। পুলিশ বিভাগ কর্তৃক ৮৩.৬ শতাংশ নিম্ন আদালত কর্তৃক ৭৫.৩২ শতাংশ, ভূমি প্রশাসন কর্তৃক ৭২.৭৮ শতাংশ, স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃক ৫৫.৫০ শতাংশ কর বিভাগ কর্তৃক ১৯.২৫ শতাংশ জনগণ দুর্নীতি বা ঘুষের শিকার হয়। ২০০৪ সালে প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাঙ্কের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি বছর সরকারের কেনা কাটায় প্রায় ২৭০০ কোটি টাকার দুর্নীতি করা হয়। সরকার প্রতি বছর প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা মূল্যের পণ্য ও সেবা কেনে। বিশ্ব ব্যাংক পরিচালিত জরিপে তথ্য পর্যালোচনা করে বলা হয়, সরকারী খাতের ক্রয় ব্যবস্থায় যথেষ্ট লুকোচুরি রয়েছে। বাংলাদেশের অর্জন ও চ্যালেঞ্জ শিরোনামে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে ব্যাপক দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিকে সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচীসহ সকল অর্জনের পথে বড় বাধা বলে চিহ্নিত করা হয়।

রাজস্ব আয়ের বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাষ্টমস হাউসে প্রতিদিন ৩০-৩৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়ে থাকে, এখানে অবৈধ লেনদেন হয়ে থাকে আড়াই কোটি টাকা। কতিপয় কাষ্টমস কর্মকর্তা এখানে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে গেছেন। বিগত আওয়ামী সরকারের ৪১ জন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার তালিকা প্রস্তুত হলেও তাদের বিরুদ্ধে আজো কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অথচ ঐসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সম্পদের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকা।

দারিদ্র্য বিমোচনের নামে এনজিওদের সুদী কারবার দারিদ্র্যকে আরো প্রকট করে তুলেছে। প্রত্যেক বছর এনজিওরা ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে দারিদ্র্য বিমোচন, দরিদ্র জনগণকে ৪০ শতাংশ সুদ উৎসর্গ করতে হয়। এনজিওদের উদ্দেশ্যে। স্বাভাবিকভাবে তাদের শক্তি সামর্থ ব্যয় করেও দারিদ্র্যের দুঃসহ সীমানা পার হতে পারেন না এদেশের দুঃস্থ জনগণ। এনজিওদের সুবাদে তারা দরিদ্র থেকে হত দরিদ্রে পরিণত হয়। এ ব্যাপারে এদেশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তরা নির্বাক।

গত ১২ ফেব্রুয়ারী (২০০৭) ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল টিআইবির এক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত টিআইবির এক গবেষণা প্রতিবেদন অষ্টম জাতীয় সংসদে কোরাম সংকটের কথা উল্লেখ করে বলা হয়-‘সংসদ সদস্যদের অনুপস্থিতির জন্য সংসদ কার্যক্রমের ২২৭ ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়েছে, এর ফলে সংসদের ২০ কোটি ৫০ লাখ টাকা অপচয় হয়েছে। ২৭৩ কর্ম দিবসের মাত্র ৯টি কর্মদিবসে নির্দিষ্ট সময়ে অধিবেশন শুরু হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী মোট কার্যদিবসের মধ্যে ১৭৮ দিন এবং প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রী মোট কর্ম দিবসের ২৪৮ দিন অনুপস্থিত ছিলেন। প্রধান বিরোধী দল ২২৩ কর্মদিবস সংসদে অনুপস্থিত ছিল। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এ সংসদে ১৩ হাজার ১৫১ কোটি ৫৪ লাখ টাকার অডিট আপত্তির মধ্যে ১২ হাজার ৫৩৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা অনাদায়ী পড়ে আছে। ১৮৩ জন সংসদ সদস্যের টেলিফোন বকেয়া বিলের পরিমাণ ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

টিআইবি এর প্রতিবেদনে জাতীয় নেতৃবৃন্দের কাণ্ডজ্ঞান বিবর্জিত দায়িত্বহীনতা প্রকট হয়ে ধরা পড়েছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সদস্যরা জনগণের ভাগ্য নির্মাণে যে অমনোযোগী ছিলেন এটাই প্রমাণ করেছে টিআইবি’এর গবেষণা প্রতিবেদন এ অমনোযোগিতার পেছনে রয়েছে ব্যক্তি স্বার্থ। রাজনীতি অর্থ তাদের কাছে এমন একটা উপকরণ যা দিয়ে অতি সহজে প্রভাব প্রতিপত্তি অর্থ সম্মান ও সম্পদ অর্জন করা সহজ। নির্বাচিত হয়ে একারণে তারা গণ স্বার্থের কথা বিবেচনা না করে সম্পদ আহরণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আর সম্পদ আহরণের অবৈধ পথ দুর্নীতির পথে অগ্রসর হয়েছে নির্দ্বিধায়, অগ্রসর হয়েছে কোন রূপ বাছ বিচার না করে। এদের সংসদ অধিবেশনে অংশ গ্রহণের সময় কোথায়।

শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ভুখা নাঙ্গা দেশবাসীর প্রতি কি দারুণ দরদ সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাদের লোভ লালসায় পরিপূর্ণ কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। খালেদা জিয়া সরকারের কাছ থেকে দান হিসেবে ক্যান্টনমেন্টে সাড়ে ১০ বিঘা জমির উপর সুবিশাল ভবন রাজি এবং গুলশানে আর একটি ভবন নিয়েছেন। শেখ হাসিনাও অনুরূপ সরকারী দান হিসেবে নিজের নামে গণভবন এবং বোনের জন্য একটি বিশাল ভবন জাতীয় সংসদে আইন পাস করে নিয়ে নিয়েছিলেন। যদিও নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করতে না পারায় ভবন দুটি তাদের নিজেদের দখলে রাখতে সক্ষম হননি। হাসিনা তার মাতাল মদ্যপ প্রবাসী সন্তান জয়কে রাজনীতিতে টেনে এনেছেন, খালেদা জিয়া তার অযোগ্য, অপদার্থ, অর্ধশিক্ষিত, লোভী সন্তান তারেক জিয়াকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়ে তাকে রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন এটা আর কিছু নয়, বংশানুক্রমিক ক্ষমতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। এর মধ্যেও রয়েছে খালেদা-হাসিনার হীনস্বার্থ। এরা দুজনেই প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা দান করে রাজনীতিতে ছড়িয়ে দিয়েছেন- ভোগবাদী নীতি। এর ফলে রাজনৈতিক দলসমূহের শীর্ষ নেতা থেকে পাতি নেতা পর্যন্ত সকলেই দুর্নীতির পাঁকে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। এমন কোন সংসদ সদস্য নেই যাকে দুর্নীতি স্পর্শ করেনি। দুর্নীতি করার নিত্য নতুন পথ উন্মুক্ত করেছে সরকার। দুর্নীতির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে গাড়ী আমদানীর লাইসেন্স দিয়ে, অন্যায় আরো বহুবিধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে। সেসব এখন ধরা পড়ছে সেনাবাহিনী ব্যাক্টড তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে। এ সরকারই গণদেবতাদের চোখ খুলে দিয়েছে কয়েকশ’ রাজনীতিকের তালিকা প্রদান করে।

এখন এক অথবা দু’কোটি টাকা মূল্যের একাধিক গাড়ীর মালিকের সন্ধান মিলেছে। সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রীর ট্রাডিলাক গাড়ী, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যানের বিলাস বহুল বিএম ডব্লিউ, অনুরূপ গাড়ী সিলেটের এক সাবেক এমপি এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিবের ইনফ্যানিটি কি এক্স-৫০ তিনটি গাড়ি। ঢাকার সাবেক এক এমপির এবং জনৈক সাবেক প্রতিমন্ত্রীর বাড়ী থেকে পাঁচটি করে বিলাসবহুল গাড়ী জব্দ করা হয়েছে। দুর্নীতির বৈচিত্র আমরা প্রতিদিন খবরের কাগজ থেকে জানতে পারছি। বরিশাল বানড়ী পাড়ার সাবেক এমপি ও হুইপ শুধু তার ব্যবহারের জন্য ১০ বছর ধরে সড়ক ও জনপদের একটি ফেরী নিজ দখলে রেখেছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে যে, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপী ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ব খাতের ৪ বাণিজ্যিক ব্যাংকের ১১ হাজার ৫শ ৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে ২০০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ দেশের সবগুলো ব্যাংক ১১ হাজার ৬০৭ কোটি টাকার খেলাপী ঋণ মওকুফ করেছে। এর মধ্যে ৪ রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মওকুফ কৃত ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৯০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

সম্প্রতি দুর্নীতির দায়ে যাদের ব্যাঙ্ক একাউন্ট জব্দ করা হয়েছে তাদের প্রদর্শিত আয়ের চেয়ে অপ্রদর্শিত আয়ের পরিমাণ ৪০ গুণ বেশী। এ ৫৫ জনের অপ্রদর্শিত আয়ের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার ও বেশী। গত ২৭ মার্চ (২০০৮) জাতীয় প্যারেড ময়দানে মুক্তি যোদ্ধাদের সম্মানে আয়োজিত এক চা চক্রে সেনাবাহিনী প্রধান লেঃ জেনারেল মইন ইউ আহমদ বলেন, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকরা দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করেছে। তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলে কেবল বিদ্যুৎ খাত থেকেই বিদেশে পাচার হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা।

গিয়াস উদ্দিন আল মামুন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানের বন্ধু হওয়ার সুবাদে কত অজস্র টাকা অবৈধ পন্থায় অর্জন করেছে তার সঠিক হিসাব এখনো মিলেনি। মামুন স্বীকার করেছে যে, বিদেশী ব্যাংকে তার ৩০০ কোটি টাকা রয়েছে যা সে অবৈধ পন্থায় উপার্জন করেছে এবং অবৈধভাবে পাচার করেছে। এর বাইরেও তার রয়েছে স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি।

দুদকের নির্দেশ মোতাবেক সম্পত্তির হিসেব দাখিল করা বিশিষ্ট ব্যক্তি ও তাদের ৬ পরিবারের কাছে ৮০০ কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে। তাদের হিসেব বহির্ভূত আরো যে অনেক সম্পত্তি রয়েছে সেটা এখনো অনাবিস্কৃত। তবে এই ৬ পরিবারের কাছে ব্যাংক পাবে ৪ হাজার কোটি টাকা। এই ৬ জন হলেন বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহ আলম, আওয়ামী নেতা আকতারুজ্জামান বাবু, আওয়ামী নেতা আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, সাবেক আওয়ামী এমপি হাজী সেলিম, হাজী মকবুল হোসেন, যুবলীগের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির নানক। দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে যে শতাধিক লোকের নাম ও বিবরণ আমাদের সামনে এসেছে এটাকেও বলা যায় যৎকিঞ্চিত। জনগণের বিশাল সম্পদ এখন কয়েক শ’ অথবা কয়েক হাজার লোকের কুক্ষিগত আর এরা সকলেই রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। এই দুর্বৃত্তরা জনগণকে মনে করে তাদের গোলাম। হাসিনার বিরুদ্ধে কয়েকটি দুর্নীতি মামলা ঝুলছে। এখন পর্যন্ত খালেদার নামে  দুর্নীতির মামলা দায়ের না  হলেও তার সন্তান অসংখ্য দুর্নীতির বোঝা কাঁধে নিয়ে কারাগারে। বিগত সময়গুলোতে রাজনীতির নামে হিংসা বিদ্বেষ ছড়িয়ে দ্বন্দ্ব সংঘাতের দিকে তাড়িয়ে নেয়া হয়েছিল জনগণকে এবং সব সময় চলছিল জনগণকে বিভক্ত রাখার প্রয়াস আর যখনই রাজনীতি বন্ধ করা হল তখন আর হিংসা বিদ্বেষ দ্বন্দ্ব সংঘাত হাওয়া হয়ে গেল। এর কারণ কি? এর কারণ হল, জনগণের নামে কায়েমী স্বার্থ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা এখন ক্রিয়াশীল নয়। প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার সাহস তারা হারিয়ে ফেলেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক ডক্টর মইনুল হোসেন ঠিকই বলেছেন- ‘ব্যাংকগুলো সারাদেশ থেকে আমানত কুড়িয়ে এনে ৫০০ লুটেরাদের হাতে ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে তুলে দিচ্ছে এখন ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক খ্যাতে। ১২ হাজার কোটি টাকা অপসরণ অথবা অন্যখাতে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোও দুর্নীতিবাজদের সহযোগী এবং তাদেরকে অধিকতর দুর্নীতিতে নিমজ্জিত করেছে। অর্থনীতিবিদ সমিতির এক ওয়ার্কসপে আইন উপদেষ্টা ব্যারিষ্টার মইনুল হোসেন যা বলেছেন, সেটা মোটেও ফেলে দেয়ার নয়। তিনি বলেছেন, দুর্নীতি ও অপচয় না হলে দেশের প্রবৃদ্ধির হার দুই অঙ্কে পৌঁছে যেত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতি বিরোধী অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে। এ সংক্রান্ত ফিরিস্তি অনেক লম্বা হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে চলমান এই দুর্নীতি বিরোধী অভিযান থেকে যে মজার তথ্য বেরিয়ে আসছে সেটাই এখানে তুলে ধরা দরকার।

বাংলাদেশের ৩৬ বছর অতিবাহিত হলেও পঞ্চমবাহিনী ও দিল্লীর সেবাদাসরা সংঘবদ্ধ হয়ে সমস্বরে আওয়াজ তুলছে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি এবং বিপক্ষের শক্তি বলে। এটা করা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে জাতিকে বিভক্ত রাখার জন্য। তারা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি যাদেরকে বলছে তাদের উপস্থাপন করা হচ্ছে ধোয়া তুলসীর পাতা হিসেবে। যাদেরকে তারা বলছে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি তাদের উপস্থাপন করা হচ্ছে চরিত্রহীন লম্পট ও খলনায়ক হিসেবে। কিন্তু চলমান দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে যাদের পাকড়াও করা হচ্ছে তারা সকলেই স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির একজনের নামও খবরের কাগজে দেখতে পাওয়া যায় না। শেখ মুজিব স্বাধীনতার মূল নায়ক এবং অনুসারীরা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক অতএব এর অনুসারীরা ও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। আওয়ামী লীগ বিএনপির নেতা কর্মীরাই যে সীমাহীন দুর্নীতির পাঁকে নিমজ্জিত এটা প্রমাণিত সত্য এবং দিবালোকের মত পরিষ্কার।

ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামো টিকে থাকার কারণ
সিরাজের পতনের মধ্য দিয়ে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পত্তন হয়েছিল এই বাংলায়, তারা ১৯০ বছর শাসন করেছিল এদেশ। ঔপনিবেশবাদী বৃটিশদের ধারাবাহিক শোষণের মধ্যদিয়ে এদেশে ভয়াবহ দরিদ্র অবস্থার সৃষ্টি হয় স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায়। শোষণকে পাকা পোক্ত করে তোলার জন্য তারা ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামো গড়ে তোলে। এই শোষণমূলক শাসন কাঠামো বিন্যস্ত করার জন্য তিনটি কৃত্রিম স্তর গড়ে তোলে।
(১) সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করে বৃটিশরা জনগণকে শোষণ করার জন্য।
(২) মধ্যবর্তী স্তর গঠিত হয়েছিল বৃটিশদের অনুগত দালালদের নিয়ে। এরাই হল জমিদার ও রাজকর্মচারী। শোষণ সুসংহত করার জন্য মধ্যবর্তী স্তরে দেয়া হয় মেকি আভিজাত্যের প্রলেপ। এরাই জনগণকে শোষণ পীড়ন করার জন্য বৃটিশদের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
(৩) সর্বনিম্ন স্তরে রাখা হয় ৯৯ শতাংশ মানুষকে। যারা তাদের মেধা সৃজনশীলতা ও মেহনত দিয়ে সম্পদ সৃষ্টি করে। এরাই ঔপনিবেশবাদী চক্রের নির্মম শোষণের শিকারে পরিণত হয়।

শেষ কথা
মুর্শিদাবাদের সেই ঐতিহাসিক পলাশী এবং কুষ্টিয়া মেহেরপুরের আম্রকানন খুব বেশী দুরে নয়। মাত্র কতক মাইলের ব্যবধান। দুই আম্রকাননের মধ্যে বিস্তর সাদৃশ্য রয়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। দুই আম্রকাননের ঐতিহাসিক চরিত্রের কোন ভিন্নতা নেই। সমগ্র ভারতে মুসলিম শাসন অবসানের নিমিত্ত সর্ব ভারতীয় ব্রাহ্মণ্য ষড়যন্ত্রের প্রথম সাফল্য দৃশ্যমান হয় পলাশীতে। কুষ্টিয়া মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় আম্রকাননেও অনুরূপ উপমহাদেশে মুসলিম শাসন অবসানের লক্ষ্যে দীর্ঘ মেয়াদী সর্ব ভারতীয় নেপথ্য ষড়যন্ত্র স্বাধীন বাংলার ছদ্মাবরণে বিমূর্ত হয় ১৯৭১ সালে।

উপমহাদেশের খণ্ডিত অংশ সিন্ধুতে ৭১২ খৃঃ মোহাম্মদ বিন কাসেমের সফল অভিযানের মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বৈষম্যমূলক সমাজ কাঠামো প্রকম্পনের শুভ সূচনা হয়। পরবর্তীতে সুলতান মাহমুদ ও মুহাম্মদ ঘোরীর সমরাভিযানের ফলে ভারতের অধিকাংশ এলাকায় মুসলমানদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর ১১৯৭ থেকে ১৫২৫ সাল অবধি তুর্ক আফগান মুসলমানরা সমগ্র ভারতের ওপর তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত রাখে। পরবর্তীতে অনৈক্য ও ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ক্রমশ তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে মধ্য এশিয়ার জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে সমরাভিযানে এসে ১৫২৬ সালে পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীকে পরাস্ত করে রাজধানী দিল্লীকে তার কবজায় নিতে সক্ষম হন। দিল্লী দখলে এলেও তখন পর্যন্ত তার অবস্থান শক্তিশালী হয়নি এমতাবস্থায় তাকে ভয়াবহ সঙ্কটের সম্মুখীন হতে হয়।

মুসলমানদের ভ্রাতৃঘাতী লড়াই চলাকালীন সময়ে হিন্দু রাজা মহারাজারা ভারতে মুসলিম আধিপত্য বিনাশ করার জন্য সঙ্গোপণে সংঘবদ্ধ হতে থাকে। এটা ছিল তাদের হিন্দু আধিপত্য পুনরুদ্ধার প্রয়াস। বাবর দিল্লী কবজা করার এক বছরের মধ্যে ভারতের ১২০ জন রাজা মহারাজা সংঘবদ্ধ হয়ে মুসলিম শক্তি উৎখাতের জন্য যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বাধ্য হয়ে বাবরকে আকস্মিক সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। বাবর তার মাত্র ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে প্রতিপক্ষের ৫০ হাজার অশ্বারোহী ৫শ’ রণহস্তী এবং লক্ষ লক্ষ পদাতিক সৈনিকের মুকাবিলা করে আগ্রার অদূরে খানুয়ায় সম্মিলিত হিন্দু শক্তিকে বিধ্বস্ত করে দেয়। সেই থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের মুসলিম শক্তিকে মুকাবিলার উচ্চাশা নিঃশেষ হয়ে যায়। এমতবস্থায় থেকে তারা কৌশল বদলে ফেলে এবং সম্মুখ সমর পরিহার করে। যে কৌশলে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বৌদ্ধবাদীদের উপমহাদেশ থেকে উৎখাত করেছে সেই কূটকৌশল দিয়ে মুসলমানদের উৎখাতের উদ্যোগ নেয়। মুসলিম শক্তির সাথে বৈরিতা নয় সখ্য বজায় রেখে চলার নীতি অবলম্বন করে। তারা আপোষে কন্যা দান করে, তোষামোদ ও এক ধরনের মেকি আনুগত্য প্রদর্শন করে তৎকালীন রাজনীতির নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয় এবং অন্দর মহল ও রাজ দরবারকে অক্টোপাশের মত বেধে ফেলে এ ছাড়াও পরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় অতি সন্তর্পণে মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্যের বীজ বপন করে চলে। তাদেরই প্ররোচনায় মুসলমানরা ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এসবের অনিবার্য পরিণতি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে পলাশীতে। মুসলিম শক্তি বিনাশের ব্যাপারে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের কূটকৌশল খানুয়ার যুদ্ধোত্তর ১৯৫ বছর ব্যবধানে সাফল্যের মুখ দেখে পলাশীতে। সেটাও বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে অন্যের ঘাড়ে বন্ধুক রেখে এবং মীর জাফরকে শিখণ্ডি বানিয়ে।

অন্যদিকে কায়দে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর অনমনীয় নেতৃত্ব তার দূরদর্শিতা এবং তার ক্ষুরধার যুক্তির কাছে হার মেনে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন যখন ভঙ্গ হল তখনই তারা পাকিস্তানকে অখণ্ড ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়। পরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে তারা আগ্রাসনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। জুনাগড় মানভাদার এবং হায়দারাবাদ দখল করে কাশ্মীরের দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু সেটা আগের মত বিনা যুদ্ধে জয় সম্ভব হয়নি। প্রবল গণ প্রতিরোধের মুখে থমকে দাঁড়াতে হয় দিল্লীকে। সহজে কাশ্মীরকে গেলা সম্ভব হল না। গলার কাঁটা হয়ে আজো কাশ্মীর ভারতকে যন্ত্রণা দিচ্ছে।

কাশ্মীরের পর তাদের লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের দিকে। ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তান দখলের নীল নক্সা প্রণয়ন করেও দিল্লী তার লক্ষ্য থেকে ফিরে আসে। কারণ সেই সময় আর এক কাশ্মীর সৃষ্টি করে যন্ত্রণার আগুনে ঝাপ দেয়া প্রধানমন্ত্রী নেহেরু ভারতের জন্য কল্যাণকর বিবেচনা করেননি। তখন পূর্ব পাকিস্তান দখলের উদ্যোগ নিলে হয়তো আসাম ত্রিপুরাও বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা হিন্দুস্তানের তৎকালীন আগ্রাসনকে একাত্তরের মত সাদর সম্ভাষণ জানাত এমনটি নয়। অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা ও সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে হিন্দুস্তানী আক্রমণ প্রবল প্রতাপে প্রতিরোধ করতো। এমন কি এ যুদ্ধ গণ যুদ্ধের রূপ নিত এবং বিক্ষুদ্ধ অহমিয়ারাও জড়িয়ে পড়ত তাদের সাথে। পরবর্তীতে এ আগুন ছড়িয়ে পড়ত ভারতের সর্বত্র। একারণে ব্রাহ্মণ্যবাদী নেতৃবৃন্দের প্রবল চাপ থাকা সত্ত্বেও ঠান্ডা মাথায় নেহেরু পূর্ব পাকিস্তানে আগ্রাসনের সিদ্ধান্ত নিয়েও কার্যকর করেননি।

সেই সময় তারা যুদ্ধ পরিহার করলেও এমন একটা কৌশল অবলম্বন করলেন যে, প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণের একটা অংশকে কায়দে আযম, পাকিস্তান এবং মুসলিম লীগের প্রতি বিরূপ করে তোলা যায়। শুরু হল অপ-প্রচার, কায়দে আযম পাকিস্তান ও মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে। বলা হল বাংলা বিভক্ত হয়েছে মুসলিম লীগের কারণে। বলা হল জিন্নাহ কোলকাতা নেয়নি করাচীকে রাজধানী বানানোর জন্য ইত্যাদি ইত্যাদি। ইতিহাসের বিপরীত চিত্র অবলম্বন করে প্রচারাভিযান চলতে থাকল। পাকিস্তান ভুমিষ্ট হওয়ার আগেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে পাকিস্তান বিরোধী করার নীল নক্সা তৈরী করে রেখেছিল ব্রাহ্মণ্যবাদী বিশেষজ্ঞরা, কোলকাতা থেকে পরিচালিত কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির মাধ্যমে। ভারতের প্ররোচনায় ভারতের আর্থিক সহযোগীতায় ভাষা আন্দোলনের সূচনা হল। ভারতীয়রা এমন কি পশ্চিম বঙ্গের বাংলা ভাষীরা হিন্দি ভাষাকে সমগ্র ভারতের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে মেনে নিলেও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে রাষ্ট্র ভাষা উর্দুর বিরুদ্ধে বিক্ষুদ্ধ করে তোলার জন্য ইন্ধন যোগাতে লাগল, নৈতিক ও বৈষয়িক সহযোগিতা দান করে। কোলকাতা থেকে পরিচালিত কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট পাটি এবং দিল্লীর সাহায্য পুষ্ট লঘুচেতা বুদ্ধিজীবিরা সুকৌশলে পূর্ব পাকিস্তানের অবহেলা ও বঞ্চনার সব দায়-দায়িত্ব মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে কিস্তিমাত করে তুলল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকারী দল মুসলিম লীগের অনিবার্য পতনের মধ্য দিয়ে প্রকৃত পক্ষে শুরু হল ভারতের অগ্রাভিযান।

এভাবে পেরিয়ে গেল পাকিস্তানের কয়েকটা বছর। রাজনৈতিক অরাজকতার প্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আইয়ুব খান, গভর্ণর আব্দুল মোনয়েম খান দীর্ঘকালের বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নিলেন। অজস্র কলকারখানা স্থাপিত হতে থাকল। জনগণের জীবনের মান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়া শুরু হল। পরিকল্পনা মাফিক ১৯৭০ সাল নাগাদ সব রকম বৈষম্য অবসানের কথা ছিল। কিন্তু দিল্লী সেটা হতে দিতে চাইল না। এ কারণে ভারত পঞ্চমবাহিনী নির্ভর কোন পরিকল্পনা না নিয়ে স্বনির্ভর কর্মসূচী নিল। সেটা শক্তি প্রয়োগ করে পাকিস্তানের ওপর তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। পরিকল্পিতভাবে পাকিস্তানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়। এটা এই কারণে করা হল যে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে পাকিস্তানকে এগিয়ে যেতে দেয়া হলে পাকিস্তানের ঐক্য অটুট থাকবে এবং শীসাঢালা প্রাচীরের রূপ নিবে, যা হবে এমনই দুর্ভেদ্য যে দিল্লী এখানে কখনই তার গোপন অভিলাষ চারিতার্থ করতে সক্ষম হবে না। পরিকল্পিত যুদ্ধের সহায়ক হিসেবে ১৯৬২-৬৪ সালে ভারতে মুসলিম নিধনযজ্ঞ শুরু করা হল। ভারত থেকে বিতাড়িত সর্বহারা মুসলমানদের পুনর্বাসন নিয়ে পাকিস্তানের অর্থনীতির উপর প্রবল চাপের সৃষ্টি করা হল।

এরপর ১৯৬৫ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর ৮০০শত ট্যাঙ্ক এবং বিশাল নৌবহর ও বিমান বহর নিয়ে দিল্লী লাহোর ওয়াগা সেক্টর দিয়ে পাকিস্তানের ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। উদ্দেশ্য ছিল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লাহোর দখল করা এবং পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডকে তছনছ করা। এটা সম্ভব হলে পঞ্চমবাহিনী প্রভাবিত পূর্ব পাকিস্তান তো তাদের জন্য নস্যি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে ১৭ দিন লড়াই করার পরও ভারত বেশী অগ্রসর হতে পারল না। ভারত যতখানি এলাকা দখল করল পাকিস্তান দখল করল তার চেয়ে অনেক বেশী।

খানুয়ায় বাবরের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল দিল্লী অনুরূপ অভিজ্ঞতা অর্জন করল ৬, সেপ্টেম্বর, ১৯৬৫ লাহোর আক্রমন করে। তখন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার দূর্ভেদ্য ঐক্য দেখে দিল্লী যুদ্ধ পরিহার করল। শুরু হল ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। পূর্ব পাকিস্তানে ভারত সৃষ্ট পঞ্চমবাহিনীদের সক্রিয় করে তোলা হল। পত্র পত্রিকায় ঘাপটি মেরে থাকা পঞ্চমবাহিনী সক্রিয় ও সরব হয়ে উঠল। তিলকে তাল বানিয়ে তারা তাদের প্রচারনাকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুলল। মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলামী পিডিপিসহ অন্যান্য আরো দেশপ্রেমিক সংগঠনগুলোও প্রচারনার তোড়ে ভেসে গেল। তারা আন্দোলনের অংশীদার হয়ে উঠল পরিণতির কথা বিবেচনায় না এনে। ভারতের জন্য এই সময় প্রয়োজন ছিল মীর জাফরের মত একজন সর্বজন গ্রাহ্য শিখণ্ডির- যাকে সামনে রেখে আন্দোলনকে তুঙ্গে নেয়া যায়। সেটাও ম্যানেজ হল। শেখ মুজিব পঞ্চমবাহিনীর বরপূত্র হিসেবে আবির্ভূত হলেন। পাকিস্তান নব্য মীর জাফর সনাক্ত করতে ভুল করেনি। ইতোমধ্যে আগড়তলা ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটিত হল। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান, গভর্ণর আব্দুল মোনয়েম খান মুজিবকে আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী করলেন। কিন্তু তার বিচার পর্যন্ত অগ্রসর হওয়া সম্ভব হল না। একপেশে প্রচারণা এবং উত্তরোত্তর আন্দোলনের তোড়ে আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী পরিণত হলেন সমকালীন রাজনীতির প্রধান ব্যক্তিত্বে। কি দূর্ভাগ্য আমাদের, যে ভারত পূর্ব বাংলার স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে শুরু থেকে আজ অবধি স্বীকার করেনি, সেই ভারতের একজন ক্রীড়নক পরিণত হল জাতীয় হিরোতে। কি বিচিত্র এই দেশ সেলুকাস!

১৯৭০-এ নির্বাচন হল। সীমাহীন প্রচারনা ও শক্তি প্রয়োগের মধ্য দিয়ে দিল্লীর শিখণ্ডি শেখ মুজিবেরই হল নিরঙ্কুষ বিজয়। নির্বাচনের পর যে কোন মূল্যে পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে কৃত অঙ্গীকার থেকে মুজিব সরে দাঁড়ালেন। এমন কি সমগ্র পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী হওয়াকেও এড়িয়ে আঞ্চলিক রাজনীতির মহানায়ক হওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। তার বিবেক বুদ্ধি দিয়ে নয়-দিল্লী প্রণীত নীল নক্সার ছক অনুযায়ী। যে কোন মূল্যে পাকিস্তান টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে ইয়াহিয়ার সদিচ্ছা প্রসূত অনুরোধ শেখ মুজিব উপেক্ষা করলেন- মঞ্চে সরব ভাবাবেগে আপ্লুত জনগণ মুজিবের নেপথ্য কর্মকান্ডের ব্যাপারে রয়ে গেল অন্ধকারে। এটা সম্ভব হয়ে ছিল কমিউনিষ্ট ও আঞ্চলিকতাবাদী বাম সাংবাদিকদের মিডিয়ায় প্রাধান্য থাকার কারণে। মুজিবের প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবী তথাকথিত স্বাধীন বাংলার দাবীতে পরিণত হল। ইয়াহিয়া বিতর্কিত ৬ দফা মেনে নিয়ে হলেও- যে কোন মূল্যে পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার সদিচ্ছা নিয়ে ঢাকায় এলেন। মুজিব, ইয়াহিয়ার কাছে নির্বাচন পূর্ব এবং নির্বাচনোত্তর অঙ্গীকার এড়িয়ে সরাসরি স্বাধীনতার দাবী উত্থাপন করলেন। নির্বাচনের আগে মুজিব কখনো স্বাধীনতার কথা বলেননি। স্বাধীনতার প্রশ্নে মুজিবের আপোষহীন অবস্থানের কারণে সংলাপ ব্যর্থ হল। ওদিকে মুজিব ও আওয়ামী লীগ অসহযোগ আন্দোলনের নামে প্রশাসনিক অচলাবস্থা সৃষ্টি করে, অরাজকতার শেষ প্রান্তে নিয়ে এলেন দেশকে। খুনী ও লুটেরাদের সংঘবদ্ধ করে আওয়ামী লীগ অবাঙালীদের সম্পদ লুট করল। নির্বিচার গণহত্যা ও ধর্ষণ চালিয়ে কম পক্ষে ৬০ হাজার অবাঙালী বনি আদমকে নিঃশেষ করা হল ঠাণ্ডা মাথায়। এতে হিন্দুস্তানের বর্বর খুনী লম্পটদেরও ব্যবহার করা হয়েছিল। সবকিছু জেনেও সমকালীন মানবতাবাদীরা ও মিডিয়াসমূহ নীরব ছিল। এই অবাঙালী মুসলমান গণহত্যাও ছিল দিল্লীর সুদূর প্রসারী নীল নক্সা। দিল্লী জানতো যে ব্যাপারটা এখানেই থেমে থাকবে না। দিন বদলের পর নির্যাতীত অবাঙালী ও অবাঙালী সৈনিকরা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে এবং বাঙলাভাষীদের ওপর চড়াও হবে। হলোও তাই, পাক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়াকালীন কিছু হত্যা ও কিছু নিপীড়নের ঘটনা ঘটল। এসব ঘটনা তিলকে তাল করে প্রচারিত হল বহির্বিশ্বে ভারতীয় মিডিয়ার কল্যাণে যাতে তরুণদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়। এর ফলে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীসহ সব ধরনের অগণিত মানুষ ভারতে আশ্রয় নিল। অবশেষে এরাই পরিণত হল তৎকালীন রাজনীতির দাবার ঘুটিতে। এদের ব্যবহার করে দিল্লী পূর্ব পাকিস্তানে ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড শুরু করল। যাদের দেশ তারাই হিন্দুস্তানের ক্রীড়নক হয়ে স্বদেশে আত্মঘাতী কর্মকান্ডে লিপ্ত হল। দিল্লী রয়ে গেল নেপথ্যে। কি দারুন সূক্ষ্ম পরিকল্পনা। অবশেষে ২৪ বছরের ধারাবাহিক পরিকল্পনার ইতি টানতে চাইল ভারত কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় যা এখন মুজিব নগর হিসেবে খ্যাত। সেখানে বাংলাদেশ সরকার গঠন করে। আপোষের পথ বন্ধ হয়ে গেল। ভারতে আশ্রয় নেয়া নেতৃবৃন্দ সেনাবাহিনী বিডিআর অফিসার, জোয়ান ও অন্যান্য তরুণদের সামনে লড়াই ছাড়া বিকল্প কিছু রইলো না। ভারত যুদ্ধের যোগান দিল অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ করে। শুরু হল ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ উভয় পক্ষে নিহত হল মুসলমান। ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ তুঙ্গে নেয়া হল পাক বাহিনীকে বেসামাল করার জন্য। এক পর্যায়ে ভারত পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করে বসলো। অবশেষে পাক বাহিনীর আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে সবকিছুর সমাপ্তি হল। ভারতীয় বাহিনীর বুটের নীচে নিস্পিষ্ট হয়ে নীরবে কাঁদতে থাকল আমাদের পূর্ব পুরুষদের অর্জিত পূর্ব পাকিস্তান। হাজার বছর পর বিজয়ী হল ব্রাহ্মণ্যবাদীরা খানুয়ার যুদ্ধের ১৯৫ বছর পর ব্রাহ্মণ্যবাদীরা তাদের পরাজয়ের গ্লানী দূর করল পলাশীতে, মুসলিম আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে। অন্যদিকে অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতা এবং ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান দখলের ব্যর্থতা ও পরাজয়ের গ্লানী দূর করতে সক্ষম হল মাত্র ৭ বছরের ব্যবধানে। দিল্লীর এ বিজয় ও সাফল্যের ব্যাপারে সব কিছুর যোগান দিলাম আমরা।

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা’র পতন ও তার হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল তারই সেনাবাহিনীর অধিনায়করা এমন কি তখনকার জনগণও। অনুরূপ পূর্ব পাকিস্তানের পতনেও এদেশের সামরিক কর্মকর্তা, জোয়ান এবং জনগণের অধিকাংশকে দেখা গেছে আনন্দে উদ্বেল হতে, পলাশীতে মুসলিম আধিপত্যের অবসান হলেও ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তি প্রত্যক্ষভাবে বিজয়ী হওয়ার গৌরব অর্জন করেনি। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান পতনের মধ্যে দিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা মুসলিম শক্তির ওপর প্রত্যক্ষভাবে বিজয়ী হয়েছে। তাদের এ বিজয় হাজার বছরের মধ্যে এই প্রথম। পলাশীতে সিরাজের পতনের পর গণ মানুষের সম্পদ, রাজকোষ লুণ্ঠন নৈরাজ্য এবং সীমাহীন শোষণের সূচনা হলে রাজনৈতিক বিশৃংখলা ও অনাচারের ফলে সমগ্র বাংলায় দুর্ভিক্ষ কড়া নাড়তে ১৩ বছর সময় নিয়েছিল। কিন্তু এখানে ভারতীয় সেনা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের লুণ্ঠন এমন বেপরোয়া হয়েছিল এবং সামাজিক বিশৃংখলা নৈরাজ্য ও রাজনৈতিক অনাচার এমন তুঙ্গে উঠেছিল যে বৈদেশিক সাহায্যের প্রবাহ অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও মাত্র ৩ বছরের ব্যবধানে শেখ মুজিবের স্বাধীন বাংলায়  মন্বন্তর ও দুর্ভিক্ষ উলঙ্গ নৃত্য করেছে।

এবার আর এক বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা যাক সেটা হল সিরাজের পতন এবং পূর্ব পাকিস্তানের নেপথ্য ষড়যন্ত্রকারী এবং ষড়যন্ত্রের সহযোগীদের মর্মান্তিক পরিণতির মধ্যে সাদৃশ্য। প্রথমে পলাশী ট্রাজেডীর নেপথ্য নায়কদের পরিণতির কথা স্মরণ করা যাক। সিরাজ হত্যার মূল নায়ক ছিলেন মীর জাফর তনয় মীর মোহাম্মদ সাদেক আলী খান মিরন। মিরন সিরাজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। সিরাজের মাতা আমেনা বেগম এবং ঘষেটি বেগম হত্যার নায়কও তিনি। মিরন নিহত হয় ইংরেজদের হাতে। মেজর ওয়ালেস তাকে গোপনে হত্যা করে।

সিরাজকে প্রত্যক্ষভাবে হত্যা করে মুহাম্মদী বেগ। পরবর্তীতে তার মস্তিস্ক বিকৃতি হয় এবং অকারণে কুপে ঝাপিয়ে মৃত্যুবরণ করে।

পলাশী ট্রাজেডির শিখণ্ডি এবং সিরাজের প্রধান সেনাপতি ছিলেন মীর জাফর আলী খান তিনি পবিত্র কুরআন হাতে নিয়ে সিরাজের পাশে থেকে লড়াই করার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু সেই অঙ্গীকার পূরণ করেননি তিনি। রণাঙ্গণে পুতুলের মত দাড়িয়ে থেকে তিনি ইংরেজদের বিজয়ের প্রতিক্ষা করছিলেন। প্রকৃতি এর নির্মম প্রতিষোধ নিয়েছিল। তিনি দুরারোগ্য কুষ্ঠ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

পলাশী ট্রাজেডির নীল নক্সা প্রণয়নকারী হলেন জগৎশেঠ। ইংরেজদের সাথে মীর কাসেমের যুদ্ধ বাধলে বার বার পরাজিত হওয়ার পর মীর কাসেম উপলব্ধি করেন স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার প্রয়াসে তার ব্যর্থতার মূলে রয়েছে জগৎশেঠ। তিনি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে জগৎশেঠকে মুঙ্গেরের অতুচ্চ দূর্গ শিখর থেকে গঙ্গা গর্ভে নিক্ষেপ করেন। সেখানেই তার সলিল সমাধী হয়।

ইয়ার লতিফ ছিলেন সিরাজের আর একজন সেনাপতি। তিনি ষড়যন্ত্রের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। রনাঙ্গণে তিনি সকল সৈন্যসহ ছবির মত দাঁড়িয়ে সিরাজের পতনের প্রতীক্ষা করছিলেন। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস তিনি সিরাজের পতনোত্তর উৎসবে যোগ দিতে পারেননি, যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে তিনি নিরুদ্দিষ্ট হয়ে যান। হতে পারে কোন দেশপ্রেমিক সৈনিক তাকে হত্যা করেছিল। আর এক ষড়যন্ত্রকারী নন্দকুমার তহবিল তছরূপ এবং অন্যান্য কারণে আদালত কর্ত্তৃক প্রাণদণ্ডে দন্ডিত হন।

রায় দুর্লভ নবাবের একজন সেনাপতি মীর জাফরের সহযোগী হয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা নেন। কিন্তু যুদ্ধ ক্ষেত্রে আততায়ীর হাতে তিনি নিহত হন। উমিচাঁদ ইংরেজ কর্তৃক প্রতারিত হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং উন্মাদ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। রাজা রাজ বল্লভ তার কীর্তি সহকারে পদ্মা গর্ভে বিলিন হয়ে যান। দানিশ শাহ বিষাক্ত সর্প দংশনে মুত্যুবরণ করেন।
রবার্ট ক্লাইভ ছিলেন ষড়যন্ত্রের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। বিজয়ের পর তিনি অনেক সম্পদের মালিক হয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যান। সেখানে তিনি যে কোন কারণেই হোক আত্মহত্যা করেন। কেউ বলে গলায় ক্ষুর চালিয়ে কেউ বলে টেমসে ঝাপ দিয়ে। যাই হোক তার মৃত্যু হয়েছিল অস্বাভাবিক।

ওয়ার্টস মীর জাফরের সাক্ষ্য এনে ষড়যন্ত্রে উল্লেযোগ্য ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে কোম্পানী তাকে বরখাস্ত করে। দেশে ফিরে তিনি মনের দুঃখে আত্মহত্যা করেন। ষড়যন্ত্রের পেছনে ক্র্যাফটনের বিশেষ ভূমিকা ছিল। বাংলার বিপুল সম্পদ লুণ্ঠন করে লণ্ডনে যাবার সময় জাহাজ ডুবিতে তার মৃত্যু হয়। ষড়যন্ত্রকারী ওয়ালটন ভগ্ন স্বাস্থ্য হয়ে কোলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। মীর কাসেম পলায়ন পর নবাব সিরাজকে ভগবান গোলা থেকে বেধে এনেছিলেন মুর্শিদাবাদে। এক পর্যায়ে মীর জাফরকে সরিয়ে ইংরেজরা মীর কাসেমকে নবাবের আসনে সমাসীন করেন। অল্প দিনের মধ্যে ইংরেজদের সাথে মীর কাসেমের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ইংরেজদের সাথে কয়েকটি যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি নিরুদ্দেশ যাত্রা করেন। অবশেষে দিল্লীতে তাকে এক বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে সনাক্ত করা হয়, তার চাপকানে মীর কাসেম লেখার সূত্র ধরে।

উপমহাদেশের নির্যাতিত সংখ্যালঘু মুসলমানদের শেষ ভরসা এবং সর্বশেষ আশ্রয় স্থল হিসেবে পাওয়ার জন্য পাকিস্তান আন্দোলন হয়েছিল। সংখ্যা গরিষ্ঠ বৈরী হিন্দু জনগোষ্ঠীর নিষ্পেষন থেকে আত্মরক্ষার জন্য এবং আমাদের অনাগত ভবিষ্যৎ নিরাপদ করার জন্য আমাদের পূর্ব পুরুষরা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বিরোধীতার মুখে অখণ্ড ভারতের মানচিত্র কেটে দুই ডানা বিশিষ্ট পাকিস্তান ছিনিয়ে এনেছিল। আমাদের পূর্ব পুরুষদের এই আমানত ধ্বংস করার জন্য যারা ষড়যন্ত্র করেছে তারা পলাশী ষড়যন্ত্রের নায়কদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়, বরং তা থেকে আরো বেশী মর্মান্তিক আরো বেশী ভয়ঙ্কর পরিণতির সম্মুখীন হয়েছে।

পূর্ব পাকিস্তানের দুঃসহ ট্রাজেডীর মূল হোতা তিন কুচক্রী মুজিব, ভুট্টো এবং ইন্দিরা। এই তিন জনের মৃত্যু অস্বাভাবিক, মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক এর মধ্যে শেখ মুজিবকে হত্যা করেছে তারই সহগামী মুক্তি যোদ্ধা সৈনিকরা যারা এক সময় ছিল মুজিবের সম্মোহনী শক্তির আওতায় নিয়ন্ত্রিত নেশা গ্রস্তের মত বুদ হয়ে। তথাকথিত সোনার বাংলার যে অলীক স্বপ্ন মুজিব দেখিয়েছিলেন সেই স্বপ্ন ভঙ্গের যন্ত্রনায় তারই অনুগামী মোহাবিষ্ট সৈনিকরা তাকে হত্যা করেছে। পচাত্তরের ১৫ আগস্ট একাত্তরের সেই জনপ্রিয় মহানায়কের সবংশ হত্যাকান্ডের ব্যাপারে কোন ধরনের মৃদু প্রতিক্রিয়া কোথাও হয়নি। এদেশের কোন একজন ও অশ্রু বিসর্জন করেনি বরং জনগণের ওপর চেপে থাকা জগদ্দল পাথর উপড়ে ফেলার জন্য উল্লসিত হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা ষড়যন্ত্রকারী মীর জাফরদের বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশোধ অথবা তার অপকর্মের সাজা  সমকালীন কোনো দেশপ্রেমিক সচেতন বিবেক দিতে সক্ষম হয়নি। মীর জাফর দুরারোগ্য কুষ্ঠ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু মুখে পতিত হন। এটা ছিল কুদরতী ফয়সালা, প্রকৃতির নির্মম প্রতিশোধ। কিন্তু মুজিবের ক্ষেত্রে ঘটেছে ভিন্ন, তিনি যাদের একদিন তার অপকর্মের সহযোগী হওয়ার জন্য উন্মাতাল করেছিলেন তারাই তাকে হত্যা করে দেশটাকে শেষ রক্ষা করেছেন। মুজিব হত্যার পর পরই দিল্লীমুখী স্রোত উজানে বইতে শুরু করে। মুজিবের অপকর্মের সহযোগী এসব মুক্তি যোদ্ধারা বিভ্রান্তির পাঁক থেকে বেরিয়ে এসে প্রমাণ করেছেন যে তারা সত্যিকার অর্থে দেশপ্রেমিক।

আর এক কুচক্রী পশ্চিম পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো নিহত হয়েছেন তারই মনোনীত সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াউল হকের শাসনামলে। আদালতের বিচারে তার ফাঁসির নির্দেশ দেয়া হয়। পূর্ব পাকিস্তানের দুঃসহ ট্রাজেডীর জন্য তার চাতুরীপূর্ণ অবস্থান কম দায়ী নয়।

পূর্ব পাকিস্তানে ভ্রাতৃঘাতী লড়াই অকারণ হত্যাযজ্ঞের নীল নক্সাতো ছিল তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর-মুজিব ছিলেন তার ক্রীড়নক মাত্র। ইন্দিরার পরিণতি কি হয়েছিল? অতি সতর্কতার পরও তার দেহ রক্ষীদের ব্রাস ফায়ারে একেবারে ঝাঝরা হয়ে গিয়েছিল তার সর্বাঙ্গ।

জেনারেল ভগবৎ সিং নিজে একজন উচ্চপদস্থ সেনা শিখ কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি একাত্তরে জেনারেল ওবানের সাথে বাংলাদেশের মুক্তি বাহিনীর ট্রেনিং এর পরিকল্পনা বাস্তব ট্রেনিং প্রদান ইত্যাদি কাজে যুক্ত ছিলেন। জেনারেল অরোরা যিনি কিনা একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করার সেনা নায়ক ছিলেন। তিনিও একজন শিখ ছিলেন। শিখদের মুসলিম বৈরীতার ইতিহাস সুদীর্ঘ। হয়ত এ কারণেই জেনারেল অরোরাকে ইন্দিরা পূর্ব পাকিস্তান আক্রমন করার প্রধান সেনা নায়ক নিযুক্ত করেছিলেন। যাহোক ভগবৎ সিং ও একই কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দান ও পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য তাদের যথেষ্ট উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস যে এই ভগবৎ সিং পরে ১৯৮৪ সালের ৫ই জুন যখন ভারতীয় সেনাবাহিনী অপারেশন ব্লু স্টার এর মধ্যে দিয়ে শিখদের অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দির ও আকালতখত ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। খালিস্তান আন্দোলনের নেতা বিন্দ্রানওয়ালেসহ অনেক শিখ স্বাধীনতা কর্মীকে ভারতীয় সৈন্যরা হত্যা করে, তখন বিন্দ্রানওয়ালে ভগবৎ সিং ও সেখানে ভারতীয় সেনাদের হাতে গুলিতে প্রাণ হারাণ। বাংলাদেশ স্বাধীন করায় ভগবৎ সিং-এর অবদান থাকলেও নিজেদের দেশ খালিস্তান ভারতীয় বাহ্মণ্যবাদী দখলদারিত্ব থেকে আজও স্বাধীন হয়নি। দেখুন জেমস জে নোভাক এর বাংলাদেশ রিফ্লেকশান্স অন দি ওয়াটার, ইউপিএল, ঢাকা, ২০০৮, পৃ, ১২৪ ও ১৩০)

মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে যারা প্রবাসী সরকার গঠন করেন- তাদের প্রভাবশালী ৪ জনকে হত্যা করা হয়েছিল- ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে। আর এক নতুন ষড়যন্ত্র করার সুযোগ দেয়নি দেশপ্রেমিক সৈনিকরা। নিহতদের মধ্যে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজুদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং কামরুজ্জামান।

শেখ মুজিব পাক বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পনের পর- হয়তো বা স্বাধীন বাংলার আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যেত। মুজিবও হয়তো এটাই চেয়েছিলেন। তিনি ‘র’ নিয়ন্ত্রিত জঙ্গী ছাত্র ও তরুণদের বেষ্টনী থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আত্মসমর্পন করেছিলেন। অনেক পর্যবেক্ষকদের ধারণা পাকিস্তান আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে তাদেরই সংগ্রামের ফসল পাকিস্তানকে শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হতে দিতে চাননি শেখ মুজিব। শেখ মুজিবের আত্মসমর্পনের পর মেজর জিয়া চট্টগ্রামের কালুর ঘাটে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে স্তিমিত হয়ে যাওয়া আন্দোলনকে শুধুমাত্র চাঙ্গা করলেন বললে ভুল হবে, আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন। সশস্ত্র সংগ্রামের আহবান জানিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত বাংলা ভাষী পাকিস্তানী সেনা সদস্য, ইপিআর, পুলিশ ও আনসারদের স্বাধীন বাংলার জন্য লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করেছে তার এ ঘোষণা। বাংলাদেশোত্তর পরিস্থিতিতে মেজর, পরবর্তীতে জেনারেল জিয়া মীর কাসেমের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। মীর কাসেম যেমন বিজয়ী বৃটিশদের হুকুম তামিল না করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন অনুরূপ জেনারেল জিয়া দিল্লীর নেপথ্য কর্তৃত্ব থেকে বাংলাদেশকে রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। তাকেও নির্মমভাবে নিহত হতে হল তারই সহকর্মী অথবা তারই নিম্নস্থ অফিসারদের হাতে। সংগ্রামের শুরুতে তিনি যেমন করে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে তার উপরস্ত অফিসার শিশু নারীকে নির্দয়ভাবে ব্রাস ফায়ারে হত্যা করেছিলেন অনুরূপভাবে তিনিও নিহত হলেন তার সহকর্মী অথবা তার নিম্ন অফিসারদের ব্রাস ফায়ারে একেবারে ঝাঝরা হয়ে। আল্লাহর বিচার কি নির্মম নিক্তিতে মাপা। নিউটনের তৃতীয় সূত্র প্রত্যেক ক্রিয়ার সম-মূখী বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

(বইটির pdf version download করুন এখানে)


Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh