Home EBooks দুই পলাশী দুই মীরজাফর গ্রন্থকারের কথা

eBooks

Latest Comments

গ্রন্থকারের কথা Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:05
এদেশে জাতিসত্তার বিভাজন চলছে। বাংলাদেশের সূচনা পর্ব থেকে আজ অবধি তিন তিনটা যুগ অতিবাহিত হলেও এদেশে বিভাজন প্রক্রিয়া থেমে থাকেনি। কারণটা কি? ভারতের জাতিসত্তায় সম্ভাব্য শতাধিক ভাঙনের চিড়ধরে আছে। কিন্তু এর উৎকট প্রকাশ উচ্চকিত হয় না কখনো। সেখানকার সংবাদ মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আচরণে অথবা রাজনৈতিক কর্মসূচীতে সরব ভাঙন প্রক্রিয়া অনুপস্থিত যদিও সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে।

কিছু অসংলগ্ন অভিব্যক্তির গুঞ্জন আবর্তিত হওয়া সত্ত্বেও প্রত্যেকটি জাতিসত্তায় ঐক্যের অনুরণন পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু কি দুর্ভাগ্য আমাদের পঞ্চমবাহিনী বিশ্বাসঘাতকরা জাতিসত্তা বিভাজন প্রক্রিয়ার বিশেষ বিশেষ দিবসের সুনির্দিষ্ট ল্যাণ্ডমার্কসমূহ উচ্চকিত করে বছরে কয়েক মাস ব্যাপী অপপ্রচারের জোয়ার আনে এবং দেশপ্রেমিক জনগোষ্ঠীর একাংশকে অপশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে জাতি সত্তাকে অনৈক্যের আবর্তে নিক্ষেপ করে চলেছে প্রতিনিয়ত পরিকল্পিতভাবে। কিন্তু কেন?
এই কেন? এর উত্তর অনুসন্ধানের আকাঙ্খা কারো কারো মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না এমনটি নয়। কিন্তু পঞ্চমবাহিনী ও তাদের সহযোগী শক্তিসমূহের সমস্বর কলকাকলি, সরব উল্লাস ও আবেগময় উচ্ছ্বসিত প্রচারণার তোড়ে অনুসন্ধানীদের আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে যায় অপমৃত্যুর অতল গহ্বরে। একারণে আজকের ইতিহাস একপেশে। এই একপেশে ইতিহাসে পঞ্চমবাহিনী বিশ্বাসঘাতকদের আজ জাতীয় বীর হিসেবে আর দেশপ্রেমিকদের অপশক্তি ভিলেন হিসেবে চিহ্নিত করে চলেছে।

ভারতে যারা বহিরাগত তারা ভূমি সন্তানদের মাথার ওপর ছড়ি ঘুরাচ্ছে। ১৫ শতাংশ বহিরাগত ৮৫ শতাংশ ভূমি সন্তানদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে রেখেছে। ভারতের ১৫ শতাংশ ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতের ৮৫ শতাংশ সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছে, বহুকাল ধরে এখানকার ৮৫ শতাংশ মানুষ নিপীড়িত হয়ে চলেছে এবং নীরবে অশ্রু বিসর্জন করছে আজ অবধি।

শতাব্দীর পর শতাব্দী এই বহিরাগত ব্রাহ্মণ্যবাদীরা তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে। এই আধিপত্যবাদী শক্তির কায়েমী স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবার সম্ভাবনা যে সব উপাদানে নিহিত রয়েছে সে সব উপাদানের শক্তি ও সামর্থ্য ফোকলা করে দেয়ার জন্য নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হয় তাদের নিজেদের আধিপত্যবাদী কায়েমী স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখার জন্য।

এখন কিছু জিজ্ঞাসা উপ্ত হওয়া স্বাভাবিক, বহিরাগত প্রতিরোধকামী সংখ্যাগুরু ভূমি সন্তানরা পর্যুদস্ত হয়েছিল কিভাবে? কিভাবে আজো তারা ভূমি সন্তানদের মাথা তোলার সাহস কেড়ে নিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীকে দুর্বল দলিত করে রেখেছে, আমরা জানি না। কিভাবে প্রগতিশীল শক্তি বৌদ্ধবাদীদের উত্থান হয়েছিল? শতাব্দীর পর শতাব্দী  ভারত শাসন করা সত্ত্বেও কিভাবে তাদেরকে ভারত ভূমি থেকে উৎখাত ও বিতাড়িত হতে হয়েছিল আমরা তা জানিনা। কিভাবে এই ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তি প্রবল প্রতাপশালী মুঘলদের কুড়ে কুড়ে নিঃশেষ করে বৃটিশ বেনিয়াদের হাতে তুলে দিয়েছিল আমরা তা জানিনা। কিভাবে বাংলার মুসলমানদের শৌর্য বীর্য কেড়ে নিয়ে একবারে লাঙ্গলের পেছনে ঠেলে দিয়ে পর্যুদস্ত ব্রাহ্মণ্য শক্তির উত্থান ঘটিয়েছিল আমরা তা জানিনা। আমরা জানিনা বৃটিশ শাসন অবসানে সর্বভারতীয় মুসলমানদের সংগ্রামের ইতিহাস। কায়দে আজমের দূরদৃষ্টি ও অনমনীয় নেতৃত্বে ব্রাহ্মণ্যষড়যন্ত্রের অক্টোপাস ছিন্ন করে ভারতের মানচিত্র ভেঙে মুসলিম ভুখণ্ড পাকিস্তানের অভ্যুদয় উপমহাদেশ এবং দুনিয়ার মুসলমানদের জন্য আশির্বাদ ছিল কিনা। আমরা জানিনা বাংলা খণ্ডিত হওয়ার ব্যাপারে ব্রাহ্মণ্য ষড়যন্ত্রের ইতিবৃত্ত। আমরা জানিনা সাত চল্লিশে মুসলিম বাংলার নব উত্থান, অতঃপর আবারো স্বাধীনতা মুক্তি ও তথাকথিত সোনার বাংলার আদলের নবতর বিপর্যয়। সমৃদ্ধির পথ থেকে পদস্খলন এবং আবারো তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হওয়ার সত্যিকার ইতিহাস। এসব ইতিহাসের বড় বড় বাঁকগুলোকে আমাদের দৃষ্টি সীমানা থেকে সরিয়ে রাখার অদম্য প্রয়াস চলছে তথ্য ও ইতিহাস বিকৃতির মধ্যদিয়ে। অপ্রাসঙ্গিক ও আবেগ নির্ভর বিষয়গুলোর অবতারণা করে বিভাজন প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখে জাতিসত্তাকে ভাঙতে ভাঙতে শক্তিহীন নিষ্ক্রিয় করে ফেলেছে। অথচ আমরা স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে নেশাগ্রস্তের মত ঢুলছি।

ইতিহাসের সত্যিকার উপলব্ধি থেকে আমরা অনেক দূরে। আমি আমার অনুভব ও গভীর উপলব্ধি দিয়ে ইতিহাস হাতিয়ে যা পেয়েছি সেই বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত তত্ত্ব ও উপাত্ত দিয়ে সত্যিকার গণবিরোধী শক্তি এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিপর্যয়কর সব ঘটনার নেপথ্য শক্তি ও একটি সুসংগঠিত ও চতুর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি চলমান এই গ্রন্থে। আমার এই ছোট্ট প্রয়াস হাজার হাজার বছরের বহমান ইতিহাসের মূল্যায়ন হিসেবে যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে কোন বিজ্ঞ ইতিহাসবিদ যদি বিস্তৃত আলোচনার অবতারণা করে বিভ্রান্ত ও সম্মোহিত এ জাতিকে মূল্যবান গ্রন্থ দেবার উদ্যোগ নেন তাহলে আমি সবচেয়ে বেশী খুশী হব। আমার ছো্‌ট্ট গ্রন্থের ক্ষুদ্র পরিসরে বিস্তৃত আলোচনার অবকাশ অতি অল্প। আমার এই গ্রন্থটি বহমান একটি বিশাল ইতিহাসের আউট লাইন মাত্র।

আমার এই মহৎ প্রয়াসে অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ক্ষমা প্রার্থী তাদের কাছেও এ গ্রন্থটি যদি কারো মানসিক যন্ত্রণার কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। কোন মনোযোগী পাঠক যদি এই গ্রন্থ পাঠে চলমান বিভ্রান্তি সম্মোহন ও নেশার ঘোর থেকে বেরিয়ে আসে তাহলে তার প্রতি আমি আমৃত্যু কৃতজ্ঞ থাকব। আল্লাহ হাফেজ!

দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা

বিজ্ঞ পাঠকবৃন্দের তাগিদ, উৎসাহ, সহযোগিতায় গ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হল। গ্রন্থটির আকর্ষণীয় দিক হল এর বিষয়বস্তু। কেউ জানুক অথবা না জানুক কেউ বুঝুক অথবা না বুঝুক উপমহাদেশের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে এক হাজার বছর ধরে।

যে নেপথ্য ষড়যন্ত্রের কারণে ভয়াবহ সংকট আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে যে ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়ার জন্য আমার এই গ্রন্থটির অবতারণা করা হয়েছে। আমি দেখতে পাচ্ছি বঙ্গোপসাগরের উপকূলে আকাশ কাঁপান সংকট আগামী একদা আছড়ে পড়বে। সেদিনের জন্য যদি এখনই আমরা সতর্ক হতে না পারি তাহলে সম্ভাবনাময় এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে ভয়ঙ্কর এক দানবের সম্মুখে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে হবে। এই জন্য ইতিহাসের সূত্র ধরে আমি সেই ভয়ঙ্কর দানবকে চিহ্নিত করেছি; চিহ্নিত করেছি তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

অতি প্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকারী এই উপমহাদেশ এ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচাইতে পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর আবাস ভূমি এটা। এর কারণ হিসেবে ইতিহাসের সূত্র ধরে আমি যা পেয়েছি সেটা হল একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র। জনগণের মধ্যে ভেদ রেখা টেনে জনগণকে বিভক্ত করে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর কায়েমী স্বার্থ সমুন্নত করার যড়যন্ত্র।
ইতিহাস হাতড়ে যতটুকু জানা যায়- ঐতিহাসিক কার্যকারণ সমূহের অবতারণা করে দেখান হয়েছে যে একটা বিশেষ জনগোষ্ঠীর চলমান ষড়যন্ত্র জনগণের মধ্যে ভেদ রেখা টেনে সাধারণ মানুষের কর্মস্পৃহা এবং উদ্ভাবনী শক্তিকে স্থবির করে রেখেছেন কিভাবে। এটা করা হয়েছে শুধু মাত্র সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য।

উপমহাদেশের সভ্যতা অতিপ্রাচীন। ইতিহাসের শুরু থেকে এই উপমহাদেশে বনি আদমের আধিবাস ছিল বলে মনে করা হয়। অতিসামপ্রতিক গবেষণা থেকে জানা যায় যে এ অঞ্চলের অধিবাসিরা হযরত নূহ (আঃ)-এর অনুগামী ছিলেন। নূহ (আঃ)-এর মহাপ্লাবনের কিছু তত্ত্ব উপাত্ত এখানকার প্রাচীন ধর্মগ্রন্থসমূহে বিধৃত রয়েছে। কালক্রমে এখানকার অধিবাসীরা অহিলব্ধ জ্ঞান থেকে অনেক দূরে সরে যায়। এর মূলে রয়েছে উপরোল্লিখিত জনগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যবাদী ষড়যন্ত্র। এই ব্রাহ্মণ্যবাদীরা এই উপমহাদেশের ভূমি সন্তান নয় বহিরাগত। এরা মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার ইহুদীদের হারিয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠী। খাদ্যাভাব অথবা অন্য যে কারণেই হোক তারা তাদের আধিনিবাস পরিত্যাগ করে নতুন আবাসের সন্ধানে বেরিয়ে পরে। সুদীর্ঘ পথ অতিক্রমের মধ্যদিয়ে তারা উপমহাদেশে প্রবেশ করে। এখানে এসে তারা ভারতবর্ষের ভূমি সন্তানদের দ্বারা প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। ব্রাহ্মণ্যবাদীদের কূটবুদ্ধি এবং সুদীর্ঘ পথ অতিক্রমের অভিজ্ঞতা এবং যুদ্ধ ও আপোষের মধ্যদিয়ে বৈরি পরিবেশকে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা উপমহাদেশের প্রতিরোধকামী আধিবাসি ভূমি সন্তানদের ওপর বিজয়ী হতে সক্ষম হয়। এবং ভূমি সন্তানদের অক্টোপাশের মত বেঁধে ফেলে ধর্মের খোল নালচে পাল্টে নতুন করে ধর্মাচার চালুর উদ্যোগ নেয়। শুধু তাই নয় ভূমি সন্তানদের বোকা বানিয়ে এদের ধর্মকে তারা নিজেরা গ্রাস করে এবং নতুন করে সংযোজন ও বিয়োজন করে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেয়। সম্ভবত ব্রাহ্মণ্যচক্র এখানকার ভূমি সন্তানদের চেয়ে জ্ঞান গরিমা ও কৌশলের দিক দিয়ে অগ্রসর ছিল বলেই এটা সম্ভব হয়েছিল। বিজয়ী ব্রাহ্মণ্যবাদীরা উপমহাদেশের সর্বত্র নতুন করে পিড়ামিড আকৃতির সমাজ কাঠামো গড়ে তুলে এবং পিরামিডের শীর্ষে অবস্থান নেয় ব্রাহ্মণ্যবাদীরা আর সর্বনিম্নস্তরে ঠেলে দেয় এখনকার ভূমি সন্তানদের। পুরো সমাজটার ভার বইতে হয় ব্রাহ্মণ্যচক্র নির্মিত নিম্নবর্ণের আধিবাসী দলিতদের। এরা এইসব ব্রাহ্মণ্যবাদীরা একদিন দু’দিন নয় হাজার হাজার বছর ধরে সমগ্র ভারতকে দহন করতে থাকে। এমতবস্থায় বৌদ্ধ ধর্মের উদ্ভব হয়। বৌদ্ধবাদ তখনকার দিনে ছিল একটি বিপ্লব। এই বৌদ্ধবাদীরা ব্রাহ্মণ্য দুঃশাসনের সম্মুখে হিমাচলের মত প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি শত শত বছর ধরে আগ্রাসী শক্তির মুকাবিলা করে রাজদন্ড হাতে নিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে। এই সময় ব্রাহ্মণ্যবাদীরা সম্মুখ সমর পরিহার করে কূট কৌশলের আশ্রয় নেয়। তারা ক্ষমতার বাইরে থাকা বৌদ্ধবাদীদের মস্তিষ্কে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বিষ ঢালতে শুরু করে। আজকের মত সেদিনও যারা ব্রাহ্মণ্যবাদীচক্রের ফাঁদে পা রেখেছিল তাদেরকে প্রগতিশীল বলে আখ্যায়িত করা হয়। তখনকার পরিভাষায় তাদেরকে বলা হত মহাজান। আজকের মত সেদিনও বৌদ্ধদের মধ্যকার তথাকথিত প্রগতিশীল ব্রাহ্মন্যবাদীদের প্রশংসা পৃষ্ঠপোষকতা ও বৈষয়িক সাহায্য পুষ্ট হয়ে বৌদ্ধ ধর্ম ও ধর্মাচারের বিরোধিতা করতে থাকে। যারা বৌদ্ধ ধর্ম আকড়ে থাকে তাদের হীনযান বলা হত। এরপর এই হীনযান ও মহাজানদের সংঘাত শুরু হয়। সম্মিলিত ব্রাহ্মণ্য শক্তি এবং বৌদ্ধদের বিদ্রোহী শক্তি সমন্বয়ে মহাজোট সৃষ্টি হয়। এরপর শুরু হয় বৌদ্ধ ধর্মের অবক্ষয়। শেষ পর্যন্ত সমগ্র বৌদ্ধবাদীদের বৌদ্ধ ধর্মের সুতিকাগার ভারতবর্ষ থেকে উৎখাত হতে হয় বড় নিষ্ঠুর মর্মান্তিক ও নির্মমভাবে। যারা টিকে থাকে তারা নাম মাত্র বৌদ্ধ। তারা টিকে থাকে নিজস্ব মৌলিকত্ব হারিয়ে ব্রাহ্মণ্য সৃষ্ট ধর্মচার এবং কালচার আঁকড়ে ধরে। উপমহাদেশ হারিয়ে যায় অন্ধকারে।

অতঃপর উপমহাদেশ দীর্ঘ তমস্যা বিদীর্ণ করা আলোর পূর্বাভাস দেখতে পায় মুহাম্মদ বিন কাশিমের সিন্ধু বিজয়ের মধ্যদিয়ে। এরপর সুলতান মাহমুদ ১৭ বার আঘাত হেনে কায়েমী স্বার্থবাদী চক্রের বেরিকেটগুলো ভেঙ্গে গুরিয়ে দেয়।

সর্বশেষ আঘাত হানেন মুহাম্মদ ঘোরী। তিনি উপমহাদেশ ঘিরে ব্রাহ্মন্যবাদী চক্রের সকল দুর্গ এবং সর্বশেষ দুর্গ ভাঙতে সক্ষম হন। তখন উপমহাদেশ শান্তি সাম্য ও সৌভ্রাতৃত্বের নতুন আলোর ঝলকানী দেখতে পায়। নতুন সভ্যতায় স্নাত হয় উপমহাদেশ। এরপর শুরু হয় মুসলিম রাজদরবারে ব্রাহ্মন্যবাদী চক্রের সেই পুরান খেলা। এই খেলা এই ষড়যন্ত্র ছিল মুসলিম রাজশক্তির তখত্‌ ঘিরে।
ক্ষমতাসীনরা ব্রাহ্মণ্যবাদী ষড়যন্ত্র কখনো উপলব্ধি করেছে, কখনো থেকেছে বেখবর। এদের প্ররোচনায় মুসলমানদের মধ্যে শুরু হয়েছে ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধ ও আত্মহনন। এরপর দৃশ্যে এসেছেন মধ্য এশিয়ার উচ্চাবিলাশী রাজপুরুষ সম্রাট জহির উদ্দিন বাবর। তিনি পানি পথের যুদ্ধে ইব্রাহীম লোদীকে পরাজিত করে দিল্লীর সিংহাসনে সমাসিন হন। দিল্লীতে বাবর তার শক্তি সুসংহত করার আগেই মাত্র এক বছরের মধ্যে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা তাদের সম্মিলিত হিন্দু শক্তিকে সুসংহত করে ফেলে। উদ্দেশ্য বাবরকে উৎখাত ও বিতাড়িত করে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের স্বরাজ প্রতিষ্ঠা করা। আকস্মিক যুদ্ধে সম্মুখীন হতে হল বাবরকে। মাত্র ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে তিনি হিন্দুদের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাস্ত করতে সক্ষম হন। এই খানুয়ার যুদ্ধের পর ব্রাহ্মণ্য শক্তি তাদের কৌশল বদলে ফেলে। তারা তাদের পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্মুখ সমরের কর্মসূচী থেকে সরে এসে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের পথ ধরে। সেই থেকে শুরু হয় মুসলিম বিরোধী ষড়যন্ত্র যার শেষ এখনো হয়নি।

এ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক তত্ত্ব ও তথ্যগুলো টেনে এনে অকাট্য যুক্তির মাধ্যমে দেখান হয়েছে চোখে আঙ্গুল দিয়ে কিভাবে তারা মুসলিম রাজশক্তিকে দুর্বল করেছে, কিভাবে মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের সূচনা করা হয়েছে, কিভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে পলাশীর বিপর্যয়। কিভাবে মুসলমানদেরকে ভারতবর্ষ থেকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র চালান হয়েছে। দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্যদিয়ে অর্জিত পাকিস্তানকে কিভাবে খণ্ডিত করা হয়েছে। কিভাবে সংঘটিত হয়েছে ঢাকার পতন এবং ষড়যন্ত্রের আগামী দিন কত বিস্তৃত এসব কিছুর বিশ্লেষণাত্বক বিবরণ এই গ্রন্থের বিভিন্ন অধ্যায়ে বিধৃত করেছি।

এই গ্রন্থের মধ্য দিয়ে আমি আমাদের আগামী প্রজন্ম এবং আগামী নেতৃত্বকে সতর্ক সংকেত দেবার চেষ্টা করেছি। এই সতর্ক সংকেত কারো অনুভবকে যদি আন্দোলিত না করে তাহলে বুঝতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সচেতন অথবা অবচেতন ভাবে ষড়যন্ত্রের ফাঁদে আটকে রয়েছেন। আমাদের সতর্ক উদ্যোগ সত্ত্বেও ত্রুটি বিচ্যুতি থাকতেই পারে। বিজ্ঞ পাঠকবৃন্দ যদি আমাদের এই উদ্যোগকে ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখেন তাহলে আমরা বাধিত হব।

গ্রন্থটির চলমান সংস্করণে মুজিব ইন্দিরা ভূট্টোর সাক্ষাৎকার সংযোজন করেছি। সাক্ষাৎকার গ্রহণে ইটালীর বিখ্যাত সাংবাদিক (ওরিয়ানা ফালাচি-১৯৭২) পলাশী ও মুজিব নগর ষড়যন্ত্রের সাদৃশ্য সংক্রান্ত একটি অধ্যায়ও সংযোজন করা হয়েছে। বিষয়টি এবং সম্পূর্ণ গ্রন্থটি বিজ্ঞ পাঠকদের সংবেদনশীল মননে নতুন তুলির আচড় টানতে সক্ষম হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

আমি তাদের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যারা এই গ্রন্থটি গ্রন্থনার ব্যাপারে আমাদের সার্বিকভাবে বিরল সহযোগিতা করেছেন। গ্রন্থটি পাঠকদের অনুভবকে নাড়া দিলে আমাদের উদ্যোগ সফল হয়েছে বলে আমরা মনে করব। আল্লাহ হাফেজ!

(বইটির pdf version download করুন এখানে)

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh