Home EBooks দুই পলাশী দুই মীরজাফর অধ্যায় ২: পলাশী বিজয়ের পটভূমি

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ২: পলাশী বিজয়ের পটভূমি Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:12
পলাশী বিজয়ের পটভূমি

পলাশী বিপর্যয়ের মূল নায়ক মীর জাফর নয় মূল নায়ক ছিলেন জগৎশেঠ। ব্রাহ্মণ্যবাদী চক্রের স্বৈরাচারী শোষণ, লুণ্ঠন এবং আধিপত্যের অবসান হয় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর। তাদের লুপ্ত শক্তি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ ইতিহাসে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই কখনো প্রকাশ্যে আবার কখনো নেপথ্যে। সম্মুখ সমরে মুসলমানদের পরাস্ত করার সর্বশেষ প্রয়াস ছিল আগ্রার অদূরে খানুয়ায় বাবুরের সাথে যুদ্ধ। উত্তর ও মধ্য ভারতের হিন্দু রাজা ও মহারাজাদের সম্মিলিত বাহিনীর ৮০ হাজার অশ্বারোহী এবং ৫০০ রণ হস্তী সম্রাট বাবুরের ১০ হাজার সৈন্যের প্রতিরোধের মুখে বিধ্বস্ত হওয়ার পর ব্রাহ্মণ্যবাদীরা সম্মুখ সমর পরিহারের নীতি অবলম্বন করে।  অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তারা অতি ধৈর্য সহকারে নেপথ্য ষড়যন্ত্রের পথে এগুতে থাকে। তোষণ ও আনুগত্যের অভিনয় করে এক দিকে যেমন সংশ্লিষ্ট শাসকদের আস্থা অর্জন করে, অন্যদিকে অনুরূপ ষড়যন্ত্রের নিত্য নব নব কৌশল অবলম্বন করে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে।
এই কর্ম প্রয়াস শুরু হয় উপমহাদেশের সর্বত্র। যেমন মুর্শিদাবাদে শুরু হয় মুর্শিদকুলি খানের শাসনামল। আমি আগেই উল্লেখ করেছি পলাশী ট্রাজেডীর মূল নায়ক ছিলেন জগৎশেঠ। মীর জাফর ছিলেন শিখণ্ডী, পুরানের ভাষায় অধৈর্য। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা প্রতিপক্ষের প্রভাবশালী অধৈর্য ব্যক্তিত্বকে অর্থবিত্ত এবং ক্ষমতায়নে প্রলুব্ধ করে এবং তাকে সামনে রেখে ষড়যন্ত্রকে সর্বব্যাপী করে তুলে।
জগৎশেঠ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হীরানন্দ সাহা তিনি মারোয়ারের নাগর থেকে পাটনায় এসে সুদের কারবার শুরু করেন। ১৭১১ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তার জ্যেষ্ঠ পুত্র মানিক চাঁদ সুদের কারবার শুরু করেন। তিনি দাক্ষিণাত্যের ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভূত মুর্শিদকুলি খানের আস্থাভাজন হয়ে উঠেন। মুর্শিদকুলি খান তার দিওয়ানী দপ্তর মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করার সাথে সাথে মানিক চাঁদও ১৭১২ সালে মুর্শিদাবাদে এসে পড়েন। একই বছর তিনি নবাব কর্তৃক নগর শেঠ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৭১৪ সালে মানিক চাঁদের মৃত্যু হলে তার ভাগিনা ফতেহ চাঁদ সাহা তার উত্তরাধিকারী হন। মুর্শিদকুলি খানের সুপারিশে ফতেহ চাঁদ দিল্লীর বাদশাহ কর্তৃক জগৎশেঠ অর্থাৎ বিশ্ব ব্যাংকার উপাধিতে ভূষিত হন। তুর্ক আফগান সামন্তদের বিদ্রোহের আশংকায় মুর্শিদ কুলিখান তার কৌশল পরিবর্তন করে বর্ণ হিন্দু রাজা মহারাজাদের অতিরিক্ত সুবিধা দিতে শুরু করেন এবং তাদের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। নবাব মুসলিম মুদ্রা ব্যবসায়ীদের ব্যবসা ত্যাগে বাধ্য করেন। ডক্টর মোহর আলী লিখেছেন, একচেটিয়া মুদ্রা ব্যবসা ও সরকারী টাকশালে বিদেশী বণিকদের স্বর্ণতাল ও মুদ্রা তৈরীর একচ্ছত্র ক্ষমতা শুধু জগৎশেঠকে প্রদান করা হয়। মুর্শিদকুলি খানের উড়িষ্যার নায়েব সুবাদার সুজাউদ্দিন ছিলেন ভোগ বিলাসী চরিত্রহীন। অপূত্রক নবাব তার নাতি অর্থাৎ সুজাউদ্দিনের পুত্রকে তার উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন এবং দিল্লীস্থ তার প্রতিনিধি বালকিষানকে বাদশাহর স্বীকৃতি আদায়ের দায়িত্ব অর্পণ করেন। শুরু হয় ষড়যন্ত্র নাটক। নবাবের আস্থাভাজন জগৎশেঠ ফতেহ চাঁদ নবাবের ঘোষিত ইচ্ছার বিরুদ্ধে অতি গোপনে সুজাউদ্দিনকে প্ররোচিত করেন এবং যাবতীয় প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ ও সমর্থন দিয়ে সুজাউদ্দিনের প্রত্যাশা ও অবস্থানকে সুদৃঢ় করেন। এমনকি পরবর্তীতে নবাব হিসেবে স্বীকৃতি লাভের ব্যাপারে দিল্লীর দরবারকে প্রভাবিত করেন। নবাব মুর্শিদকুলির নিজের প্রতিনিধি বালকিষান বাবু তার উত্তরাধিকারী মনোনয়ন সংক্রান্ত প্রস্তাব গোপন রেখে তার প্রেরিত নজরানা উপঢৌকন ব্যবহার করেই সুজাউদ্দিনের পক্ষে দিল্লীর দরবারে তদবীর করেন এবং মুর্শিদ কুলীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে সুজা উদ্দিনের নামে পরবর্তী নবাবীর সনদ সংগ্রহ করেন। [তারিখে বাংলা পৃঃ ১২৪, উদ্ধৃতি মোহর আলী : হিষ্ট্রি অব দি মুসলিম অব বেঙ্গল]

মুর্শিদকুলী খানের শয্যা পাশে বসে জগৎশেঠ সুজাউদ্দিনকে মুর্শিদাবাদ আক্রমনের সংকেত পাঠান। সুজাউদ্দিনের সৈন্যরা মুর্শিদাবাদ অবরোধ করে। নবাব পত্মীও তার কন্যা সুজাউদ্দিনের স্ত্রীর হস্তক্ষেপে মনোনীত নবাব সরফরাজ খান পিতা সুজাউদ্দিনকে নবাব হিসেবে মেনে নেন। সুজাউদ্দিন জগৎ শেঠকে তার অতি বিশ্বস্ত এবং ঘনিস্টজন হিসেবে গণ্য করেন এবং ৪ সদস্য বিশিষ্ট প্রশাসনিক পরিষদের অন্তর্ভুক্ত করে নেন।
১৭২৭ সালে বিশ্বাসঘাতকতার সাফল্য জগৎশেঠ এবং তার সহযোগীদের অতি উৎসাহী করে তুলে। মুসলিম শাসনকে দুর্বল করে তোলা এবং বৈষয়িক ফায়দা অর্জনের জন্য ব্রাহ্মণ্য চক্র আর এক নতুন খেলা শুরু করলেন মুর্শিদাবাদের নবাবী নিয়ে। জগৎশেঠ আলম চাঁদ বাবুকে নিয়ে হাজী আহমদ ও আলীবর্দী খানের সাথে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। এদের লক্ষ্য ছিল আলীবর্দী খানকে মুর্শিদাবাদের নবাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। সেটা আলীবর্দীর প্রতি দুর্বলতার কারণে নয়, বরং তাদের উদ্দেশ্য ছিল সুসংহত মুসলিম শক্তিকে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আত্মবিনাশের দিকে ধাবিত করানো এবং সংঘর্ষ, যড়যন্ত্র ও যুদ্ধের ডামাডোল পরিস্থিতির মধ্যে নিজেদের অর্থনৈতিক ও বৈষয়িক স্বার্থ হাতিয়ে নেয়া।

যাইহোক মুর্শিদাবাদের নবাব সুজাউদ্দিনের যখন মৃত্যু হল সে সময় নাদির শাহ দিল্লী দখল করে নেয় এবং সুবাহ বাংলার আনুগত্য ও রাজস্ব দাবী করে। নাদির শাহ  মুর্শিদাবাদের নবাবের নিকট চিঠি লেখেন। নাদির শাহের পত্র পাওয়া মাত্র সরফরাজ খানের অনুমতি নিয়ে ব্যাঙ্কার জগৎশেঠ তাৎক্ষণিকভাবে রাজস্ব পরিশোধ করে দেন। কুচক্রী জগৎশেঠ এবং বাবু আলম চাঁদের পরামর্শে সুজাউদ্দিন অতিরিক্ত আনুগত্য প্রকাশের জন্য নাদির শাহের নামে খুতবা পাঠ করেন এবং মুদ্রা প্রচলন করেন। এটাও ছিল জগৎশেঠ গংদের ষড়যন্ত্র। ওদিকে কয়েক মাসের মধ্যে নাদির শাহ দিল্লী ত্যাগ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলে মুহাম্মদ শাহ তার সিংহাসনে পুনরারোহণ করেন। এই সুযোগে দিল্লীর আনুকূল্য পাবার প্রত্যাশায় জগত শেঠ গোপনে তথ্য প্রমাণ সরবরাহ করে দিল্লীর দরবারকে জানিয়ে দেন যে সরফরাজ খান বিদ্রোহী। (তারিখে বাংলাহ পৃঃ ১৫৫-৫৬)। ব্রাহ্মণ্য চক্র এখানেই থেমে থাকল না। সরফরাজ খানের বদলে আলীবর্দী খানকে বাংলার সুবাদার করার ব্যাপারে দিল্লীর দরবারকে প্রভাবিত করলো। অবশেষে তারা আলীবর্দীর নামে সনদ সংগ্রহ করতে সক্ষম হলেন। এই বাবু গোষ্ঠী ব্রাহ্মণ্যবাদী চক্রের পরামর্শে সরফরাজ খান তার সেনাবাহিনীর অর্ধেক হ্রাস করলেন। ওদিকে ব্যাংকার জগত শেঠ ২৫ লক্ষ টাকা অর্থাৎ বর্তমান মুদ্রামানে ৫ শত কোটি টাকা আলীবর্দী খানের নিকট প্রেরণ করেন সুজার বরখাস্তকৃত সৈন্যদের তার সেনা বাহিনীতে নিয়োগ দেয়ার জন্য। অন্যদিকে বিহারের হিন্দু জমিদারদের আলীবর্দী খানকে নৈতিক ও বৈষয়িক সমর্থন দানের জন্য প্ররোচিত করেন। আলীবর্দী খানের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে জগৎশেঠ তাকে মুর্শিদাবাদ আক্রমণের আহ্বান জানায়।
সামরিক গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথ তেলিয়াগিরি অতিক্রম করে আলীবর্দী খানের বাহিনী মুর্শিদাবাদের ২২ মাইল দুরত্বে অবস্থান নেয়। নবাব সরফরাজ খান আকস্মিক অবরোধে কিছুটা বিচলিত হলেও তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেন। এই অবরোধে তার আমাত্যবর্গের যোগসাজশ সম্পর্কে তার ধারণা বদ্ধমূল হয়। তার সন্দেহ বহুলাংশ সঠিক হলেও পঞ্চমবাহিনীর মূল হোতাকে তিনি চিনতে ভুল করলেন। জগৎশেঠের বদলে তিনি হাজী আহমদকে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য কারারুদ্ধ করলেন। পঞ্চম বাহিনীর দুই হোতা বাবু আলম চাঁদ ও জগৎশেঠের সাথে সরফরাজ খানের সম্পর্ক আরো নিবিড় হয়ে উঠল। এই দুই কুচক্রী পরামর্শক হিসেবে সরফরাজ খানের যুদ্ধ যাত্রার সঙ্গী হলেন। প্রথম দিনের যুদ্ধে আলীবর্দী খানের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে উঠল। নিশ্চিত পরাজয় থেকে বাবু আলম চাঁদ আলীবর্দী খানকে উদ্ধার করলেন সরফরাজ খানকে যুদ্ধ মুলতবী ঘোষণার পরামর্শ দিয়ে। যুদ্ধের মোড় ফিরিয়ে নেয়ার জন্য বাবু আলম চাঁদ এবং জগৎশেঠ বিভিন্নভাবে যোগসাজশ সলাপরামর্শ করে এবং সরফরাজ খানের সেনাপতিদেরকে মুচলেকা অর্থ বিত্তের বিনিময়ে পক্ষ ত্যাগে প্রলুব্ধ করলেন। পরদিন পূর্বাহ্নের যুদ্ধে সরফরাজ খানের বিজয় নিশ্চিত হয়ে উঠলে বাবু আলম চাঁদ তাদের ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে গেছে মনে করে আত্মহত্যা করলেন। ষড়যন্ত্রের মূলনায়ক জগৎশেঠ ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেলেন শেষ অবধি। এমতবস্থায় জগৎশেঠ তার নেপথ্য ষড়যন্ত্র আরো জোরদার করলেন। দুপুরের পর যুদ্ধ পরিস্থিতি বদলে গেল। অবশেষে সরফরাজ খান নিহত হলেন। জগৎশেঠ সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে বিজয়ী আলীবর্দী খানকে রাজধানীর অভিমুখে নিয়ে চললেন। বিশ্বাসঘাতকদের রক্তাক্ত আঙ্গিনা পেরিয়ে আলীবর্দী খান ক্ষমতাসীন হলেন। সম্ভবত সেদিনই সবার অলক্ষ্যে আর এক মর্মান্তিক বিপর্যয়ের ইতিহাস নিয়তির অদৃশ্য কাগজে লেখা হয়েছিল, লেখা হয়েছিল আলীবর্দীর বিশ্বাসঘাতকতা ও অপরাধের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে।

এরপর জগৎশেঠ মুর্শিদাবাদের দরবারে সবচেয়ে প্রতাপশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। মুসলমানদের চূড়ান্ত বিপর্যয় ডেকে আনার জন্য জগৎশেঠ নতুন প্রেরণায় নবতর চক্রান্ত জাল বিস্তারের জন্য উন্মাতাল হয়ে উঠেন। ১৭৪০ সালে আলীবর্দী খান নবাব হলেন ষড়যন্ত্র ও বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। কিন্তু তার ক্ষমতারোহনের ৩৩ বছর আগে থেকে উত্তর-মধ্য পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারত ছিল অস্থির। ব্রাহ্মণ্যবাদী ষড়যন্ত্র এগিয়ে চলছিল সাফল্যের দিকে। হুমায়ুন ও আকবরের সময় থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদী ষড়যন্ত্রের ঘাটিতে পরিণত হয়েছিল মুঘল প্রাসাদ। মুঘল হেরেমে রাজপুত বালাদের স্থান লাভের পর থেকে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি মুঘল প্রাসাদকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে নেয়। শরাব সাকী নৃত্য গীত বিলাসিতা ও আলস্যে বিবস হয়ে পড়ে সংগ্রামী বাবরের বংশধররা। তাদের ঔদাসীন্যের কারণে ব্রাহ্মণ্য ষড়যন্ত্র পোক্ত হয়ে উঠে। সম্রাট আরঙ্গজেব চলমান ধারা থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নিলেও তার সময় থেকেই শুরু হয় ব্রাহ্মণ্য বাদীদের মুসলিম বিরোধী তৎপরতা। আওরঙ্গজেব তাদের অপতৎপরতা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হলেও পরবর্তী মুঘল উত্তরাধিকারীরা বর্ণ হিন্দু, রাজপুত জাঠ মারাঠা এবং শিখদের সুসংবদ্ধ অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে রাখতে পারেননি। উপমহাদেশের বৌদ্ধ নিধন যজ্ঞের মত মুসলিম নিধন শুরু হয়। লুণ্ঠন ও হত্যার নৃশ্বংসতা মুসলিম জনপদগুলোতে ছড়িয়ে দেয়। মুঘল ও মুঘলাই সংস্কৃতির ধারকদের নেশাগ্রস্ত অন্তরে মুসলিম জনপদগুলোর মাতম কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেনি। তারা ছিল প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে উম্মাতাল এবং আত্মঘাতি তৎপরতায় লিপ্ত। কিন্তু তখন সুবাহ বাংলার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন রকম, এখানে প্রশাসন ছিল মিশ্র। নামে মুসলমানদের হাতে নবাবী থাকলেও সকল ক্ষেত্রে প্রাধান্য ছিল হিন্দুদের। মুঘলাই সংস্কৃতির সাধারণ বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকারী বাংলার মুসলিম আমীর ওমরাহ ও উচ্চ শ্রেণী যাবতীয় নৈতিকতা ও সততা বিসর্জন দিয়ে ভ্রাতৃঘাতী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তবে বাংলার জনসাধারণের সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমান থাকার কারণে এবং বাংলার কোন বিশেষ অঞ্চল বর্ণ হিন্দুদের শাসনাধীনে না থাকায় বর্ণবাদীরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিতে অথবা নেয়াতে সক্ষম হয়নি। এ সত্ত্বেও বাংলার বর্ণ হিন্দুরা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় মুসলিম বিরোধী ভূমিকায় পিছিয়ে ছিল না। তারা প্রকাশ্য যুদ্ধ না করলেও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নিয়ে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের মাধ্যমে মুসলমানদের চূড়ান্ত ক্ষতিসাধনে তৎপর ছিল। সমস্ত মুসলিম বিরোধী তৎপরতার মূল নায়ক ছিলেন জগৎশেঠ। একদিকে যেমন আলীবর্দী খানের উপর ছিল তার প্রভাব অন্যদিকে মুদ্রা ভাংগানী ব্যবসার সূত্রে ইংরেজদের সাথে গড়ে উঠে সখ্যতা। আলীবর্দী খানের নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত সহযোগী হওয়ার কারণে ঘষেটি বেগমের বিশ্বস্ত প্রাদেশিক দেওয়ান রাজ বল্লভ এবং বিহারে নিযুক্ত প্রথম গভর্নর জানকী রাম ও পরবর্তী গভর্নর রামনারায়ণের সাথে নবাবের দিওয়ান চিনুরায় বাবু বীরু দত্ত, আলম চাঁদের পুত্র বারারায়ান করাত চাঁদ ও উমিচাঁদের সহযোগিতায় রাজস্বের জামিন ব্যাংকার হিসেবে সারা বাংলার জমিদারদের সাথে ছিল স্বরূপ চাঁদ জগৎশেঠের নিয়মিত যোগাযোগ। সেনাবাহিনীর প্রধান প্রভাবশালী সৈন্যাধক্ষ, রায় দুর্লভ, রাম বাবু, মানিক চাঁদ, রাজা নন্দ কুমার, মোহন লাল প্রমুখও ছিলেন তার আপন জন। যেসব হিন্দু বেনিয়া মালামাল সরবরাহ করত সেই সব প্রতিষ্ঠিত বণিকদের সাথেও জগৎশেঠের ভাল সম্পর্ক ছিল। এই কারণে জগৎশেঠ মধ্যমনি হয়ে ষড়যন্ত্র জাল বিস্তার করতে অতি সহজে সক্ষম হন।
বর্গী হামলা প্রতিহত করার নামে বর্ধমানের মহারাজার সাথে মিলে জগৎশেঠ মুর্শিদাবাদের নবাবের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। অবশ্য ধরা পড়ে বর্তমান মুদ্রামানে দু হাজার কোটি টাকা নবাবকে ফেরত দিতে বাধ্য হন। পক্ষান্তরে বর্গী হামলার হাত থেকে রক্ষার নামে ইংরেজদের সাথে ব্যবসারত বর্ণ হিন্দু বণিকদের চাঁদার টাকায় কোলকাতা নগরীকে ঘিরে মারাঠা রক্ষা প্রাচীর ও পরিখা গড়ে তুলে সমগ্র দক্ষিণ পশ্চিম বাংলার বিত্তশালী বর্ণ হিন্দু ব্যক্তিদেরকে এমনভাবে জমায়েত করা হয় যে ১৬৯০সালে প্রতিষ্ঠিত কোলকাতার জনসংখ্যা ১৭৫৭ সালের আগেই হয়ে দাঁড়ায় লক্ষাধিক এবং এই জনসংখ্যার এক শতাংশও মুসলমান ছিল না। এর ফলে কোলকাতা কুচক্রীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হলো।

বৃটিশ শাসনের পূর্বে সুবাহ বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা

এ দেশের শিল্প বাণিজ্য ধ্বংস করে বৃটিশ বেনিয়ারা। আজকের এই তলাবিহীন ঝুড়ির এক প্রান্তে বসে আমরা কল্পনা করতে পারি না বিপুল ঐশ্বর্যের ভাণ্ডার এই বাংলা কি বিশাল সম্পদের অধিকারী ছিল এদেশের মানুষ! কি গতিশীল অর্থনীতি বিরাজমান ছিল এখানে।
ফরাসী ডাক্তার ব্যবসায়ী পর্যটক বার্নিয়ার তৎকালীন বাংলা মুলুক সফর করে লিখেছেন, “বাংলার মত দুনিয়ার অন্য কোথাও বিদেশী বণিকদের আকৃষ্ট করার জন্য এত বেশী রকমের মূল্যবান সামগ্রী দেখা যায় না... বাংলায় এতো বিপুল পরিমাণ সূতী ও রেশমী পণ্যসামগ্রী রয়েছে যে, কেবল হিন্দুস্থান বা মোগলদের সাম্রাজ্যের জন্য নয় বরং পার্শ্ববর্তী দেশগুলো এবং ইউরোপের বাজারসমূহের জন্য বাংলাকে এ দুটি পণ্যের সাধারণ গুদামঘর বলে অভিহিত করা চলে। মিহি ও মোটা, সাদা ও রঙিন ইত্যাদি সকল রকম সুতী বস্ত্রের বিরাট ¯তূপ দেখে আমি মাঝে মাঝে বিস্ময়াভিভূত হয়েছি যে, কেবলমাত্র ওলন্দাজ বণিকেরা বিভিন্ন প্রকারের ও মানের সাদা এবং রঙ্গীন সুতীবস্ত্র বিপুল পরিমাণে, বিশেষ করে জাপান ও ইউরোপে রফতানী করে থাকে, তা নয়। ইংরেজ, পর্তুগীজ ও দেশীয় বণিকেরাও এসব দ্রব্য নিয়ে প্রচুর ব্যবসা করে থাকে। রেশম ও বিভিন্ন রেশমজাত দ্রব্য সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য।” (বার্নিয়ার,পৃঃ ৪৩৯)

বাংলার চাউল সম্পর্কে বার্নিয়ার বলেন- “বাংলায় এতো বেশি পরিমাণ চাউল উৎপন্ন হয় যে, তা কেবল প্রতিবেশী দেশগুলোতেই নয়, দূরবর্তী রাজ্যগুলোতেও রফতানী করা হয়ে থাকে। মসলিপত্তম ও করোমন্ডল উপকূলের নানাস্থানে প্রেরিত হয়। সাগর পারের রাজ্যসমূহে, বিশেষ করে সিংহল ও মালদ্বীপেও চাউল পাঠানো হয়।” তিনি লিখেছেন- “বাংলা মুলক চিনি উৎপাদনেও একই রকম সমৃদ্ধশালী; এই চিনি গোলকুন্ডা ও কর্নাটক রাজ্যে (সেখানে সামান্য চিনি উৎপাদিত হয়), মোকা ও বসোরা শহরের মাধ্যমে আরব ও মেসোপটেমিয়ায় এবং বন্দর আব্বাসের পথে পারস্য পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়ে থাকে।” বার্নিয়ারের বর্ণনা মতে, বাংলা থেকে সে যুগে সব থেকে উন্নত ধরনের লাক্ষা, আফিম, মোম, মরিচ, গন্ধদ্রব্য ও ঔষধপত্র রফতানী হতো। তিনি বলেন- “ঘি-এর উৎপাদন এত প্রচুর যে, রফতানীর ক্ষেত্রে এটা খুব ভারী বস্তু হওয়া সত্ত্বেও সমুদ্র পথে বহুস্থানে প্রেরিত হয়।” (বার্নিয়ার, পৃঃ ৪৩৭-৩৯)। বার্নিয়ার জানান- “বাংলা মুলকের পুর্তগীজ অধ্যুষিত এলাকায় অর্থাৎ দক্ষিণ বাংলায় নানান জাতীয় মিষ্টিও তৈরী হয়ে বিদেশে রফতানী হয়ে থাকে। (ইতিহাসের অন্তরালে,   ফারুক মাহমুদ, পৃঃ ২১৮)

নদীমাতৃক বাংলার ভৌগোলিক অবস্থানই একে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সহায়ক করে তুলেছিল। ফলে কালক্রমে এই ভূখণ্ড বিশাল ভারত উপমহাদেশের গঞ্জ রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাম্রলিপ্ত এবং সপ্তগ্রাম ছিল বাংলার ব্যস্ত বন্দর। সময়ের প্রয়োজনেই স্বাভাবিকভাবে এসব অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল জাহাজ নির্মাণ কারখানা। বহিঃসমুদ্রের উপযোগী বিরাট বিরাট জাহাজ নির্মাণ করতো এদেশেরই মানুষ। এদেশের সন্তানেরাই দূর সমুদ্রে যাত্রা করত বিরাট বিরাট বাণিজ্য বহর নিয়ে। এই জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলোকে বৃটিশরা ধ্বংস করল তাদের নিজস্ব স্বার্থে। বাংলার অন্যান্য মুখ্য শিল্পের মধ্যে ছিল চিনি, লবণ ও সোরা। এই সমস্ত দ্রব্য ব্যাপকভাবে রপ্তানী হত। চিনি ও লবণ এবং তৎসহ জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে বৃটিশ রাজত্বের সময়ে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল সম্পূর্ণরূপে। প্রয়োজনীয় সর্ববিধ কৃষি তথা গৃহস্থালির যন্ত্রপাতি এবং বাসনপত্র তৈরি হত বাংলাতেই। বাংলা থেকে রপ্তানি করা পণ্যের মূল্য হিসেবে আমদানিকারক দেশগুলি দিত সোনার বাট, ধাতু মুদ্রা এবং মণিরত্ন। শত শত বছর ধরে বাংলা রপ্তানি উদ্বৃত্ত ভোগ করেছে। ব্রিটিশ প্রভুত্ব কায়েম হবার পরে যে দুর্ভিক্ষ ঘন ঘন দেখা দিয়েছে, সে যুগে তা ছিল অজ্ঞাত। যে যে দেশের সঙ্গে বাংলার বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল তারা প্রত্যেকেই বাংলার শিল্পকুশলতা ও কারিগরী দক্ষতার কথা স্বীকার করেছে। এমনকি ব্রিটেনের মাটিতেও এখানকার রেশম বস্ত্রের সঙ্গে সমশর্তাবলীতে প্রতিযোগিতায় এটে উঠতে না পেরে বৃটিশরা পলাশী যুদ্ধের ৫৬ বছর পূর্বে ১৭০১ সালে, বাংলা থেকে রেশমবস্ত্র আমদানি সরাসরি নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। (ধ্বংসের পথে পশ্চিম বাংলা রণজিত রায় উদ্ধৃত নতুন সফর নভেম্বর, ১৯৯৬)
১৯৫৭ সালের আগে আরমেনিয়াসহ ইউরোপের ৭টি দেশের হাজার হাজার নাবিক শত শত জাহাজ নিয়ে বাংলার নদীতে পণ্য খরিদ করে ফিরতো অন্য সবকিছু বাদ দিয়ে কেবল মসলিন, মোটা সূতী বস্ত্র, রেশম ও রেশমী বস্ত্র ইউরোপ ও জাপানসহ সারা বিশ্বে রফতানি হতো দশ/বার হাজার কোটি টাকার। বাংলাকে বলা হতো সারা ইউরোপের বাজারগুলোর কাপড়ের গুদাম; নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-কিশোর মিলিয়ে ন্যূণ ২৫ লাখ বস্ত্রশিল্পী নিয়োজিত থাকতেন কাপড় তৈরীর কাজে। গংগার পথে পাটনা হয়ে মধ্য ভারতে এবং করোমন্ডল উপকূলে, এমনকি পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে চাউল রফতানি হতো; আফিম রফতানি হতো চীন জাপানে, চিনি রফতানি হতো আরব, ইরান, ইরাক অঞ্চলে। সল্টপিটার প্রেরিত হতো ইউরোপে। লবণ চালান হতো মধ্য ভারত ও আসামে। মরিচ, আদা ও দারুচিনি রফতানি হতো ইউরোপে ও মধ্যপ্রাচ্যে- সব মিলিয়ে ন্যূণ ১৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য বাংলা থেকে বিশ্বের বাজারে ছড়িয়ে পড়তো। (ইতিহাসের অন্তরালে ফারুক মাহমুদ, পৃঃ ২১৮)

এই বিপুল রফতানির বিনিময়ে তাদের আমদানী ছিল খুবই কম। মোটা কাপড় প্রস্তুতের জন্য সুরাট মির্জাপুর থেকে কিছু সূতা এবং রেশম বস্ত্রের বাড়তি চাহিদা মেটাবার জন্য চীনদেশ থেকে কিছু কাঁচা রেশম আমদানি হতো। ধনী বাংগালীরা খনিজ লবণ ভালোবাসতো বিধায় নিজেদের তৈরী সামুদ্রিক লবণ রফতানি করে উত্তর ভারত থেকে খনিজ লবন আমদানি করতো। এছাড়া চীনামাটির সৌখীন থালাবাসন আমদানি হতো। আর আমদানি হতো কাফ্রী ক্রীতদাস-দাসী। বাংলার নিত্য বর্ধিষ্ণু কৃষি ও শিল্পোন্নত শ্রমশক্তির বিপুল চাহিদা ছিল, ঠিক যেমনটি বর্তমান বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোতে রয়েছে। বিদেশী বণিকেরা ক্রীতদাস-দাসী নিয়ে এসে বাংলায় বিক্রি করতো। বাংলার মুসলমান কারখানা ও খামার-মালিকেরা তাদেরকে খরিদ করে উৎপাদনকার্যে নিয়োগ করতেন। এ কারণেই বাংলায় নিয়মিত ক্রীতদাস আমদানি হতো। এর বাইরে তেমন কিছুই আমদানি করতে হতো না। এসব আমদানি পণ্যের মূল্য যদি সেকালের মুদ্রায় ৪০ লাখ টাকা (বর্তমান মূদ্রামানে ৮ শত কোটি টাকা ধরা হয়, তাহলে বাংলার বৈদেশিক বাণিজ্যের নীট উদ্বৃত্ত দাঁড়াতো বার্ষিক ৭ কোটি টাকা বর্তমান মুদ্রামানে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থ এদেশে আসতো স্বর্ণ, রৌপ্য ও মূল্যবান পাথর হীরা-জহরত মণিমরকত হিসেবে। (ইতিহাসের অন্তরালে ফারুক মাহমুদ, পৃঃ ১৪০)

মুসলিম শাসনামলে কৃষি নীতির প্রধান দর্শন ছিল লাঙলের পেছনের মানুষটি। কৃষি এবং শিল্প উৎপাদনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ছিল উৎপাদনে শরীক। পণ্য এবং রাজস্ব বা কর উভয়ের মাধ্যমেই প্রজা এবং সার্বভৌমত্বের মধ্যে সংযোগ ছিল। দ্বিমূখী ফলনের অংশ দ্বারা রাজস্ব দিতে হত বলে মুদ্রার উৎপাত ছিল না। রাজা এবং প্রজার মধ্যে ধনকুবের এবং মুৎসুদ্দী শ্রেণীর কোন ঠাঁই ছিল না।
(বইটির pdf version download করুন এখানে)

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh