eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ৫ Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:15
কোম্পানীর রাজস্ব নীতি

একটা স্বাধীন দেশের নাগরিকের রাষ্ট্রের প্রতি যেমন দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে অনুরূপ রয়েছে তার অধিকার ও সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামোর মূল লক্ষ্যই হলো শোষণ। সাধারণ মানুষের জন্য ন্যূনতম মানবিক দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকারে আবদ্ধ নয় ঔপনিবেশিক শাসকেরা। শোষণের মৌলিক নীতি সামনে রেখেই উপনিবেশবাদীরা তাদের সব ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। বৃটিশদের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হয়নি। বরং উপনিবেশবাদীদের ইতিহাসে জঘন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে বৃটিশ বেনিয়ারা। মুসলিম শাসনামলে যদিও বাংলায় জমিদার ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, তাহলেও এসব প্রতিষ্ঠান লাগামহীন শোষণের যন্ত্র হিসেবে কেউ মনে করত না। সরকার এবং প্রজাদের মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্কের নীতিই ছিল মুসলিম শাসন ব্যবস্থার মূলনীতি। জমিদাররা কোন অবস্থায় খাজনা বৃদ্ধি করতে পারতেন না। জমির উপর প্রজাদের বংশানুক্রমিক মালিকানা স্বত্ব বহাল থাকত এবং পুরুষানুক্রমে জমি ভোগ দখল করতে পারত। তারা নির্দিষ্ট পরিমাণ খাজনা দিত। জনগণের নিরাপত্তা এবং সুখ সুবিধার প্রতি দৃষ্টি রাখতে হত শাসকদের। কিন্তু কোম্পানী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল পৃথক। মুনাফা অর্জন ছাড়া ভিন্ন কোন ভাবনা তাদের ছিল না। যার ফলে অর্থনৈতিক শোষণই ছিল কোম্পানী শাসনের মূল নীতি। প্রজাদের কল্যাণ এবং সুযোগ সুবিধার প্রতি তাদের মোটেও ভ্রুক্ষেপ ছিল না।

‘ক্লাইভ প্রথম রাজস্বের ভার গ্রহণ করেন এবং শাসনের দায়িত্ব এড়াইয়া চলেন। রাজস্ব ব্যবস্থা হইতে মুনাফার জন্য তিনি বাংলায় দ্বৈত শাসন প্রবর্তন করেন। কোম্পানী রাজস্ব ব্যবস্থা হইতে প্রচুর অর্থ মুনাফা করিত। প্রতি বৎসর পাঁচ লক্ষ পাউন্ড রাজস্বের মুনাফা বিলাতে প্রেরিত হইত এবং ইহা কোম্পানীর অংশীদারদের মধ্যে ভাগ হইত। বাংলার রাজস্বে ইহার কৃষকদের কোন উপকার হইত না। তাহা ছাড়া কোম্পানী রাজস্বের ব্যাপারে যে পুঁজি নীতি (Investment policy) অবলম্বন করে, তাহা বাংলার পক্ষে খুব ক্ষতিকর হয়। কোম্পানীর কর্তৃপক্ষ রাজস্ব ব্যবসায়ে নিয়োগ করিত এবং এই টাকায় পণ্যদ্রব্য ক্রয় করিয়া বিদেশে পাঠাইত ও লাভজনক ব্যবসায় করিত। শাসনকার্য চালাইবার জন্য টাকার অভাব হইত। ১৭৯৩ খ্রীস্টাব্দে হাউস অব কমনসের সিলেক্ট কমিটি ইহার রিপোর্ট স্বীকার করে যে, কোম্পানীর রাজস্ব সম্পর্কে পুঁজিনীতির ফলে বাংলা ও বিহার খুবই আর্থিক দুরবস্থায় পতিত হইয়াছে। (বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, এম এ রহিম, পৃ.-৪৫)

মীর জাফর বৃটিশদের শিখণ্ডী হওয়া সত্ত্বেও তার আদায়কৃত রাজস্বের পরিমাণ ছিল ৮,১৭,৫৫৩ পাউন্ড। অথচ দেওয়ানী লাভের প্রথম বছরেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী রাজস্ব আদায় করে ১৬,৮১,৪০৭ পাউন্ড। আগের তুলনায় দ্বিগুণ। এখানে এসে অন্য আর একটি হিসেবে দেখা যায়, ১৭৫৬ থেকে ১৭৬৬ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে যেখানে মোট আদায়কৃত রাজস্বের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৮১ হাজার পাউন্ড, ১৭৬৬-৬৭ সালে সেই রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫ লাখ ২৭ হাজার পাউন্ডে। ভূমি রাজস্বের ক্ষেত্রে ওয়ারেন হেষ্টিংস যে কঠোরতা অবলম্বন করেন এবং যে নৃশংসতার পরিচয় দেন তা ইতিহাসের বিরল। (কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী এম আর আখতার মুকুল, পৃ.-৩৭)

রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে ওয়ারেন হেষ্টিংসের নতুন ব্যবস্থায় বাংলার মানুষ বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে তীব্র সংকটের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। হেষ্টিংস নিলামে রাজস্বের বন্দোবস্ত করেন। প্রথমত ইংরেজরা রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে নির্ভর করেছে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার উপর। ফলে নবাবী আমলের কর্মচারী কর্মকর্তারা নিজস্ব অবস্থানে থেকে নতুন দেওয়ানীর অধীনে কর্মরত থাকে। হেষ্টিংস প্রতিটি জেলায় ইংরেজ কালেক্টর নিয়োগ করলেন এবং এদের সহযোগী কর্মচারীদের নেয়া হল হিন্দু জনগোষ্ঠী থেকে। এর ফলে রাজস্ব আদায়ে লিপ্ত মুসলমান কর্মচারীরা অপসারিত হল। ইংরেজ কালেক্টররা জেলার দায়িত্বভার গ্রহণ করেই নিলামে রাজস্বের বন্দোবস্ত দেয়ার উদ্যোগ নেয়। যারা অধিক পরিমাণে রাজস্ব প্রদানে স্বীকৃত হল তাদের হাতেই তুলে দেয়া হল জমিদারী। এ প্রেক্ষিতে জমিদার শ্রেণীর উদ্ভব হল।

রাজস্ব বিভাগ কোম্পানীর পরিচালনাধীন হওয়ার পর কর্তৃপক্ষকে সন্তুষ্ট রাখার জন্যে হিন্দু ও ইংরেজ আদায়কারীগণ অতিমাত্রায় শোষণ নিষ্পেষণের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করে কোম্পানীর রাজকোষ পূর্ণ করতে থাকে। ইতিপূর্বে প্রজাদের নিকট থেকে আদায়কৃত সকল অর্থ দেশের জনগণের মধ্যে তাদেরই জন্যে ব্যয় হতো। কিন্তু তখন থেকে আদায়কৃত অর্থ ইংল্যাণ্ডের ব্যাংকে ও ব্যবসা কেন্দ্রগুলিতে স্থানান্তরিত হতে থাকে।

নীতি এবং দায়-দায়িত্বহীন কার্যক্রম, অনাবৃষ্টি, নির্যাতিত কৃষক সমাজের অস্থিরতা এবং বেহাল অবস্থা করুণ পরিণতির দিকে টেনে আনল বাংলার জনপদকে। সমগ্র বাংলা বিহারে এলো মহামন্বন্তর, হৃদয়বিদারক দুর্ভিক্ষ। খাদ্যের অভাবে নির্মমভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল এদেশের এক তৃতীয়াংশ মানুষ। কিন্তু তবু করুণার উদ্রেক হল না বেনিয়া এবং তাদের দালাল চক্রের। ১৭৭০-৭১ সালে হলো মহা মন্বন্তর (বাংলা ১১৭৬)। ইতিহাসে এই কুখ্যাত মন্বন্তরের পরে পরেই অধিক পরিমাণে বাহবা নেয়ার জন্য এবং নিজেকে করিৎকর্মা প্রমাণের উদ্দেশ্যে ১৭৭২ সালের ৩রা নভেম্বর বাংলার গভর্নর ওয়ারেন হেষ্টিংস বিলেতের ডিরেক্টর বোর্ডকে জানালেন- ‘দুর্ভিক্ষে এই প্রদেশের এক তৃতীয়াংশের বেশী লোক মারা গেছে, চাষাবাদেরও ভয়ানক ক্ষতি হয়েছে’ এই অবস্থা সত্ত্বেও ১৭৭১ সালের আদায়কৃত রাজস্ব ১৭৬৮ সালের রাজস্ব থেকে অনেক বেশী আদায় হয়েছে।'

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
এদেশে ইংরেজদের আগমনের শুরু থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী একচেটিয়া বাণিজ্যের সনদ লাভ করেছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ছাড়া আর কোন বিদেশী কোম্পানী এমন কি ইংরেজ কোম্পানীরও বাণিজ্যের অধিকার ছিল না। তাদের জন্য এদেশে বাণিজ্যের সুযোগ সুবিধা ছিল অবারিত। অন্যান্য বিদেশী বণিকেরা এদেশে বাণিজ্যের চেষ্টা করলেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নিকট প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে উঠতো না। ছলে বলে কৌশলে অন্যান্য বিদেশী বণিকদের বাণিজ্য ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী প্রতিহত করে নিজেদের জন্য অবারিত করে রেখেছিল। সুচারুরূপে বাণিজ্য পরিচালনার জন্য তারা বেশ কিছু এজেন্সী হাউস স্থাপিত করে। এইসব এজন্সেী হাউস এক ধরনের ব্যাংকিং পরিচালনা করত। স্থানীয় বণিক মূলত যারা ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত তারা প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে এইসব এজেন্সী হাউসগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ে। এসব এজেন্সী হাউসগুলোর মাধ্যমে এদেশের রেশম, পাট, তুলা, নীল, অন্যান্য পণ্যের ব্যবসা একচেটিয়াভাবে পরিচালিত হতে থাকে। এসব কারবারে অতিদ্রুত বিপুল পরিমাণ মুনাফা আসতে থাকে। এসবের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার কারণে সুবর্ণ বণিকদের পুঁজির সাথে য্ক্তু হতে থাকে অকল্পনীয় মুনাফা। মুর্শিদাবাদ এবং বাংলার জনপদ লুট করার পর ইংরেজ বণিকদের চোখ পড়ে কোলকাতার বণিকদের সঞ্চিত সম্পদের দিকে। তারা আশঙ্কা করে যদি কোলকাতায় সুবর্ণ বণিকদের স্ফীত সম্পদ দেশে অথবা বহির্বিশ্বে বাণিজ্য পরিচালনায় ব্যবহার হয় তাহলে এরাই একদা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর প্রতিযোগী ও প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হবে। ১৭৭৩ সালের ৬ই মার্চ কর্নওয়াালিস ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ডিরেক্টরদের কাছে লিখলেন- ‘বেশ কিছু নেটিভদের হাতে যে বিপুল পরিমাণ মূলধন রয়েছে তা বিনিয়োগ করার আর কোন পথ নেই। তাই জমিদারী বন্দোবস্ত (চিরস্থায়ী) নিশ্চিত করা হলে শীগগির উল্লিখিত সঞ্চিত মূলধন জমিদারী ক্রয়ে বিনিয়োগ করা হবে।’ কর্নওয়লিসের এই পদক্ষেপ বৃটিশ স্বার্থের জন্য মোক্ষম হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। তার উদ্দেশ্য সুবর্ণ বণিকদের অর্জিত অর্থ সম্পদ ও মুলধন হাতিয়ে নেয়া এবং পুরাতন জমিদারদের হটিয়ে নতুন জমিদার সৃষ্টি করা, যারা অনুগত ঔপনিবেশিক দালাল হিসেবে কোম্পানীর স্বার্থ সমুন্নত রাখবে। মোটের উপর নবাবের পতন ঘটিয়েও ইংরেজরা নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারেনি। ছোট ছোট জমিদার জায়গীরদারদের উচ্ছেদ করে মুসলমানদের কড়ির কাঙ্গালে পরিণত না করা পর্যন্ত তারা স্বস্তি পাচ্ছিল না।

যে কারণে লর্ড কর্নওয়ালিস দশশালা বন্দোবস্তে পুরোপুরি সন্তুষ্ট না হয়ে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী ভিত্তিতে জমিদারী প্রথা চালু করলেন। সূর্যাস্ত আইনের অছিলায় মাত্র ২ বছরের মধ্যে লর্ড কর্নওয়ালিসের আমলে বাংলার অর্ধেক জমিদারী নিলাম হয়ে গেল। নিলামে এসব জমিদারী ক্রয় করল কোলকাতা কেন্দ্রিক হিন্দু বিত্তশালী ও সুবর্ণ শ্রেণীর মহাশয়েরা। শুরু হল নতুন উদ্যোগে অত্যাচার। (কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী, এম আর আখতার মুকুল, পৃ-৬৯।)

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল মসলমান জমিদারদের অধীনে নিযুক্ত হিন্দু নায়েব ম্যানেজার প্রভৃতিকে নব্য জমিদার হিসেবে স্বীকৃতি দান। ১৮৪৪ সালে Calcutta Review যে তথ্য প্রকাশিত হয় তাতে বলা হয় এক ডজন জমিদারীর মধ্যে, যাদের জমিদারীর পরিধি ছিল একটি করে জেলার সমান, মাত্র দুটি পূর্বতন জমিদারদের দখলে রয়ে যায় এবং অবশিষ্ট হস্তগত হয়, প্রাচীন জমিদারদের নিম্নকর্মচারীর বংশধরদের। এভাবে বাংলার সর্বত্র এক নতুন জমিদার শ্রেণীর পত্তন হয়, যারা হয়ে পড়েছিল নতুন বিদেশী প্রভুদের একান্ত অনুগত ও বিশ্বাসভাজন।
হান্টার তাঁর গ্রন্থে বলেন : যেসব হিন্দু কর আদায়কারীগণ ঐ সময় পর্যন্ত নিম্নপদের চাকুরীতে নিযুক্ত ছিল, নয়া ব্যবস্থার বদৌলতে তারা জমিদার শ্রেণীতে উন্নীত হয়। নয়া ব্যবস্থা তাদেরকে জমির উপর মালিকানা অধিকার এবং সম্পদ আহরণের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে। অথচ মুসলমানরা নিজেদের শাসনামলে এ সুযোগ সুবিধাগুলো একচেটিয়াভাবে ভোগ করেছে। (Hunter The Indian Musolman অনুবাদ আনিসুজ্জামান, পৃ-১৪১)

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নব্য জমিদারদের অবাধ লুণ্ঠনের অধিকার দিয়েছে। কিন্তু প্রজা সাধারণের কোন অধিকার দেয়া হয়নি। সাধারণ মানুষকে জমিদারদের উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। প্রজাপালন এবং প্রজাদের কল্যাণের দিকে জমিদারদের কারো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। প্রজা সাধারণ অনাবাদী জমিকে আবাদ যোগ্য করে তুললেও জমির উপর তাদের কোন স্থায়ী অধিকার ছিল না। জমিদার তার ইচ্ছা মত যে কোন প্রজাকে যে কোন সময় উচ্ছেদ করতে পারত। মুসলিম শাসন আমলে আইন ছিল প্রজা সাধারণের সাধারণ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে জমিদাররা। তারা এজন্য সমাজ বিরোধী দুষ্কৃতকারী ও দস্যু তস্করের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতো, লুণ্ঠিত মালামালসহ ধরা পড়লে রাজকোষে জমা দিতে হতো।  ১৭৭২ সালে কোম্পানী এই আইন রহিত করে দুষ্কৃতকারীদের বেআইনী লুণ্ঠনের অবাধ সুযোগ করে দেয়। ব্যবসায়ী শ্রেণী থেকে আগত নতুন জমিদারেরা স্বাভাবিকভাবে দস্যু তস্করদের ধরিয়ে দেয়ার পরিবর্তে তাদের লালনকারী হয়ে উঠে এবং লুণ্ঠিত দ্রব্যের অংশীদার হয়ে তাদের ধনাগার পূর্ণ করতে থাকে। ১৯৪৪ সালে Calcutta Review তে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয় যে, এসব জমিদার ধন অর্জনের উদ্দেশ্যে দস্যু তস্করদের লালন পালন করত। বুকানন্ বলেন, “রায়তদেরকে বাড়ি থেকে ধরে এনে কয়েকদিন পর্যন্ত আবদ্ধ রেখে নিরক্ষর প্রজাদের নিকট থেকে জাল রশিদ দিয়ে জমিদারের কর্মচারীগণ খাজনা আদায় করে আত্মসাৎ করতো। (Martin-The history-Antiquities Topocraogt and stakes of esters Indian London-1438, Vol-11)
অন্য আর এক তথ্য থেকে জানা যায়- “তৎকালীন জমিদারগণ সরকারকে ৩৭,৫০,০০০ পাউন্ড রাজস্ব দিত। কিন্তু তাহারা প্রজাদের নিকট হইতে প্রায় ১,৩০,০০,০০০ পাউন্ড খাজনা আদায় করিত।” (বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস এম এ রহিম, পৃ-৪৮)

“চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে মুসলমানগণ খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাহাদের সমৃদ্ধি নষ্ট হইয়া যায়। হান্টার লিখিয়াছেন যে, মুসলমান আমলে রাজস্ব আদায় শাসন পরিচালনায় মুসলমানদের একচেটিয়া অধিকার ছিল এবং ইহা হইতে তাহাদের প্রচুর অর্থ সমাগম হইত। পুরাতন রাজস্ব ব্যবস্থার পরিবর্তন ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রচলন করিয়া বৃটিশ গভর্নমেন্ট বাংলার মুসলমানদের আর্থিক জীবনে তীব্র আঘাত করে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অবিচারের কথা স্বীকার করিয়া মেটকাফ বলিয়াছেন যে, এই ব্যবস্থায় জমির প্রকৃত মালিকদের নিকট হইতে ছিনাইয়া লইয়া এরূপ এক শ্রেণীর বাবুদিগকে দেওয়া হয় যাহারা ঘুষ ও অন্যান্য অবৈধ উপায়ে ধনী হইয়াছেন। জেমস ও কেনেলী মন্তব্য করিয়াছেন- ‘যে সকল হিন্দু কর্মচারী পূর্বে রাজস্ব বিভাগের সামান্য পদে ছিল, এই বন্দোবস্তে তাহাদেরকে জমিদার পদে উন্নীত করার জন্য জমির মালিকানাস্বত্ব দেওয়া হয় এবং অর্থ সংগ্রহ করিতে সুযোগ দেওয়া হয়। এই অর্থ মুসলমানদের শাসনকালে মুসলমানদের হাতে আসিত।’ বড় জমিদারদের অধীনে অনেক তালুকদার ও পত্তনিদার ছিল। তাহারা জমিদারদের নির্দেশ মত চলিত। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে তাহারা স্বাধীন হইয়া পড়ে।” (বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, এম এ রহিম, পৃ-১৭)

মহাজনদের অত্যাচার
জমিদার-পত্তনীদারদের উৎপীড়নে কৃষকদের জীবন যখন দুর্বিষহ হয়ে পড়তো, বাধ্য হয়ে তাদেরকে তখন হিন্দু মহাজনদের দ্বারস্থ হতে হতো। উপরন্ত তাদের গরু, মহিষ মহাজনের কাছে বন্ধক রাখতে হতো। অভাবের দরুন মহাজনের কাছে অগ্রিম কোন শস্য গ্রহণ করতে হলে তার দ্বিগুণ পরিশোধ করতে হতো। আবার উৎপন্ন ফসল যেহেতু মহাজনের বাড়ীতেই তুলতে হতো, এখানেও তাদেরকে প্রতারিত করা হতো। মোটকথা হতভাগ্য কৃষকদের জীবন নিয়ে এসব জমিদার মহাজনরা ছিনিমিনি খেলে আনন্দ উপভোগ করতো।
কৃষকদের এহেন দুঃখ-দুর্দশার কোন প্রতিকারের উপায়ও ছিল না। কারণ তা ছিল অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ। উপরন্ত জমিদার ও তাদের দালালগণ উৎকোচ ও নানাবিধ দুর্নীতির মাধ্যমে মামলার খরচ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিত। পরিণাম ফল এই হতো যে, জমিদার মহাজন তাদেরকে ভিটেমাটি ও জমিজমা থেকে উচ্ছেদ করে পথের ভিখারীতে পরিণত করতো। (বাংলার মুসলমানদের ইতিহাসঃ আব্বাস আলী খান, পৃ.-১০৪)

নীলকরদের অত্যাচার
বৃটিশ সৃষ্ট নব্য জমিদারদের শোষণ এবং নিত্য নৈমিত্তিক, নিপীড়নের সাথে যুক্ত হল আর এক যন্ত্রণা নীলকরদের অত্যাচার। যেন গোদের উপর বিষফোড়া। এদিকে সিরাজের পতনের পর কোম্পানীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে বৃটিশ বণিকেরা নীলের জন্য বাংলাকে উপযুক্ত স্থান বলে মনে করল। শুরু হল ব্যাপক নীলচাষ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহে প্রতিষ্ঠিত হল নীলকুঠি। রাজ্য হারিয়ে, জমিদারী হারিয়ে, চাকুরিচ্যুত হয়ে মুসলমানরা যখন দু’মুঠো অন্নের জন্য পুরোপুরি কৃষিনির্ভর হয়ে উঠল, সে সময় বৃটিশ বণিকরা নব্য জমিদারদের পাশাপাশি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় ডেরা বাঁধল। জমিদারদের শোষণের সাথে সাথে শুরু হল জুলুম। বণিকরা কোম্পানীর বিজয়ের আধিপত্যকে পুঁজি করে গ্রামবাংলায় ঝ^াঁপিয়ে পড়ল। এরা নীলের এমন নিম্নমূল্য বেঁধে দিল যাতে চাষীদের উৎপাদন খরচও উঠতো না। এই নিষ্ঠুর নীলকর সাহেবরা কৃষকদের নীল চাষে বাধ্য করত। তা না হলে বাড়ীঘরে আগুন লাগিয়ে দিত, দৈহিক অত্যাচার করত, এমনকি মহিলাদের অপরহণ করত। এছাড়াও জাল চুক্তিনামার বলে জমি-জিরাত ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করতো। প্রশাসন এবং নব্য জমিদারদের সাথে ছিল এদের অন্তরের যোগ। এ কারণে পুলিশে খবর দিয়ে প্রতিকার তো হতোই না পরন্তু উল্টো ঝামেলায় পড়তে হতো। অনেক সময় জমিদাররা প্রজাকে শাস্তি দেয়ার জন্য তার কাছ থেকে জমি কেড়ে নিয়ে নীলকরদেরকে হস্তান্তর করত। যে কারণে একজন ম্যাজিষ্ট্রেট একজন খৃস্টান মিশনারীকে কথা প্রসঙ্গে বলেন- ‘মানুষের রক্তে রঞ্জিত হওয়া ব্যতীত একবাক্স নীলও ইংলন্ডে প্রেরিত হয় না।’ (নীল কমিশন রিপোর্ট এবং ক্যালকাটা খৃস্টান অবজারভার, নভেম্বর ১৮৫৫ সাল)। ঐতিহাসিক হারান চন্দ্র চাকলাদার লিখেছেন, ‘ইউরোপীয়রা এদেশে এসেছিল দাস মালিকের মনোবৃত্তি নিয়ে। নিরঙ্কুশ শ্রেষ্ঠত্বের প্রচণ্ড লোভের সংগে উদ্ভাবনী কল্পনাশক্তি মিলিত হয়ে যত প্রকার উপায় আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিল তার প্রত্যেকটিকেই নীলকর সাহেবরা এদেশে প্রয়োগ করেছিল।... (ফিফটি ইয়ার্স এগো, ডন ম্যাগাজিন, জুলাই, ১৯০৫)

লা’খেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
পলাশী যুদ্ধের প্রায় ১৫ বছর পর ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তরবারির জোরে বঙ্গীয় এলাকায় তহসিলের দায়িত্ব নেয়ার পর ভেবেছিল যে খাজনা আদায়ের উদ্বৃত্ত অর্থ থেকে কোম্পানীর হেড অফিসে পাঠানো সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে তা না হওয়ার ফলে ১৭৭২ খৃস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিং সর্বপ্রথম হিসেব করে বের করলেন যে, বাংলার ৪ ভাগের ১ ভাগ জমি একেবারে নিস্কর অর্থাৎ লাখেরাজ হয়ে রয়েছে। এর পর থেকেই ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী নানা বাহানায় এসব জমি খাজনা যুক্ত করার জন্য এক অঘোষিত যুদ্ধ অব্যাহত রাখে, জমির প্রকৃত মালিক স্থিরীকরণের অছিলা এসব বাহানার অন্যতম। (কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী এম, আর, আখতার মুকুল, পৃ.-৭৮)

কয়েক শতাব্দী ধরে লাখেরাজ সম্পত্তি যথানিয়মে ভোগ দখল হয়ে আসছিল। শাসক পরিবর্তন হলেও লাখেরাজ সম্পত্তির উপর কেউ হস্তক্ষেপ করেনি। কিন্তু বৃটিশ বেনিয়াদের অর্থনৈতিক লালসা এমন তীব্র ছিল যে লাখেরাজ সম্পত্তির উপর নির্মমভাবে হস্তক্ষেপ করতেও তারা কুণ্ঠিত হয়নি। লর্ড কর্নওয়ালিশ ১৭৯৩ সালে আইনের ১৯ ও ৩৭ প্রবিধান বলে অফিসে লাখেরাজ জমির দানপত্র পরীক্ষার ব্যাপারে জেলা কালেষ্টর অফিসে জমা দেয়ার জন্য নিস্কর সম্পত্তির মালিকদের প্রতি নির্দেশ জারি করেন। কোন মাপকাঠির ভিত্তিতে দলিলসমূহ পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হবে সে ব্যাপারে কোন দিক নির্দেশনা ছিল না। সম্ভবত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ‘মরি মারি পারি যে কৌশলে’। যেভাবেই হোক লাখেরাজ সম্পত্তি হস্তগত করাই হল ইংরেজ সরকারের মূল লক্ষ্য। কোন মাপকাঠি না থাকার দরুন কালেষ্টরের ইচ্ছাই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। ওদিকে কালেক্টরদের প্রলুব্ধ করার জন্য বলা হয়, যেসব জমি বাজেয়াপ্ত করা হবে, কালেক্টরদের সেগুলির প্রথম বছরের খাজনার এক চতুর্থাংশ কমিশন হিসেবে দেয়া হবে। স্বাভাবিকভাবে কমিশন প্রাপ্তির আশায় লাখেরাজ সম্পত্তি সরকারের হাতে তুলে দেয়া কালেক্টরের মূল লক্ষ্য হয়ে উঠল। এ যেন বৈধতার মোড়কে চুরিকে উৎসাহিত করা। এছাড়াও এক পর্যায়ে কালেক্টরদের নিস্কর জমি সংক্রান্ত মোকদ্দমা বিচারের অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়া হয়। সরকারী বাদী এবং বিচারক উভয়বিধ ক্ষমতার অধিকারী হয় কালেক্টর স্বয়ং। এর ফলে লাখেরাজ সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলাসমূহের সুবিচারমূলক নিষ্পত্তি হয়নি।

চট্টগ্রাম বোর্ড অব রেভিনিউ-এর জনৈক অফিসার নিম্নোক্ত মন্তব্য করেনঃ সরকারের নিয়তের প্রতি লাখেরাজদারগণ সন্দিগ্ধ হয়ে পড়লে তাতে বিস্ময়ের কিছুই থাকবে না। এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক, ১৪৮৬৩টি মামলার মধ্যে সব কয়টিতেই লাখেরাজদারদের অনুপস্থিতিতে সরকারের পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ তিক্ত অভিজ্ঞতার পর Tribunals of Resumption-এর প্রতি তাদের আস্থাহীন হবারই কথা। Comment by Smith on Harver’s Report of 19th June 1840. A.R. Mallick: British policy and the Muslims of Bengal.
মুসলমান লাখেরাজদারদের ন্যায্য ভূমি মালিকানা থেকে উচ্ছেদ করার জন্যে নানাবিধ হীনপন্থা অবলম্বন করা হতো এবং ইংরেজ কর্মচারীদের মধ্যে এ ব্যাপারে এক বিদ্বেষদুষ্ট মানসিকতা বিরাজ করতো। লাখেরাজদারদের সনদ রেজিষ্ট্রী না করার কারণে বহু লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। জেলার কালেক্টরগণ ইচ্ছা করেই সময়মতো সনদ রেজিষ্ট্রী করতে গরিমসি করতো। তার জন্যে চেষ্টা করেও লাখেরাজদারগণ সনদ রেজিষ্ট্রী করাতে পারতেন না।

চট্টগ্রামে লাখেরাজদারদের কোর্টে হাজির হবার জন্যে কোন নোটিশই দেয়া হতো না। অনেক ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে যে, মামলার ডিক্রী জারী হবার বহু পূর্বেই সম্পত্তি অন্যত্র পত্তন করা হয়েছে। ১৮২৮ থেকে ১৮৫১ সাল পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে সমগ্র বাংলা বিহারে লাখেরাজদারদের মিথ্যা তথ্য সংগ্রহের জন্যে চর, ভুয়া সাক্ষী ও রিজাম্পশন অফিসার পংগপালের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুসলমানদেরকে মামলায় জড়িত করে। এসব মামলায় সরকার ছাড়াও তৃতীয় একটি পক্ষ বিরাট লাভবান হয়। যারা মিথ্যা সাক্ষ্যদান করে এবং যারা সরকারী কর্মচারীদের কাছে কাল্পনিক তথ্য সরবরাহ করে- তারা প্রভুত অর্থ উপার্জন করে। পক্ষান্তরে, মুসলিম উচ্চশ্রেণী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হওয়ার ফলে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়ে যায়। (বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস আব্বাস আলী খান, পৃ.-১০৩)

‘লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ফলে ১৮৪৭-৪৮ সাল পর্যন্ত সরকারের যাহা খরচ হয়, তাহা এই বার্ষিক আয়ের প্রায় চারগুণ ছিল। হান্টার লিখিয়াছেন যে, এই আয়ের অধিকাংশই মুসলমানদের লাখেরাজ সম্পত্তি হইতে হইত। লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্তির দরুন বাংলার মুসলমানদের যে কি ভয়ানক ক্ষতি হইয়াছিল, তাহা উল্লেখ করিয়া হান্টার বলিয়াছেন, শত শত পরিবার সর্বস্বান্ত হইয়া পড়ে এবং যে সকল মুসলিম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিস্কর জমির আয়ের উপর চলিত সেগুলি ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। সরকারের আঠার বৎসরব্যাপী স্বেচ্ছাচারিতামূলক কার্যকলাপের দরুন মুসলমানদের শিক্ষিত শ্রেণীর অস্তিত্ব বিপন্ন হয়।

সিরাজের পতনের পর থেকে কোম্পানী কর্তৃপক্ষের প্রতিটি পদক্ষেপে মুসলমানদের জন্য ছিল অসনি সংকেত। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ মুসলমানদেরকে অনিবার্য ধ্বংসের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে। আঘাতে আঘাতে মুহ্যমান করে তুলেছে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠি বাংলার মুসলমানদের। বিনয় ঘোষের ভাষায়ঃ মুসলমানদের প্রতি বৃটিশ শাসকদের অবিচার ও বিদ্বেষভাব প্রথম যুগে বেশ প্রবল হয়ে উঠেছিল। ইংরেজদের নতুন জমিদারী ব্যবস্থার ফলে শুধু যে মুসলমান জমিদার জায়গীরদার ধ্বংস হয়ে গেলো তা নয় বাংলার যে কৃষক প্রজারা ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হল তাদের মধ্যে অধিকাংশ মুসলমান। (কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী এম আর আখতার মুকুল, পৃ.-৭৩)

এখানে এসে বৃটিশদের চক্রান্ত থেমে থাকল না। হিন্দু জনগোষ্ঠীর জন্য সৌভাগ্যের দ্বার একটার পর একটা উন্মোচন করার এবং মুসলমানদের রুটিরুজীর পথ রুদ্ধ করে সর্বহারা জাতিতে রূপান্তর করার চক্রান্ত অব্যাহত থাকল। হিন্দুদের সাথে হৃদ্যতা উত্তরোত্তর বাড়তে লাগল। ১৮৩৭ সালে অফিস আদালতে ফার্সীর পরিবর্তে ইংরেজীর প্রবর্তন মুসলমানদের কপালে বরাবর আর এক প্রচণ্ড আঘাত।
কোলকাতা কেন্দ্রিক হিন্দু এলিটদের সাথে বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ১৮৩৭ সালে মুসলমানদের ক্ষতবিক্ষত করার জন্য এই বিষাক্ত তীর নিক্ষেপ করা হয়। একটু গভীরভাবে খতিয়ে দেখলে চক্রান্তটা সুস্পষ্টই হয়ে উঠে। ১৮১৬ খৃস্টাব্দে উচ্চ শিক্ষার জন্য কোলকাতায় প্রথম হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়। এই সময় থেকেই কোলকাতা এবং তার সন্নিহিত এলাকাসমূহে ব্যাপক ইংরেজী শিক্ষা প্রসারের উদ্যোগ দেখা যায়। এর ফলে ১৫/২০ বছর সময়ের মধ্যে বিরাট সংখ্যক হিন্দু যুবক শিক্ষা সমাপন করে বেরিয়ে আসে। ওদিকে ইংরেজরা ভাষা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশের আগেই দেখা গেল ১৮৩৫ সালে ইংরেজদের সহযোগী শক্তি ঔপনিবেশিক দালাল কোলকাতার ধনাঢ্য বর্ণহিন্দুরা ৬,৯৪৭ জনের এক যুক্ত দরখাস্তে অফিস আদালতের ভাষা ইংরেজী চালু করার দাবী তোলে। ওদিকে ১৮৩২ সালে ক্যাপ্টেন টি বৃসকান সিলেক্ট কমিটির কাছে অত্যন্ত জোরের সংগে সুপারিশ করেছিলেন যে অফিসের ভাষার পরিবর্তনটা যেন মন্থর হয়। অন্যথায় বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠী মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু তার সুপারিশ অরণ্যের রোদনে পরিণত হল। ১৮৩৭ সালে অফিস আদালতে এবং ১৮৪৪ সালের ১৪ই অক্টোবর সরকারী নির্দেশ এই মর্মে জারী করা হল যে ‘অতঃপর সরকারের সমস্ত দপ্তরে ইংরেজী শিক্ষিত লোকদের চাকুরিতে নিয়োগ করতে হবে। (কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী এম, আর আখতার মুকুল, পৃ-৭৩)

ফারসীর বদলে ইংরেজী চালু করার শক্ত পদক্ষেপ নেয়ার ফলে শিক্ষা বিভাগ এবং প্রশাসনের অন্যান্য বিভাগ থেকে দলে দলে বাঙালী মুসলমানরা চাকুরীচ্যুত হয়ে বিতাড়িত হল। ‘এ পরিবর্তন অপর সম্প্রদায়ের (বাঙালী হিন্দু) জন্য খুব সুখকর হয়ে উঠলো। কারণ তারা ইতিমধ্যেই ইংরেজী শিক্ষায় অনেকদূর অগ্রসর হতে পেরেছিল। মুসলমানদের জন্য এ সময়ে ইংরেজী শিক্ষার কোন প্রতিষ্ঠান ছিল না। সুতরাং হিন্দু কলেজের (পরবর্তীতে কোলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ) ছাত্ররা এই পরিবর্তনের পূর্ণ উপকার ভোগ করেছে। অপরপক্ষে মুসলিম আপার ক্লাশ নতুন ব্যবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে সর্বস্তরের অফিস আদালত থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। (ব্রিটিশ নীতি ও বাংলার মুসলমান)

আমীর আলী আরো বলেন- “গত বিশ বৎসর যাবত মুসলমানগণ যোগ্যতা লইয়া চাকুরীতে ঢুকিতে আপ্রাণ চেষ্টা করিতেছে; কিন্তু ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকগণ প্রত্যেক সরকারী চাকুরীর দ্বার রুদ্ধ করিয়া রাখায় তাহাদের পক্ষে কোনো অফিসে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছে। যদি সৌভাগ্যক্রমে কোন মুসলমান চাকুরী পায়, তাহা হইলে ইহা রক্ষা করাও তাহার পক্ষে কঠিন হয়ে উঠে।”

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh