eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ৭ Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:17
সিপাহী বিপ্লবের পর কেড়ে নেয়া হল মুসলমানদের মুখের ভাষা

ওদিকে (পাঁচ-সাতশ’ বছর ধরে একটানা মুসলিম শাসনামলে আরবী ফারসী  সমন্বয়ে প্রাকৃতিক নিয়মে মিশ্র প্রক্রিয়ায় সহজভাবে ভাব প্রকাশের জন্য একটা ভাষার উদ্ভব হয়েছিল সেটাকে বলা হত চলতি ভাষা। অনেকে বলত মুসলমানী ভাষা। এ প্রসঙ্গে উইলিয়াম হান্টার বলেন- আজ পর্যন্ত বদ্বীপ অঞ্চলের কৃষক মুসলমান। নিম্নবংগে ইসলাম এতই বদ্ধমূল যে, এটি এক নিজস্ব ধর্মীয় সাহিত্য ও লৌকিক উপভাষার উদ্ভব ঘটিয়েছিল। হিরাতের ফার্সী ভাষা থেকে ভারতের উর্দু যতোখানি পৃথক, ‘মুসলমানী বাংলা’ নামে পরিচিত উপভাষাটি উর্দু হতে ততোখানি পৃথক। (W. W Hunter-Indian Musoleman’s, P-146.) এই ভাষার পরিচয় যে যেভাবেই উপস্থাপন করুক না কেন, এটা ছিল হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে এদেশের প্রতিটি মানুষের মুখের ভাষা। এ সত্বেও গোড়া হিন্দু পণ্ডিতেরা এই ভাষাকে অবজ্ঞা অবহেলার চোখে দেখত। এর কারণ সম্ভবত এ ভাষাতে ছিল আরবী ফারসী উর্দু শব্দসমূহের সহজ মিশ্রণ। এছাড়াও ছিল এর মধ্যে মুসলিম সংস্কৃতির স্বাচ্ছন্দ প্রবেশাধিকার। হিন্দু মানসিকতার কাছে এটা ছিল দুর্বিসহ। শতাব্দীর পর শতাব্দী মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণে এর বিরুদ্ধে হিন্দু পণ্ডিতেরা সক্রিয় অবস্থান নিতে পারেনি। মুসলিম শাসকদের ঔদার্যের কারণে তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দুদের অনেক ধর্মীয় গ্রন্থ অনুবাদ হয়। কিন্তু এইসব গ্রন্থ সাধারণ হিন্দুদের পাঠের ব্যাপারে হিন্দু পণ্ডিতেরা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রাখে। তারা বলে, অষ্টাদশ হিন্দু পুরাণ রাম চরিত যে মানব পড়বে, তার ব্যবস্থা হবে রৌরব নরকে। তাদের এই নিষেধাজ্ঞা পুরো হিন্দু সমাজকে চলতি বাংলাভাষা চর্চার ব্যাপারে অনীহাপ্রবণ করে তোলে। ভাষা চর্চার ব্যাপারে তারা সংস্কৃত আশ্রিত হয়ে উঠে।

ওদিকে খৃস্টান মিশনারীদের লক্ষ্য যেহেতু হিন্দু জনগোষ্ঠী তারা হিন্দুদের উপর প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে তাদের উপযোগী সাহিত্য সৃষ্টির জন্য সংস্কৃত ভাষাকে নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করে। একথা খৃস্টান মিশনারীগণও ভালোভাবে উপলব্ধি করেন যে, যে ভাষার প্রতি হিন্দু পণ্ডিতগণ ঘৃণা পোষন করেন, সে ভাষার শুদ্ধিকরণ ব্যতীত তার দ্বারা খৃস্টধর্মে আকৃষ্ট করা কষ্টকর হবে। তাই তাঁরা এক ঢিলে দুই পাখি মারার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হন। ভাষাকে আরবী-ফার্সীর ছোঁয়াচ্ থেকে রক্ষা করে হিন্দুর গ্রহণযোগ্য করা এবং মুসলমানদের বাংলা মাতৃভাষার ধ্বংসযজ্ঞ সম্পাদন করা, যার উল্লেখ সজনীকান্ত করেছেন। এ মহান (?) উদ্দেশ্যে নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড (Halhed) ১৭৭৮ সালে A Grammar of the Bengali Literature নামে বাংলা ব্যাকরণ প্রণয়ন করেন এবং শ্রীরামপুর প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় মুদ্রিত গ্রন্থ হিসেবে। এইটিই ছিল প্রথম- যাতে প্রথম বাংলা অক্ষর ব্যবহৃত হয়। এরপর শুরু হয় সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা। ১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়ামে বাংলা বিভাগ খোলা হয়। উইলিয়াম কেরী হলেন অধ্যক্ষ, ভাষা সংস্কারের জন্য তার অধীনে ৮ জন পণ্ডিত নিযুক্ত হলো। সংস্কৃত স্টাইলের বাংলা ভাষায় মুসলমান বিবর্জিত বিষয়বস্তু নিয়ে পুস্তক প্রকাশ শুরু হল। প্রতাপ আদিত্য, রূপ সনাতন, বীরবল ইত্যাদি নিয়ে শুরু হল ভারতীয় ইতিহাসের চরিত্র চিত্রণ।

আবদুল মওদুদ বলেন- “এই মিশ্রনীতির বাংলাভাষায় সাহিত্য গড়ে উঠার মুখেই বণিকের তুলাদণ্ড হলো রাজদণ্ডে রূপান্তরিত এবং বণিকের তল্পীবাহক মিশনারীরাও দিলেন সাহিত্যের ভাষার মোড় পরিবর্তন করে।... পাশ্চাত্যের শিক্ষার প্রবর্তকরা বাংলা ভাষার কাঠামোকেও নতুন ছাঁচে তৈরী করে দিলেন- বাবু সম্প্রদায়ের জন্যে। তার দরুন বাবু কালচারের আবাহন হলো যে ভাষায়, তা কেবল সংস্কৃতঘেঁষা নয়, একেবারে সংস্কৃতসম। আর এটিও হয়েছে সুপরিকল্পিত সাধনায়- হিন্দু পন্ডিতরা উল্লসিত হলেন। তার দরুন সংস্কৃত ভাষা ও কৃষ্টির নব প্রবর্তনের সম্ভাবনায় এবং মিশনারীকূল তৎপর হয়েছিলেন মুসলমানদের মুখের ভাষা কেড়ে নিয়ে তাকে সাহিত্য ও কালচারের দিক দিয়েও নিঃস্ব করে দিতে। (আব্দুল মওদুদ, মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ, পৃঃ ৩৮৫)

শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানদের পিছু হটিয়ে দেয়া হল
সে দিনের সুবাহ বাংলায় শিক্ষার এত ব্যাপক বিস্তৃতি সম্ভব হয়েছিল শিক্ষার প্রতি মুসলমানদের ঐতিহ্যগত অনুরাগের কারণে। শাসক, ওমরাহ রাজকর্মচারী এবং সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা শিক্ষিত লোক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এদেশের মুসলমানদের বিদ্যানুরাগ কত প্রবল ছিল উইলিয়াম এডামসের বক্তব্য থেকে বুঝা যায়। তিনি বলেনঃ বাংলার মুসলমান বহু বেসরকারী বিদ্যালয় স্থাপন করেছিল এবং শিক্ষাকে তারা কেবল জীবনের পেশা এবং জীবিকা নির্বাহের উপায় হিসেবে গ্রহণ করেনি। তারা তাকে ন্যায় এবং পূণ্যের কাজ বলে বিশ্বাস করত। (মুসলমানদের ইতিহাস এম এ রহিম, পৃঃ ১০০)

বিহারে ৪ কোটি মানুষের জন্য এক লক্ষ প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। একজন প্রাচ্য বিশারদ বলেন, ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার ৩০ বছর পূর্বে বাংলায় ৮০ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। ফারুক মাহমুদ লিখেছেন, তৎকালীন বাংলায় ১৩টি বিশ্ব বিদ্যালয় ছিল। এ সত্ত্বেও মাত্র কয়েক যুগের ব্যবধানে শিক্ষার উজ্জল দিগন্ত থেকে ছিটকে হারিয়ে গেল অন্ধকারের অতল গহবরে। কিন্তু কিভাবে এমনটি হল।
মুসলমানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের অর্থনৈতিক উৎস ছিল লাখেরাজ সম্পত্তি। ইতিপূর্বে আমরা বলেছি, লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহ অর্থ সংকটে অচল হয়ে পড়েছিল। বৃটিশ হিন্দু যৌথভাবে এমন নীতি অবলম্বন করেছিল যেন মুসলমানরা তাদের বিধ্বস্ত বর্তমানকে সামাল দিতে ব্যস্ত থাকে।

এম. এ রহিমের ভাষায়- ‘হিন্দু জমিদারগণ তাঁহাদের সম্প্রদায়ের জন্য স্কুল স্থাপন করিয়াছেন। পূর্ববাংলায় কোন কোন হিন্দু জমিদার তাঁহাদের জমিদারীতে স্কুল স্থাপন না করিয়া পশ্চিম বাংলার হিন্দু এলাকায় স্কুল স্থাপন করেন। ঠাকুর পরিবার এবং আরও অনেক হিন্দু জমিদারের পূর্ববাংলায় জমিদারী ছিল। তাঁহারা কলিকাতা ও পশ্চিম বাংলায় বাস করিতেন এবং সেখানকার লোকের শিক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় করিতেন। তাহারা পূর্ববাংলায় নিজেদের জমিদারীর প্রজাদের শিক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় করেন নাই। কোন কোন জমিদার প্রজাদের শিক্ষার বিরোধী ছিলেন, কারণ তাঁহারা মনে করিতেন যে, প্রজাগণ শিক্ষিত হইলে জমিদারীতে তাঁহাদের কর্তৃত্ব দুর্বল হইয়া পড়িবে। (বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস এম. এ রহিম, পৃঃ ১১২)

‘মিশনারী স্কুল ও কলেজের পাঠ্যতালিকা মুসলমানদের জন্য গ্রহণযোগ্য হয় নাই। হিন্দুদের পরিচালিত স্কুল ও কলেজে মুসলমানদের শিক্ষার উপযোগী না হওয়ায় তাহারা সেখানে ভর্তি হইতে উৎসাহ পাইত না। বিদ্যালয়গুলোতে যে সংস্কৃত উদ্ভুত বাংলা শিক্ষা দেওয়া হইত তাহা মুসলমান ছাত্রদের পক্ষে খুব কঠিন হইয়া পড়িত, কারণ তাহারা কথ্যভাষা ব্যবহার করিত। তাহা ছাড়া বাংলা পাঠ্যপুস্তক দেবদেবী ও পৌরাণিক কাহিনীতে পূর্ণ ছিল।’ এ প্রসঙ্গে ইসি বেইলী বলেন- ‘শিক্ষা পদ্ধতি মুসলমানদের নিকট গ্রহণযোগ্য না হওয়ার কারণ ছিল, এটা প্রবর্তন করার সময় তাদের সংস্কার সম্বন্ধে কোনরূপ বিবেচনা করা হয়নি এবং তাদের প্রয়োজনের প্রতিও লক্ষ্য করা হয়নি। এই জন্য শিক্ষাপদ্ধতি তাদের স্বার্থের পরিপন্থী ও সামাজিক রীতিনীতির প্রতিকূল হয়ে পড়ে।”
বেইলী আরো বলেন- ‘সত্য কথা বলতে গেলে বলতে হয় যে, আমাদের জনশিক্ষা পদ্ধতি তিনটি বিষয়ে মুসলমানদের প্রবল মানসিক বৃত্তি উপেক্ষা করেছে। প্রাদেশিক ভাষায় শিক্ষা মুসলমানদের মনঃপূত হয়নি এবং হিন্দু শিক্ষকও তাহাদের নিকট গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাছাড়া গ্রাম্য বিদ্যালয়গুলিতে যে শিক্ষা দেয়া হত তা মুসলমান ছাত্রদিগকে সামাজিক জীবনে শ্রদ্ধার আসন পেতে ও ধর্মীয় কর্তব্য পালন করতে সাহায্য করত না। জিলা স্কুলগুলিতেও আরবী-ফার্সী শিক্ষার কোন ব্যবস্থা ছিল না। জনশিক্ষা পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থার কোন পর্যায়ে ধর্মীয় শিক্ষার স্থান ছিল না। মুসলমানগণ সাধারণ শিক্ষার সহিত ধর্মীয় শিক্ষা অত্যাবশ্যক বলিয়া মনে করিত। (বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস এম. এ রহিম, পৃঃ ১১২-১১৩)

বৃটিশ ও বর্ণ হিন্দুদের উদ্যোগে ধ্বংস হল বাংলার শিল্প
বাংলার এই বিপুল ঐশ্বর্যের প্রতি বৃটিশ বেনিয়াদের ছিল অপরিসীম লোভ। এই সম্পদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল তাদের দীর্ঘ কালের প্রয়াস। সুদীর্ঘকাল ধরে সুপরিকল্পিতভাবে তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা কাজ করে গেছে। প্রথমতঃ তারা এদেশের ধনিক বণিক বিশেষ করে হিন্দু বণিকদের সাথে সখ্যতা স্থাপন করে। বাংলার রাজদরবারে এসব বণিকদের প্রভাব থাকার কারণে তাদের মাধ্যমে বৃটিশরা সব ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা আদায় করে নেয়।
দ্বিতীয়তঃ বৈদেশিক বাণিজ্য ক্ষেত্রে সমস্ত বিদেশী বণিকদের বাংলাদেশের বাজার থেকে বিতাড়িত করে। কখনো শক্তি প্রয়োগ করে, কখনো হিন্দু বেনিয়া রাজা মহারাজাদের মাধ্যমে রাজদরবারে প্রভাব বিস্তার করে সরকারী নীতি নির্ধারণের মাধ্যমে অন্যান্য বিদেশী বণিকদের বৃটিশরা বাংলাছাড়া করে। মসলিন সুতি কাপড় রেশম ও রেশমজাত বস্ত্র চিনি চাউল, আফিম সল্টপিটার ইত্যাদি রপ্তানীর ক্ষেত্রে মনোপলি প্রতিষ্ঠা করে। সিরাজের পতনের পর বলতে গেলে সব কিছুর উপর বৃটিশদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর দেওয়ানী প্রাপ্তির পর ব্রিটিশরা এমন রাজস্ব আয়-ব্যয় নীতি প্রবর্তন করে যার তুলনা বিশ্ব-ইতিহাসে ছিল না এবং এখনো নেই। কর আরোপ এখন থেকে হয়ে দাঁড়াল কোম্পানীর মুনাফা লোটার এক বাড়তি এবং মোটা রকমের উৎস। এখন হতে বাংলা থেকে আমদানিকৃত পণ্যদ্রব্যের জন্য ব্রিটেনের কোন মূল্য দিতে হত না। মূল্য প্রদান করা হত বাংলার রাজত্ব থেকে যাকে কোম্পানী তার বৈধ “মুনাফা” স্বরূপ গণ্য করত। ব্রিটেনে প্রেরণের উদ্দেশ্যে বাংলার পণ্যদ্রব্য খরিদের জন্য রাজস্ব সঞ্চয় ব্যবহার করাটাকে মোলায়েম করে বলা হত “বিনিয়োগ”। এই পণ্যদ্রব্য ব্রিটেনে বিক্রয় করে যে অর্থ লাভ হত তা জমা পড়ত কোম্পানীর লন্ডনস্থিত হিসেবের খাতায়, এবং বাংলা তা থেকে বঞ্চিত হত চিরতরে। রমেশ দত্তের ভাষায়ঃ মূল্যহ্রাস প্রাপ্ত টাকার হিসেবে পড়লে এটা দাঁড়াবে ১৪,৫০০০ কোটি টাকার সমান। (নতুন সফর, ঢাকা)

অতীতে বাংলা চিরদিনই ছিল পণ্যদ্রব্যের রপ্তানিকারক দেশ। উদ্বৃত্তের বিনিময়ে আমদানি হত স্বর্ণ ও রৌপ্যের বাট, ধাতু মুদ্রা ও মণিরত্ন। রাজস্ব ব্যবস্থা কোম্পানীর হাতে যাওয়ার পর থেকেই স্বর্ণ-রৌপ্যের বাট প্রভৃতি আমদানী বন্ধ হয়ে যায়। কোম্পানির উদ্বৃত্ত রাজস্ব দিয়ে ব্রিটেন বাংলার পণ্যদ্রব্য ক্রয় করত। কিন্তু বাংলাকে ব্রিটিশ মালপত্র ক্রয় করতে হত ব্রিটিশ উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত দরে। ব্যক্তিগত হিসেব মারফতও পাঠান হত প্রচুর অর্থ। এর মধ্যে থাকত কোম্পানীর দালাল-গোমস্তা অথবা কর্মচারীদের বেতন থেকে সঞ্চিত আয়, ব্যক্তিগত ব্যবসা থেকে অর্জিত মুনাফালব্ধ অর্থ এবং কোম্পানির নিজস্ব ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ। রাজস্ব সঞ্চয়সহ এই অর্থের কিছু অংশ রেলপথ অথবা জনহিতকর কার্যে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে পরবর্তীকালে উচ্চ সুদে ভারতে ফিরে এসেছে। ফলে বিরাট হয়ে জমে উঠেছে ভারতের সরকারী ঋণের বোঝা। এই বোঝা আরো ভারী হয়ে উঠেছে অপর একটি কারণে। বিভিন্ন যুদ্ধে ইংরেজদের যে অর্থ ব্যয় হত তার দায় তারা চাপিয়ে দিত ভারতের কাঁধে।
বৃটিশরা এদেশে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রচলন করল দুটি উদ্দেশ্য সামনে নিয়ে। আর্থিক কারসাজির মাধ্যমে দেশীয় ব্যবসায়ী মুৎসুদ্দী শ্রেণীকে বৈদেশিক বাণিজ্যের অঙ্গন থেকে হটিয়ে দিয়ে অন্তর্মুখী করে তোলা এবং সুদকে ব্যবসার আকর্ষণীয় বিকল্প বানিয়ে স্থানীয় উৎপাদনের বিনাশ করা। আর্থিক নীতি নির্ধারণের মাধ্যমে তারা অর্থনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ শুরু করল। শোষণের দ্বার অবারিত করল সুদ ব্যবস্থার প্রচলন ঘটিয়ে। এদেশের উৎপাদন এবং বাণিজ্যের সাথে সংশ্লিষ্টরা ক্রমশ উৎসাহ হারাতে থাকে। এদেশী ভোক্তাদের প্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি মূল্য গুনতে হত। বৃটিশরা এদেশে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আগে তাঁতশিল্পে বাংলার অগ্রগতি বিশ্ববাজারে শ্রেষ্ঠত্বের দাবী রাখত। এই শিল্পে বৃটিশরা হস্তক্ষেপ করে এবং শিল্প সংশিষ্টদের নিপীড়নের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে পরিকল্পিতভাবে এ শিল্পকে ধ্বংস করে।
উইলিয়াম বোল্ট নামে একজন ইংরেজ বণিক বাংলার তাঁতীদের উপর কোম্পানীর নিপীড়নের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন- ‘ইংরেজ এবং তাদের অনুগত হিন্দু বেনিয়া এবং গোমস্তাগণ নিজেদের মর্জি মাফিক কাপড়ের দর বেঁধে দিয়ে সেই নির্দিষ্ট দরে কাপড় সরবরাহে বাধ্য করত। নীলকরদের মত তারা বাধ্য করত তাঁতীদের স্বার্থবিরোধী চুক্তি স্বাক্ষর করতে। কোম্পানীর বেঁধে দেয়া বাজার দর থেকে শতকরা ১৫ থেকে ৪০ ভাগ কম হত। তাদের নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে বস্ত্র সরবরাহ করতে না পারলে তাঁতীদেরকে বেত্রাঘাত করা হত।’ পরবর্তীতে কোম্পানী বাংলার বস্ত্রশিল্পকে ধ্বংস করার জন্য বাংলার উৎপাদিত বস্ত্র ইংল্যান্ডে না এনে কাঁচামাল হিসেবে রেশম এবং কার্পাস আমদানী করত। ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের ফলে বাংলার তাঁত শিল্প ধ্বংসের ক্ষেত্রে আর একমাত্রা যোগ হয়। স্থানীয় উৎপাদিত যন্ত্রের উপর কোম্পানী শুল্ক নির্ধারণ করার ফলে ইংল্যান্ড থেকে আমদানীকৃত বস্ত্রের সাথে প্রতিযোগিতায় এদেশের তাঁতীরা কুলিয়ে উঠতে পারে না। এভাবে দেশের তাঁতশিল্প পর্যায়ক্রমে মার খেতে খেতে তার অস্তিত্ব হারাতে থাকে। বৃটিশের নীতি ছিল এদেশের তাঁতী সম্প্রদায়কে নির্মূল করা।’ (মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশঃ আব্দুল মওদুদ)

এদেশের ভাগ্যহত তাঁতীদের দুঃখ দুর্দশা সম্পর্কে পন্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু বলেন- ‘এসব তাঁতীদের পুরানো পেশা একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। নতুন কোন পেশার দ্বারও উন্মুক্ত ছিল না। উন্মুক্ত ছিল শুধু মৃত্যুর দ্বার। মৃত্যুবরণ করলো লক্ষ লক্ষ। লর্ড বেন্টিংক ১৮৩৪ সালের রিপোর্টে বলেন, তাদের দুঃখ-দুর্দশার তুলনা নেই বাণিজ্যের ইতিহাসে। ভারতের পথঘাট পূর্ণ হয়েছে তাঁতীদের অস্থিতে। (Pandit Nehru Discovery of India, P-352)
‘উনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশরা অধিকতর লাভজনক দু’টি বিকল্প ক্ষেত্রের সন্ধান পায়। একটি হলো পাট, অপরটি চা। পাটের ক্ষেত্রে একমাত্র শিকার হয় বাংলা এবং চায়ের ক্ষেত্রে প্রথমে আসাম ও তারপর বাংলা। বাংলা থেকে অর্থ সংগ্রহের মূখ্য উপায় হয়ে দাঁড়ায় পাট। কিন্তু তাতে চাষী বা বাংলার কোন লাভ হয়নি। বাজারে কারচুপি আর প্রত্যক্ষভাবে ঠকাবার দরুণ চাষের খরচ ওঠার মত দামও পাটচাষীর ভাগ্যে জুটত না। মুনাফা লুঠতো একমাত্র ব্যবসায়ীরা এবং পরবর্তীকালে পাটকলের মালিকরাও। ক্রীতদাসদের খাটানোর জন্য আমেরিকায় যেভাবে লোক নিযুক্ত করা হতো চা চাষের ক্ষেত্রে ব্রিটিশরাও সেই একই পন্থা অনুসরণ করতো। শ্রমিকদের চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়ে, তারপর খাটান হত রুক্ত পানি করে। লাভ যা হত সব পাঠান হত ব্রিটেনে। (নতুন সফর, ঢাকা)

ঔপনিবেশবাদী বৃটেন তাদের শাসনকালের দ্ইুপ্রান্তে দুটো মন্বন্তর উপহার দিয়েছিল বাংলাকে। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর এবং পঞ্চাশের মন্বন্তর। ১৭৬৯ সালে সংঘটিত দুর্ভিক্ষের ১ কোটি বাংলার মানুষ অনাহারে মুত্যৃবরণ করে। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে অনাহারে মৃত্যুবরণ করে ৩৫ লাখ আদম সন্তান। জে আর ডি টাটো ১৯৪৫ সালের মে মাসে লন্ডনে বলেন, যুদ্ধ এবং যুদ্ধে ভারতের সাহায্যের ফলে বাংলার দুর্ভিক্ষে লক্ষ মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে।

এই অবস্থায় মুসলিম উচ্চবিত্তদের আয় কমে গেলো। হিন্দু মধ্যবিত্তরা সরকারী সকল প্রকার চাকরি বাকরি থেকে মুসলমানদের বহিষ্কার করে দিল। রাজনৈতিক এই পরিবর্তনের ফলে নেতৃস্থানীয় মুসলিম পরিবারগুলো বিনষ্ট হয়ে গেল। বৃটিশদের মানসিক ভীতি হিন্দুদের প্রতিরোধস্পৃহা যুক্ত হয়ে নিত্য নব নব কৌশলে মুসলমানদের ওপর দিনের পর দিন চলতে থাকল জুলুম অত্যাচার আর শোষণ। বাংলার সমৃদ্ধশালী মুসলিম জনগোষ্ঠী কড়ির কাঙালে পরিণত হল। নৈরাজ্যের নিছিদ্র অন্ধকারে নিমজ্জিত হল। নিক্ষিপ্ত হল অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারের অতল গহবরে। বর্ণহিন্দুদের ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত হল মুসলমানরা। মুসলমানদের জাতীয় স্বাতন্ত্র হিন্দু ষড়যন্ত্র আর বৃটিশদের কায়েমী প্রভুত্বের দাপট থেকে নিস্কৃতির পথ রচনা করতে চেয়েছে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের বিপর্যয় পর্যন্ত ভারতের ইতিহাস বৃটিশ আর বর্ণহিন্দুদের যৌথ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে মুসলমানদের একটানা বিদ্রোহ সংঘাত আর লড়াইয়ের ইতিহাস। লক্ষ লক্ষ মুসলমান তাদের বুকের রক্ত উজার করে মুসলমানদের সভ্যতা সংস্কৃতি আর লুপ্ত গৌরবকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছে, তারপর হিম্মতহারা মুসলমান রণাঙ্গন পরিহার করে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতি রেখে বাঁচতে চেয়েছে। কিন্তু হিন্দু ষড়যন্ত্র আর শোষণের রাজনীতি মুসলমানদের মাথা গুড়িয়ে দিয়েছে।

(বইটির pdf version download করুন এখানে)


Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Comments  

 
+1 # AK Delwar Hussain 2011-09-18 04:29

All Praise and Glory belongs to Allah SWT.This is indeed a very commendable web site to learn about the truth behind the creation of so-called independent Bangladesh.It is said that if you speak the falsehood often enough some will never investigate the veracity and believe the falsehood as the truth. Among other great falsehoods the bases for the creation of Bangladesh is an open example. Those who fought for the truth, Islam and Muslims of Pakistan are not heard at all in any forum. Often these people are laughed, scoffed and ostracised by the "majority" and "civil society". As for me "Enough is Allah SWT and His Rule of Law of the Quran". My identity is Muslim and Muslim only ..This is our only identity from the earth to the heaven..
May Allah SWT guide us to the truth with the Quran always at all times.. Ameeen
I would like to draw the attention of administrator of this site to kindly accept two more books to your collection namely BDR Tragedy and Dui Polashi and Dui Amro Kanon By Aminul Hoque.

Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh