অধ্যায় ৩: ইতিহাস ভরপুর পক্ষপাতদুষ্টতায় Print
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 19 October 2008 03:03
পুলিশ, উকিল বা বিচারকের ভূমিকায় নামা ইতিহাসের লেখকের কাজ নয়। ঘটনা ঘটে যায়। সে ঘটনার পক্ষ-বিপক্ষের নিরপেক্ষ বিচারের দায়ভার প্রতিটি ব্যক্তির। যিনি ইতিহাস লেখেন তার দায়িত্ব,সে বিচারকার্যে ব্যক্তিকে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দিয়ে সাহায্য করা। কিন্তু বাংলাদেশে ইতিহাস লেখকদের বড় ব্যর্থতা এবং সে সাথে বড় অপরাধ হল, পাঠকের সামনে নিরপেক্ষ তথ্য তুলে ধরতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। বরং নিজেরাই বাদী, নিজেরাই পুলিশ, সরকারি উকিল ও সরকারি ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকায় নেমেছেন। মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য দিয়ে ঘটনার বিচারে জনগণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন। তারা এক পক্ষের প্রচন্ড গুণকীর্তন ও অপর পক্ষের চরিত্রহনন করেছে। ইতিহাসের বিচার প্রত্যেকের কাছেই ভিন্ন ভিন্ন। কারণ,এখানে কাজ করে ব্যক্তির নিজস্ব চিন্তা-চেতনার মডেল। তাই একই ঘটনার রায় ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ভিন্নতর হয়। হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা নিক্ষেপের পর এক পক্ষের কাছে সেটি শুধু ন্যয্য নয়, উৎসবযোগ্যও গণ্য হয়েছে। ইরাকে ইঙ্গো-মার্কিন যৌথ আগ্রাসন, হত্যা ও বোমাবর্ষণ ইরাকীদের কাছে যত নিষ্ঠুরই হোক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট, ব্রিটেন ও তাদের মিত্রদের কাছে গণ্য হচ্ছে সভ্যতা ও গণতন্ত্রের নির্মাণে অতি মহৎ কর্ম রূপে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রি ব্লেয়ারের এ নিয়ে কত অহংকার! এমন হত্যাকান্ডে নিয়োজিত নিজ দেশের নিহত যোদ্ধাদেরকে তারা জাতীয় বীর মনে করে।

এবং এ মহৎ কর্ম(?) জারি রাখতে ইরাকে তারা শত বছরের জন্য সৈন্য মোতায়েনের কথাও বলে, যেমনটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকানপ্রার্থী জন ম্যাকেইন বলেছেন। এমন দুটি ভিন্ন ধরনের রায় এসেছে একাত্তরের লড়াই নিয়েও। তখন দুটি ভিন্ন ও সম্পূর্ণ বিপরিত মুখী চেতনা কাজ করেছিল। একটি ছিল বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী চেতনা। সে চেতনায় পাকিস্তান ভাঙ্গা, পাকিস্তানপন্থি এবং অবাঙ্গালীদের হত্যা ও তাদের ঘরবাড়ী ও দোকানপাট দখল নেওয়া ন্যায্য কর্ম গণ্য হয়েছিল। লক্ষ লক্ষ অবাঙ্গালীকে তাদেরকে বাড়ী থেকে উচ্ছেদ করে বস্তিতে পাঠিয়ে দেওয়াও কোন রূপ অন্যায় মনে হয়নি। যে কোন সভ্য আইনে জবরদখলমূলক এমন কাজ জঘন্য অপরাধ। অথচ বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও সরকারি প্রশাসনের কাছে তা অতিশয় বীরত্বের মনে হয়েছে। সে বীরত্বের পুরস্কারস্বরূপ এসব সম্পত্তির জবরদখলকারিদেরকে সরকার নিজ হাতে মালিকানার দলিল পৌঁছে দিয়েছে। অথচ একাত্তরের ইতিহাসে এসব ঘটনার উল্লেখ নেই। অবাঙ্গালীদের উপর এমন নির্যাতনের বিবরণও নাই।


কোন দেশে ব্যাপক হারে পশু নির্যাতন হলে সেটিও খবর হয়। কিন্তু বাংলাদেশে কয়েক লক্ষ অবাঙ্গালীর উপর যে নিষ্ঠুর নির্যাতন হল তার কোন বিবরণ দেশটির ইতিহাসের বইতে স্থানই পেল না। তাই বাংলাদেশের লিখিত ইতিহাস শুধু পক্ষপাতদুষ্ট এবং সত্যবর্জিতই নয়, অপূর্ণাঙ্গও। বরং যারা সেদিন বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশটি ভাঙ্গতে অমুসলিম কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করলো ও বহু মুসলিম হত্যা করল তারা চিত্রিত হয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী রূপে। অবশ্য বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী চেতনায় এমনটিই স্বাভাবিক। কারণ, এখানে নিরেট বাঙ্গালী হওয়া এবং অন্য যারা বাঙ্গালী তা সে পৌত্তলিক কাফের বা নাস্তিক কমিউনিস্ট হোক তাদের সাথে একাত্ম হওয়াটাই গুরুত্ব পায়, মুসলমান বা প্যান-ইসলামিক হওয়া নয়। তাই এ ইতিহাসে বাঙ্গালী যুবকেরা কেন বিপুল সংখ্যায় মুক্তিযোদ্ধা হল সেটি বিশদ ভাবে আলোচিত হলেও লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালী সন্তান কেন স্বাধীন বাংলাদেশের বিরোধীতা করল, কেন তারা রাজাকার হয়ে পাকিস্তানের একতা রক্ষায় নির্যাতীত হল, এমনকি প্রাণও দিল তার একটি দর্শনগত বা তত্ত্বগত বিশ্লেষণ এ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। কেনই বা দেশের প্রতিটি ইসলাম দল ও প্রায় প্রতিটি ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও আলেম তাদের বিরোধীতা করল তারও কোন বুদ্ধিবৃত্তিক ও দর্শনগত বিবরণ তারা দেয়নি। বরং এ ইতিহাসের লেখকগণ তাদেরকে চিত্রিত করেছে পাঞ্জাবী সৈনিকদের দালাল ও নারী সরবরাহকারি রূপে। এ অভিযোগ থেকে এমনকি ইসলামি দলসমূহের প্রবীণ নেতা-কর্মী ও আলেমদেরও তারা রেহাই দেয়নি। এভাবে প্রতিপক্ষের চরিত্রহানীর কোন সুযোগই তারা ছাড়েনি। সে সময়ের রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষে ছিল আওয়ামি লীগ, ন্যাপ ও কমিউনিষ্ট পার্টি। এপক্ষটি ছিল মূলতঃ দেশের বহুল পরিচিত নাস্তিক কমিউনিস্ট,ধর্মে অঙ্গিকারশূণ্য জাতীয়তাবাদী ও হিন্দু সংখ্যালঘুদের সম্মিলিত কোয়ালিশন।


১৩শত বা ১৪শত বছর আগে আরবী,ফার্সী,কূর্দী,তুর্কিভাষী অধ্যুষিত বিশাল মুসলিম রাষ্ট্র ভাঙ্গার কাজ কেউ যদি এভাবে তৎকালীন কাফেরদের সাথে কোয়ালিশন করে করতো তা হলে তাদেরকে কি বলা হত? মুসলমানদের রাষ্ট্র ভাঙ্গার কাজ যুগে যুগে যে হয়নি তা নয়,তবে কোন কালেই তা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের পক্ষ থেকে হয়নি,হয়েছে কাফের ও মুনাফিকদের পক্ষ থেকে। সর্বশেষে হয়েছে ব্রিটিশ উপনেবিশিক শক্তির দ্বারা যারা আরব বিশ্বকে বিশেরও বেশী টুকরায় ভেংগেছে। ঈমানদার মুসলমান কাফেরদের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে যুদ্ধ করেছে এমন নজির নেই। রাষ্ট্র দূরে থাক,ইসলাম কারো ঘর ভাঙতেও অনুমতি দেয় না। মুসলমান হওয়ার অর্থ শুধু আল্লাহর ইবাদত করা নয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাসের সাথে অন্য ঈমানদার মুসলমানকেও আপন ভাই রূপে গণ্য করতে হয়। অন্য মুসলমান যে তার প্রাণপ্রিয় ভাই সেটি তার পিতা, পীর বা নেতার কথা নয়,এ ঘোষনাটি এসেছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। প্রাণপ্রিয় ভাইকে দেখা মাত্র একজন ব্যক্তির প্রতিক্রিয়াটি কেমন হয়? সেকি তাকে মারতে উদ্দ্যত হবে। তাকে ঘর থেকে নামিয়ে দিয়ে তার ঘর নিজে দখল নিবে? অথচ ঈমানের দাবী, ভাইকে দেখে তার মুখই শুধু হাসবে না আত্মাও আনন্দে আন্দোলিত হবে। অন্তরে যে ঈমান আছে এটি তো সেটিরই ইন্ডিকেটর বা নির্দেশক। মুসলিম হওয়ার অর্থ শুধু নামাযী হওয়া নয়, নিজ ভাষা, নিজ গোত্র ও নিজ ভূগোলের সীমানা ডিঙ্গিয়ে অন্য ভাষা ও অন্য ভূগোলের মুসলমানের সাথে একাত্ব হওয়াও। এটিই ইসলামের বিশ্বভাতৃত্ব। মদিনার আউস ও খাজরাজ গোত্রদ্বয় শতশত বছর ব্যাপী পরস্পর যুদ্ধ করেছে। মুসলমান হওয়ার সাথে সাথে সে আত্মঘাতি যুদ্ধ থেমে যায়, গড়ে ওঠে অটুট ভ্রাতৃত্ব। তাঁরা ভাই রূপে গ্রহণ করেছিল মক্কার মোহাজিরদেরকে। নিজের একমাত্র সম্বল ঘরখানিও ঘরহীন মোহাজির ভাইদের সাথে তারা ভাগ করে নিয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানেরাও সেদিন মীরপুর,মোহাম্মদপুরের ন্যায় প্রায় প্রতি জেলায় বিশাল বিশাল এলাকা ছেড়ে দিয়েছিল হিন্দুস্থান থেকে আগত তাদের নির্যাতিত মোহাজির ভাইদের বাসস্থান নির্মাণে। তাদের মাঝে দোষত্রুটি যে ছিল না তা নয়। দোষত্রুটিপূর্ণ মানুষের সংখ্যা কি বাঙ্গালীদের মাঝে কম? কিন্তু সে জন্য কি একটি ভাষার মানুষের বিরুদ্ধে অত্যাচারে নামতে হবে? আল্লাহতায়ালা মুসলিম উম্মাহর বর্ণনা দিয়েছেন সীসাঢালা দেওয়াল রূপে। কোরআনের ভাষায় যা হলো “বুনিয়ানুম মারসুস”। মুসলিম উম্মাহর জন্য এটিই হল মহান আল্লাহর কাঙ্খিত মডেল। প্রতিটি মুসলমানের কাজ,সে কাঙ্খিত মডেল নির্মাণে পরিপূর্ণ আত্মনিয়োগ। ইসলামে এটি উচ্চতর জ্বিহাদ। নবীজীর (সাঃ) যুগে এমন কোন সাহাবী ছিলেন না যারা এ জ্বিহাদে নিজেদের শ্রম,অর্থ ও মেধার বিণিয়োগ করেননি। শতকরা ৭০ ভাগেরও বেশী সাহাবী এ কাজে শহীদ হয়েছেন। অপর দিকে যে কোন বিচ্ছিন্নতা মুসলিম উম্মাহর সীসাঢালা দেওয়ালে ফাটল ধরায়। তাই এটি হারাম। একাজ শুধু ইসলামে জ্ঞানশূণ্য ও চেতনাশূণ্যদের হাতেই সম্ভব। এমন অজ্ঞতার কারণেই ১৯৭১ এ পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজটি জাতিয়তাবাদী সেকুলারিষ্ট শক্তি আনন্দ চিত্তে ও উৎসব-ভরে করেছে। কিন্তু ইসলামের পক্ষের শক্তি তা থেকে সযত্নে দূরে থেকেছে। বরং চেষ্টা করেছিল দেশটির হেফাজতে। ১৯৭১এ ইসলামের পক্ষের শক্তি কেন পাকিস্তানের পক্ষ নিল এটি হল তার দার্শনিক ভিত্তি। মুসলমান হওয়ার আরেক দায়বদ্ধতা হল, তাকে অনুসরণ করতে হয় ইসলামের তথা কোরআনে বর্ণীত আল্লাহর হুকুমকে। যদি সেটি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের রায়ের বা অভিমতের বিরোধীও হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা নবী করীম (সাঃ)কে বলেছেন,

"ওয়া ইন তুতি আকছারা মান ফিল আরদে ইউদিল্লুকা আন সাবিলিল্লাহ"

অর্থঃ "এবং আপনি যদি এ জমিনে বসবাসকারি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের অনুসরণ করেন তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথকে সরিয়ে বিভ্রান্তির পথে নিয়ে যাবে।"

অথচ যারা সেকুলার এবং যারা ইসলামী চেতনাশূণ্য তাদের দাবী 'জনগণ কখনও ভূল করে না'। তাদের এ দাবী যে কতটা মিথ্যা ও কোরআন-বিরোদী সেটি কি কোরআনের এ আয়াত শোনার পরও বুঝতে বাঁকী থাকে? আর জনগণ যে সিদ্ধান্ত নিতে কত বড় বিশাল ভূল করে সেটি কি বাংলাদেশের জনগণ এরশাদের মত দুর্বৃত্তদের বিপুল ভোটি বিজয়ী করার মধ্য দিয়ে বার বার প্রমাণ করেনি? সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই কি হিটলার বা বুশের ন্যায় নরখাদক পশুদের নির্বাচিত করেনি? মুসা (আঃ) বিরুদ্ধে ফিরাউনের পক্ষে অস্ত্র ধরেনি?


সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন ইসলামের নবী হযরত মহম্মদ (সাঃ)ও। মক্কার সে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রচন্ড বিরোধীতা ও বয়কটের কারণেই নবীজী (সাঃ) কে মাতৃভূমি ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করতে হয়েছিল। মুসলমান হওয়ার অর্থই হল, শিকড়হীন কচুরিপানা বা খড়কুটোর মত গণ-স্রোতে ভেসে যাওয়া যাবে না। বরং শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও যেটি ইসলাম ও মুসলমানের জন্য কল্যাণকর সেটির উপর অটল থাকতে হবে। আর দুনিয়ার সর্ব বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রটি বিনাশ করার মধ্যে ভারত ও তার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ব্যক্তিগণ কল্যাণ দেখলেও ইসলামি চেতনাশূণ্য ব্যক্তিরা সেটির মহা কল্যাণই দেখেছে। তাই পাকিস্তান ভাঙ্গার প্রচন্ড বিরোধীতাও করেছে। যারা ৭১-এ পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন, তাদেরকেও সেদিন জীবনের প্রচন্ড ঝুঁকি নিতে হয়েছিল। তারা জানতেো পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়ার অর্থ ভারতীয় এজেন্ট ও আওয়ামী কর্মীবাহিনীর হামলার মুখে তাদের পড়তে হবে। তাদের ঘরবাড়ি ও দোকান-পাট জ্বলবে এবং নিজেদেরও নিহত হতে হবে। এবং সেটি যুদ্ধচলাকালীন ৯ মাসে এবং ১৬ ডিসেম্বরের পর প্রমাণিতও হয়েছিল। কথা হল, এমন চেতনাসমৃদ্ধ আত্মত্যাগী মানুষদেরকে কি দালাল ও নারী সরবরাহকারি বলা যায়? অথচ দেশের ভারতপন্থি স্যেকুলারগণ সেটিই অবিরাম ভাবে বলছে। অবশ্য এটি যে তারা বিবেকের তাড়নায় বলছে তা নয়,তারা ব্যবহৃত হচ্ছে শত্রুপক্ষের রাজনৈতিক অভিলাষ পুরণে। পশ্চিমা ওরিয়েন্টালিস্টরা এককালে প্রচুর বই লিখেছে ইরানীদের এ কথা বুঝাতে যে আরবরা তাদের উপর অকথ্য নির্যাতন ও প্রকান্ড হত্যাকান্ড চালিয়েছে। এদেরই আরেক দল আবার বই লিখেছে আরবদের বুঝাতে যে ইরানীরা কতটা বর্ণবাদী,আরববিদ্বেষী ও ষড়যন্ত্রকারি। এভাবে দুই ভাষাভাষি মানুষের মাঝে বিভেদকে অতিশয় গভীর ও প্রতিহিংসাপূর্ণ করেছে। শুধু তাই নয়,সংঘাতকে রক্তাত্ব করতে দুই পক্ষকে যেমন অস্ত্র দিয়েছে তেমনি প্রশিক্ষণও দিয়েছে। আর এতে আরব-ইরানী বিভেদ যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে মুসলিম উম্মাহর দুর্বলতা। একই কাজ করেছ তুর্কিদের বিরুদ্ধেও। ভারতীয় ও পশ্চিমা লেখকগণ একই কাজ করছে দক্ষিণ এশিয়ায়। তারা বাংলাদেশে অবাঙ্গালী মুসলমানদেরকে শোষক,নির্যাতনকারি ও খুনি হিসাবে পেশ করছে। অথচ এ কথা লিখছে না পূর্ব পাকিস্তানে অবাঙ্গালী মুসলমানেরা যত কলকারখানা গড়েছে বৃটিশ তাদের ১৯০ বছরের শাসনে হাজার ভাগের এক ভাগও করেনি। পাকিস্তানের ২৩ বছরে সেটি এমনকি বাঙ্গালী পুজিপতিরাও করেনি। অপরদিকে ভারত ও পাকিস্তানের অবাঙ্গালীদেরকে বুঝাচ্ছে বাঙ্গালীরা কতটা দূর্নীতিপরায়ন,কলহপ্রবন ও অবাঙ্গালীবিদ্বেষী সেটি। ফলে বাংলাদেশের মানুষদের বন্ধুরূপে গ্রহন করতে পারছে না পাকিস্তান ও ভারতের অবাঙ্গালী মুসলমানরা। এ প্রচার পৌঁছে গেছে মধ্যপ্রাচ্যেও। ফলে আছড় পড়ছে বাংলাদেশের শ্রম বাজারেও। ভাষা,গোত্র,অঞ্চল,জেলা বা পরিবারের ভিত্তিতে যে বন্ধন গড়ে উঠে সেটি নিরেট জাহেলিয়াত। ইসলামের আগমন ঘটেছে এমন জাহিলিয়াতকে নির্মূল করতে,পরিচর্যা দিতে নয়। মুসলিম চেতনায় ইসলাম যে কতবড় বিপ্লব এনেছিল তার পরিচয় পাওয়া যায় হযরত আবু বকর (রাঃ) এর উক্তি থেকে। ইসলাম গ্রহণের পর একবার হযরত আবু বকর (রাঃ)এর পুত্র তাঁকে বলেছিলেন,“আব্বাজান,বদরের যুদ্ধে আমি তিন বার আপনাকে আমার তরবারির সামনে পেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি আমার শ্রদ্ধেয় পিতা। শৈশবে আপনার কত স্নেহ-আদর পেয়েছি। সেটি প্রতিবার মনে পড়ায় আঘাত না করে প্রতিবারই সরে দাঁড়িয়েছি।” শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন,“পুত্র, যদি তোমাকে আমি একটি বার তরবারির সামনে পেতাম,নিশ্চিত দুই টুকরা করে ফেলতাম।”


হযরত আবু বকর (রাঃ) যা বলেছেন তা হল নিরেট ঈমানদারির কথা। আর তাঁর পুত্র যা বলেছেন সেটি জাহেলিয়াত। জাহেল ব্যক্তি ভাষা, বর্ণ, ভৌগোলিকতা, পরিবার বা গোত্রের মধ্যে সম্পর্ক খোঁজে। জাতিয়তাবাদ তাই আধুনিক নয়,বরং সনাতন জাহেলিয়াত। প্যান-ইসলামিক চেতনার বিরুদ্ধে এটি ব্যধি। মুসলমান রাষ্ট্রগুলিতে বিভেদ ও ভাঙ্গন ছাড়া এটি আর কোন কল্যাণটি করেছে? যেখানে এ জাহেলিয়াতের বিকাশ ঘটেছে সেখানে আত্মঘাতি রক্তপাতও ঘটেছে। এক রাষ্ট্র ভেঙ্গে জন্ম নিয়েছে বহু রাষ্ট্রে। এ ভাবে বেড়েছে ক্ষুদ্রতা,এবং ক্ষীণতর হয়েছে বিশ্বশক্তি রূপে মুসলমান উম্মাহর উত্থানের সম্ভাবনা। অপর দিকে যেখানেই ইসলামের মৌলিক শিক্ষার বিকাশ ঘটেছে সেখানেই বেড়েছে প্যান-ইসলামিক চেতনা। তখন নানা ভাষাভাষী মুসলমানের মাঝে একতাও গড়ে উঠেছে। ১৯৪৭ পূর্ব ভারতের মুসলমানের মাঝে সেটিই হয়েছিল। ফলে বাঙ্গালী,বিহারী,পাঞ্জাবী,সিন্ধি,পাঠান সবাই কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে এক রাষ্ট্রের নির্মাণও করেছে। বাঙ্গালী মুসলমানগণ সেদিন ভারত থেকে আসা তাদের ভাইদের জন্য সর্বপ্রকার সাহায্য করেছে। এমন ভ্রাতৃত্বে জুটে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত সাহায্য। আল্লাহর সে নেয়ামতের বরকতেই বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় হিন্দু কংগ্রেসের যৌথ বিরোধীতার মুখে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। নইলে নিরস্ত্র ও পশ্চাদপদ মুসলমানদের পক্ষ্যে কি সম্ভব হত বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের নির্মাণ? সুলতান মুহম্মদ ঘোরির হাতে দিল্লি বিজয়ের পর উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাসে এটিই হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং সবচেয়ে বড় বিজয়। অথচ একাত্তরের ইতিহাসে এমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কোন উল্লেখই নেই। বরং পাকিস্তানকে বলা হয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির এক সামপ্রদায়ীক সৃষ্টি। বলা হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশ। অথচ যে মুসলিম লীগ পাকিস্তান গড়লো তার জন্ম ও পরিচর্যা দিয়েছিল বাংলার মুসলামানেরা। সে প্রতিষ্ঠানটি জন্মে ঢাকায়। এবং সেটি ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ নেতৃত্বে। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহোর সম্মেলনে যিনি পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন করেন তিনিও ছিলেন বাঙালী মুসলমান শেরে বাংলা ফজলুল হক। নানা ব্যর্থতার মাঝে বাংলার মুসলমানেরা অন্ততঃ এ বিষয়টিকে নিয়ে গর্ব করতো পারতো। কিন্তু বিকৃত ইতিহাস রচনার নায়কগণ সে গর্বের বিষয়টিকেও ভূলিয়ে দিয়েছে। গর্বের বিষয় রূপে পেশ করেছ ক্ষুদিরাম, সূর্যসেনদেরকে। অথচ বাংলার সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমান অধিবাসীদের প্রতি তাদের কোন অঙ্গিকারই ছিল না। বরং ছিল প্রচন্ড অন্ধ বিদ্বেষ।


পাকিস্তান গড়া হয়েছিল শুধু উপমহাদেশের মুসলমানদের কল্যাণে নয়, বরং সেখানে গুরুত্ব পেয়েছিল বিশ্বের মজলুম মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণে শক্তিশালী ভূমিকা নেওয়ার বিষয়টিও। পাকিস্তান সে কাঙ্খিত ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদের কি সাহায্য করবে,দেশটি নিজেই টিকে থাকতে পারেনি। কিন্তু সে ব্যর্থতার জন্য শুধু পশ্চিম পাকিস্তানীদেরকে দায়ী করা যায়? পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা পূর্ব পাকিস্তানী হওয়ার কারণে সে ব্যর্থতার জন্য সবচেয়ে বেশী দায়ী হল পূর্ব পাকিস্তানীরা। সংখ্যাগরিষ্ট হওয়ার কারণে অনেকে ক্রিকেট,হকির টিমেও সংখ্যানুপাতিক খেলোয়াড় নেওয়ার দাবী তুলেছে। কিন্তু সে জন্য যে ভাল খেলারও প্রয়োজন রয়েছে সে গুরুত্ব অনুভব করেনি। এবং সেটি প্রায় সর্বক্ষেত্রে। ঠিকমত খেলেনি কোন খেলাই। রাজনীতির খেলায় ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের সদস্যগণ তো সংসদ খুনোখুনিও করে ফেললো। বিভক্তির সূত্র গুলো খুঁজে খুঁজে দাঙ্গা ও লুটপাটের সুযোগ খুঁজেছে। তাই বাঙ্গালী-বিহারী দাঙ্গার জন্ম দেওয়া হয়েছে আদমজী জুটমিলে। অথচ দাঙ্গার সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র ছিল করাচী। সেখানে সিন্ধি,মোহাজির,পাঠান,পাঞ্জাবী ও গুজরাতি ভাষাভাষি বিপুল সংখ্যক মানুষের বসবাস। এ শহরটিতে বাস করে কয়েক লক্ষ বাঙালীও।মুসলিম বিশ্বের আর কোন শহরে এত ভিন্নতা ও এত বৈচিত্র নেই। পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবী,সিন্ধি,পাঠান,বেলুচ ও মোহাজির মুসলমানেরা তাদের ভাষা,পোষাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য ও নৃতাত্ত্বিক ভিন্নতা সত্ত্বেও এখনও এক অখন্ড রাষ্ট্রের মাঝে বসবাস করছে। নিজেদের মাতৃভাষা নয় এমন একটি ভাষা উর্দুকে তারা রাষ্ট্র ভাষা রূপে বরণ করে নিয়েছে। ইসলামের গৌরব যুগেও মুসলমানেরা সেটিই করেছিল। বিশ্বে যারা প্রথম কাগজ আবিস্কার করলো,নবীজীর (সাঃ) জন্মের কয়েক হাজার বছর আগে যারা ভাষা ও ভাষালিপির জন্ম দিল,সাম্রাজ্য গড়লো,পিরামিডের ন্যায় বিস্ময়কর ইমারত গড়লো তারাও নিজ ভাষা ছেড়ে দিয়ে আরবী ভাষাকে বরণ করে নিয়েছিল। একটি জনগোষ্ঠি বিশ্বশক্তি ও বিশ্বসভ্যতা রূপে প্রতিষ্ঠা পায় তো এভাবেই। শত শত নদী যেমন সাগরে মিশে তাকে বিশালতা দেয়, তেমনি একটি জাতিও। ইসলামে উম্মাহর যে ধারণা তার মূল কথা তো এটিই। পাকিস্তান তার জন্ম থেকেই ভারতীয়,বার্মীজ,আফগানসহ নানা দেশের মুসলমানদেরকে আপন নাগরিক রূপে বরণ করে নিয়েছে। মুসলিম বিশ্বের ৫৭টি দেশের মাঝে পাকিস্তানই একমাত্র দেশ যেখানে চারটি রাজ্যের বা প্রদেশের ভিন্‌ ভাষাভাষি মানুষ এক অভিন্ন রাষ্ট্রের পতাকা তলে বাস করছে। অথচ বিভক্তি ও ভাতৃঘাতী সংঘাতই আজকের মুসলমানের প্রধানতম নৈতিক রোগ। আরবরা একই ভাষা ও একই ধর্মের হয়েও আজ ২২ টুকরায় বিভক্ত। ফলে প্যান-ইসলামি চেতনার দিক দিয়ে সমগ্র বিশ্বে পাকিস্তান আজও অনন্য। বাংলাদেশে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা ও বিহারী মোহাজির নিদারুন অবহেলা ও দুর্দশার শিকার। অথচ পাকিস্তানে আশ্রয় দিয়ে আছে ৩০ লাখ আফগান মোহাজিরকে বিগত ৩০ বছরেরও বেশীকাল ধরে। আফগানিস্তানে আগ্রাসী সোভিয়েত হামলার বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১০ বছরের রক্তাক্ষয়ী লড়াইয়ে পাকিস্তানের নাগরিকগণ সে লড়ায়ে বিশাল ত্যাগ স্বীকার করেছে। হাজার হাজার পাকিস্তানী মোজাহিদ আফগানদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছে। এমনকি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হককে প্রাণও দিতে হয়েছে,এবং সেটি সোভিয়েত রাশিয়া বিরোধী তাঁর লড়াকু ভূমিকার কারণে। আজও ভারতীয় জবরদখলের বিরুদ্ধে মজলুম কাশ্মিরীদের লড়ায়ে যে দেশটির নাগরিকগণ নানরূপ সহায়তা দিয়ে যাচেছ তা হল পাকিস্তান। শত ব্যর্থতার পরও এটি কি পাকিস্তানের জন্য কম অর্জন? একমাত্র এদেশটির মুসলিম বিজ্ঞানীরাই সফল হয়েছে আনবিক বোমা আবিস্কারে।এসব কারণে বিশ্বের মুসলমানদের কাছে এ দেশটির যে বিশেষ সন্মান রয়েছে তা কি অস্বীকার করা যায়?


সে তুলনায় বাংলাদেশের অর্জন কতটুকু? বাংলাদেশের সরকার কাশ্মিরে ভারতীয় জুলুমবাজীর বিরুদ্ধে সামান্য প্রতিবাদ করতেও ভয় পায়। সেখানে শত শত মুসলমান মহিলা ধর্ষিতা এবং ধর্ষণের পর আগুণে নিক্ষিপ্ত হলেও নীরব থাকে বাংলাদেশের সরকার।মিয়ানমারের সামরিক জান্তাদের বর্বর হামলার শিকার সে দেশের রোহীংগা মুসলমানেরা।সরকার নীরব এক্ষেত্রেও।বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশের পক্ষ থেকে প্রতিবেশী দেশের মজলুম মুসলমানদের প্রতি এটিই কি দায়িত্বপালনের নমুনা? অথচ ভারত থেকে ছিন্নমূল মজলুম মুসলমানদের সর্ববৃহৎ আশ্রয়স্থল হল পাকিস্তান। নানা ব্যর্থতার পরও সেখানে প্যান-ইসলামিক চেতনা যে এখনও বেঁচে আছে এ হল তার নজির। একাত্তরে বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী রক্তাক্ষয়ী সংঘাতের পর আজও ১০ লাখেরও বেশী বাংলাদেশী বসবাস করছে পাকিস্তানে। এসব বাঙালীদের অধিকাংশই গেছে একাত্তরের পর। এটি কি প্যান ইসলামিক চেতনার কারণে নয়? ফলে একাত্তরে পাকিস্তানী সৈন্যদের লক্ষ্য ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাঙ্গালীর নির্মূল -আওয়ামী বাকশালীদের এ প্রচারণা কি বিশ্বাস করা যায়? অথচ আওয়ামী সেকুলারদের রচিত ইতিহাসে সেটিই অতি জোরেসোরে বলা হয়েছে। তাদের রচিত ইতিহাসে তুলে ধরা হয়নি বাঙালীর ব্যর্থতা ও অযোগ্যতাগুলো। এ হিসাব কখনই নেওয়া হয় না,বাঙালী মুসলমানরা যতটা হাত পেতে বিশ্ব থেকে নিয়েছে ততটা দিয়েছে কি? দিয়েছে কি এক কালের নিজ দেশ পাকিস্তানের শিল্প, বাণিজ্য, সাহিত্য, শিক্ষা ও প্রতিরক্ষার উন্নয়নে? এমন কি খেলাধুলায়? অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার সুবাধে তাদের কাছ থেকে সেটিই কি পাকিস্তানের ন্যয্য পাওনা ছিল না? আদমজী,বাওয়ানী,দাউদ,ইস্পাহানী এসে কেনে পূর্ব পাকিস্তানে এসে শিল্পায়ন করবে? তারা তো ছিল সংখ্যালঘু। সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্বপাকিস্তানীদের কি পূজিঁ, যোগ্যতা ও কারগরি দক্ষতা নিয়ে পশ্চিম-পাকিস্তানী ভাইদের শিল্পায়নে এগিয়ে যাওয়া উচিত ছিল না? পশ্চিম পাকিস্তানী সৈনিকেরা এসে কেন চোরকারিবারীদের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সীমানা পাহারা দিবে? অথচ ২৩ বছরের পাকিস্তানী আমলে সেটাই হয়েছে। এমনকি ১৯৫৬-এ পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সীমাহীন ব্যর্থতার দেখে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন জিওসি জেনারেল ওমরাহ খানের কাছে সীমান্ত পাহারায় সেনাবাহিনী নিয়োগের অনুরোধ করেছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ দলীয় মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান।-(আতাউর রহমান খান,২০০০)। এসব ব্যর্থতা নিয়ে আত্মজিজ্ঞাসা কি বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের মনে কখনও উদয় হয়েছে? তারা নিজেদের ব্যর্থতার কারণ ও তার প্রতিকারের চেষ্টা না করে দোষ অন্বেষণ করেছে অন্যদের। আর এটিই হল সকল ব্যর্থ ব্যক্তি ও জনগোষ্ঠীর চিরাচরিত খাসলত। প্রো-এ্যাকটিভ না হয়ে তারা হয় রিয়াকটিভ। বাংলাদেশে সেকুলার মহলটি তেমন একটি অভ্যাসেরই পরিচর্যা দিয়েছে।


ইসলামের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদের বড় অপরাধ,এটি প্যান-ইসলামিক মিশন থেকে জনগণকে হঠিয়ে নেয়। অঙ্গিকার শূণ্য করে বিশ্বমুসলিমের কল্যানে কিছু করায়। এজন্যই কাশ্মীরের মুসলমানদের পরাধীনতার বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোন ইস্যুই নয়। ইস্যু নয় প্রতিবেশি মায়ানমারে নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমানের স্বাধীনতার বিষয়টি। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ১৯৪৭এর পরপরই এমন জাতীয়তাবাদী চেতনার খপ্পরে পরে। এমন কি নেতারাও জনগণের সামনে দেওয়া নিজেদের ওয়াদার কথা ভূলে যায়। সে ওয়াদার কথা শেরে বাংলা ফজলুল হকের মত ব্যক্তি ভূলে গিয়েছিলেন সাতচল্লিশের আগেই। তিনি ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগকে ঠেকাতে চরম সামপ্রদায়িক দল শ্যামা প্রসাদ মুখার্জির হিন্দু মহাসভার সাথে কোয়ালিশন করেছিলেন। অথচ ১৯৪০এ তিনিই লাহোরের মিন্টো পার্কে মুসলিম লীগের সম্মেলনে পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপণ করেছিলেন। যে মাওলানা ভাষানী আসাম মুসলিম লীগের নেতা হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি ১৯৫৪ সালে কাগমারি সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানকে শেষ বিদায় জানিয়ে দিলেন। অপর দিকে শেখ মুজিব পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজ শুরু করেন ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর সাথে ৪৭এর পর থেকেই। রাজনীতিবিদদের থেকে বুদ্ধিজীবীদের অবস্থাও ভিন্নতর ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জনাব ডঃ শহিদুল্লাহ বলা শুরু করলেন, “আমরা প্রথমে বাঙ্গালী, তারপর মুসলমান”। অথচ ব্যক্তির বর্ণ ও ভাষাভিত্তিক পরিচয়টি মহান আল্লাহর দরবারে গুরুত্বহীন। রোজহাশরের দিন গুরুত্ব পাবে,সে কতটুকু সাচ্চা মুসলমান সেটি। কোন ভাষার কোন দেশের বা কোন বর্ণের সেটি নয়।কথা হল,আখেরাতে যার মূল্য নেই সেটি ইহকালেই বা গুরুত্ব পায় কি করে? সেটির পিছনে মুসলমান কেন তার অমূল্য সময় ও সম্পদ খরচ করবে? মুসলমানের কাছে ভাষা বা বর্ণের পরিচয়টি তাই গুরুত্বের দিক দিয়ে প্রথম হয় কী করে? মুসলমানের কাছে তো সেটিই গুরুত্ব পায় যা মহান আল্লাহর কাছে গুরুত্ব রাখে, এবং পরকালের মূক্তিতে যা অপরিহার্য।ঈমানের অর্থ তো এই পরকাল সচেতনতা। আর এ বিপরীতে যেটি, সেটি হল ইহজাগতিকতা বা সেকুলারিজম। সেকুলারিজমে তাই ভাষা ও বর্ণ গুরুত্ব পায়। বাংলার মুসলমান রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীগণ যে কতটা বিভ্রান্ত ছিলেন এ হল তার নমুনা। কায়েদে আযম মোহম্মদ আলী জিন্নাহ ভাষা, বর্ণ, মাজহাব ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে যে নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন বাঙ্গালী মুসলিম নেতা ও বুদ্ধিজীবীগণ তা পারেননি। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কারণে পাকিস্তানকে গড়ে তোলার বৃহত্তর দায়িত্ব ছিল তাদের উপরই। অথচ তারা আত্মসমর্পণ করেছেন ক্ষুদ্রতা ও সংকীর্নতার কাছে। এমন ভাষাভিত্তিক সংকীর্নতা নিয়ে ১২ শত মাইলের শত্রুভূমি দিয়ে বিভক্ত একটি দেশ কি টিকে থাকতে পারে?


পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার মূল কারণ হলো মূলতঃ এই চেতনাগত ব্যর্থতা।ভৌগলিক ব্যবধান নয়। ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব প্রান্তের দ্বীপটি থেকে পশ্চিম প্রান্তের দ্বীপের দূরত্ব ঢাকা-লাহোরের দূরত্বের চেয়েও অধিক।পাঞ্জাব থেকে বাংলাদেশের দূরত্বের চেয়েও অধিক হল ভারতের পূর্ব সীমান্তের অরুনাচল প্রদেশ থেকে গুজরাটের দূরত্ব।বিস্তর ব্যবধান রয়েছে ভাষার ক্ষেত্রেও।কিন্তু সে জন্য কি প্রশাসনে কোন অসুবিধা হচ্ছে? অথচ বাংলাদেশের মুসলিম বুদ্ধিজীবী মহলে নিজেদের ব্যর্থতা নিয়ে সমান্যতম আত্মসমালোচনাও নেই। আছে শুধু অন্যদের উপর দোষারোপ। প্রশ্ন হল,নিছক অবাঙ্গালী হওয়ার কারণে কোন মুসলিম ব্যক্তি কি মুসলমানের দুষমন হতে পারে? একজন স্বভাষী, স্বদেশী,এমনকি প্রতিবেশীও তো তার পরম দুষমণ হতে পারে। নবীজীকে (সাঃ)কে যারা হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল তারা শুধু আরবই ছিল না,আত্মীয় এবং স্বগোত্রীয়ও ছিল। কিন্তু তাঁর সাহায্যে অর্থ ও প্রাণ দানে এগিয়ে এসেছিলেন দূরবর্তী মদিনার মানুষ। সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন রোমের শোহাইব, আফ্রিকার বেলাল এবং ইরানের সালমান। এটিই ইসলামের বিশ্বভাতৃত্ব। পাকিস্তানে অনাচার ছিল, অবিচার ছিল,বৈষম্য এবং দূর্নীতিও ছিল। এটি কোন মুসলিম দেশে নেই? খোদ বাংলাদেশে সামাজিক ও আঞ্চলিক বৈষম্য কি কম? উত্তর বঙ্গের সাথে রয়েছে দেশের পূর্বাংশের বিস্তর বৈষম্য। এবং সেটি চাকুরি-বাকরি, কলকারখানা, বিশ্ববিদ্যালয়, সেনানিবাস, বিমানবন্দর, রেল যোগাযোগসহ সর্ব ক্ষেত্রে। দূর্নীতিতে দেশটিতো রেকর্ড করেছে। কিন্তু এর জন্য কি দেশ ধ্বংস করতে হবে? অথচ আওয়াম লীগ ও তার মিত্ররা পাকিস্তানের সাথে তাই করেছে। কিন্ত দেশ বিনাশের সে কাজে সমর্থন দেয়নি কোন ইসলামি ব্যক্তিত্ব। সাহায্য বা সমর্থণে এগিয়ে আসেনি একটি মুসলিম দেশও। সামরিক, রাজনৈতিক ও কুটনৈতিক ভাবে সমর্থন করছিল ভারত ও রাশিয়ার ন্যায় কিছু অমুসলিম দেশ। একজন আলেমকেও তারা স্বপক্ষে পায়নি। কোলকাতা থেকে যখন জয়বাংলা রেডিও সমপ্রচার শুরু করে তখন সে প্রচার কাজে আলেমের কাজটি চালিয়ে নিতে হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষার অধ্যাপক সৈয়দ আলি আহসানকে দিয়ে। মুসলমানের প্রতিটি খাদ্যকে যেমন হালাল হতে হয় তেমনি প্রতিটি যুদ্ধকেও জ্বিহাদ হতে হয়। নইলে সে যুদ্ধে প্রাণ দূরে থাক একটি পয়সা বা একটি মুহুর্তই বা সে বিণিয়োগ করবে কেন? মুসলমানের প্রতিটি সামর্থই মহান আল্লাহর নিয়ামত। ঈমানদার হওয়ার অর্থ,আল্লাহর প্রতিটি নিয়ামতকে একমাত্র আল্লাহকে খুশি করার কাজে ব্যয় করা। নইলে সেটি পরিণত হয় খেয়ানতে। এমন প্রতিটি খেয়ানতের জন্য সে তখন দায়বদ্ধ হয় মহান আল্লাহর কাছে। ইসলামে এটি গোনাহ। প্রতিটি যুদ্ধে মুসলমান ও ইসলামের কল্যাণের বিষয়টিকে এজন্যই সবার শীর্ষে রাখতে হয়। এমন এক মহৎ লক্ষ্যের কারণেই প্রতিটি মুসলিম যোদ্ধাই মোজাহিদ এবং যুদ্ধে নিহত হলে সে হয় শহিদ। অথচ আওয়ামী লীগ নেতারা নিজেরাও একাত্তরের যুদ্ধকে জ্বিহাদ বলে দাবী করেনি। যারা নিজেদেরকে একাত্তরের চেতনার ঝান্ডাবাহি মনে করে তারা আজও সেটি বলে না। বরং তাদের ভাষায় এ যুদ্ধ ছিল ইসলাম চেতনা ও সে চেতনা-নির্ভর পাকিস্তানের ধ্বংসে এবং একটি সেকুলার বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্যে। এমন এক সেকুলার যুদ্ধে একজন মুসলমান অংশ নেয় কি করে? কেনই বা বিণিয়োগ করবে তার মহামূল্য জীবন। কারণ মুসলমান তো তার আল্লাহর শ্রেষ্ঠ আমানত – তাঁর জীব্নকে যুদ্ধে তখনই বিণিয়োগ করবে যখন সে যুদ্ধটিকে শতকরা শতভাগ জ্বিহাদ বলে প্রমাণিত হবে।একজন কাফের থেকে প্রকৃত মুসলমানের পার্থক্য তো এখানেই।নইলে তার জীবন দান তো আল্লাহর কাছে প্রচন্ড খেয়ানত হিসাবে চিত্রিত হবে।আওয়ামী লীগ কি নিছক নিজেদের গদীর স্বার্থে এবং সে সাথে ভারতকে খুশি করতে জাতিকে তেমন একটি প্রচন্ড খেয়ানতের দিকেই জনগণকে ধাবিত করেনি? কথা হল,মহান আল্লাহর কাছে তাদের জবাব টা কি হবে?

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites