Home EBooks ৭১এর আত্মঘাতের ইতিহাস অধ্যায় ৭: পাকিস্তানের ঘরের শত্রু

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ৭: পাকিস্তানের ঘরের শত্রু Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 19 October 2008 04:05
আওয়াম লীগের নেতৃত্বে যারা আসীন ছিলেন তাদের মধ্যে অনেকে পাকিস্তানকে শুরু থেকেই মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। যদিও তারা একসময় মুসলিমের লীগের নেতা ছিলেন, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন এবং মন্ত্রীরূপে পাকিস্তানের সংহতি বহাল রাখার জন্য পবিত্র কোরআন শরিফ ছুঁয়ে বা আল্লাহর নামে কসম খেয়েছেন। পাকিস্তানের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে বরাবরই তীব্র ক্ষোভ ছিল। তারা বিশ্বাস করতেন, পাকিস্তান হল ১৯৪০ সালের গৃহীত লাহোর প্রস্তাবের সাথে গাদ্দারীর ফসল। এ ধরণের নেতাদের সেরূপ মানসিকার স্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় এ গ্রুপের প্রধান বুদ্ধিজীবী জনাব আবুল মনসুর আহমদের লেখায়। তিনি লিখেছেনঃ “মুসলিম লীগ ৪৬ সালে নির্বাচনে ৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের উপর ভোট নিয়া নির্বাচনে জিতিবার পরে গুরুতর ওয়াদা খেলাফ করিলেনঃ লাহোর প্রস্তাবে বর্ণিত পূর্ব-পশ্চিমে দুই মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের বদলে পশ্চিম-ভিত্তিক এক পাকিস্তান বানাইলেন।”(আবুল মনসুর আহম্মদ, ১৯৮৯)।

অর্থাৎ তার মতে অতি অপরাধ হয়েছে এক পাকিস্তান বানিয়ে। পাকিস্তানকে বলেছেন পশ্চিম পাকিস্তান ভিত্তিক পাকিস্তান। পাকিস্তান-এর প্রতি এ গভীর বীতশ্রদ্ধা নিয়ে কেঊ কি সে দেশের মঙ্গল করতে পারে। অথচ আবুল মনসুর আহম্মদ সাহেব নিজে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী হয়েছেন। কথা হল, তারা যে মন্ত্রী হয়েছেন সেটি কি নিছক ক্ষমতার মোহে ও আখের গুছানোর তাগিদে?

এটা ঠিক, লাহোর প্রস্তাবে পূর্ব বাংলার পাকিস্তান ভূক্তির কথা ছিল না। কিন্তু তিনি ভূলে গেছেন, পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানভূক্ত করা হয় অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের মুসলিম সদস্যদের ভোটে। কায়েদে আযম বা অন্য কোন অবাঙালী নেতা বাঙালী মুসলমানদের উপর সে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়নি। সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয় ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের দিল্লি সম্মেলনে।সেখানে বাংলার পাকিস্তান ভূক্তির পক্ষে প্রস্তাব উত্থাপন করেন বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জনাব সোহরাওয়ার্দ্দী এবং সে প্রস্তাবটি বিপুল ভোটে গৃহীত হয়। পাকিস্তানের সংহতিতে বিশ্বাসের জন্য যেটি অপরিহার্য ছিল সেটি প্যান-ইসলামিক চেতনা। মনের ভূবন এ চেতনায় সমৃদ্ধ না হলে তার কাছে অপর ভাষা ও অপর দেশের মুসলমান নিতান্তই বিদেশী গণ্য হয়। অথচ একজন মুসলমান অন্য এক মুসলমানকে ভাই জ্ঞান করবে সেটিই আল্লাহর প্রত্যাশা। আল্লাহতায়ালা তাঁর কোরআনে মুসলানদেরকে সেভাবেই চিত্রিত করেছেন। এ চেতনাটিই একজন মুসলমানকে বেঈমান থেকে পৃথক করে। এই চেতনাতেই বিশ্বে নানা ভাষা ও নানা বর্ণের মুসলমানদের মধ্যে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় মজবুত দেওয়াল সৃষ্টি হয়। এই চেতনা নিয়ে তারা একত্রে রাষ্ট্র নির্মাণ করে,রাজনীতি করে এবং প্রয়োজনে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধও করে। মুসলমানের এমন একতা যে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে কত প্রিয় সেটি তিনি পবিত্র কোরআনে ঘোষণা দিয়েছেন এভাবে,

“ইন্নাল্লাহা ইউহিব্বুল্লাযীনা ইউকাতিলুনা ফি সাবিলিল্লাহি সাফফান কা আন্নাহুম বুনিয়ানুন মারসুস”।

অর্থঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা সে সব লোকদের ভালবাসেন যারা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে সীসা ঢাকা দেওয়ালের ন্যায় অটুট একতা নিয়ে”।

কিন্তু আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল এমন লোকদের দিয়ে যাদের অধিকাংশই ছিল সেকুলার চেতনার। সে সেকুলার চেতনায় প্যান-ইসলামী তথা বিশ্ব-মুসলিম ভাতৃত্বের চেতনা গণ্য হত সামপ্রাদায়ীকতা রূপে,ফলে দলটিতে তেমন চেতনা ছিল নিষিদ্ধ ও বর্জনীয়। ফলে সে চেতনার চর্চায় বা প্রসারে তাদের সামান্যতম আগ্রহও ছিল না। বরং তাদের সকল প্রয়াস ছিল এ চেতনার বিনাশে। তাদের রাজনীতিতে ভোটের চিন্তাটাই ছিল বড়,সে চিন্তাতে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে তারা মুসলিম শব্দটি কেটে দিয়েছিল। এতে হিন্দু ভোট পাওয়ার পথটি পরিস্কার হয়ে যায়। এভাবে দলটি শুধু হিন্দু ভোটের দিকেই শুধু ঝুঁকেনি, ঝুকেঁছে হিন্দুস্থানের দিকেও। অপরদিক পরিকল্পিত ভাবে ঘৃণা সৃষ্টি করেছে পাকিস্তানের নেতা ও জনগণের বিরুদ্ধে। কারণ হিন্দুদের ভোট ও হিন্দুস্থানের সাহায্য পাওয়ার জন্য তারা এটিকে জরুরী মনে করতো। নিজেদের ঘরোয়া মিটিংগুলোতেই শুধু নয়, আওয়ামী লীগের নেতা ও বুদ্ধিজীবীগণ সে ঘৃণা প্রকাশ করতেন নিজেদের লেখনীতেও। নিজেদের লেখণীতে বা বক্তৃতায় তারা পশ্চিম পাকিস্তানীদেরকে ভাই না বলে স্রেফ পশ্চিমা বলে উল্লেখ করতেন, এভাবে জাহির হত নিজের মনের গভীরে লুকানো বিষপূর্ণ প্রছন্ন ঘৃণা। এটি যে সাধারণ কর্মীদের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়, আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও। আওয়ামী লীগ শিবিরে বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানের গুরু ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। এমন ঘৃণা অহরহ প্রকাশ পেত তার লেখনিতে। অথচ মুসলমান হিসাবে অপর মুসলমানকে -তা তিনি যে ভাষা,যে বর্ণ বা ভূগোলেরই হোন না কেন -তাকে ভাই বলে সম্বোধন করা শুধু ইসলামি আদব কায়দাই নয়, ঈমানী দায়িত্ববোধও। সে সামান্য আদবটুকুও তারা দেখাতে পারেননি। বরং এরূপ ঘৃণাপূর্ণ আচরণের প্রকাশকে তারা ব্যক্তিস্বাধীনতা বলতেন। আবুল মনসুর আহমেদের রচিত “আমাদের দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর”-এ এমন ঘৃণাবোধের প্রকাশ ঘটেছে অসংখ্য বার। আওয়ামীকর্মীরা যেমন অবাঙালীদের ছাতু বলেছেন,আর আবুল মনসুর আহমদ বলেছেন পশ্চিমা। এটিই হল স্বভাবসুলভ আওয়ামী শালীনতা বা ভদ্রতা। ইংল্যান্ডে কালো ব্যক্তিকে কালো বা নিগার বলা ফৌজদারী অপরাধ। এটি চিত্রিত হয় রেসিজম বা বর্ণবাদ। আর ইসলামে কাউকে এমন নামে ডাকা হারাম যা ঐ লোকটির কাছে অপছন্দের। তাই ছাতু বলা বা পশ্চিমা বলাতে কি কোন পশ্চিম পাকিস্তানি খুশি হতে পারেন? অথচ অওয়ামী-বাকশালী নেতা-কর্মীগণ যত্র-তত্র ঐ শব্দগুলির ব্যবহার করেছেন। এ ঘৃণাকে আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীগণ শুধু দলীয় অফিস, গৃহে বা কেতাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, সেটিকে তারা অবাঙ্গালীদের জানমালের উপরও প্রয়োগ করেছেন। এ লক্ষ্যে তারা আদমজী জুট মিলে অবাঙ্গালী নিধনে দাঙ্গা বাধিয়েছেন। দাঙ্গা বাধায় সাধারনতঃ দূবৃর্ত্ত প্রকৃতির অপরাধীরা। কোন রাজনৈতিক দল ও তার নেতারা সেটি ভাবতেও পারে না। কারণ রাজনীতি তো মানব কল্যাণের ব্রত। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেটিকেও রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত করেছিল। রাজনীতির নামে এভাবে তারা প্রচন্ড পাপের চর্চা বাড়িয়েছেন। এভাবে তখন পূর্ব পাকিস্তানে অবাঙ্গালীদের পুঁজি বিণিয়োগের পথ বন্ধ করেন। কারণ, পুঁজি চায় নিরাপত্তা। পশ্চিম পাকিস্তানী বিণিয়োগকারীগণ তখন বুঝলেন, যে দেশে তাদের জানেরই নিরাপত্তা নেই সেদেশে তাদের পুঁজি নিরাপত্তা পাবে কি করে? ফলে যে দেশটি শিল্পোন্নয়নে তৃতীয় বিশ্বে রিকর্ড গড়ছিল, পরিকল্পিত ভাবে সেখানে স্থবিরতা আনা হল। উল্লেখ্য ৬০-এর দশকে বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর শিল্পোন্নয়নের উপর একটি প্রচ্ছদ-নিবন্ধ ছেপেছিল। সে প্রবন্ধে দুটি দেশকে তৃতীয় বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উন্নয়নমুখী দেশ রূপে চিহ্নিত করেছিল। এর একটি হল কোরিয়া, অপরটি পাকিস্তান। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পাকিস্তান সে অগ্রগতি ধরে রাখতে পারিনি, কিন্তু কোরিয়া পেরেছে।


একাত্তরের পর দেশীয় শিল্প ধ্বংস করে শেখ মুজিব ভারতের জন্য প্রতিযোগিতামূক্ত নিরাপদ বাজার সৃষ্টি করিছেলন,কিন্তু সেটির শুরু তিনি করেছিলেন পাকিস্তান আমল থেকেই। অবাঙ্গালী বিণিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা, ভয়ভীতি, চাঁদাবাজী এসব ছিল তার মোক্ষম অস্ত্র। কথা হল, পাকিস্তান ছিল বহু এলাকার ও বহু ভাষাভাষি মানুষের দেশ। এমন সংকীর্ণ ও ঘৃণাপূর্ণ মনের রাজনীতিবিদগণ কি এমন একটি দেশের নেতৃত্ব পাওয়ার যোগ্যতা রাখে? প্যান-ইসলামিক চেতনার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতাদের মন-মগজ যে কতটা বিষর্পূণ তার একটি বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক। এবং এটি এ লেখকের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে। ১৯৬৯ সালের কথা। তখন ইয়াহিয়া খানের আমল। পাকিস্তান সরকারের নীতিনির্ধারেকরা অবশেষে উপলদ্ধি করে, যে প্যান-ইসলামি চেতনার ভিত্তিতে উপমহাদেশের বাঙালী, বিহারী, পাঞ্জাবী, সিন্ধি,পাঠান ও অন্যা ভাষাভাষি মুসলমানগণ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম দিয়েছিল সে চেতনাটিই দ্রুত দূর্বল হয়ে যাচ্ছে। দেশটির সংহতির বিরুদ্ধে বড় বিপদ এখানেই। প্যান ইসলামী চেতনার অভাবে অসংখ্য শত্রু বেড়ে উঠছে নিজ ঘরেই। পূর্ববর্তী সরকারগুলোয় যারা ছিলেন তাদের অধিকাংশ ছিলেন মনে প্রাণে সেকুলার। তারা এসেছিলেন দেশের সবচেয়ে রেডিক্যাল সেকুলার ইনস্টিটিউশন যেমন আর্মি, আওয়ামী লীগ ও বুরোক্রাসী থেকে। তারা ইসলামি চেতনার বিকাশে কোন কাজই করেননি। এ চেতনার উপর তাদের নিজেদেরও কোন বিশ্বাস ছিল না।


বিপদ যখন ঘরের দরজায় তখন কিছু ইসলামি চেতনাসমৃদ্ধ ব্যক্তি এটিও অনুধাবন করে যে, দেশের চলমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও তার পাঠ্য বই ছাত্রদের মনে এ চেতনার সৃষ্টি বা বৃদ্ধিতে কোন পুষ্টিই জোগাচ্ছে না, বরং উল্টোটি করছে। ইতিমধ্যে দেশ ছেয়ে গেছে ভারতীয়, রুশ ও চীনা বই-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকা। পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত ঘিরে ভারত বসিয়েছে শক্তিশালী অনেকগুলি রেডিও সম্প্রচারকেন্দ্র। এ্যায়ার মার্শাল নূর খান তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। নতুন প্রজন্ম যাতে ইসলামি চেতনা ও পাকিস্তানের ইতিহাস নিয়ে সম্যক ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠে সে লক্ষ্যে নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। পাকিস্তানঃ ইতিহাস ও কৃষ্টি নামে একটি বইও স্কুলের পাঠ্যসুচী করে। কিন্তু এতে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগ। ছাত্র লীগ নূর খান শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক প্রতিবাদ সভা ডাকে। সেখানে প্রধান বক্তা ছিলেন শেখ মুজিবর রহমানের ভাগিনেয় শেখ ফজলুল হক মনি। তখন বিভিন্ন সংগঠনের সাধারণ ছাত্র সভা হত এ মধুর ক্যান্টিনে। শেখ ফজলুল হক মনি অনেক কথাই বল্লেন। তবে যে বিষয়টির উপর তিনি জোর দিয়ে বললেন তা হল,

“নূর খান শিক্ষানীতির লক্ষ্য এ দেশে প্যান-ইসলামিক চিন্তার বিকাশ। বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদী চেতনার বিরুদ্ধে এটি এক গভীর ষড়যন্ত্র। তাই ছাত্রলীগ এ শিক্ষানীতি মেনে নিবে না। এ শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আমাদের দুর্বার ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।”

শেখ মনি বুঝতে ভূল করেননি, প্যান-ইনলামী চেতনা আর জাতিয়তাবাদী চেতনা এক সাথে চলতে পারে না। একটি প্রবল হলে অন্যটি বিলুপ্ত হতে বাধ্য। আর বাংলাদেশে প্রবলতর হচ্ছিল বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদী চেতনা। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন সম্মিলিত ভাবে তুমুল ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলে নূর খান শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে। সে বছরই (১৯৬৯ সালে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্রের পক্ষ থেকে (টিএসসি) নূর খান শিক্ষানীতির উপর আলোচনা সভার আয়োজন হয়েছিল। সেখানে ছাত্রলীগসহ আরো অনেক ছাত্র সংগঠনের ছাত্ররা নিজ নিজ অভিমত তুলে ধরে। নিজ মত তুলে ধরেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র জনাব আব্দুল মালেকও। তিনি যা বলেছিলেন তা নূর খান শিক্ষা নীতির পক্ষে। তিনি তার মাশূলও দিয়েছিলেন। তার বক্তৃতা শান্তিপূর্ণ ভাবে শেষ করতে দেয়া হয়নি, বক্তৃতা চলা কালে প্রচন্ড হাঙ্গামা শুরু করেছিল ছাত্র লীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরা। শুধুমাত্র নিজ মত তুলে ধরার কারণে এই নিরস্ত্র মেধাবী ছাত্রকে সোহরাওয়ার্দ্দী (সাবেক রেস কোর্স) ময়দানে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আব্দুল মালেক ছিলেন ইসলামি ছাত্র সংঘ নামক একটি সংগঠনের ঢাকা শহর শাখার সভাপতি। সে সময় ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানটি যে কতটা সন্ত্রাস কবলিত ছিল এ হল তার নজির। এবং আওয়ামী-বাকশালীরা চক্র যে কতটা ফ্যাসীবাদী ছিল, সেদিন সে স্বাক্ষরও তারা রেখেছিল। তবে এমন ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসী চেতনায় যে শুধু আওয়ামী-বাকশালী নেতা-কর্মীরা আক্রান্ত হয়েছিল তা নয়, চরম ভাবে আক্রান্ত হয়েছিল ঢাকার মিডিয়া এবং বুদ্ধিজীবী মহল। ফলে এতবড় একটা হত্যাকান্ড দিনদুপুরে সংঘটিত হওয়ার পরও তা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকুলার বু্দ্ধিজীবী মহলে ও মিডিয়াতে সামান্যতম আলোড়নও সৃষ্টি হয়নি। ভাবটা এমন, যেন ঢাকাতে কিছুই ঘটেনি এবং তারা কিছুই দেখেনি। সে সময় ঢাকা-কেন্দ্রীক বুদ্ধিবৃত্তি যে কতটা আত্মঘাতের শিকার হয়েছিল এ হল তার নমুনা। পাকিস্তানের ইতিহাস ও কৃষ্টির উপর যে নতুন বইটিকে সরকার পাঠ্য তালিকাভূক্ত করেছিল, সেটির বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন এমন তুমুল ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলে যে সরকার সে বইটি তুলে নিতে বাধ্য হয়। আওয়ামী লীগ,ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের ন্যায় সেকুলার সংগঠনগুলির কাছে পাকিস্তান ও তার ইতিহাস জানা যে কতটা অপ্রিয় হয়ে পড়েছিল এ হল তার নমুনা। অথচ এরাই পাকিস্তানে ইসলামী দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চার জন্য জিদ ধরেছিল। প্রশ্ন হল, নিজ দেশে এত শত্রু থাকতে সে দেশ ভাঙ্গতে কি বিদেশী শত্রুর প্রয়োজন হয়?

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh

 

Most Read