Home EBooks ৭১এর আত্মঘাতের ইতিহাস অধ্যায় ৮: যে গাদ্দারী দ্বি-জাতি তত্ত্বের সাথে

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ৮: যে গাদ্দারী দ্বি-জাতি তত্ত্বের সাথে Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 19 October 2008 18:21
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে মূল দর্শন ও যুক্তিটা ছিল দ্বি-জাতি তত্ত্ব। যার মূল কথা, মুসলমানগণ হিন্দুদের থেকে এক পৃথক জাতি। তাদের নাম ও নামকরণ পদ্ধতিই শুধু আলাদা নয়, আলাদা হল তাদের জীবন-লক্ষ্য, তাহজিব তামুদ্দন, ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং এ জীবনে সফলতা ও বিফলতা যাচাইয়ের মানদন্ড। মুসলমান ও হিন্দু -এ দুইটি জাতি যেমন এক লক্ষ্যে বাঁচে না, তেমনি একই লক্ষ্যে রাজনীতিও করে না। মুসলমানের বাঁচবার মূল লক্ষ্যটি হল, সর্বকাজে আল্লাহকে খুশি করা। এ জন্যই ভিন্ন হল, মুসলমানের রাজনৈতিক এজেন্ডাও। এবং সে এজেন্ডাটি হল আল্লাহর দ্বীন তথা বিধানকে সর্বস্তরে বিজয়ী করা। এজন্যই রাজনীতি তার কাছে কোন নেশা নয়, পেশাও নয় বরং ইবাদত। এটি জ্বিহাদ। আল্লাহর বিধানকে বিজয়ী করতে গিয়ে নবীজী (সাঃ) কে ৫০-এর বেশী যুদ্ধ করতে হয়েছে। তাই শুধু নামাযা-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালন করলেই পরিপূর্ণ ইবাদত হয় না। তাকে জীবনের প্রতি মুহুর্ত ও প্রতি ক্ষেত্রকে আল্লাহর অনুগত করে দিতে হয়। কোরআনের বিধান তাই শুধু মসজিদে পালন করলে চলে না, সে বিধানকে রাষ্ট্র-পরিচালনা, বিচার-আচার ও শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে নিয়ে আসতে হয়। প্রতিকর্মে মেনে চলতে হয় আল্লাহর বিধানকেও। নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাতের ন্যায় ইবাদতগুলি যেরূপ অমুসলিমদের সাথে একত্রে চলে না, তেমনি চলে না তার রাজনৈতিক ইবাদতও।

দুইটি ট্রেন যখন দুই ভিন্ন ধরনের যাত্রী নিয়ে ভিন্ন গন্তব্যস্থলের দিকে ছুটে, সে দুটি ভিন্ন ট্রেনকে কি এক ও অভিন্ন বলা যায়? বিষয়টি অবিকল অভিন্ন জাতিসত্ত্বা নির্ধারেণর ক্ষেত্রেও। মুসলমানগণ তাই সর্বাত্রেই ভিন্ন জাতি, সেটি ভিন্ন জীবনবোধ ও জীবন-লক্ষ্যের কারণে। নামায আদায়ে ভিন্ন জামাত, ভিন্ন নেতা ও ভিন্ন ইবাদতগাহ গড়তে হয়। তেমনি রাজনৈতীক ইবাদতের জন্যও মুসলমানের ভিন্ন জামাত, ভিন্ন নেতা এবং সম্ভব হলে ভিন্ন দেশ বেছে নিতে হয়। এজন্যই মুসলমানও পারে না অমুসলমানের রাজনীতির সাথে একাত্ব হতে। তাই মুসলমানগণ শুধু এক খন্ড ভূখন্ডের জন্য রাজনীতি করে না, সে লক্ষ্যে রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠা করে না। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য শুধু এ নয়,সেখানে নিছক জান-মাল, ঘর-বাড়ী, ব্যাবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি নিরাপত্তা পাবে। বরং তারা রাষ্ট্র চায় এ জন্য যে, সেখানে আল্লাহতায়ালার বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে পারবে। দেশের সংখ্যা-গরিষ্ঠ জনসংখ্যা অমুসলিম হলে সে লক্ষ্য পূরণ অসম্ভব হয়। অসম্ভব হয় পরিপূর্ণ মুসলমান রূপে বেড়ে উঠা। এমন দেশে অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জিম্মিদশা নেমে আসে সংখ্যালঘু মুসলমানদের জীবনে। স্বাধীনতার ৬০ বছর পরও তেমনি এক জিম্মিদশায় ভুগছে আজকের ভারতীয় মুসলমানগণ। মুসলমানগণ সেখানে এতটাই নিরাপত্তাহীন যে, হাজার হাজার মুসলমানকে জ্বালিয়ে মারা হলেও নূণ্যতম অধিকার নেই ন্যায় বিচারের। ১৯৪৭-এ পাকিস্তান সৃষ্টি না হলে ভারতীয় মুসলমানদের সে জিম্মিদশায় যোগ হত আরো তিরিশ কোটি মুসলমান। ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান সৃষ্টির প্রয়োজন দেখা দেয় তো একারণেই। সেটির পক্ষে মূল যুক্তি বা দর্শনটি ছিল দ্বি-জাতিতত্ত্ব। সে সময় মুসলমানগণ আওয়াজ তুলেছিল, “পাকিস্তানে কা মতলব কিয়া? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।”এ যুক্তিটি এতই শক্তিশালী ছিল যে এমনকি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা তা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এই দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতেই ব্রিটিশ সরকার দেয় পৃথক নির্বাচন। যার ফলে মুসলমান এমপি নির্বাচিত হয় মুসলিম ভোটে। এতে মুসলমানের রাজনীতিতে গুরুত্ব পায় মুসলিম স্বার্থের প্রতি অঙ্গিকার । ফল দাঁড়ায়, মুসলিম প্রার্থীগণ ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম মানুক আর নামুক, মুসলমানদের কাছে নিজেকে ধর্মভীরু রূপে পেশ করার প্রতিদ্বন্ধিতা শুরু হয়। মিষ্টারও তখন হাজির হয় মৌলবী রূপে। নেতাদের পোষাক-পরিচ্ছদেও কোট-প্যান্ট-টাইয়ের পরিবর্তে পাজামা-শেরওয়ানি-টুপি ও মুখে দাড়ী গুরুত্ব পায়। মুসলিম লীগের নেতাদের মুখ দিয়ে তখন ধ্বনিত হতে থাকে, “কোরআনই আমাদের শাসনতন্ত্র” এবং “আল্লাহর দেওয়া আইনই আমাদের আইন”। ভারতীয় মুসলমানগণ তখন দেখতে পায় ইসলামের নতুন জাগরণের সম্ভাবনা। স্বপ্ন দেখে, হারানো দিনের গৌরব ফিরে পাওয়ার। এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশে এমনকি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠদের দল ভারতীয় কংগ্রেসও আবুল কালাম আজাদের ন্যায় একজন মাওলানাকে সভাপতি করে। চল্লিশের দশকের সেই অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দীর্ঘ চার বছর তাঁকে সে পদে রাখে। সে সময় কংগ্রেস পেশ করেছিল, হিন্দু-মুসলিম মিলিত এক অভিন্ন ভারতীয় জাতিয়তাবাদের তত্ত্ব। তাদের মুল কথা ছিল, ভারতে বসবাসকারি সকল হিন্দু, মুসলমান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বিগণ প্রথমে ভারতীয়, তারপর ধর্মীয় পরিচিতি। কংগ্রেস এ নীতিকে পরিচিত করেছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বলে।


১৯৪৬ সালে নির্বাচন হয়েছিল মূলতঃ দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে - পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ইস্যুতে। মুসলমানগণ সেদিন বিপুল পাকিস্তানের পক্ষে রায় দেয় এবং প্রত্যাখান করে কংগ্রেসের পেশ করা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব। কিন্তু ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শুরু হয় দ্বি-জাতি তত্ত্বের সাথে গাদ্দারী। সেটি শুরু হয় মুসলিম লীগের সাবেক নেতাদের দ্বারা। তাদের এ নীতির পিছনে কোন দর্শন ছিল না,ছিল ক্ষমতা দখলের রাজনীতি। দ্বি-জাতি তত্ত্বের বিরোধীতায় প্রথম সারিতে ছিলেন মাওলানা ভাষানী ও সোহরাওয়ার্দ্দী প্রমুখ। অথচ ১৯৪৬ সালে তারা নিজেরাও হিন্দু ও মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনের কথা বলতেন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই তাঁদের নীতিতে আসে প্রচন্ড ডিগবাজি। মাওলানা ভাষানী নামে মাওলানা হলেও তাঁর অঙ্গিকার বাড়ে চীনের নেতা মাও সে তু্‌‌ঙয়ের সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি। তিনি রাজনীতির ছাতা ধরেন চীনপন্থি সমাজতন্ত্রিদের আশ্রয় দিতে। বহু জনসভা, বহু অনশন,বহু মিছিল তিনি করেছেন, কিন্তু একটি বারও আল্লাহর আইন শরিয়ত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে করেননি। অথচ এটিই মুসলমানের রাজনীতির মূল এজেন্ডা।আর সেটিই বাদ পড়েছিল তার রাজনীতি থেকে।এরপরও তিনি নিজেকে পরিচয় দিতেন মাওলানা রূপে। তিনিই প্রথম নেতা যিনি হিন্দুদের সাথে সুর মিলিয়ে পৃথক নির্বাচনের বিলোপের দাবী তুলেন। পাকিস্তান ধ্বংসের এটি ছিল প্রথম ষড়যন্ত্র। কারণ পৃথক নির্বাচন ছাড়া পাকিস্তানের জন্ম যেমন সম্ভব ছিল না,তেমনি সম্ভব ছিল না এদেশটিকে বাঁচিয়ে রাখাও। নবীজীর (সাঃ) আমলে এবং তার পরবর্তীতে খোলাফায়ের রাশেদার আমলে মুসলিম দেশে বহু অমুসলিমও বাস করত। কিন্তু কে হবে খলিফা বা কি হবে আইন-আদালত ও রাজনীতি সেটি মুসলমানরাই নির্ধারিত করেছেন। অমুসলমানদের তারা জানমাল ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পূণ্য নিরাপত্ত দিয়েছেন, কিন্তু ধর্মীয় বিধান প্রতিষ্ঠার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেননি।মুসলিম উম্মাহর জীবনে প্রতিটি রাজনৈতিক ফয়সালাই গুরুত্বপূর্ণ,এর উপর নির্ভর করে আল্লাহর দ্বীনের বিজয় ও পরাজয়ের বিষয়টি। তাই এ ফয়সালায় ভেজাল চলে না। কিন্তু মাওলানা ভাষানী ইসলামের সে মূল শিক্ষাকে মানেননি। তার রাজনীতিতে আল্লাহকে খুশি করার চেয়ে গুরুত্ব পায় হিন্দু,সেকুলারিস্ট,নাস্তিক ও কম্যুনিষ্টদের খুশি করার বিষয়টি। বস্তুতঃ তাদের পক্ষ হয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে মূল খেলাটি শুরু করেন তিনিই প্রথম। পরবর্তীতে শেখ মুজিবসহ আরো অনেকে সেটিকেই ষোলকলায় পূর্ণ করেন। মুসলিম লীগ ভেঙ্গে মাওলানা ভাষানীই আওয়ামী মুসলিম লীগ গড়ায় নেতৃত্ব দেন। শুরুতে আওয়ামী মুসলিম লীগের নীতিতে যুক্ত নির্বাচনের দাবী ছিল না। কিন্তু ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রধান দল রূপে আবির্ভূত হলেও দলটি সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ক্ষমতা পায় দ্বিতীয় বৃহত্তম দল শেরে বাংলার কৃষক-শ্রমিক-প্রজা দল। যাদেরকে সমর্থন দেয় সংখ্যালঘু সদস্যগণ। আওয়ামী লীগ নেতাগণ তখন বুঝতে পারে, সংখ্যালঘুদের দলে টানতে না পারলে তাদের পক্ষে ক্ষমতায় যাওয়া অসম্ভব। ফলে মৌলিক পরিবর্তন আসে তাদের নীতিতে। তারা দাবী তুলে পৃথক-নির্বাচন প্রথা বাতিলের। সোহরাওয়ার্দ্দী প্রথমে রাজী না হলেও পরে তিনি আত্মসমর্পন করেন ভাষানীর কাছে। তখন ভাষানীই ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রাদেশিক সভাপতি। পরে আওয়ামী মুসলিম লীগের মুসলিম শব্দটিও তাদের কাছে অসহ্য হয়ে পড়ে। ১৯৫৫ সালে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে আয়োজিত অধিবেশনে মুসলিম নামটিকে তারা আবর্জনা স্তুপে ফেলে। আওয়ামী মুসলিম লীগ তখন পরিণত হয় আওয়ামী লীগে।


১৯৫৬ সালের ৭-৮ ফেব্রেয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারি -বর্তমানে সন্তোষ-এ অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগকে সেকুলার দল হিসাবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ইসলাম এবং মুসলিম স্বার্থের প্রতি যে অঙ্গিকার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তান, সে অঙ্গিকারটি চিত্রিত হয় সামপ্রদায়িকতা রূপে। এভাবে আওয়ামী লীগের ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদদের স্বার্থপর রাজনীতিতে মুসলিম ও ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার শুধু অসহনীয়ই নয়, বর্জণীয় রূপে গণ্য হয়। পাকিস্তানের অস্তিত্বের প্রতি বিপদসংকেত বেজে উঠে তখন থেকেই। সেকুলারিজমকে তাঁরা সংজ্ঞায়ীত করে ধর্ম-নিপরপেক্ষতা রূপে। অথচ মুসলমান হওয়ার অর্থই হল রাজনীতিসহ জীবনের প্রতিটি অঙ্গণে ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের পক্ষ নেওয়া।আল্লাহতায়ালার উপর ঈমানের অর্থই হল,ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের প্রতি প্রবল অঙ্গিকারবদ্ধতা। নিরপেক্ষতা এ ক্ষেত্রে হারাম।মানুষ যত দল বা জাতিতেই বিভক্ত হোক না কেন,মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মানুষের শ্রেণী বা দল মাত্র দুইটি। একটি আল্লাহর দল,আরেকটি শয়তানের। হাবিল ও কাবিল থেকে শুরু করে মানব-ইতিহাসের সর্বযুগ জুড়ে এ দুটি দলের সংঘাত। মুসলমান হওয়ার অর্থই হল পক্ষ নেওয়া,এবং সেটি মহান আল্লাহর পক্ষ। আল্লাহর পক্ষ নেওয়ার অর্থ হল ইসলাম ও মুসলমানের পক্ষ নেওয়া। তাই কোন মুসলমান ইসলাম ও মুসলিম প্রসঙ্গে নিরপেক্ষ হয় কি করে? মহান আল্লাহ তো চান তার প্রতিটি বান্দাহ শুধু ইসলামের পক্ষই নিবে না, প্রয়োজনে যুদ্ধও করবে। পাকিস্তান তো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নানা ভাষাভাষি ভারতীয় মুসলমানদের সে লড়াকু অঙ্গিকারের বলেই। পাকিস্তান সৃষ্টির মূলেই শুধু নয়, এ দেশটির বেঁচে থাকারও মূল প্রাণশক্তি ছিল মুসলিম ও ইসলামের প্রতি গভীর অঙ্গিকার। এ প্রাণ শক্তি দূর্বল হলে পাকিস্তানের বেঁচে থাকার শক্তিটিও যে বিলুপ্ত হবে সে সত্যটি শত্রুদেরও অজানা ছিল না। ফলে ভাষানীর প্রতিষ্ঠিত সে সেকুলার আওয়ামী লীগের মধ্যে তারা পাকিস্তানের মৃত্যুর পয়গাম শুনতে পেল। বিশ্বের সর্ব বৃহৎ এ মুসলিম দেশটির সৃষ্টিতে হিন্দু ও তাদের মিত্র সেকুলারিস্ট ও সোসালিস্টদের কোন ভূমিকা ছিল না, বরং প্রাণপণে তারা বিরোধীতাই করেছিল। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর তারা যেন হাঁফ ছেড়ে বাচেঁ। তারা যেন নতুন জীবন ফিরে পায়। এ দলটিতে তখন তারা দলে দলে যোগ দেয়। এভাবে ইসলামের প্রতিপক্ষ ১৯৪৭-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগে নতুন মিত্র খুঁজে পায়।


নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের বীজ বপন করা হয়েছিল ঢাকাতে। সে ঢাকা নগরীতেই রোপণ করা হয় দেশটির ধ্বংসের বীজ। এবং সেটি ১৯৫৫ সালে সেকুলার আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। সেটি প্রমাণ হয় ১৯৭১ সালে। যখনই পরিস্থিতি উপযোগী ভেবেছেন তখনই মাওলানা ভাষানী পাকিস্তান ভাঙ্গার গান গেয়েছেন। তিনিই সর্ব প্রথম পশ্চিম পাকিস্তানকে আস্সালামু আলাইকুম জানিয়ে দেন। এবং সেটি ১৯৫৫ সালের ১৭ জুন পল্টন ময়দানে আয়োজিত আওয়ামী লীগের জনসভায়। দ্বিতীয় বার জানান ১৯৫৬ সালে কাগমারী সম্মেলনে। সে সম্মেলনে তিনি গান্ধী, সুভাষবোস, চিত্তরঞ্জণ দাস প্রমুখ ভারতীয় নেতাদের নামে তোরণ নির্মাণ করেছিলেন। যেন বাংলার মুসলমানদের কল্যাণে এসব হিন্দু নেতাদের অবদানই বেশী। তার তালিকায় স্থান পাননি কায়েদে আযম, আল্লামা ইকবাল বা নবাব সলিমুল্লাহ। এমনকি নবীজী (সাঃ) বা খোলাফায়ে রাশেদারও কেউ নয়। তোরণ নির্মাণের মধ্য দিয়ে মূলতঃ তিনি জানিয়ে দিলেন তার কেবলা এখন কোন দিকে। এবং কারা তার আদর্শনীয় ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তৃতীয়বার তিনি আর আস্সালামু আলাইকুম বলেননি, সরাসরি স্বাধীনতারই ঘোষণা দিয়েছিলেন। এবং সেটি ১৯৭০-এ দেশের দক্ষিনাঞ্চলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর। অথচ শেখ মুজিব তখনও নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। এই হল এক কালের মুসলিম লীগ নেতার কান্ড! দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালাও-পোড়াও, ঘেরাও -এসবই ছিল তার রাজনীতি; কোরআনের পরিভাষায় যা হল ফিতনা। পবিত্র কোরআনে এমন গোলযোগ সৃষ্টিকে মানব-হত্যার চেয়েও জঘন্য বলা হয়েছে। কারণ কিছু মানবের নিহত হওয়ার কারণে একটি জাতির জীবনে ধ্বংস,পরাজয় বা বিপর্যয় আসে না। বাংলাদেশের ন্যায় কত দেশেই তো কত দুর্যোগ আসে। সে সব দুর্যোগে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুও হয়। কিন্তু তাতে দেশ ধ্বংস হয় না। দেশ ধ্বংস হয় বা বিপর্যয়ের শিকার হয় আভ্যন্তুরীণ বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগের কারণে। আর মাওলানা ভাষানী ছিলেন এমন গোলযোগ সৃষ্টির গুরু। তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিজ দল ন্যাপের পক্ষ থেকে কোন প্রার্থাই দেননি। তার দলীয় সমর্থকগণ ভোট দিয়েছে তাঁরই সাবেক দল আওয়ামী লীগকে। অপর দিকে তিনি মিত্রতা গড়েছেন পাকিস্তানে রাজনীতি আরেক ভিলেন জুলফিকার আলী ভূট্টোর সাথে।


১৯৬৮ সালে আইউব খান গোল টেবিল বৈঠক ডেকে দেশে পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের দাবী মেনে নেয়ায় রাজী হয়েছিলেন। তখন মহাসুযোগ আসে পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের।দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের বিরোধীদল সমূহ সে দাবীতে আন্দোলন করছিল। সে সুযোগটিও তিনি এবং শেখ মুজিব বানচাল করে দেন। মাওলানা ভাষানী গোল টেবিল বৈঠকেই যোগ দেননি। বৈঠকের বাইরে থেকে তিনি জনাব ভূট্টোর সাথে মিলে জ্বালাও পোড়াও আন্দোলন শুরু করেন। অপর দিকে শেখ মুজিব জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বৈঠকে ৬ দফা দাবীতে অনড় থাকেন। অথচ গোল টেবিল বৈঠক সে দাবি পেশের জন্য উপযুক্ত ফোরামই ছিল না। স্বাধীন দেশে এমন দাবী বিষদ নিয়ে বিষদ আলোচনা হয় দেশের পার্লামেন্টে। কারণ এর সাথে জড়িত আইনের সংশোধনের বিষয়। এভাবে ব্যর্থ হয় গোল টেবিল বৈঠক, নেমে আসে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বে আরেকবার সামরিক শাসন। মাওলানা ভাষানীর নীতি ভ্রষ্টতা আরেকবার প্রমাণিত হয় ১৯৬৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। তখন তিনি আইয়ুব খানকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে রাজনীতিতে হঠাৎ খামোশ হয়ে যান। সে নির্বাচনে আইয়ুবের প্রতিদ্বন্দী ছিলেন কায়েদে আযমের বোন মিস ফাতেমা জিন্নাহ। তার পক্ষে তিনি কোন প্রচারণাই চালাননি। এ নিরাবতার কারণ রূপে তিনি নিজেই বলেছিলেন, মাও সে তুং তাঁকে তৎকালে চীনের ঘনিষ্ট বন্ধু আইউব খানকে বিব্রত করতে নিষেধ করেছিলেন। অথচ সে নির্বাচনটি পাকিস্তানের ইতিহাসে অতিগুরুত্বপূর্ণ ছিল, সে সময় ফাতেমা জিন্নাহ নির্বাচিত হলে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ হয়ত ভিন্নতর হত।

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Comments  

 
0 # 2008-11-14 00:00

Dear Uncle, I have read many articles from many Bangladeshi people, Bangladeshi real scholars or so-called scholars. but i have not found anything as comprehensive as your article. Please write more and more. ALLAH has give you knowledge, inform this knowledge to the illiterate people like us.

Mabrur, Phd Research Scholar, Composite Materials Laboratory, School of Mechanical and Aerospace Engineering, Nanyang Technological University, Singapore 639798.

Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh

 

Most Read