অধ্যায় ১০: জেনেবুঝে রক্তপাতের পথ বেছে নেওয়া হয় Print
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 19 October 2008 18:38
স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পক্ষে শেখ মুজিব ও অন্যান্য আওয়ামী লীগের নেতাদের দলীল হল, ১৯৭০ -এর নির্বাচনে তাদের বিজয়। অথচ জনগণ তাদেরকে ভোট দিয়েছিল পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য হতে। এবং সেটি অখন্ড পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক সংকট দুর করার লক্ষ্যে, দেশটি বিভক্ত করতে নয়। কিন্তু যে জন্য জনগণ তাদেরকে ভোট দিল সে দায়িত্ব তারা পালন করেননি। পাকিস্তানের খেদমত না করে,দেশটিকই তারা ভেঙ্গে ফেলল। অথচ নির্বাচন কালে দেশটি ভাঙ্গার কথা বলে তারা জনগণ থেকে ভোট নেননি। এটি ছিল তাদের উপর অর্পিত আমানতের খেয়ানত। অথচ এরূপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষযে রায় দেওয়ার অধিকার ছিল একমাত্র জনগনের। যে কোন সভ্য দেশে এমন বিষয়ে বিপুল আয়োজনে জনমত যাচাই বা রেফারেন্ডাম হয়। রাজনৈতিক ময়দানে তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তর আলোচনা হয়। উপমহাদেশেও এমন একটি রিফারেন্ডাম হয়েছিল ১৯৪৬ সালে। সেটি ভারত ভাঙ্গার পক্ষে রায় যাচায়ে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সে রিফারেন্ডামের ভিত্তিতেই। তখন বাংলার সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমান ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় দেয়। এদেশটির বিলুপ্তি হতে পারত একমাত্র আরেকটি অনুরূপ রায়ের ভিত্তিতে। কিন্তু তা হয়নি।

কোন দেশেই এমপিদের হাতে সব ক্ষমতা থাকে না। তারা বড় জোর শাসনতন্ত্রে পরিবর্তন আনতে পারেন, বাজেট পাস করাতে পারেন, প্রধানমন্ত্রী কে হবেন সে সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। এরূপ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল বা শক্তির সাথে তারা দর কষাকষিও করতে পারে। কিন্তু সে দরকষাকষিতে ব্যর্থ হলে তারা বড় জোর পদত্যাগ করতে পারেন,এবং অন্যদের জন্য তখন পথ ছেড়ে দিতে পারেন। কিন্তু ক্ষমতায় যেতে ব্যর্থ হলেই তারা দেশকে খন্ডিত করবেন, সে অধিকার কোন দেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের থাকে না।অথচ আওয়ামী লীগ সেটাই করেছে। ইয়াহিয়া খান ও ভূট্টোর সাথে দরাকষিতে সফর না হয়েই শেখ মুজিব স্বাধীনতার পথ ধরেন। কিন্তু জনগণ কি তাঁকে সে মান্ডেট দিয়েছিল? উত্তরবঙ্গ থেকে নির্বাচিত এমপিগণ কি অধিকার রাখেন উত্তর বঙ্গকে বাংলাদেশের অন্য এলাকা থেকে আলাদা করে স্বাধীন করার? আওয়ামী লীগ বলে, ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সে ঘোষণাটি তিনি দিলেন কোন ম্যান্ডেট অনুযায়ী? কে তাকে সে অধিকার দিল? শেখ মুজিব ও তার দল ১৯৭০-এর নির্বাচনে অংশ নেয় ইয়াহিয়ার দেওয়া ৫ দফা লিগ্যাল ফ্রেমওংয়ার্ক অর্ডার মেনে নিয়ে। তার শর্ত্বগুলো ছিল নিন্মরূপঃ

১। পাকিস্তানকে অবশ্যই ইসলামি আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

২। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পর দেশের জন্য একটি গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে হবে।

৩। আঞ্চলিক অখন্ডতা ও সংহতির বিষয়কে অবশ্য শাসনতন্ত্রে গুরুত্ব দিতে হবে।

৪। দেশের দুই অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে অবশ্যই দূর করতে হবে

৫। কেন্দ্র ও প্রদেশগুলির মধ্যে ক্ষমতা অবশ্যই এমনভাবে বন্টন করতে হবে যাতে প্রদেশগুলি সর্বাধিক পরিমাণ স্বায়ত্বশাসন পয়। কেন্দ্রকে আঞ্চলিক অখন্ডতা রক্ষাসহ ফেডারেল দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট ক্ষমতা থাকতে হবে।


শেখ মুজিব উপরের শর্ত্বগুলোয় দস্তখত করলেন, অন্যরা সেটি দেখল, সেটি দেখলেন মহান আল্লাহপাকও। কোন কিছু স্বাক্ষর করার অর্থ সেটি পালনে পবিত্র অঙ্গিকার করা। কোন মুসলমান কি পারে সে অঙ্গিকারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা বা গাদ্দারী করতে? এ কাজ তো মুনাফিকের। তাছাড়া সেটি স্বাক্ষরে তাঁকে তো কেউ বাধ্য করেনি। এ দলীল স্বাক্ষরের পর কোথা থেকে তিনি অধিকার পেলেন পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মাণের? তবে কি তিনি সেটি স্বাক্ষর করেছিলেন জনগণকে এবং সে সাথে পাকিস্তান সরকারকে ধোকা দিতে? আর সেটি হলে, স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি কি তবে ধোকাবাজি? স্বাধীনতার ঘোষণা কি এজন্য যে, ২৫শে পাকিস্তান আর্মির হাতে ঢাকার অনেক বাঙ্গালী মারা গিয়েছিল? ২৫ শে মার্চ রাতে যত জন মারা গিয়েছিল, মুজিব আমলে রক্ষি বাহিনীর হাতে তার চেয়ে বেশী মানুষ মারা গিয়েছিল উত্তরবঙ্গে। অনেক প্রাণহানী হয়েছিল একমাত্র আত্রাইয়ের একটি ক্ষুদ্র এলাকায়। সে কারণে কি উত্তরবঙ্গের এমপিগণ স্বাধীনতা ঘোষণা করবে?


পাকিস্তান ভাঙ্গার লক্ষ্যে সংঘাতের যে পথটি আওয়ামী লীগ বেছে নিয়েছিল তাতে প্রচন্ড রক্তপাত হবে সেটি কারোরই অজানা ছিল না। শেখ মুজিব কারাবন্দী থাকা অবস্থায় যে ব্যক্তিটি আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন আওয়ামী লীগের সে সময়ের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মিসেস আমেনা বেগমও শেখ মুজিবকে এ বিষয়ে হুশিয়ার করে দিয়েছিলেন। আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রের মুখে পাকিস্তানকে যারা দুর্গ মনে করত তাদের সংখ্যা শুধু পশ্চিম পাকিস্তানেই নয়, পূর্ব পাকিস্তানেও কম ছিল না। পাকিস্তানের সংহতি রক্ষাকল্পে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে কসম খেয়েছিল এমন মুসলমানের সংখ্যা পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতেই ছিল কয়েক লক্ষ। ছিল সেনাবাহিনীর বাইরেও। সে কসম খেয়েছিল বহু বাঙ্গালী সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিও। সে কসম শেখ মুজিবও খেয়েছিলেন, বিশেষ করে যখন তিনি পূর্ব-পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন। শেখ মুজিব না হয় তাঁর কসমের সাথে গাদ্দারী করতে পারেন, কিন্ত সবাই কি তা পারে? ফলে আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তের কারণেই দুই পক্ষের রক্তাত্ব সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠে। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল,যেভাবেই হোক পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের সৃষ্টি। তা যত রক্তপাতেই হোক। আওয়ামী বাকশালীদের কাছে পাকিস্তান হল, দক্ষিণ এশিয়ার বুকে এক সামপ্রদায়িক অনাসৃষ্টি। অনুকরণীয় সভ্য রাষ্ট্র মনে করত ভারতকে। অথচ ভারতে মুসলিম নিধন, মুসলিম নারীধর্ষণ ও তাদের সম্পদ লুন্ঠনকল্পে এ অবধি সাম্প্রদায়ীক দাঙ্গা হয়েছে দশ হাজার বারেরও অধিক। শত শত জীবন্ত মানুষকে সেখানে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। এ পক্ষটি তা নিয়ে একটি দিনের জন্যও প্রতিবাদে নামেনি। অথচ পূর্ব পাকিস্তান ছিল তাদের ভাষায় পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশ। তাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মিত্র ছিল পশ্চিম বাংলা ও ভারতের স্যেকুলার রাজনৈতিক শক্তিবর্গ। তাদের কথাবার্তায় চরম ঘৃণা ও উৎকট আক্রোশ প্রকাশ পেত পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলমানদের বিরুদ্ধে। তাদের নেতাকর্মীগণ পাকিস্তানের অবাঙ্গালী মুসলমানদেরকে ছাতুখোর বলে প্রকাশ্যে অবজ্ঞা করত। এরূপ ঘৃণা সৃষ্টির ফলে ১৯৭০এ আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর অবাঙ্গালী ব্যবসায়ীগণ নিরাপত্তার অভাবে পূর্ব পাকিস্তান ছাড়তে থাকে। ক্যাম্পাস ছাড়তে থাকে ঢাকা,চট্টগ্রাম,সিলেট,রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন শহরের বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল ও ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে অধ্যয়নরত অবাঙ্গালী ছাত্র-ছাত্রীরা। অথচ লক্ষ্যনীয় ছিল তাদের সে ঘৃণা প্রকাশ পেত না ভারতীয় অবাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে। বরং পাঞ্জাবী শিখ, হিন্দু বিহারী, মারওয়ারিদের সাথে যথেষ্ট সখ্যতাই ছিল। গান্ধি, নেহেরু, সুভাস বোস, রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্কিম ছিল তাদের আদর্শ; কায়েদে আযম বা ইকবাল নয়। কায়েদে আযমের বিরুদ্ধে প্রচন্ড অভিযোগ ছিল, কোলকাতা পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে পরেনি শুধু তাঁর কারণে। অথচ যে গান্ধি, নেহেরু ও পশ্চিম বাংলার কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ কোলকাতা পাকিস্তানভূক্তির প্রচন্ড বিরোধীতা করল তাদের বিরুদ্ধে তাদের সামান্যতম অভিযোগ বা ক্ষোভও ছিল না। যে রবীন্দ্রনাথ ঢাকাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল এবং নিজের ছোট গল্পে অছিমন্দিকে হিন্দু জমিদারের জারজ সন্তান রূপে চিত্রিত করল তার জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী তারা মহা উৎসবে পালন করত। এমন মুসলিম স্বার্থবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক কবিকে তাদের কাছে সাম্প্রদায়িক মনে হয়নি, বরং সাম্প্রদায়ীক গণ্য করেছে ইসলামের উৎসবগুলি। ফলে মহানবীর (সাঃ) জন্ম বার্ষিকীতে তাদের কোন মহফিল বা কর্মকান্ডই নজরে পড়ত না।


শেখ মুজিব জীবনে কখনও কোরআন শরিফ বা হাদীস পাঠ করেছেন কিনা সে খবর নেই, কিন্তু তিনি প্রতিদিন সকালে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতেন এবং তার কবিতা পাঠ করতেন সে খবর বহুল প্রচার পেয়েছে। ইসলামের প্রতিষ্ঠা তার জীবনে আদৌ কোন রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল না। তার রাজনৈতিক কর্মকান্ড ছিল মুসলিম শক্তিবিনাশী। সে বিনাশী কাজে সহায়তা দিচ্ছিল শুধু ভারত নয়, বরং রাশিয়া ও গ্রেট ব্রিটেনসহ এমন সব দেশ যাদের কাছে মুসলমানের প্রতিটি পরাজয় ও শক্তিহানির প্রতিটি ঘটনাই ছিল অতিশয় উল্লাসের বিষয়। দেশে দেশে মুসলিম নিধন, নির্যাতন ও তাদের সম্পদ লুন্ঠনে এদেশগুলোর প্রচুর অভিজ্ঞতাও ছিল। ফলে একাত্তরের বহুকাল পর ঢাকার রাজপথে ২০০৭ এর জানুয়ারিতে বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদী এ সেকুলার পক্ষটি বৈঠা হাতে যেভাবে দাড়ীটুপিধারি নিরীহ মুসল্লীদের পিটিয়ে আহত ও নিহত করে সেটি কোন নতুন ঘটনা নয়। তাদের মাঝে এমন নির্মূলমুখি চেতনা একাত্তরপূর্বকালেও ছিল। তারা ১৯৭০এর ১৮ই জানুয়ারিতে পল্টনে জামায়াতে ইসলামীর জনসভায় লাঠিসোটা ও পাথর নিয়ে হামলা করে তিনজনকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে। আহত করেছিল বহু শতকে। নিহত তিনজনই এসেছিল মফস্বলের গ্রাম থেকে। তারা সেদিন পল্টন ময়দানে এসেছিল জামায়াত নেতা মাওলানা মওদূদীর বক্তৃতা শুনতে। হামলার পরিকল্পনাকারি কোন আওয়ামী ক্যাডার ছিল না, বরং শেখ মুজিব নিজে। পুরনো পল্টনে অবস্থিত তৎকালীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অফিসে বসে মাওলানা মওদূদীর সে জনসভা সম্মদ্ধে শেখ মুজিব বলেছিলেন,“লাহোর-করাচীর ব্যবসায়ীদের পয়সা নিয়ে বাঙ্গালী কিনতে আসছেন। দেখে নিব কি করে মিটিং করেন।” শেখ মুজিবের অফিস কক্ষে তার সামনে বসে সে কথা আমি নিজ কানে শুনেছি। সে মিটিং পন্ড করতে তিনি সমর্থও হয়েছিলেন। একই কায়দায় এবং একই স্থানে ২৫শে জানুয়ারিতে মুসলিম লীগের জনসভায় তারা আহত করেছিল দলের নেতা ফজলুর কাদের চৌধুরিসহ বহু নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষকে। দুইটি জনসভাতেই হামলার দৃশ্য আমি স্বচক্ষে দেখেছি। আরো লক্ষ্যনীয় হল, সে সময়ের মিডিয়ার ভূমিকা। ১৮ই জানুয়ারীর জামায়াত আয়োজিত পল্টনের মিটিংয়ে যে হত্যাকান্ড অনুষ্ঠিত হল, পরের দিন দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ সে হত্যাকান্ডের জন্য দোষ চাপিয়েছিল জামায়াত কর্মীদের উপর। প্রথম পাতায় বিশাল খবর ছিল,”সমবেত জনতার উপর জামায়াত কর্মীদের হামলা”এরূপ মিথ্যা শিরোনামে। একটি দেশের পত্র-পত্রিকা যে কতটুকু সত্য বিবর্জিত হতে পারে এ হল তার নমুনা।


নির্বাচনে বিজয়ের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা যখন বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের খন্ডিত করণে অস্ত্র ধরল এবং মুসলমানদের চিহ্নিত দুষমন ভারত যেখানে তার সর্বাত্মক সহায়তায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করল এবং অবশেষে যুদ্ধ শুরুও করল তখন ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের প্রতি অঙ্গিকারবদ্ধ তৌহিদী জনতা নীরব থাকতে পারেনি। স্বেচ্ছাসেবকের (উর্দু ভাষায় এর অর্থ হল রাজাকার) বেশে তারা পাকিস্তান বাঁচানোর লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। এরাই একাত্তরের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে অপর পক্ষ। সংখ্যায় অল্প হয়েও নিজেদের রক্ত দিয়ে সেকুলার জাতীয়তাবাদের সে প্রবল জোয়ার এবং ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের সে বিশাল হামলাকে সর্ব-সামর্থ দিয়ে রুখবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তা পারেনি। পাকিস্তানকে তারা শুধু পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পাঠান, বেলুচদের দেশ নয়, নিজেদের দেশও মনে করত। তাছাড়া তারাই ছিল পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পাঠান, বেলুচদের সম্মিলিত জনসংখ্যার চেয়ে অধিক। কোন দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কি সে দেশের সংখ্যালঘুদের থেকে আলাদা হয়? আলাদা হতে চায়নি ইসলামপন্থিরাও। কিন্তু এজন্য কি তাদের যুদ্ধাপরাধী বলা যায়? মুসলিম উম্মাহর শক্তিহানির লক্ষ্যে শত্রু-পক্ষ সব সময়ই মুসলিম দেশের অভ্যন্তরে সহযোগী মিত্র খুঁজে। এসব শত্রুরাই বিশেরও বেশী টুকরায় বিভক্ত করেছে অখন্ড আরবভূমিকে। পাকিস্তানও বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র হওয়ার কারণে শত্রুর টার্গেটে পরিণত হয় তার জন্মলগ্ন থেকে। একাজে ভারত কোন সুযোগই হাত ছাড়া করেনি। সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ কাশ্মির এবং মুসলিম শাসিত গোয়া, মানভাদর ও হায়দারাবাদের নিজামের দাক্ষিণাত্য দখলের পর ভারত চেষ্টা চালিয়ে আসছিল পূর্ব পাকিস্তান দখলেরও। কিন্তু বহু ষড়যন্ত্রের পরও সফলতা মিলছিল না। সফলতা মিলেনি ১৯৬৫ সালে পরিচালিত প্রকান্ড যুদ্ধেও। এরপর সামরিক আগ্রাসন পরিকল্পনার পাশাপাশি ভারত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে শত শত কোটি টাকার বিণিয়োগ করে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে। এতে তাদের মুনাফাও মেলে প্রচুর। পাকিস্তানের এবং সে সাথে মুসলিম উম্মাহর শক্তিহানি প্রকল্পে অতিশয় বিশ্বস্ত ও সহযোগী রূপে তখন সমাদৃত হয়েছিল বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদি ও বামপন্থি দলের নেতাকর্মীগণ। ফলে মুজিবের মত যারা একদিন ”লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” বলে কোলকাতার রাস্তায় লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন তারাই পাকিস্তান ভাঙ্গতে ভারতীয় গোয়েন্দাদের আগড়তলা ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত হয়। লক্ষণীয় হল, শেখ মুজিব ও তার সহযোগিরা পাকিস্তান আমলে তাদের বিরুদ্ধে আনীত এ ষড়যন্ত্রে জড়িত হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করলেও বাংলাদেশ সৃষ্টির পর এটিকে নিজেদের জন্য অহংকার রূপে জাহির করেন। পাকিস্তান ভাঙ্গার সে ষড়যন্ত্রকে প্রচার করেন দেশপ্রেম রূপে। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলার এক আসামী আব্দুর রউফ ভৈরবে তার সম্মানে আয়োজিত এক সমাবেশে বলেছিলেন, “..দেশ ও জনগণের প্রতি ভালবাসার টানেই আমি জড়িয়ে পড়েছিলাম স্বাধীন বাংলা আন্দোলনে।”-(আব্দুর রউফ, ১৯৯২)


তাই বাংলাদেশের সৃষ্টিকে যারা ইয়াহিয়া খানের ভূল ও পাকিস্তান আর্মির নির্যাতনের কারণে হয়েছে বলেন তারা সঠিক বলেন না। এ ষড়যন্ত্রের শুরু তাই বহু পূর্ব থেকেই এবং সে প্রমাণ প্রচুর। প্রমাণ এসেছে এমনকি আওয়ামী লীগ নেতা জনাব আব্দুর রাজ্জাকের বক্তব্য থেকেও। আওয়ামী লীগ নেতা জনাব আব্দুর রাজ্জাক ১৯৮৭ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক মেঘনা পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে বলেন,

“আগেই বলেছি আমরা বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট করেছিলাম। (নেতৃত্বে সিরাজুল আলম খান ও কাজী আরেফ আহমেদও ছিল) ...বঙ্গবন্ধুকে বলি ..আমাদের প্রস্তুতির জন্য ভারতের সাথে যোগাযোগ থাকা চাই। ...আমাকে তিনি একটা ঠিকানা দিলেন। বললেন, “এই ঠিকানায় তুই যোগযোগ করবি।” তিনি তখনই আমাদের বললেন ভারতের সাথে তার একটা লিংক আপ আগে থেকেই ছিল- ১৯৬৬ সাল থেকে। “তারা তোদের সব রকম সাহায্য করবে। তুই এই ঠিকানায় গিয়ে দেখা করবি।” তখন তিনি চিত্ত রঞ্জণ সুতারের সঙ্গে দেখা করতে বললেন।(এই সেই চিত্তরঞ্জন সুতোর যে বাংলাদেশ ভেঙ্গে স্বাধীন বঙ্গভূমি বানানোর আন্দোলনের নেতা।) বললেন, “তোরা শিগগিরই একটি ট্রান্সমিশন বেতার কেন্দ্র পাবি। সেটা কোথা থেকে কার মাধ্যমে পাওয়া যাবে তাও বলে দিলেন।”(সাপ্তাহিক মেঘনা,৪/০২/৮৭, পৃষ্ঠা ১৮)


ফলে সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়টি হঠাৎ ২৫শে মার্চ সামনে আসেনি। শেখ মুজিব ভারতীয় সাহায্য ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি পাকাপোক্ত করেছিলেন অনেক আগেই। আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলায় তো সে অভিযোগইতো আনা হয়েছিল। অথচ সে অভিযোগকে তিনি মিথ্যা বলেছিলেন। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছেন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে। আব্দুর রাজ্জাকের এ সাক্ষাতকারের পরও কি বুঝতে বাকি থাকে, কে ছিলেন মিথ্যাবাদী ও ষড়যন্ত্রকারী? মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কবলে পড়ে আজ খন্ডিত হতে যাচ্ছে ইরাক। কোন মুসলমান কি সেটি সমর্থন করতে পারে? পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ উঠে পড়ে লেগেছে আফ্রিকার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র সূদানকে খন্ডিত করার কাজে। সেটিও কি কোন মুসলমান সমর্থন করতে পারে? এমন কাজে সমর্থন দিলে কি তার ঈমান থাকে? মুসলমানের ঈমান শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতে প্রকাশ পায় না। সেটির প্রবল প্রকাশ ঘটে তার রাজনীতিতেও।


মুনাফেকি নামাযে লুকানো যায়, কিন্তু লুকানো যায় না রাজনীতিতে। কারণ এখানে ধরা পড়ে সে কার মিত্র, এবং কে তার পিছনে অর্থ বিণিয়োগ করছে। যেমন নবীজীর (সাঃ) আমলে আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের মুনাফেকি ধরা পড়েছিল তার রাজনীতিতে। ইসলামের উত্থান রুখতে সে মক্কার কাফেরদের সাথে চুক্তি করেছিল। নবীজীর (সা) পিছনে নামায পড়েও মুনাফিক হওয়ার এ কলংক থেকে সে রক্ষা পায়নি। ব্যক্তি বা দলের চেয়ে দেশ বড়। ফলে বলা যায়, একাত্তরে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের শাসনক্ষমতায় না গেলেও মুসলমানদের তেমন কোন ক্ষতি হত না। বরং শেখ মুজিব বাংলাদেশের জন্য যে ভিক্ষার ঝুলির অপবাদটি অর্জন করেছিলেন সেটি হয়তো অর্জন করতেন পাকিস্তানের জন্যও। মায়ানমারের নির্বাচনে জিতেও আং সান সুকির দল ক্ষমতায় যেতে পারেনি। কিন্তু সে জন্য কি তারা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে? যুদ্ধ শুরু হলে মায়ানমারের অবস্থা কেমন হত? একটি দেশ ভাঙ্গা শুধু ইসলামেই নিষিদ্ধ নয়, নিষিদ্ধ এমনকি আন্তর্জাতিক আইনেই। এজন্যই ভারতের হামলার পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যে অধিবেশন হয় সে অধিবেশনে ১০৪টি রাষ্ট্র পাকিস্তানের অখন্ডতা ও সংহতির পক্ষ্যে ভোট দেয়। মাত্র ১০টি রাষ্ট্র বিরোধীতা করে। কোন মুসলিম রাষ্ট্রই পাকিস্তানের বিভক্তির পক্ষে ভোট দেয়নি। বাংলাদেশের সৃষ্টির পরও কোন মুসলিম রাষ্ট্রই বাংলাদেশকে প্রথমে স্বীকৃতি দেয়নি। দিয়েছিল ভারত, ভূটান, রাশিয়া। সাধারণ মুসলমানের ইসলামি চেতনা থেকে ভয় পেত শেখ মুজিব নিজেও। কারণ সে চেতনার অতি প্রবল রূপ তিনি দেখেছিলেন চল্লিশের দশকে পাকিস্তান আন্দোলন চলা কালে। ফলে জেনে শুনেই পাকিস্তান ভাঙ্গার গোপন বিষয়টিকে তিনি নির্বাচনি ইস্যূতে পরিণত করেননি। জনগণ যে এমন কাজকে সমর্থণ করবে না সে বিশ্বাস সম্ভবতঃ তার ছিল। ফলে ১৯৭০এর নির্বাচনী জনসভায় তিনি পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি তুলেছিলেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্দানে আয়োজিত নির্বাচনি জনসভায় তিনি বলেছিলেন,

“আমাকে বলা হয় আমি নাকি পাকিস্তান ভাঙতে চাই। আপনারা জোরকন্ঠে এমন পাকিস্তান জিন্দাবাদ আওয়াজ তুলুন যাতে পিন্ডির শাসকদের কানে পৌঁছে যায়।”

অথচ তিনি পাকিস্তান ভাঙ্গার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন ১৯৪৭ থেকেই, যা তিনি পাকিস্তানের জেলখানা থেকে ফিরে এসে সোহরোওয়ার্দি উদ্দ্যানে আয়োজিত প্রথম জনসভাতে বলেছিলেন। ১৯৭০এ নির্বাচনী বিজয়ের পর আওয়ামী লীগের বিজয়কে তিনি পাকিস্তান ভাঙ্গা ও বাংলাদেশ সৃষ্টির পক্ষে রায় বলে চালিয়ে দেন। অথচ ভোটযুদ্ধে এটি কোন আলোচিত বিষয়ই ছিল না। জনগণের সাথে এটি ছিল আরেক প্রতারণা। নির্বাচনে বিজয়ের পর তিনি হাইজ্যাক করে নেন জনগণের রায়কে। ভোটের মাধ্যমে জনগণ যা বলেনি,যে বিষয়টি নেতার মুখ থেকে একটি বারও শুনেনি সেটিই জনগণের রায় বলে চালিয়ে দেওয়া হল। বাংলাদেশের বু্দ্ধিজীবীদের ব্যর্থতা, এ মিথ্যাচার নিয়ে কোন রূপ চ্যালেঞ্জই করেনি। বরং তারা পরিণত হয়েছে হিজ মাস্টার্স ভয়েসে। সে সময় এমন কোন ইসলামি দল ছিলই না যা পাকিস্তানের পক্ষ নেয়নি। যুবকেরা যেমন মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিয়েছে তেমনি পাকিস্তানের পক্ষও নিয়েছে। বহু সাধারণ মানুষ, মুসলিম ও জামায়াত কর্মী, মাদ্রাসার ছাত্র, অন্যান্য পাকিস্তানপন্থি দলের রাজনৈতিক কর্মী ও সমর্থক সেদিন অস্ত্র হাতে দেশের অফিস, রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট পাহারা দিয়েছে। বহু হাজার নিহতও হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতি তাদের অঙ্গিকার এতই অটল ছিল যে ভারতীয় বাহিনীর বিজয়ের পর হাত-পা বেঁধে তাদের উপর অকথ্য নির্যাতন করা হয়েছে এবং জয়বাংলা শ্লোগান বলতে বলা হয়েছে, জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে তাদের গায়ে জয়বাংলা লেখা হয়েছে, কিন্তু তারপরও সে শ্লোগান তারা উচ্চারণ করেনি। কালেমা শাহাদত পড়তে পড়তে তার মুক্তিবাহিনীর বেয়নেট চার্জে নিহত হয়েছে। ১৬ই ডিসেম্বর পাক বাহিনীর আত্মসমর্পনের পরও কিশোরগঞ্জের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আতাহার আলী ও তার হাজার হাজার সমর্থক পাকিস্তানের পতাকা নামাতে অস্বীকার করেছিলেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণকে তিনি হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন। ইসলামে চেতনাসমৃদ্ধ প্রতিটি ব্যক্তিদেরকে স্যেকুলার রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীগণ আজও যে কারণে রাজাকার বলে তা তো সে অভিজ্ঞতা থেকেই। কারণ তারা নিজেরাও ভাবতে পারে না, ইসলামি চেতনাসমৃদ্ধ কোন ব্যক্তি পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির সমর্থক হবে। বাংলাদেশের সৃষ্টি যে নিছক সেকুলার প্রজেক্ট, সেটি তারা নিজেরাও বুঝে।

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites