Home EBooks ৭১এর আত্মঘাতের ইতিহাস অধ্যায় ১৪: একাত্তরে মুক্তি বাহিনীর প্রকৃত সফলতা কতটুক?

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ১৪: একাত্তরে মুক্তি বাহিনীর প্রকৃত সফলতা কতটুক? Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 19 October 2008 19:10
বহু ভিত্তিহীন মিথ্যার পাশাপাশি বাংলাদেশের ইতিহাস রচনায় আরেক মিথ্যাচার হয়েছে মুক্তিবাহিনীর অবদান নিয়ে। এ নিয়ে কোন বিরোধ নেই যে, মুক্তিবাহিনীর বহু হাজার সদস্য ভারতে গিয়েছিল এবং সেখানে গিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও গুপ্তচর সংস্থা র’এর প্রশিক্ষকদের থেকে ট্রেনিং নিয়েছিল। ট্রেনিং শেষে বাংলাদেশের ভিতরে তারা বহু লড়াই এবং বহু নাশকতা তৎপরতাও চালিয়েছে। এ নিয়েও বিরোধ নেই যে, আওয়ামী লীগের কর্মীদের নিয়ে স্বাধীন বাংলা মুক্তিফৌজ নামে একটি গুপ্ত সংগঠন ষাটের দশক থেকেই ভারতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। তারা বিভিন্ন স্থানে গুপ্ত হামলা চালিয়েছিল এবং এসব হামলায় অনেকে প্রাণও হারিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের পরাজয় ও বাংলাদেশের সৃষ্টিতে তাদের ভূমিকা কতটুকু? মুক্তিবাহিনীর দাবী, স্বাধীন বাংলাদেশ তাদেরই সৃষ্টি। এ যুক্তিতে ভারতের ভূমিকাকে পাদটিকায় পাঠানো হয়েছে। এ কথাটি প্রমাণের চেষ্টা হয়েছে স্কুলের পাঠ্যপুস্তকেও। স্কুলের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি প্রতি বছর এ কথাটিই তারা বার বার বলে ১৬ই ডিসেম্বরে। এ কথা বলে, নিছক নিজেদের ভাবমূর্তিটাকে বড় করে তুলে ধরার লক্ষ্যে। এটি সত্য যে, মুক্তিবাহিনী যুদ্ধ করেছিল ৯ মাস। এ ৯ মাসে ভারত তাদের সর্বাত্মক সামরিক ও বেসামরিক সরবরাহ জুগিয়েছিল।

তবে এটিও পুরাপুরি সত্য, মুক্তিবাহিনীর ৯ মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীর পরাজয় হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশেরও সৃষ্টিও হয়নি। কোন একটি জেলা শহর থেকেও পাক বাহিনীকে হটানো যায়নি। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের কোথাও এ সত্যটির উল্লেখ নেই। ভারত সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করে ১৯৭১-এর ৩রা ডিসেম্বর। ভারতের বিশাল স্থল, বিমান ও নৌবাহিনী এ যুদ্ধ করে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে। তাদের বহু হাজার সৈন্য এ যুদ্ধে হতাহতও হয়। যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৬ই ডিসেম্বর, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। কথা হল,মুক্তিযোদ্ধাদের ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যদি অর্জিত হয়েই থাকে তবে ভারতের বিশাল বাহিনী তাদের স্থল, বিমান ও স্থলবাহিনী নিয়ে কি পাক বাহিনীর সাথে খামখা তামাশা করার জন্য ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিল? বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর হাতে স্বাধীন হয়ে গেলে যুদ্ধ-ঘোষণার প্রয়োজনটাই বা দেখা দিবে কেন? আরো প্রশ্ন, ৩রা ডিসেম্বরে যুদ্ধ শুরুর পূর্বে সমগ্র বাংলাদেশ দূরে থাক, তৎকালীন ১৭টি জেলার একটি জেলাও কি মুক্তিবাহিনী পাকিস্তান সেনা বাহিনী থেকে মুক্ত করতে পেরেছিল? তারা যদি মুক্ত করেই থাকে তবে সে জেলা কোনটি?


প্রশ্ন হল, ভারতীয় বুদ্ধিজীবী ও ইতিহাসবেত্তাগণও কী একাত্তর নিয়ে একই রূপ ভাবেন, যেভাবে বাংলাদেশের ইতিহাস বইতে পড়ানো হয় বা আওয়ামী-বাকশালী লীগ যেভাবে দাবী করে থাকেন? এ প্রসঙ্গে ভারতীয়দের রায় যে ভিন্নতর সে প্রমাণ অনেক। উদাহরণ দেওয়া যাক। একাত্তরের যুদ্ধে ভারতীয় সেনা বাহিনীর প্রধান ছিলেন জেনারেল ম্যানেক শ’। তিনি মারা যান ২০০৮ সালের আগষ্ট মাসে। তার মৃত্যু উপলক্ষে ২৭/০৮/০৮ তারিখে প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। উক্ত নিবন্ধের শিরোনাম ছিলঃ Manek Shaw: A Soldier Who Created a Nation, অর্থঃ ম্যানেক শঃ একজন সৈনিক যিনি একটি জাতির জন্ম দিয়েছেন।

ভারত জুড়ে এটি ছাপা হয়েছে। সারা দুনিয়ার মানুষ সেটি ইন্টারনেট মারফত পড়েছে। এর অর্থ দাঁড়ালো কি? এ নিবন্ধে বুঝানো হয়েছে, বাংলাদেশে যে নতুন জাতিসত্ত্বার সৃষ্টি হয়েছে তার জন্ম দিয়েছেন জেনারেল ম্যানেক শ’। এখানে কোন ঘোরপ্যাঁচের আশ্রয় নেয়া হয়নি। এই একটি মাত্র নিবন্ধই একটি প্রবল বিশ্বাস ও চেতনা তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট। এ নিবন্ধটি প্রচার করা হয়েছে কোন ব্যক্তি বা অখ্যাত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নয়, বরং প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার ন্যায় একটি খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান থেকে। যারা বলে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে, তাদের মাথায় এতে বাজ পড়ার কথা। কিন্তু সেটি হয় নি। আওয়ামী বাকশালীরা এতে একটুও বিক্ষুব্ধ হয়নি,বরং নীরবে হজম করেছে। তাদের আত্ম-সম্মানে এতে একটু আঁচড়ও লাগেনি। এ নিবন্ধের বিরুদ্ধে কোনরুপ প্রতিবাদও করেনি। প্রশ্ন হল, একাত্তরে মুক্তি বাহিনীর প্রকৃত সফলতা কতটুক? তাদের সামর্থই বা ছিল কতটুকু? তাদের কি সামর্থ ছিল, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে পরাজিত করার? কেনই বা ভারতীয় বাহিনীর সরাসরি যুদ্ধে নামার প্রয়োজন দেখা দিল?


ভারতীয় বাহিনীর যুদ্ধে নামার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়, পাক-বাহিনীর পরাজিত করার সামর্থ মুক্তি-বাহিনীর ছিল না। পাক-বাহিনীর পরাজয় শুরু হয়েছে ৩রা ডিসেম্বরে ভারতীয় স্থল, বিমান ও নৌ-হামলা শুরুর পর। আফগানিস্তান, ভিয়েতনাম ও আলজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধ থেকে এখানেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বড় পার্থক্য। ভিয়েতনামের মুক্তিযোদ্ধারা বিশ্বের এক নম্বর বিশ্ব-শক্তিকে পরাজিত করেছিল। অন্যরা সাহায্য দিলেও এ যুদ্ধে কোন দেশের সরাসরি যুদ্ধে নামার প্রয়োজন পড়েনি -যেমনটি একাত্তরে ভারত নেমিছিল। আফগানিস্তানের মোজাহিদরা আরেক বিশ্বশক্তি সোভিয়েত রাশিয়াকে শুধু পরাজিতই করেনি, দেশটিকে ১০ বছরের যুদ্ধে এতটাই কাহিল করেছিল যে তার পক্ষে বেঁচে থাকাই অসম্ভব হয়েছিল। সে পরাজয়ের পর বিশ্বের মানচিত্র থেকে বিলুপ্ত হয়েছিল সোভিয়েত রাশিয়া। সে মৃত দেশটি থেকে জন্ম নিয়েছে ডজন খানেক স্বাধীন দেশ। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ভিয়েতনামের প্রায় দ্বিগুণ, আর আফগানিস্তানের তুলনায় চারগুণ। তা হলে, পাক-বাহিনী কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়ার সেনাবাহিনীর চেয়েও শক্তিশালী ছিল? অথচ সে সময় বাংলাদেশে মাত্র ৯০ হাজার পাকিস্তানী সৈন্য ছিল। অথচ আফগানিস্তানে সোভিয়েত সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লাখ। বাংলাদেশে পাক বাহিনীর যে অস্ত্র ছিল আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর অস্ত্র ছিল তার চেয়ে অনেক বেশী ও অনেক উন্নত। পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তি বাহিনীর বিজয় যে অসম্ভব, সে বিষয়টি বুঝতে ভারত সরকারের বেশী দিন লাগেনি। মুক্তিবাহিনীর সদস্যগণ রেলপথ ও সড়কপথের ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়া বা গ্রামের নিরস্ত্র ও প্রতিরক্ষাহীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামি, পিডিপি ও শান্তিকমিটির সদস্য, পাকিস্তানপন্থি আলেম ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে সমর্থ হলেও পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে তেমন কোন সফলতা আনতে পারেনি। তাছাড়া একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র ভারত, সোভিয়েত রাশিয়া ও কিছু অমুসলিম রাষ্ট্র ছাড়া কোন মুসলিম রাষ্ট্রই পাকিস্তানের অখন্ডতার বিরুদ্ধে ভারত পরিচালিত যুদ্ধকে সমর্থণ দেয়নি। পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল, দেশের সমগ্র ইসলামি সংগঠন ও সকল ইসলামি ব্যক্তিত্ব। আলেমরা ইসলামের নামে অর্জিত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে হারাম ঘোষণা দেয়। আর পাকিস্তানের পক্ষের যুদ্ধকে বলে জ্বিহাদ। ফলে হাজার হাজার বাঙ্গালী যুবক রাজাকার রূপে পাকিস্তান বাঁচানোর লড়াইয়ে যোগ দেয়। রাজাকার শব্দটি মূলতঃ ফারসী, এর অর্থ স্বেচ্ছাসেবক। এ বাহিনীতে তারা যোগ দিয়েছিল আধিপত্যবাদী ভারতীয় ষড়যন্ত্র থেকে পাকিস্তানকে বাঁচানোর তাগিদে, বেতনের লোভে নয়। এমন একজন রাজাকারের পিতার সাথে লেখকের সাক্ষাৎ হয়েছিল চাঁদপুরে। মাথায় টুপি, লুঙ্গি-পাঞ্জাবী পরিহিত মধ্যম বয়সী একজন সাধারণ মুসল্লি বলছিলেন, 'আমার এক ছেলে রাজাকার ছিল। সে শহীদ হয়ে গেছে। আরেক ছেলে আছে। তাঁকেও ইনশাল্লাহ রাজাকারে নাম লেখাবো’ তাঁর ছেলে যে রাজাকার ছিল এবং সে শহীদ হয়ে গেছে এটি ছিল তাঁর জন্য গর্বের। মুক্তিবাহিনী চারিদিকে পরাস্ত হচ্ছিল এদের হাতে। লক্ষাধিক যুবক রাজাকার ও আলবদর বাহিনীতে লাগাতর নাম লেখাচ্ছিল। আলিয়া ও খারেজী মাদ্রাসার ছাত্রদের পাশে যোগ দিচ্ছিল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, পীর সাহেবদের মুরীদ এবং অরাজনৈতিক অথচ ধর্মীয় পরিবারের সদস্য। সবাই উজ্জিবীত ছিল প্যান-ইসলামি চেতনায়। একাত্তরের সংঘাত তখন সুস্পষ্ট এক আদর্শিক সংঘাতে পরিণত হয়েছিল। সত্তরের নির্বাচনে ইসলামপন্থি ও পাকিস্তানপন্থিদলগুলোর শোচনীয় পরাজয়ের বড় কারণ, তাদের মধ্যে একতা ছিল না। ফলে সে সময়ে বহু পাকিস্তানপন্থি দিকপালও পরাজিত হয়। আব্দুস সবুর খান একাত্তরের পর খুলনা জেলার তিন সিট থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। অথচ মুজিব সরকার তাঁকে কারারুদ্ধ করেছিল, কত কুৎসিত ভাবেই না তাঁকে চিত্রিত করেছিল! কিন্তু অনৈক্যের কারণে আব্দুস সবুর খান ৭০-এর নির্বাচনে জিততে পারেননি। একাত্তরে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন অনৈক্যও দূর হয়। ভারতীয় হামলা যে বাঙ্গালী মুসলমানের জন্য আসন্ন ভয়াবহ বিপদ নিয়ে আসবে তাতে তাদের সামান্যতম সংশয়ও ছিল না। এমন কি সে পরিণতির কথা মুজিবকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর এক সময়ের রাজনৈতিক গুরু জনাব আবুল হাশিম। জনাব আবুল হাশিম ছিলেন ১৯৪৭ সালে মুসলিম লীগের বাংলা প্রদেশ শাখার সেক্রেটারি। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় শেখ মুজিব জনাব আবুল হাশিমের সংস্পর্শে আসেন।


সত্তরের নির্বাচনে মুজিবের বিজয়ের পর জনাব আবুল হাশিম তাঁকে কি বলেছিলেছেন সে বিবরণ শোনা যাক একজন প্রত্যক্ষদর্শী থেকে। “নির্বাচনের পর পরই আমি আবুল হাশিমের বাসায় বসা। হঠাৎ দেখি মুজিব এবং জহিরুদ্দীন (আওয়ামী লীগের নেতা ও ১৯৭০ এর নির্বাচনে মোহম্মদপুর-ধানমন্ডি এলাকা থেকে নির্বাচিত এমএনএ) হাশিম সাহেবের সাথে দেখা করতে এসেছেন। বোধ হয় নির্বাচন জিতে সৌজন্য সাক্ষাত করতে এসেছিলেন তাঁরা। হাশিম সাহেব বললেন, মুজিব আমি শুনেছি কাইয়ুম ও দৌলতানার মুসলিম লীগ তোমাকে ভূট্টোর বিরুদ্ধে সমর্থন দিতে রাজি হয়েছে। খেলার মাঠে ভাল দল কখনও মারা মারি করে না। ...তোমার প্রতি আমার অনুরোধ তুমি প্রোভোকেশনে যাবে না। আমি দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছি। আমি জানি তোমাকে অসৎ পরামর্শ দেয়ার লোকের অভাব নেই। আশাকরি তুমি সেটা থেকে দূরে থাকবে। তুমি তো জানো আমি (পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান থেকে) এখানে এসেছি সর্বহারা মুহাজির হয়ে। পশ্চিম বঙ্গে আমার সবই ছিল। ওখানে থাকতে পারিনি। আমার আত্মীয়-স্বজনেরাও ওখানে অনেকে আছে। যতদূর জানি তাদের অবস্থা ভাল না। তুমি নিজেও পাকিস্তান আন্দোলন করেছ। হয়তো পাকিস্তান পেয়েও আমাদের অনেকের অনেক স্বপ্ন বাস্তবায়ীত হয়নি। তা সত্ত্বে এ দেশ আমারাই তৈরি করেছি। আমাদের সকলের প্রচেষ্টায় এটা আরো সুন্দর হবে”। -(ইব্রাহিম হোসেন, ২০০৩)।


কিন্তু যে ব্যক্তি পাকিস্তান ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র করছেন ১৯৪৭ সাল থেকেই এবং বহু বছর আগেই জড়িত পড়েছেন ভারতীয় র’এর সাথে তার উপর জনাব আবুল হাশিমের মুরব্বী সুলভ নসিহত কোন কাজই দেয়নি। জনাব আবুল হাশিম সাহেবের মনে ভারতীয় ষড়যন্ত্র নিয়ে যে প্রচন্ড আশংকা ছিল, একাত্তরের পর যেটি প্রমাণিতও হয়েছিল - সেটি ইসলামি চেতনা সম্পন্ন প্রতিটি ব্যক্তির মধ্যেই কাজ করছিল। ফলে ৭০এ যে ঐক্য তাদের মধ্যে অসম্ভব ছিল সেটি ৭১-য়ে অতি সহজসাধ্য হয়। এমনকি বহু আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মী ভারতীয় ষড়যন্ত্রের বিপদ বুঝতে পারে। ভারতে অবস্থানকালে সেখানকার নিপীড়িত মুসলমানদের থেকে পাকিস্তান ভাঙ্গার সাথে জড়িত থাকার কারণে তাদের অনেকে তিরস্কৃত হয়েছেন। অনেকে বীরূপ অভিজ্ঞতা নিয়ে ভারত থেকে ফিরেও আসে। আরো অনেকে ফিরে আসার প্রস্ততিও নিচ্ছিল। কেউ কেউ ডাঃ মালেক মন্ত্রীসভার মন্ত্রীও হয়। মোশতাক আহম্মদসহ অনেকে ভারত থেকে ফিরে আসার পরিকল্পনা করছিল। চীনপন্থি রাজনৈতিক দলগুলিরও অনেকে পাকিস্তান ভাঙ্গার ভারতীয় ষড়যন্ত্রের বিরোধীতা শুরু করে। পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির আওয়ামী-বাকশালীদের পরিকল্পনার এরা এতটাই বিরোধী ছিল যে, ৭১-এর পরও নিজদের দলের নাম পূর্ব পাকিস্তানের কম্যুনিষ্ট পার্টি রাখে। অপর দিকে মুক্তি বাহিনীর মধ্যেও দ্রুত হতাশা বাড়ছিল। একাত্তরে দেশে প্রচন্ড বন্যা হয়েছিল। এতে জুন-জুলাই-আগষ্ট-সেপ্টেম্বর মাস অবধি মুক্তিবাহিনীর যথেষ্ট সুবিধা হয়েছিল। হামলার পর মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা সহজেই বিল, হাওর ও নদীর চরে আশ্রয় নিতে পারত। কিন্তু অক্টোবর-নভেম্বরে পানি নেমে যাওয়ায় তাদের বিপদ বাড়ছিল। ফলে চরম হতাশা নেমে আসছিল মুক্তিবাহিনীর মধ্যে। সে সময়ের হতাশা নিয়ে মুক্তিবাহিনীর পাবনা সদর থানার এক সদস্য লেখককে বলেছিলেন,

“একাত্তরের বন্যার সময় আমরা নৌকা নিয়ে থাকতাম পদ্মার চরে। চারিদিকে পানি আর পানি। সেখানে রাজাকার বা পাক-বাহিনীর পক্ষে পৌঁছা সম্ভব ছিল না। কিন্তু নভেম্বরে যখন পানি নেমে যেতে লাগল তখন আমাদেরও বিপদ বাড়তে লাগল। ঘন ঘন রাজাকারদের হামলা শুরু হল। কতদিন আর পালিয়ে পালিয়ে থাকা যায়? দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল। আর কোন দিন বাড়ীতে ফিরতে পারবো কিনা সে দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম হত না। ডিসেম্বরে ভারতের হামলা শেষ রক্ষা করেছে”।


ভারতের বুঝতে বাঁকী থাকেনি, ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের মোক্ষম সুযোগটি দ্রুত হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ভারতের পক্ষ থেকে সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর এটিই মূল কারণ। ভারতের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বড় কথা ছিল না। মূল লক্ষ্য ছিল, পাকিস্তানকে দ্বিখন্ডিত করে শক্তিহানী করা। কারণ শেখ মুজিব যাই বলুক না কেন, ভারত ভালই জানত, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ যে স্বাধীনতা ভোগ করে তা ভারতের পশ্চিম বাংলার মানুষ ভোগ করে না। এটিও জানত, ১৯৪৭-এর পর ঢাকায় যে উন্নয়ন হয়েছে তা কোলকাতার মানুষ চোখেও দেখেনি। কোলকাতায় যা হয়েছে তা ১৯৪৭-এর পূর্বে। কারণ, ১৯১১ সাল অবধি এ শহরটি সমগ্র ভারতের রাজধানী ছিল। ভারতের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানকে দূর্বল করা ছিল না। মূল লক্ষ্য ছিল, উপমহাদেশের মুসলিম শক্তিকে দুর্বল করা।
ভারতের লক্ষ্য যদি স্বাধীন ও শক্তিশালী বাংলাদেশের নির্মাণ হত, তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাদবাকী অস্ত্র-শস্ত্র, যানবাহন ও সম্পাদ নিজেরা না নিয়ে বাংলাদেশে রেখে যেত। কিন্ত ভারত তা করেনি। দরিদ্র বাংলাদেশীদের সুখ-শান্তি তাদের কাম্য হলে হাজারো মাইল ব্যাপী সীমান্ত খুলে দিয়ে সীমাহীন লুন্ঠন করত না। জাল নোট ছেপে পঙ্গু করত না বাংলাদেশের অর্থনীতি। তারা শুধু পাকিস্তানের মেরুদন্ডই ভাঙ্গেনি, মেরুদন্ড ভেঙ্গেছে বাংলাদেশেরও। বাংলাদেশ যে তলাহীন ঝুড়িতে পরিণত হয়েছিল তার জন্য শুধু শেখ মুজিব ও তার দলীয় দুর্বৃত্তরাই শুধু দায়ী নয়। দায়ী ভারতীয় দুর্বৃ্ত্তরাও । একটি দেশের তলা হল তার সীমান্ত। সেটি দেশের সম্পদ চোরাচালানের মারফত হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। তাই তলা ছিদ্র হলে বা খুলে যাওয়াতে লাভ হয় প্রতিবেশীর, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটি হলে সম্পদ গিয়ে উঠে ভারতে। আর মুজিবামলে বস্তুতঃ সেটিই ঘটেছে। দেশের ও বিদেশের দেওয়া সম্পদ তখন বাংলাদেশের নিজ ভান্ডারে না দাঁড়িয়ে সরাসরি গেছে ভারতে। বিপুল ভাবে যায় খাদ্যশস্য, ফলে ৭৪-এ বহু লক্ষ মারা গেছে দুর্ভিক্ষে। অপরদিকে যুদ্ধ শুরু করার মধ্য দিয়ে তারা পুরা দেশ জুড়ে লুটপাটের অবাধ অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। দীর্ঘ দিন দেশ ছিল তাদের দ্বারা অধিকৃত। পুরাদেশটাকে তারা মনে করে যুদ্ধজয়ের পুরস্কার। ভারতীয় সেনাবাহিনী দেশের সর্বত্র গেছে ইচ্ছামত। ব্যাংক-বীমা, সরকারি গুদাম ও অফিস-আদালত, সেনানিবাস, কলকারখানা সর্বত্র ছিল তাদের মূক্ত পদচারণা। খুঁজে খুঁজে তারা তুলে নিয়ে যায় বাংলাদেশের দামী সম্পদ যা পাকিস্তানে আমলের ২৩ বছরে জমা হয়েছিল। ভারতের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করার আরেক কারণ তো এটিই। এটি ছিল এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের মত অবস্থা। পাকিস্তানকেও যেমন খন্ডিত করতে পারল, তেমনি সম্পদ লুন্ঠনেরও অধিকার পেল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র-শস্ত্রই শুধু নিয়ে যায়নি, নিয়ে গেছে তৎকালীন সরকারের হাজার হাজার সামরিক-বেসামরিক গাড়ী, রেলগাড়ীর ইঞ্জিন ও বগি, সামুদ্রিক জাহাজ এবং ব্যাংকে গচ্ছিত বৈদেশিক মুদ্রা। এমনকি সরকারী অফিস, সেনাবাহিনীর মেস এবং সরকারি রেস্ট হাউস থেকে তারা ফ্যান, ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার পর্যন্ত খুলে নিয়ে যায়। লুন্ঠনের ফল দাড়ালো, একাত্তরের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে কোন ট্যাংক ছিল না এবং বিমান বাহিনীর হাতে কোন বিমানও ছিল না। লক্ষ্যণীয় যে, একাত্তরের ইতিহাস যারা লিখেছেন তারা এনিয়ে কিছুই লেখেননি। বরং দস্যুচরিত্রের ভারতকে চিত্রিত করেছে অকৃত্রিম বন্ধু রূপে।

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Comments  

 
0 # 2009-01-24 13:35
আসসালামু আলাইকুম। আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আপনার লেখাটা আমি পড়েছি। বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে আপনার এ ভুমিকা অবশ্যই প্রসংসার দাবী রাখে। আমি লেখা পাঠাতে চাই। আপনার অনুমতি পেলে ইনশাআল্লাহ পাঠাবো। আজাদ ছোবহান আহমাদ, জেদ্দা, সউদি আরব।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2010-01-21 12:53

It is a very good website for young generation. So I would like to thank the organizer.

Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh

 

Most Read