Home EBooks ৭১এর আত্মঘাতের ইতিহাস অধ্যায় ১৭: ভারতপন্থিরা কি স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি?

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ১৭: ভারতপন্থিরা কি স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি? Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 19 October 2008 19:33
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পিছনে যে আদর্শটি কাজ করেছিল সেটি ছিল প্যান-ইসলামিক চেতনা। সে চেতনার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল ছিল মুসলিম লীগের দ্বি-জাতি তত্ত্ব। যার মূল কথা হল, হিন্দু ও মুসলমান দু'টি পৃথক জাতি। ফলে তাদের জীবন ও জগত নিয়ে ভাবনা যেমন ভিন্ন, তেমনি ভিন্ন হল রাজনীতির মূল লক্ষ্য ও এজেন্ডা। তখন পেশোয়ার থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল উপমহাদেশে, মুসলমানদের সর্ববৃহৎ সংগঠন ছিল মুসলিম লীগ। তখন এ সংগঠনটির নেতাদের মাঝে স্থান পেয়েছিল মুসলমানের কল্যানচিন্তার এক প্রবল ভাবনা। সে ভাবনা নিয়ে সেদিন একতাবদ্ধ হয়েছিল বাঙ্গালী, বিহারী, পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পাঠান, গুজরাটি তথা নানা ভাষাভাষী ভারতীয় মুসলমানগণ। তারা বুঝতে পেরেছিল মুসলমানদের জন্য কল্যাণকর কিছু করতে হলে আলাদা দেশ চাই। সে লক্ষ্যে একতাও চাই। নইলে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সে সাথে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রসর হিন্দুদের সাথে প্রতিযোগিতা করে মুসলমানদের জন্য কল্যাণকর কিছু করা অসম্ভব। সে ধারণা অতি দ্রুত গ্রহনযোগ্যতা পায় অধিকাংশ ভারতীয় মুসলামানদের কাছে। এ ধারণা প্রবল ঝাঁকুনি দেয় ভারতীয় মুসলিম যুবকদের মনে।

এমন কি যারা নিশ্চিত ছিল যাদের ঘরবাড়ী ও ব্যবসা-বাণিজ্য কখনই পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্ত হবে না তারা পাকিস্তানের পক্ষে রাজপথে নেমেছিল। নিজেদের কল্যাণের চেয়ে তারা বেশী গুরুত্ব দিয়েছিল সর্ব-ভারতীয় এবং সে সাথে বিশ্ব-মুসলিমের কল্যাণ চিন্তা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তারা এ উপমহাদেশের বুকে নিজেদের এবং সে সাথে বিশ্ব-মুসলিমের নবজাগরনের স্বপ্ন দেখছিল। এক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলমান জনগোষ্ঠীর বাস ভারতে। ফলে তাদের চেতনালোকে অতি সক্রিয় ছিল বিশ্ব-মুসলিমের কল্যাণে কিছু করার প্রবল দায়িত্ববোধ। ইতিমধ্যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গের সম্মিলিত ষড়যন্ত্র, আগ্রাসী হামলা ও সে হামলার সাথে ইসলামে অঙ্গিকারহীন ক্ষমতালোভী মুসলিম নেতাদের সহযোগীতার কারণে মুসলিম বিশ্বের - বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের - বড়ই বিপন্ন দশা। তখন লুপ্ত হয়েছে খেলাফত, ২০-এর বেশী টুকরায় বিভক্ত হয়েছে আরব ভূ-খন্ড। ভারতীয়রা স্বপ্ন দেখছিল নিজেদের হৃত গৌরব ফিরে পাওয়ার। মুসলমানদের সে স্বপ্ন ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের ভাল লাগেনি। তারা ভিন্ন আরেকটি স্বপ্ন দেখছিল, সেটি ভারত জুড়ে রাম রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। সে আন্দোলনে বল্লব ভাই প্যাটেল, বাল গঙ্গাধর তিলকের ন্যায় চরমপন্থিদের সাথে একাত্ম হয়েছিলেন গান্ধী ও নেহেরুর নেতারাও। তারা শ্লোগান তুলেছিল অখন্ড ভারত মাতার স্বাধীনতার, প্রচার করছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের। অখন্ড স্বাধীন ভারত প্রতিষ্ঠার তারা স্বপ্ন দেখছিল একটি বিশ্ব-শক্তি রূপে ভারতের আবির্ভাবের। এমন প্রেক্ষাপটে মুসমানদের একতা, সে একতার বলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা মেনে নেওয়ার বিষয়টা ছিল তাদের কাছে অসহ্য। খেলাফতের বিলুপ্তি ও ইরাক-ফিলিস্তিনসহ আরব ভূমি জবরদখলের সমগ্র বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের মুসলিম স্বার্থবিরোধী ভূমিকার কথা তাদের অজানা ছিল না। তাই দক্ষিণ এশিয়ার বুকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা রুখতে তারা জোট বেধেছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের সাথে। কিন্তু তাদের সে সম্মিলিত কোয়ালিশনের বিরুদ্ধে ১৯৪৭-এ প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল পাকিস্তান। যদিও তারা দেশটিকে ভৌগলিক ভাবে দূর্বল করার কোন চেষ্টাই বাদ রাখেনি। তবে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান যখন প্রতিষ্ঠা পায় তখন পাকিস্তান-ভূক্ত প্রদেশগুলির সবাই যে এ নতুন দেশটির প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিল তা নয়। অনেকেই এ দেশটির প্রতিষ্ঠার বিরোধী ছিল শুরু থেকেই। প্রচন্ড বিরোধীতা করেছিল কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা, আরএসএস ও অন্যান্য হিন্দু ও সেকুলার সংগঠন। পাকিস্তানভূক্ত পূর্ব বাংলায় তাদের ছিল বহু হাজার রাজনৈতিক কর্মী। ছিল শত শত কবি-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী। ১৯৪৭ সালে তারা পরাজিত হয়েছিল বটে, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার বুকে অপ্রতিদ্বন্দ্বি শক্তি রূপে ভারত গড়ার স্বপ্ন বিলুপ্ত হয়নি। এ লক্ষ্য অর্জনে পাকিস্তানই ছিল প্রধান বাধা। তাই বিলুপ্ত হয়নি পাকিস্তানের ধ্বংস বা শক্তিহানীর ভাবনা। উপমহাদেশের মুসলিম শক্তির বিনাশ ভিন্ন সে লক্ষ্যে পৌঁছা তাদের জন্য অসম্ভব ছিল। সে লক্ষ্য-পূরণে ভারত শুধু ১৯৪৮ ও ১৯৬৫ সালেই পাকিস্তান সীমান্তে হামলা করে ক্ষান্ত দেয়নি। হামলা করেছে পাকিস্তানের মূল দর্শনেও।


রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও প্রতিরক্ষায় সবচেয়ে বড় সামর্থ জোগায় একটি দর্শন। একটি প্রবল দর্শনের কারণে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় তাই একটি তীরও ছুড়তে হয়নি। প্যান-ইসলামিক চেতনা ও সে চেতনাভিত্তিক দ্বি-জাতি তত্ত্বই সে কাজটি করে দেয়। কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান সরকার নিছক রাস্তাঘাট ও কলকারখানা গড়া গুরুত্ব দিয়েছে, কিন্তু পুঁজিবিণিয়োগ করেনি সে দর্শনকে আরো মজবুত করায়। সমুদ্র পাড়ী দেওয়াই যার কাজ, তার কাছে নৌকার গুরুত্ব প্রতিদিনের। সেটিকে নিয়মিত মেরামত করতে হয়। তাই পাকিস্তানের বেঁচে থাকার স্বার্থে দ্বি-জাতি তত্ত্ব, প্যান-ইসলামী চেতনার মজবুত গণভিত্তি অতি অপরিহার্য। কিন্তু বিষয়টি প্রচন্ড অবহেলার শিকার হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। উর্দু ভাষায় কিছু কাজ হলেও বাংলায় আদৌ হয়নি। ফলে পাকিস্তানের আদর্শিক মৃত্যু দ্রুত ঘনিয়ে আসতে থাকে পূর্ব পাকিস্তানে। প্রবল জোয়ারের টানে কচুরীপানার ন্যায় শিকড়হীন ও অগভীর শিকড়ের অনেক আগাছাই ভেসে আসে। তেমনি আন্দোলনের জোয়ারের ভেসে আসে দর্শনহীন অনেক সাধারন মানুষও। কিন্তু জোয়ারে ভাসা সে লোকগুলো মূল ধারায় বেশী দিন টিকে থাকে না। তাই ভাষানী, শেখ মুজিব, আবুল মনসুর আহমদ, আতাউর রহমান খানের মত অসংখ্য ব্যক্তি পাকিস্তানের প্যান-ইসলামী দর্শনের সাথে বেশী দিন থাকতে পারেনি। ‘ঝাঁকের কই ঝাঁকে মেশা’র ন্যায় তারা গিয়ে মিশেছেন ভারতীয় কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী সেকুলার দর্শনের সাথে। লিপ্ত হয়েছেন পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে। এজন্যই দেশ বাঁচাতে হলে জনমনে দর্শনের গভীরতা গড়তে হয় শিক্ষার মাধ্যমে। আর ইসলামি দর্শনের সে গভীরতা আসে পবিত্র কোরআন থেকে। সে কাজটিই পাকিস্তান সরকার করেনি। ফলে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রবল জোয়ারে যারা একদিন কচুরিপানার ন্যায় ভেসে এসেছিল তারাই আবার ভেসে যাওয়া শুরু করে সেকুলারিজম,সমাজবাদ ও জাতীয়তাবাদের ন্যায় নানা মতাদর্শের প্রবল স্রোতে। চিন্তা-চেতনার দিক দিয়ে শেখ মুজিব ও তার অনুসারীরা ছিলেন পুরাপুরি শিকড়হীন। ফলে খড়কুটোর মত উড়েছেন মতবাদের ঝড় যেদিকে যায় সেদিকেই। তাই কখনও মুসলিম লীগের সাথে ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তানে বলেছেন’, কখনও সোহরওয়ার্দীর সাথে মার্কিন শিবিরের দিকে ঝুঁকেছেন, আবার কখনও মস্কোপন্থিদের সাথে সমাজতন্ত্রের ঝান্ডা উঁচু করেছেন।


১৯৪৭-এর পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে সবচেয়ে বেশী বিণিয়োগ করে ভারত। তখন প্রাণ ফিরে পায় ভারতপন্থি বুদ্ধিজীবীরা। সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সাহিত্যের প্রবল প্লাবন নেমে আসে পূর্ব পাকিস্তানে। পূর্ব বাংলায় ১৯৪৭ সালের পূর্বে রবীন্দ্র সাহিত্যের এত চর্চা মুসলমানেদের মাঝে হয়নি। তার জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকীও এত পালিত হয়নি -যা পালিত হয়েছে ১৯৪৭ সালের পর। তখন দেশে প্লাবনের পানির ন্যায় ঢুকেছে মস্কো ও বেইজিং থেকে সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য। সে সাহিত্য বিভ্রান্ত করে বিপুল সংখ্যক বাঙালী যুবকদের। সে সাহিত্য তাদেরকে প্রচন্ড ইসলাম বিরোধী এবং সেসাথে পাকিস্তান বিরোধীও করে তোলে। তখন চলছিল বিশ্ব ব্যাপী পুঁজিবাদী ও সমাজবাদী –এ দুই শিবিরের প্রচন্ড বু্দ্ধিবৃত্তিক লড়াই। এ লড়াইয়ের ময়দান থেকে রাশিয়া ও চীন উভয়ই বিদায় নিয়েছে, পতন ঘটেছে সোভিয়েত রাশিয়ার। কিন্তু বিষধর শাপ মড়নের আগেও মরণ ছোবল হানতে পারে। সোভিয়েত রাশিয়া তেমনি ছোবল মেরেছিল পাকিস্তানের অখন্ড অস্তিত্বে। সোভিয়েত রাশিয়ার সমর্থণের কারণেই ভারত সাহস পায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর। আওয়ামী শিবিরে কোরআন পাঠ বা কোরআন শিক্ষার কোন আয়োজন হয়েছে কিনা সেটি জানা যায়নি, কিন্তু আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্র সংগঠন রবীন্দ্র সংগীতের আসর বসিয়েছে যত্র যত্রই। দেশী ও বিদেশীদের সৃষ্ট সে সেকুলার সাহিত্যের জোয়ারে ভেসে গেছেন এমনকি আওয়ামী শিবিরের প্রধান রাজনৈতিক গুরুরা। ফলে যে ভাষানী আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন, ১০ বছর যেতে না যেতেই তিনি সেকুলারিজম ও সমাজতন্ত্রের ঝান্ডা কাঁধে তুলে নেন। ১৯৫৬ সালের কাগমারী সম্মেলনে ভারতীয় সেকুলারিজমের গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে কংগ্রেসী নেতা গান্ধীর নামে তোরণও নির্মন করেন। তিনি নতুন ভাবে দীক্ষা দেন মাওবাদে। আবুল মনসুর আহম্মদ, শেখ মুজিব, আতাউর রহমান খানের মত আওয়ামী লীগ নেতারা কাঁধে তুলে নেন কংগ্রেসী সেকুলারিজমের পতাকা। ইসলাম, ইসলামের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের নির্মাণ তাদের কাছে পরিণত হয় সাম্প্রদায়িকতা রূপে। কারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ও কারা বিপক্ষে - সেটি বিচারে গুরুত্বপূর্ণ হল চেতনা রাজ্যে কোন দর্শনটি কাজ করছে সেটি। আজকের বাংলাদেশ মূলতঃ দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের ভগ্নাংশ। কাঁচের পাত্র ভেঙ্গে গেলেও ভাঙ্গা অংশটি কাঁচেরই, মাটি বা কাঁসার নয়। ভেঙ্গেঁ যাওয়ার কারণে পাত্রটির নির্মাণে যে মৌল পদার্থ কাজ করে তাতে গুণগত পরিবর্তন আসে না। তেমনি পাকিস্তান ভেঙ্গেঁ গেলেও বাংলাদেশ ভারতের সাথে মিশে না গিয়ে প্রমাণ করেছে দ্বি-জাতি তত্ত্বই সঠিক ছিল। ভারতভূক্ত পশ্চিম বাংলা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের এখানেই পার্থক্য। বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ রূপে টিকে থাকতে পারে সে দ্বি-জাতি তত্ত্বকে মজবুত ভাবে আঁকড়ে ধরার মধ্য দিয়েই। দেশের সীমানা তখনই বিলুপ্ত হয় যখন বিলুপ্ত হয় দর্শনের সীমানা। পশ্চিম বাংলার সাথে দিল্লীর কোন দর্শনগত বিভক্তি নেই। তাই বিভক্তি নেই রাজনৈতিক দিক দিয়েও। একই ভাবে ভারতীয় সেকুলারিজমের যারা যত কাছের বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তারাই ততই বিপদজনক। যাদের দ্বি-জাতি তত্ত্বে বিশ্বাস নেই, বাংলাদেশের স্বাধীনতার বন্ধু হতে পারে না। যারা একটা ভিন্ন দর্শনে বিশ্বাস করে তারা সে দর্শনের ভিত্তিতে একটা পৃথক ও সুরক্ষিত ভূগোলেও বিশ্বাস করে। তাই বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল একাত্তর-পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা। সেকুলার ভারতের আধিপত্য বাড়লে শুধু বাংলাদেশের শিল্প-বাণিজ্যই নিরাপত্তা হারাবে না, তখন সুরক্ষা পাবে না মুসলমানের জানমাল, তাহজিব-তামুদ্দনও। স্বাধীন দেশের অর্থ নিছক আলাদা পতাকা নয়, তেমন পতাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভূক্ত প্রতিটি রাষ্ট্রেরই আছে। স্বাধীনতার অর্থ নিজেদের ভৌগলিক,রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও আদর্শিক সার্বভৌমত্বের সুরক্ষার সামর্থ। সেটি মুজিব আমলে ছিল না। তাই বিপর্যয় নেমে এসেছে বাংলাদেশের ভূগোলে; অর্থনীতি, রাজনীতি ও জীবন দর্শনে। সে সামর্থ না থাকার কারণেই মুজিব আমলে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে বেরুবাড়ী ও তালপট্টি। ধ্বংস নেমে এসেছে বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যে। অবাধ সীমান্ত বাণিজ্যের নামে দেশের তলা খসিয়ে সম্পদ ঢেলে দেয়া হয়েছে ভারতের পেটে। এভাবে ডেকে এনেছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ্য।


বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে ভাবতে হলে ভাবতে হবে তার ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশকে নিয়ে। বাংলাদেশ তিন দিক দিয়ে ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার উপর হামলা আসমান থেকে হবে না। হলে প্রতিবেশী দেশ থেকেই হবে। স্বাধীনতার সুরক্ষায় তো তারাই এগিয়ে আসে যারা বিশ্বাস করে স্বাধীনতা বিলুপ্ত হলে তাদের আর কোন নিরাপদ আশ্রয়স্থল থাকবে না। কিন্তু সে ভয় কি আওয়ামী বাকশালীদের আছে? তারা তো বরং বাংলাদেশের চেয়ে ভারতকেই নিরাপদ ভাবে। তাই ১৯৭৫-এর ১৫ আগষ্টের পট পরিবর্তনের পর কাদের সিদ্দিকীদের মত আওয়ামী বাকশালীরা দলে দলে ভারতে গিয়েছিল। যে দেশটিকে যারা এতটা নিরাপদ ভাবে সে দেশের পক্ষ থেকে হামলা হলে তারা কেন যুদ্ধ করতে যাবে? কেনই বা জান দিবে? প্রাণপনে তো তারাই লড়বে যাদের সে হামলায় অতি মূল্যবান কিছু হারিয়ে যাবার ভয় আছে। তাছাড়া আওয়ামী বাকশালী পক্ষটির নেতা শেখ মুজিব তো ১৯৭২-এ ২৫ বছর মেয়াদী চুক্তি সাক্ষর করেছিল প্রয়োজনে ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশে প্রবেশের অধিকারকে জায়েজ করতে। আজ এরা বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের ট্রানজিট দিতে উদগ্রীব। মুজিব ভারতীয় বাহিনীর অনুপ্রেবেশকে চুক্তি করে জায়েজ করেছিল। এ ভয়ে, তার সরকার বিরোধীদের দমনে যদি অক্ষম হয় তবে ভারতীয় সামরিক বাহিনী যেন তাকে উদ্ধার করে। দূর্বলতাই মানুষকে পরনির্ভর করে। শেখ মুজিবও একই কারণে ভারত নির্ভর হয়েছিলেন। এমন চেতনার লোকেরা কি কখনও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হতে পারে? বাংলাদেশের স্বাধীনতা কি এদের হাতে সুরক্ষা পেতে পারে?


ইসলামী চেতনাধারী মানুষের কাছে ভারত কখনই নিরাপদ স্থান রূপে বিবেচিত হতে পারে না। দেশটিতে অতি ঘন ঘন ঘটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ছদ্দাবেশে মুসলিম নিধন যজ্ঞ। মুসলিম মহিলারা সেদেশে ধর্ষিতা হয়, ধর্ষনের পর আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়। নিরাপত্তা পায় না মুসলমানদের ব্যবসা-বাণিজ্য। নিরাপত্তা পায় না এমনকি মসজিদ মাদ্রাসাও। ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ বিধ্বস্ত হল হাজার হাজার উগ্র হিন্দুদের দ্বারা দিন-দুপুরে। সভ্যদেশে কারো ঘরের দিকে ঢিল ছুড়ে মারলেও পুলিশ ছুটে আসে। অথচ মসজিদ ধ্বংসের কাজ অতি উৎসবভরে হল পুলিশের চোখের সামনে। তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও সেটি টিভিতে দেখলেন, দেখেছেন শত শত রাজনৈতিক নেতা এবং পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা। একজনও গ্রেফতার হল না। কারো শাস্তিও হল না। যেন দেশে কোন কিছু ঘটেনি, কেউ কিছু দেখেও নি। এমন দেশে কি কোন মুসলমান নিরাপত্তা পেতে পারে? বরং এমন দেশের আগ্রাসন থেকে বাঁচতে একজন মুসলমান যে অর্থ, শ্রম, মেধা এমনকি প্রানদান করবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? অথচ আওয়ামী বাকশালী পক্ষ তাদেরকেই স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি বলছে। তবে এমনটি বলার মধ্যেও একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য আছে। আছে নিরেট মিথ্যাচার। এ মিথ্যাচারের লক্ষ্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রকৃত সৈনিকদের হেয় করা। এভাবে দূর্বল করা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে এবং স্বাধীনতার এ প্রকৃত সৈনিকদের নির্মূলের লক্ষ্যে একটি উপযোগী প্রেক্ষাপট তৈরী করা। যেমনটি তারা একাত্তরে করেছিল।

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh

 

Most Read