Home EBooks ৭১এর আত্মঘাতের ইতিহাস অধ্যায় ২১: যে আত্মঘাত শুরু হয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ২১: যে আত্মঘাত শুরু হয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 19 October 2008 19:57
মুজিবামলে বাংলাদেশে যে ভয়ানক দূর্ভিক্ষ নেমে আসে তাতে মৃত্যু হয় বহু লক্ষ মানুষের। ১৯৭০ সালের নভেম্বরের ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস যত মানুষ মারা গিয়েছিল এ সংখ্যা ছিল তার চেয়েও বেশী।কারণ এ দুভিক্ষ আঘাত হেনেছিল সমগ্র বাংলাদেশে।সভ্যদেশ মাত্রই সেদেশের মানুষ কেন পশু কোন দুর্যোগে মারা গেলেও হিসাব রাখে। কিন্তু অগণিত মানুষ মরলেও শেখ মুজিব তার হিসাব নেওয়ার প্রয়োজন মনে করতেন না। তাই একাত্তরের যুদ্ধে নিহত মানুষের যেমন হিসাব করেনি তেমনি ১৯৭৪ সালের দূর্ভিক্ষে নিহত মানুষের সংখ্যাও গণনা করিনি। মশা-মাছি ও শিয়াল-কুকুরের ন্যায় মানুষ মানুষ পথে ঘাটে মারা গেছে। সরকারি বিভাগের কোন কর্মচারির পদধুলি যেমন তাদের ঘরে জীবত অবস্থায় পড়েনি,তেমনি তাদের লাশের পাশেও পড়েনি। আর এ দুর্যোগ হঠাৎ আসেনি, এসেছিল একটি পরিকল্পনার অংশ রূপে। সে ভয়াভহ দুর্ভিক্ষর নেমে এসেছিল মূলতঃ দুটি কারণে। প্রথমতঃ শেখ মুজিব সরকারের সীমাহীন দূর্নীতি ও অযোগ্যতা, দ্বিতীয়তঃ ভারতের সীমাহীন শোষণ। নিজেদের দূর্নীতি ও অযোগ্যতার পাশাপাশি ভারতের শোষনেও মুজিব সরকার সহযোগী ভূমিকা পালন করে।

শুরু থেকেই ভারতের কাছে এটা অজানা ছিল না যে,বাংলাদেশে ভারত ও ভারতীয় স্বার্থের যারা প্রকৃত বন্ধু হল শেখ মুজিব ও তার আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ নয়। সেটি প্রকাশ পেয়েছে এমন কি একাত্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল মানেক শ’র কথা থেকেও। তিনি বলেছিলেনঃ

“যদি বাংলাদেশকে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসাবে ঘোষণা করা হয়,তাহলে ভারতের আশ্চার্য হবার কিছু নেই। যেদিন আমার সৈনিকেরা বাংলাদেশকে মূক্ত করে সেদিনই আমি উপলদ্ধি করি,বাংলাদেশীদের কখনোই ভারতের প্রতি তেমন ভালবাসা ছিল না। আমি জানতাম ভারতের প্রতি তাদের ভালবাসা অস্থায়ী। অনুপ্রেরণা লাভের জন্য ভারতের দিকে না তাকিয়ে তারা মক্কা ও পাকিস্তানের দিকে দৃষ্টিপাত করবে। আমাদের সত্যাশ্রয়ী হতে হবে। বাংলাদেশীদের সাথে আমরা সঠিক আচরণ করিনি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের সব রকমের সাহায্য করা উচিত ছিল, আমাদের রাজনীতিবিদরা তা করেননি। তারা বেনিয়ার মত আচরণ করেছেন।”-(দৈনিক স্টেট্সম্যান, কোলকাতা, ২৯ এপ্রিল ১৯৮৮)।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিজয় যে বেশী দিন থাকবে না সে ভয় ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও পরিকল্পনাবিদদের শুরু থেকেই ছিল। ভারতীয় স্ট্রাটেজিস্টদের অতি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হল, কোন প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে শক্তিশালী হতে না দেওয়া। সে সাথে সব সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা জিইয়ে রাখা। সে কৌশল শুধু পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই নয়, বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও। ভারত চায় তার চারপাশে ভূটান ও নেপালের ন্যয় দুর্বল রাষ্ট্র গড়ে উঠুক। ১৯৪৭ সাল থেকেই সেটি করেছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে করেছে ১৯৭১ থেকেই। প্রতিবেশীর সামরিক শক্তিতে ভারত যে কতটা স্পর্শকাতর তার একটা উদাহরন দেয়া যাক। প্রেসিডেন্ট এরশাদের আমলে বাংলাদেশ কয়েকখানি মিগ-১৭ কিনেছিল চীন থেকে। তা নিয়ে প্রতিবাদ উঠেছিল ভারতে। ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজী সাপ্তহিক পত্রিকা “ইন্ডিয়া টুডে”-এ মিগ ক্রয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-মূলক নিবন্ধ ছেপেছিল। কোথায় ভারতের সামরিক শক্তি আর কোথায় বাংলাদেশের!ভারত আনবিক বোমা বানানোর অধিকার রাখে,অথচ বাংলাদেশকে পুরনো আমলের মিগ কিনতে দিতেও রাজী নয়। বাংলাদেশকে তারা যে কতটা শক্তিশালী দেখতে চায় এ হল তার নমুনা।একই লক্ষ্যে বাংলাদেশ পরিকল্পিত ভারতীয় লুটপাটের শিকার হয়েছিল ১৯৭১ থেকেই। তাই পাকিস্তান আর্মির ফেলে যাওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র লুন্ঠন করে নিয়ে যাওয়া হয় ভারতে। পাকিস্তান আমলে গাজীপুরে চীনের সহয়তায় একটি অস্ত্র কারখানা গড়া হয়। ভারতীয় বাহিনীর সে অস্ত্রকারখানার অস্ত্রনির্মানকারি যন্ত্রাপাতি খুলে নিয়ে যায়। সে সময় আওয়ামী নেতা ও মুক্তিবাহিনীর কাজ ছিল সে লুটপাটকারী ভারতীয় সৈনিকদের স্যালুট করা। শুধু তা নয়,তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সেনানিবাসগুলোতে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের কাছে যেসব সোনা-রুপা ও দামী জিনিষপত্র ছিল সেগুলোও লুটে ভারতে নিয়ে যায়। ভারতীয় দৈনিক সংবাদপত্র “অমৃত বাজার”-এর ১২ই মে ১৯৭৪ সাল-এর রিপোর্ট অনুসারে ভারত সরকার দুই হতে আড়াই শত রেলওয়ে ওয়াগন ভর্তি অস্ত্রশস্ত্র বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধক্রমে স্থানান্তরিত করে। অথচ ১৯৭৩ সালের ১১ই জুলাই বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে,“ভারতে কোন অস্ত্রশস্ত্র পাচার হয় নাই বা লইয়া যায় নাই”।প্রশ্ন জাগে,যদি জনাব তাজ্উদ্দিন সত্য বলে থাকেন তবে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া কয়েক শত ট্যাংক গেল কোথায়? ১৯৭৫ সালে মুজিব সরকারের অপসারণে সামরিক বাহিনীর তরুন অফিসারগণ যে ট্যাংক ব্যবহার করেছিল সেগুলি ছিল মিশর সরকারের দেওয়া।তখন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে পাকিস্তান আমলের কোন ট্যাংকই ছিল না।অতএব তাজউদ্দিন যা বলেছেন সেটি সত্য ছিল না, ছিল ডাহা মিথ্যা।আর জাতির সাথে যারা এরূপ নির্লজ্জ মিথ্যা বলেন,সে সব মিথ্যাবাদীদের থেকে জনগণ কি আশা করতে পারে? অপর দিকে ১৯৭৪ সালের ১৭ই জুন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুর বলেন, ভারতে স্থানান্তুরিত অস্ত্রশস্ত্র বাংলাদেশকে ফেরত দেওয়া শুরু হইয়াছে। দুই মন্ত্রীর দুই ধরনের বক্তব্য। যদি ভারত কোন ট্যাংক ফেরত দিয়েই থাকে তবে কোথায় রাখা হল সে ফেরতপ্রাপ্ত ট্যাংকগুলো? দুইজনের কেউই সত্য বলেন নি। আর এই হল আওয়ামী লীগের মিথ্যানির্ভর রাজনীতির নমুনা। একই ভাবে পরিকল্পিত লুন্ঠনের শিকার হয় বাংলাদেশের শিল্প। একাত্তরের পূর্বে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান যে পরিমান বৈদিশিক মূদ্রা উপার্জন করতে তার ৯০% ভাগ আসতো কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানী করে। বাঁকিটা আসতো চা ও চামড়া রপ্তানী করে। আর এ তিনটি খাতই ছিল আন্তজার্তিক বাজারে ভারতের সাথে প্রতিযোগিতা মূলক। ভারত এ তিনটি খাতই পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করে দেয় এবং প্রতিদ্বন্দিতার ময়দান থেকে বাংলাদেশী পণ্যকে বের করে দেয় যা পাকিস্তান আমলে তাদের জন্য অসম্ভব ছিল। আর এর ফলে চরম আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল লক্ষ লক্ষ কৃষক পরিবার যারা পাট থেকে তাদের উৎপাদন খরচও পাচ্ছিল না। আওয়ামী লীগ ও তার নেতা শেখ মুজিব সবসমই নিজেদের ব্যর্থতাকে অন্যদের ঘাড়ে চাপাতে অভ্যস্থ। শিল্পের এ দূর্গতির জন্যও তারা একাত্তরের যুদ্ধকে দায়ী করে। কিন্তু সেটি সঠিক ছিল না। এ ব্যাপারে ১৯৮০ সালে দৈনিক ইত্তেফাক লিখেছিল,

“একাত্তরের যুদ্ধের বছর নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে তেমন কোন শিল্প প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বা উৎপাদন ব্যাহত হয়নি। আসলে যুদ্ধটা একটা অজুহাত মাত্র। তাছাড়া জাতিসংঘের ত্রাণ কমিটির এক হিসাব থেকেও জানা যায়,বাংলাদেশের যুদ্ধজনিত সমস্ত ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে বাংলাদেশে প্রদত্ত সাহায্যের পরিমাণ ছিল তেরগুণ বেশী।”-(ইত্তেফাক সেপ্টম্বর ৩,১৯৮০)।

দেশী শিল্প চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মুজিবামলে। বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত হল পাট শিল্প। কিন্তু এ শিল্পকে ধ্বংস করা হয়েছে পরিকল্পিত ভাবে এবং সেটি ভারতের স্বার্থে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম পাটকল স্থাপিত হয় ১৯৫১ সালে। ১৯৫১ সাল থেকে ১৯৭১ সাল এই ২০ বছরে পাটকলগুলোতে তাঁতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় শূণ্য থেকে ২১,৪০০। পাকিস্তানের চতুর্থ ৫ সালা পরিকল্পনায় তাঁতের সংখ্যা বাড়িয়ে ১৯৭৫ সাল নাগাদ ৪০ হাজার করার পরিকল্পনা ছিল। তাঁতের সংখ্যা ৪০ হাজারে পৌঁছলে বিপুল ভাবে বাড়তো বৈদিশীক মূদ্রার উপার্জন। তখন বিদেশের বাজারে কাঁচা পাটের স্থলে সম্ভব হত পাটজাত পণ্যের রপ্তানি। কিন্তু পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ায় সে আশা আর পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। অথচ বাংলাদেশে আমলে ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৮০ সালে তাঁতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫,৭০০। অর্থাৎ ৯ বছরে বেড়েছে মাত্র ৪ হাজার। তবে তাঁতের সংখ্যা কিছু বাড়লেও প্রচন্ড ধ্বস নামে উৎপাদনে। উৎপাদন নেমে যায় ১৯৬৯-৭০ সালেরও নীচে। মুজিব সরকারের পাটমন্ত্রী আন্তর্জাতিক বাজারে প্রধান প্রতিদ্বন্দি ভারতের সাথে এমন এক চুক্তি করে যার ফলে বাংলাদেশের পাট শিল্পের স্বার্থ বিপন্ন হয়ে পড়ে। অথচ পাকিস্তান আমলে পাটশিল্প ছিল দেশের সবচেয়ে লাভজনক খাত। মুজিব সরকার এটিকে লোকসানের খাতে পরিণত করে। একাত্তরের আগে পূর্ব পাকিস্তানের পাটের সরকারি ও বেসরকারি গুদামে আগুণ লেগেছে এটি ছিল অতি বিরল ঘটনা। কিন্তু মুজিবের শাসনামলে পাটের গুদামে আগুণ লাগার ঘটনাটি অতি ঘন ঘন ঘটতে থাকে। তখন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অতি দ্রুত বিলুপ্ত হতে থাকে বাংলাদেশী পাট, সে বাজার সহজেই দখল করে নেয় ভারত। অথচ পাকিস্তান আমলে ভারত তা ভাবতেও পারেনি। আর শেখ মুজিব সেটি তাদের ঘরে তুলে দেয়। মুজিব সরকারের আমলে ভারত সরকার কিভাবে বাংলাদেশের পাট লুন্ঠন করে তার এক বিবরণ দিয়েছেন জনাব অলি আহাদঃ

“স্মরণীয় যে, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরর বিজয়ী ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশে সীমান্ত একাকার হইয়া যায়। বিনা অনুমতিতে বা বিনা দলিলেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় জনতা ও পণ্যের স্রোত প্রবাহিত হইতে থাকে। বাংলাদেশ বাস্তবে ভারতের বাজারে পরিণত হয়। বাংলাদেশ হতে লক্ষ লক্ষ গাইট পাট অবাধে সীমান্ত পারের পাটকলগুলির চাহিদা মিটাইতে আরম্ভ করে। ভারতীয় পাটকলগুলির পূর্ণোদ্যমে দুই-তিন শিফটে কাজ চালু হইয়া যায়। এমন কি বাংলাদেশের পাট-লোপাট করিয়া ভারত নূতন করে বিদেশে কাঁচাপাট রফতানী শুরু করিয়া দেয়।স্মর্তব্য,কাঁচাপাটের অভাবে ইতিপূর্বে ভারতীয় পাটকলগুলি অতি কষ্টে এক শিফটে কাজ করিত এবং ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর পাক-ভারত বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ হইয়া যাওয়ায় ভারতকে বাধ্যতঃ সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে প্রতি বৎসর ১০ থেকে ১৫ লক্ষ বেল পাকিস্তানী পাট চড়ামূল্যে ক্রয় করিতে হইত।..অথচমুজিবের শাসনামলে ভারত অবাধে বাংলাদেশের পাট লুন্ঠন শুরু করিয়া চলিল।সেই পাটজাত পণ্য দ্বারাই ভারত বাংলাদেশের পাটজাত পণ্যের বাজার দখল করিল। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশী কাঁচাপাট রফতানী দ্বারা ভারত নিয়মিত ভাবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করিয়া চলিল। অথচ শেখ মুজিব টু শব্দটি উচ্চারণ করিলেন না।ইহা কোন স্বার্থের বিনিময়ে কিংবা কোন বিশেষ কারণে? তিনি কি জ্ঞাত ছিলেন না যে,ভারতের পাটশিল্পজাত পণ্য রফতানীপ্রসূত অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মাত্র ১৫% থেকে ১৭% ; কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি কাঁচাপাট ও পাটশিল্পজাত পণ্য রফতানী আয়ের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।”

১৯৭২ সালের ২৭শে মার্চ শেখ মুজিব সরকার ভারতের সাথে সীমান্ত বাণিজ্য চুক্তি নামে যে চুক্তিটি সাক্ষর করে তার ফলে ভারত সরকার বাংলাদেশে লুটপাটের একটি বৈধ ভিত্তি পায়। তখন ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান থেকে বৈদেশিক অর্থে আমাদানিকৃত উন্নতমানের পণ্য ভারতে পাচার করা শুরু হয়। সে স্রোতের সাথে যাওয়া শুরু করে সোনা-রূপা, তামা, পাকিস্তানী আমলের ধাতব মুদ্রা, কলকারখানার যন্ত্রপাতি, সার, আমদানিকৃত বিদেশী ঔষধ এবং বাংলাদেশী মাছ।”–(অলি আহাদ)।

মুজিবের হাতে অর্থনীতির বিনাশের যে কাজ শুরু হয়েছিল, সেটি শুধু পাটশিল্পে সীমাবদ্ধ থাকে নি। ধ্বংস নেমে আসে চা এবং চামড়া শিল্পেও। শিল্পের এ দুটি খাতও ছিল বিদেশের বাজারে ভারতের সাথে প্রতিদ্বন্দিতামূলক। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের কোন ইচ্ছাই ছিল না ভারতের সাথে কোন রূপ বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় নামার,ফলে একাত্তরের পূর্বে বিদেশে বাংলাদেশের চা ও চামড়ার যে বাজার ছিল ভারত তা অতি সহজেই দখলে নিয়ে নেয়।মুজিবামলে দ্রব্যমূল্যের যে উর্ধ্বগতি ঘটে তার বিবরণ জনাব অলি আহাদ দিয়েছেন এভাবেঃ

“(পাকিস্তান আমলের) এক টাকার গামছার দাম হয় সাত টাকা।পাঁচ টাকার শাড়ীর দাম হয় পঁয়ত্রিশ টাকা। তিন টাকার লুংগি পনের টাকা বা কুড়ি টাকায়, দশ আনা বা বার আনা সেরের চাউল হয় দশ টাকায়। আট আনা সেরের আটা ছয়-সাত টাকা। দুই আনা সেরের কাঁচা মরিচ চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা। তিন-চার টাকা সেরের শুকনা মরিচ আশি-নব্বই টাকা।আট আনা সেরের লবন চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা। পাঁচ টাকা সেরের সরিষার তৈল তিরিশ-চল্লিশ টাকা। সাত টাকা সেরের নারিকেল তৈল চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা। সাত টাকার লাঙ্গল ত্রিশ-চল্লিশ টাকা।”

বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংসের লক্ষ্যে ভারত আরেকটি বৃহৎ প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশের ক্যারেন্সি নোট ছাপানোর মধ্য দিয়ে। আর সে ভারতীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে মহা সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় শেখ মুজিব নিজে। তিনি বাংলাদেশের জন্য নতুন ক্যারেন্সি নোট ছাপানো দায়িত্ব কোন নিরপেক্ষ দেশকে না দিয়ে সেটি ভারতের হাতে তুলে দেন। মুজিব ভারতকে যে পরিমাণ নোট ছাপতে বলেছিল তার চেয়ে বহু শত কোটি টাকার বেশী নোট ছেপে বাংলাদেশী টাকার চরম অবমূল্যায়ন ঘটায়। একাত্তরে পাকিস্তানী মূদ্রার বাজার দর ভারতীয় মূদ্রার চেয়ে অনেক বেশী ছিল, কিন্তু মুজিব আমলে বাংলাদেশী মূদ্রার বিণিময় হার ভারতীয় মূদ্রার অর্ধেকেরও কমে এসে দাঁড়ায়। ভারত যে অতিরিক্ত নোট ছেপে বাংলাদেশী অর্থনীতির সর্বনাশ করছে সেটি অন্যরা বুঝলেও সেটি শেখ মুজিব বুঝেছিল অনেক দেরীতে। হয়ত জেনেশুনেও বুঝতেই চায়নি। এবং যখন বুঝলো তখনও সে মূদ্রাকে সাথে সাথে অচল ঘোষনা না করে দুই মাস সময় দেয়। ফলে ভারতীয়রা বাড়তি সময় পায় আরো বেশী বেশী নোট ছেপে বাংলাদেশের বৈদেশিক মূদ্রায় অর্জিত সোনা-রোপা ও বিদেশী যন্ত্রাংশ কিনে ভারতে পাচারের। আর এটি ছিল বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের অতি সুস্পষ্ট দুবৃর্ত্তী। কিন্তু আওয়ামী বাকশালী চক্রটি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কৃত এ মহা অপরাধের বিষয়টি তাদের রচিত ইতিহাসের পাতা থেকেই বাদ দিয়েছে। অথচ ভারতের এ অপরাধের কারণেই বাংলাদেশে নেমে আসে দূর্ভিক্ষ এবং তাতে মৃত্যু ঘটে লক্ষ লক্ষ মানুষের। এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাড়ে প্রচন্ড অপমান বাড়ে। ২৩ বছরের পাকিস্তান আমলে সেটি ঘটেনি। এত মৃত্যু ও এত অপমান ৯ মাস যুদ্ধকালীন সময়েও ঘটেনি।

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh

 

Most Read