Home EBooks ৭১এর আত্মঘাতের ইতিহাস অধ্যায় ২২: তীব্রতা পায় ইসলামের বিরুদ্ধে অসহনশীলতা

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ২২: তীব্রতা পায় ইসলামের বিরুদ্ধে অসহনশীলতা Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 19 October 2008 20:01
১৯৪৭-এ পাকিস্তান যখন প্রতিষ্ঠা পায়,হিন্দুদের নামে ও হিন্দু ধর্মের ঐতিহ্য নিয়ে বহু প্রতিষ্ঠান ছিল। যেমন ভারতেশ্বরী হোম, রামকৃষ্ণ মিশন, জগন্নাথ হল, জগন্নাথ কলেজ, আনন্দ মোহন কলেজ, রাজেন্দ্র কলেজ, ভোলানাথ হিন্দু এ্যাকাডেমী (রাজশাহী) এরকম অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। দেশ জুড়ে শত শত রাস্তাঘাটের নাম ছিল হিন্দুদের নামে। বলা যায়,শহর এলাকার অধিকাংশ রাস্তার নামই ছিল হিন্দুদের নামে। কিন্তু কোন প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করা হয়নি। সে সময় বহু কংগ্রেস নেতা ও বহু হিন্দু জমিদার বাড়িঘর ফেলে হিন্দুস্থানে চলে যায়। তাদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তি পরিত্যক্ত সম্পত্তি রূপে সরকারি নথিভূক্ত হয়। কোন কোন দালানকোঠা সরকারি অফিস বা সরকারি কর্মচারির বাসস্থান রূপে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কারো হাতে ব্যক্তিগত মালিকানার দলিল তুলে দেয়া হয়নি। সেটি করা সরকারি নীতি ছিল না। অথচ বাংলাদেশ হওয়ার সাথে সাথে পাকিস্তানপন্থিদের ঘরবাড়ী ও দলীয় অফিস জবর দখল শুধু আওয়ামী লীগের নীতি নয়, সরকারি নীতিতে পরিণত হয়।

মুসলিম লীগের ঢাকার শাহবাগের প্রাদেশিক প্রধান দফতরটি কেড়ে নেওয়া হয়।বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে কায়েদে আযম বা ইকবালের নামই শুধু অপসারিত হয়নি,যেখানে ইসলাম ছিল সেখানেও হাত পড়েছে। নজরুল ইসলামের নাম থেকে ইসলাম কেটে দেওয়া হয়েছে। তাই ঢাকার নজরুল ইসলাম কলেজ হয়ে যায় নজরুল কলেজ। অথচ আরবী ভাষায় শুধু নজরুল বলে কোন শব্দই নাই। আছে নজর বা নজরুল ইসলাম। নিছক ইসলাম বাদ দেওয়ার স্বার্থে নজরুল ইসলামের নামও বিকৃত করা হয়েছে। ঢাকার ইসলামিয়া কলেজ থেকে ইসলামিয়া শব্দটি বিলোপ করা হয়।আক্রোশ শুধু ইসলামের উপর নয়, গিয়ে পড়ে মুসলিম শব্দটির উপরও। তাই সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি কেটে ফেলা হয়। অথচ আল্লামা ইকবাল শুধু পাকিস্তানের কবি নন, তিনি বাস্তাবিক অর্থেই বিশ্বকবি। তিন ছিলেন অতি উদার ও প্রশস্থ মনের কবি। তার স্বপ্নের মানচিত্র শুধু জন্মভূমি পাঞ্জাব ছিল না তিনি স্বপ্ন দেখতেন সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের নিয়ে।এমনকি সমগ্র বিশ্বকে নিয়ে।মুসলমানদের জন্য হিন্দুদের থেকে আলাদা এক স্বতন্ত্র দেশের ধারণা তিনিই প্রথম দেন। নিজের মাতৃভাষা পাঞ্জাবী হওয়া সত্ত্বেও তিনি কবিতা লিখেছেন উর্দু ও ফার্সী ভাষায়। তার কবিতা বাঙলার বহু লোকের কাছে অতি প্রিয়। তিনি শুধু কবিই ছিলেন না, ছিলেন একজন বিশ্বমানের দার্শনিক। তিনি বুঝতেন, মুসলমানের দারিদ্র্যতা খাদ্যে বা বস্ত্রে নয়, বরং দর্শনে। এবং সেটি ইসলামি দর্শনে। দর্শনই জাতীয় উন্নয়নে পাওয়ার হাউসের কাজ করে। দর্শনই বিপ্লব আনে মানুষের চরিত্রে ও কর্মে। আনে সামাজিক এ রাজনৈতিক বিপ্লব। সে দর্শনকে বেশী বেশী মানুষের কাছে পৌছানের লক্ষ্যে সে আমলের দুইটি প্রসিদ্ধ ভাষাকে তিনি কবিতার মাধ্যম হিসাবে বেছে নেন। ফলে তাঁর প্রভাব ছিল সুদুর প্রসারী। দক্ষিণ এশিয়ার বুকে মুসলিম জাগরণে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এজন্য রবীন্দ্রনাথের চেয়ে তিনি ছিলেন অনেক উর্ধে। তার মত একজন বিশাল ও উদার মনের কবিকে আজও সম্মান দেখায় বহু দেশের মানুষ। কিন্তু সে রূপ নৈতিক ও মানবিক সামর্থ ছিল না আওয়ামী বাকশালীদের। ইকবালের নামে বিশ্বের নানা দেশে নানা প্রতিষ্ঠান ও রাস্তা ঘাট আছে। অথচ আওয়ামী লীগ এতটাই সংকীর্ন ও ছোট মনের যে তাঁর মত এহেন মহান ব্যক্তির নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ইকবাল হল ছিল সেটি থেকে তার নাম মুছে দেয়। আর কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ? তিনি শুধু বর্তমান পাকিস্তানের নেতা ছিলেন না, ছিলেন সমগ্র উপমহাদেশের মুসলমানদের নেতা। তিনি হলেন সেই মহান নেতা যিনি নানা ভাষায়, নানা আঞ্চলিকতায় ও নানা মজহাবে বিভক্ত মুসলমানদের একতাবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। সে সময় এমন একতা অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নইলে কি সেদিন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা কি সম্ভব হত?


পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা যে উপমহাদেশের মুসলমানদের কতবড় কল্যাণ করেছে সেটি ভারতীয় মুসলমানদের পরাজিত দুরাবস্থা দেখলে কি আর বুঝতে বাঁকি থাকে? পাকিস্তান না হলে কি সম্ভব হত বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা? জিন্নাহর নামেও বিশ্বের নানা দেশে নানা রাস্তাঘাট ও প্রতিষ্ঠান আছে।কিন্তু মুজিব সরকার এ মহান নেতার নাম কোন প্রতিষ্ঠানেই বরদাস্ত করেনি। জিন্নাহর নাম কেটে কোথাও কোথাও মুজিবের নাম বসানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, আল্লাহতায়ালার কালামের উপরও আওয়ামী লীগ কাঁচি চালিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামে ছিল পবিত্র কোরআনের আয়াত। আল্লাহর সে অতি গুরুত্বপূণ বাণীটি হল ‌‌''ইকরা বিসমে রাব্বিকাল্লাযী খালাক” পড় সেই মহান প্রতিপালকের নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছে। এটিই হল পবিত্র কোরআনের প্রথম বাণী। আর এতে “পড়া” বা জ্ঞানার্জনের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।অথচ কোন কাফের সরকার নয়,মুজিব সরকার সে আয়াতটি মুছে দেয়। যার মধ্যে সামান্য ঈমান আছে এমন কোন ব্যক্তি কি কোরআনের আয়াতের উপর হাত দিতে সাহস পায়? শেখ মুজিব ও তাঁর দল আল্লাহ ও আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে এতটাই বিদ্রোহী ছিল যে সে গর্হিত কাজে সামান্যতম দ্বিধাও করেনি। দলের অন্য কোন সদস্যদের পক্ষ থেকেও কোন প্রতিবাদ উঠেনি। যে দেশের ৯০% ভাগ মানুষ মুসলমান, সে দেশের মানুষ যদি আল্লাহর এ আয়াতটিকে বরদাশত না করতে পারে তবে কি আল্লাহতায়ালা সে দেশের উপর প্রসন্ন হতে পারেন? মুসলমান রূপে এটি তো দায়িত্ব ছিল, আল্লাহর প্রতিটি আয়াতের প্রতি সম্মান দেখানো। আওয়ামী লীগ সেটি করেনি। সেটি বিলুপ্ত করে শুধু একটি আয়াতের অবমাননা করেনি,প্রচন্ড অবমাননা করেছে মহামহীমাময় মহান আল্লাহর। এই একটি মাত্র অপরাধই কি শেখ মুজিব ও তার দলের উপর আল্লাহর আযাব নাযিলের জন্য যথেষ্ট ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট ডলারের নোটের উপর “We trust in God” (অর্থঃ আমরা গডের উপর বিশ্বাস করি”) লিখতে লজ্জা বোধ করে না। অথচ তারা ধর্মভীরু জাতি হিসাবে পরিচিত নয়। তাই প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামে কোরআনের আয়াত লিখতে শেখ মুজিব ও দলের কেন এ হীনমন্যতা? এরূপ ইসলাম-বিরোধীতাই কি তাদের ধর্ম-নিরপেক্ষতা। সেকুলারিজমকে মাথায় তুলতে গিয়ে এভাবেই তারা আল্লাহ ও তাঁর মহান বাণীর প্রতি অবমাননা বাড়িয়েছে। এরই আরেক নজির, আওয়ামী লীগ সরকার রেডিও থেকে পবিত্র কোরআনের তেলাওয়াতও বাদ দিয়েছিল। কিন্তু তাতে বিক্ষোভে ভেঙ্গে পড়ে ঢাকা রেডির কর্মচারীরা। ফলে জনতার রোষে পড়ার ভয়ে আওয়ামী সরকার কোরআন তেলাওয়াত পুণরায় শুরু করতে বাধ্য হয, কিন্তু শুরু হয় গীতা, বাইবেল ও ত্রিপাঠক পাঠের সাথে সমতা বিধান করে।


মুসলিম সংস্কৃতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ হল, একাকী বা সমাবেশে কাউকে দেখা মাত্র আসসালামু আলাইকুম বলা।এটি এক পবিত্র দোওয়া এবং এর অর্থঃ আপনার উপর (আল্লাহর পক্ষ থেকে) শান্তি বর্ষিত হোক। প্রতিটি ঈমানদার তাই কারো সাথে দেখা মাত্র তার প্রতি এ দোওয়া পাঠের মধ্য দিয়ে সে অন্য কথা শুরু করে। সারা দুনিয়ার মুসলমানরা এটি বলে থাকে। এই একটি মাত্র সাংস্কৃতিক উপাদানই একজন মুসলমানকে অমুসলমান থেকে আলাদা করে। মহান নবীজী (সাঃ) সেটি মুসলমানদের শিখিয়ে গেছেন। অথচ আওয়ামী লীগ ধর্মহীন একটি সেকুলার সংস্কৃতি নির্মাণ করার লক্ষ্যে নবীজীর (সাঃ) সে মহান শিক্ষা ও মুসলিম সংস্কৃতির এ মৌলিক উপাদানকেই বাদ দিয়েছিল। এ লক্ষ্যে তারা রেডিও এবং টিভি থেকে বাদ দিয়েছিল আসসালামু আলাইকুম বলা। শুরু করেছিল সুপ্রভাত জাতীয় সেকুলার শব্দ। চিন্তা-চেতনায় আওয়ামী-বাকশালী চক্র যে কতটা ইসলাম বিরোধী, এ হল তার নমুনা। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার সাথে সাথেই দেশের সকল ইসলামী দলগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। আইন করে নিষিদ্ধ করে ইসলামের নামে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ার যে কোন প্রচেষ্ঠা। অথচ কম্যুনিজম, সমাজবাদসহ নানা ইসলাম বিরোধী মতবাদ নিয়ে দলগড়ার ছিল পূর্ণ অধিকার। ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার নিয়ে বহু দল বিশ্বের নানা অমুসলিম দেশে এমনকি ভারতেও কাজ করে, অথচ সেটি নিষিদ্ধ করা হল বাংলাদেশে। এটি কি শেখ মুজিবের গণতন্ত্র প্রীতি? শেখ মুজিব যে শুধু স্বৈরাচারি ছিলেন তা নয়, মনেপ্রাণে প্রচন্ড রকমের ইসলাম বিদ্বেষীও ছিলেন। তার সে স্বৈরাচারি চেতনা থেকেই জন্ম নেয় বাকশাল এবং নিষিদ্ধ হয় সকল বিরোধী রাজনৈতিক দল। আর ইসলামের প্রতি তার অন্ধ-বিদ্বেষের কারণে বাকশাল প্রতিষ্ঠার বহু আগেই নিষিদ্ধ হয় সকল ইসলামি দল। তার কর্মীরা এখনও যে লগি-বৈঠা নিয়ে রাজপথে দাড়ি-টুপিধারীদের পিটিয়ে হত্যা করে সে শিক্ষা তো তারা পেয়েছে শেখ মুজিবের ইসলাম ও ইসলামী ব্যক্তিত্বের প্রতি চরম ঘৃণাবোধ থেকে। মুসলমানদের মাঝে একতা গড়া ও তাদেরকে সংগঠিত করা নামায-রোযার ন্যায় ইসলামে ফরয। এব্যাপারে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রশিকে আঁকড়ে ধর, পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ো না”-(সুরা আল ইমরান,আয়াত ১০৩) এ হুকুম মহান আল্লাহর। আর এ হুকুম মোতাবেক একতাবদ্ধ হওয়া ফরয। তাই একতার যে কোন প্রয়াসই হল ইবাদত। আর বিভেদ বা বিচ্ছিন্নতার যে কোন প্রয়াসই হারাম। বিভেদ সৃষ্টি তাই মহা পাপ। আল্লাহর রশি সমবেত ভাবে আঁকড়ে ধরার অর্থ হল,কোরআনকে আঁকড়ে ধরা। দুনিয়ার বুকে কোন কিতাব যদি বিশুদ্ধ ভাবে একমাত্র আল্লাহর হয়ে থাকে,তবে সেটি আল কোরআন। এটিই মহান আল্লাহর মহান নেয়ামত। মুসলমানের উপর দায়িত্ব হল, কোরআনের সে শিক্ষা বাস্তবায়নে জামাত বদ্ধ হওয়া। একাকী দেশ গড়া বা সমাজ গড়া দূরে থাক,  একখানি ঘর গড়া বা দেওয়াল গড়াও সম্ভব নয়। ঘর গড়তে বা দেওয়াল গড়তেও অন্যের সাহায্য চাই। এজন্যই ইসলামি রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মানের সংগঠিত হওয়া ফরজ। কিন্তু শেখ মুজিব আইন রচনা করে আল্লাহর সে কোরাআনী হুকুম পালনে বাধা দিয়েছেন। ইসলামের নামে সংঘবদ্ধ হওয়াকে দন্ডনীয় অপরাধে পরিণত করেছেন। অথচ বহু অমুসলিম দেশেও সে বিধিনিষেধ নেই। অপর দিকে পূর্ণ আজাদী দিয়েছেন দুনিয়ার সকল কুফরী তথা ইসলামবিরোধী মতবাদের অনুসারিদের সংগঠিত ও একতাবদ্ধ হওয়ার। ফলে তার আমলে নাস্তিক কম্যুনিষ্ট ও চিহ্নিত কাফেররাও পেয়েছে নিজ নিজ মত প্রচারের অবাধ সুযোগ। এবং সে সাথে সহযোগীতাও। তাদের অনেককে তিনি তার নিজ দল এবং দেশের একমাত্র দল বাকশালেও অন্তর্ভূক্ত করেছেন।

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh

 

Most Read