Home EBooks একাত্তরের স্মৃতি অধ্যায় ১২: টেন সেলের ঘটনা

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ১২: টেন সেলের ঘটনা PDF Print E-mail
Written by অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন   
Friday, 01 October 1993 00:12
Article Index
অধ্যায় ১২: টেন সেলের ঘটনা
দ্বিতীয় অংশ
All Pages

এ সময় কলাবরেটর কেসে আত্মরক্ষার জন্য অনেকে উকিলের পরামর্শে একটা শব্দ ব্যবহার করতেন। সেটা হলো DURESS অর্থাৎ চাপ। সবাই বলেছেন যে পাকিস্তান আর্মির চাপে তাদের অনেক কিছুই করতে হয়েছে যা হয়তো স্বেচ্ছায় তাঁরা করতেন না। এ কথা বলা ছাড়া উপায়ন্তর ছিল না। কিন্তু এটা যে সস্পূর্ণ অসত্য তাও নয়। আমি আগে বলেছি যে, পাকিস্তান আর্মি বাংলাভাষী প্রায় সবাইকে অবিশ্বাস করতো। সে জন্য তাদের রোষে না পড়ার একটা উপায়া ছিল একটু বেশি করে ইসলাম প্রীতি জাহির করা। এটা ছিলো অত্যন্ত বিব্রতকর একটা অবস্থা। আবার এদিকে প্রকাশ্যে শেখ মুজিবের বিরোধিতা করেছে এ অভিষোগ প্রমাণিত হলেও রক্ষা ছিল না। আমার মনে আছে ফজলুল কাদের চৌধুরিকে যখন কোর্টে হাজির করা হয় তিনি পর্যন্ত বললেন যে, তিনিও এক সময় মুজিবকে সাহায্য করেছেন এবং এমন ভাষা ব্যবহার করলেন যাতে মনে হতে পারে যে, তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধাচরণ করেননি। তাঁর জন্য দুঃখ্য হলো। অনেকের বোধ হয় মনে নেই যে, ১৬ই ডিসেম্বরের পর ফজলুল কাদের সাম্পান ভাড়া করে কিছু টাকা-পয়সা নিয়ে আরাকানের দিকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু ফজলুল কাদের চৌধুরীর মতো ব্যক্তির পক্ষে আত্মগোপন করা অসম্ভব ছিল। পথ থেকে তাঁকে ধরে আনা হয়।

আমি উল্লেখ করতে ভুলে গেছি যে 'সাত সেলে' যখন প্রথম আসি তখন যাদের পেয়েছিলাম তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হাফিজউদ্দিন। হাফিজউদ্দিন ইসলামিয়া কলেজের আমার পুরানো ছাত্র। সে ছিলো এক ব্যাংকের ম্যানেজার। সম্ভবতঃ মুসলিম কমারশিয়াল ব্যাংকের ম্যানেজার। শেখ মুজিবের এক কেইসে তাকে সাক্ষী দিতে হয়, এই অপরাধে তার কারাবাস। সে ছিল খুব দিল খোলা লোক। মতাদর্শের দিক থেকে চরম মুজিব ভক্ত। সবাই বলতো আপনার মত ব্যক্তিকে কেন জেলে আসতে হল? পূর্ব পাকিস্তান কিভাবে শোষিত হয়েছে সে সম্পর্কে অনেক আজগুবি গল্প তার কাছে শুনতাম। দেশে নতুন ব্যাংক চালু করার প্রয়োজন যখন ঘটে তখন শেখ মুজিবের বার্তাবহ এক ব্যক্তি এসে তাকে নিয়ে যায়। সেদিনকার ঘটনটি বিশেষভাবে মনে থাকবার কারণ হাফিজউদ্দিন রাতের ভাত কিছুটা জমা করে পান্তা করে রেখেছিল। সকাল বেলা কাঁচা মরিচ আর পিয়াজ দিয়ে এসব খাবে- এই ইচ্ছা ছিল। প্রথমবার যখন খবর আসে তাকে জেলের অফিসে যেতে হবে, সে জানায় সে গোসল সেরে নাশতা করে যাবে। দশ মিনিট পর আবার তাগিদ এলো। এবারও সে একই জবাব দিলো। মুক্তি আসন্ন এটা তাকে জানানো হয়নি। স্থির করেছিলে পান্তাটা খেয়েই সে যাবে। তৃতীয়বার আসল খবর পাওয়া গেলো। পান্তা আর তার খাওয়া হলো না। আমরা মোবারকবাদ জানিয়ে তাকে বিদায় দিলাম। এরপর আর কখনো তার সাথে দেখা হয়নি। হাফিজউদ্দিন ছিলো অত্যন্ত নিঃরহঙ্কার। বেশ লেখা পড়া জানতো। এ রকম লোকের মাথায় মুজিববাদী প্ররোচনা কিভাবে বাসা বেঁধে ছিলো তা নিয়ে আমি আর মোহর আলী অনেক জল্পনা-কল্পনা করেছি। জেলে কিছুদিন থাকবার পর ডাক্তার বাসেত স্থির করেন যে, তিনি শেখ মুজিবের কাছে মুক্তির আবেদন করবেন। তাঁকে নিরস্ত করা গেলো না। তাঁর আবেদনে আর্মি DURESS বা চাপের কথাতো ছিলোই আর ছিল তাঁর শারীরিক অসুস্থতার কথা। এতে হয়তো কিছুটা কাজ হয়েছিলো। কারণ আমাদের ছয়মাস আগে, ৭৩ সালের মে বা জুন মাসে তিনি রেহাই পান।


তার কিছুকাল পরেই আমাকে জানানো হয় যে, নতুন 'টেন সেলে' আমাকে বদলী করা হবে। আমি এ অপেক্ষায়ই ছিলাম। কারণ আবদুল আউয়ালের উপস্থিতিতে একেবারে অতিষ্ঠিত হয়ে উঠেছিলাম। 'নতুন টেন'- এর বিল্ডিংটা ছিলো দোতলা। নিচের যে অংশে আমরা থাকতাম তার মধ্যে ছিলো কয়েকটা সেল। এখানে পেলাম খাজা খয়ের উদ্দিন, মওলানা নুরুজ্জামান, ব্যারিস্টার আখতার উদ্দিন এবং মওলানা মোখলেসুর রহমানকে। এই শেষোক্ত ব্যাক্তির সাথে আমার আগের পরিচয় ছিলো না। তিনি ইসলাম মিশন নামে একটা প্রতিষ্ঠান চালাতেন। তেজগাও এলাকায় তিনি একটা এতিমখানা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। পাকিস্তান পতনের কয়েকদিন আগে এটার উপর ইন্ডিয়ানরা বোমা হামলা করে। এক সঙ্গে তিনশ' এতিম মারা যায়। বাকী আর তিন জনকে আগে থেকেই চিনতাম। মওলানা নুরুজ্জামান আমার ফুপাতো ভাই সৈয়দ মুঈনুল আহসানের সহপাঠী- বরিশালের লোক- নামজাদা মওলানা। ১৬ই ডিসেম্বরের পর তাঁর বাড়ি-ঘর ভেঙ্গে চুরমার করে দেওয়া হয়। আখতার উদ্দিন যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন থেকে তাঁকে চিনতাম। তখন সন্তবতঃ উনি ল' পড়ছেন অথবা পলিটিক্যাল সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের এমএ-তে ছিলেন। ১৯৫৪ সালে যে চারজন ছাত্রকে নিয়ে আমি বার্মা সফরে যাই তার মধ্যে আখতার উদ্দিনও ছিলেন। বিয়ে করেছিলেন ঢাকার নবাব বাড়ীতে। খাজা নসরুল্লাহর মেয়েকে। সেই সুত্রে খাজা খয়েরউদ্দিনের আত্মীয় হতেন।

খাজা খয়েরউদ্দিনকে শুধু নামে চিনতাম। এই প্রথম দেখা মুসলিম লীগের লোক। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান যে কনভেনশন মুসলিম লীগ গঠন করেন তার বিরোধিতা করে খাজা খয়েরউদ্দিনরা কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং আইয়ুব সরকারের সহযোগিতা করতে অস্বীকার করেন। খুব খোশ-মেজাজী লোক। গল্পগুজব করতে ভালোবাসতেন। ভালো খাবারের দিকে আগ্রহ ছিলো। বিশেষ করে পনিরের প্রতি ছিলো দারুণ আকর্ষণ। ঢাকাই পনির ভেজে দিলে আর সব কিছু বাদ দিয়ে ওগুলি খেতেন।

খাজা সাহেবের কাছে শুনেছি যে, ১৬ই ডিসেম্বরের পর তিনি কিছুকাল আত্মগোপন করেছিলেন। একদিন গেরিলারা যে বাসায় তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন সেখানে তাঁর খোজেঁ এসে হাজির হয়। তিনি তখন এক গোসলখানায় ঢুকে পড়েন। গেরিলারা সেখানেও সার্চ করবে বলে জিদ ধরে তখন তাঁর এক আত্মীয়া অন্য পথে গোসলখানায় ঢুকে দরোজা ফাঁক করে গেরিলাদের ধমকান এই বলে যে তোমাদের কি মা-বোনদের মান-ইজ্জতের কোন জ্ঞান নেই। আমি গোসল করছি। এখানে ঢুকবে কিভাবে। এরপর ওরা চলো যায়। পরে খাজা সাহেব- উপায়ন্তর না দেখে পুলিশের কাছে সারেন্ডার করেন।

তিনি ছিলেন ঢাকা পিস কমিটির চেয়ারম্যান। তাঁর বিরুদ্ধে মুজিব দলের আক্রোশ ছিল সবচেয়ে বেশি। তাঁকে খুনের মামলায় জড়াবার চেষ্টা করা হয়। খাজা সাহেবের মামলা যখন শুরু হয় তখন তিনি কোর্টে একটি বিবৃতি পাঠ করেন। এটা রচনা করতে আমিও তাঁকে সাহায্য করেছিলাম। কথাগুলি ছিলো খাজা সাহেবের। কিন্তু ভাষা অধিকাংশই আমার। দুর্ভাগ্যবশতঃ খাজা সাহেব দলিলটি হারিয়ে ফেলেছেন। এই বিবৃতিতে তিনি যে কথা বলেন আর কোন মুসলিম লীগ নেতা সে রকম কথা বলেন নি বা বলতে সাহস পাননি। তাঁর বক্তব্য ছিলো যেমন সাহসী তেমনি দ্বিধাহীন। তিনি বলেছিলেন যে, মুসলিম লীগ তাঁরই পূর্ব পুরুষ নওয়াব সলিমুল্লাহর সৃষ্টি। এই আন্দোলনের সঙ্গে তিনি জন্মসূত্রেই জড়িত। সুতরাং '৭১ সালে পাকিস্তানের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে যে হুমকি দেখা দেয় তার মধ্যে পক্ষ নির্বাচনের প্রশ্ন ওঠেনি। যে আদর্শ যে বিশ্বাসে তিনি লালিত ও বর্ধিত হয়েছিলেন তা রক্ষা করার চেষ্টা তিনি করেছেন কর্তব্য মনে করে। এজন্য বর্তমান অবস্থায় যদি তাকেঁ শাস্তি দেওয়া হয় সেটা হবে অন্যায়। কিন্তু তিনি কিছুতেই বলবেন না যে '৭১ সালে তিনি ভুল করেছিলেন।

খাজা সাহেবের মামলা শেষ হবার আগেই '৭৩ সালের ডিসেম্বরে আমরা সবাই মুক্তি পেয়েছিলাম। সুতরাং খাজা সাহেবের কি শাস্তি হত সেটা আর বুঝা গেল না। মাওলানা মোখলেসুর রহমান ও মওলানা নুরুজ্জামান দু'জনই ছিলেন খুব গোঁড়া লোক। এদের সঙ্গে ইসলাম সম্বন্ধে কথা বলতে ভয় করতো। কারণ অল্পতেই তাঁরা ঈমান নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। একবার কি প্রসঙ্গে যেন দর্শনের কথা ওঠে। দর্শনের চরিত্র ব্যখ্যা করতে যেয়ে মহা মুশকিলে পড়লাম। উভয়ই ঘোষণা করলেন যে দর্শনের সংস্পর্শে এলে কারো ঈমান ঠিক থাকার কথা নয়। মোখলেসুর রহমান সাহেব দাবী করলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস থেকে দর্শন বিষয়টি তুলে দেওয়া দরকার। এঁর সঙ্গে তর্ক করা নিরর্থক মনে করলাম।

মওলানা নুরুজ্জামানের সেলের পাশে যে ভদ্রলোক থাকতেন তিনি ইস্ট পাকিস্তান সরকারের জয়েন্ট সেক্রেটারী পদে ছিলেন। রাজনীতির সঙ্গে সংশ্রব মোটেই ছিল না। কিন্তু নামাজ-রোজা করতেন বলে তাকেঁ চাকরীচ্যুত করা হয়। বয়স পঞ্চাশের মাঝামাঝি, কিন্তু দেখলে মনে হতো আশির মতো। খুব জয়িফ হয়ে পড়েছিলেন। হাত কাঁপতো। খুব অমায়িক লোক। অল্প কথা বলতেন। শুনলাম তিনিও নাকি আমার ফুপাতো ভাই সৈয়দ মঈনুল আহসানের সহপাঠী ছিলেন। লক্ষ্য করতাম যে, তিনি খানা খেতেন দেশী মাটির বাসনে। জিজ্ঞাসা করে জানলাম তিনি মনে করেন এ রকম বাসন ব্যবহার করা সুন্নত। রসূল (সঃ) তো মাটির বাসনেই খেতেন। আমি বললাম, চিনামাটির বাসনও তো মাটির বাসন। সেটা ব্যবহার করা সুন্নতের খেলাফ হবে কেন?  তিনি কথাটি কখনো আগে ভেবে দেখেননি। আমার কথার যৌক্তিকতা স্বীকার করলেন।

মওলানা নুরুজ্জামানকে নিয়ে একদিন এক অস্বস্তিকর সমস্যায় পড়েছিলাম। সেদিন পৃথিবীর নানা দেশের কথা হচ্ছিলো। মওলানা সাহেব 'চাইলের' স্বৈরশাসকের কথা উল্লেখ করলেন। আমি তো প্রথমে বুঝতেই পারলাম না কোন দেশের কথা তিনি বলছেন। পরে টের পেলাম 'চিলি' কে তিনি 'চাইল'- বলছেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক তাতে তাঁর উচ্চারণ সংশোধন করার প্রবৃত্তি আমার হলো না। তিনি ভালো ইংরেজী বলতে পারতেন। একদিন ডক্টর শহীদুল্লাহ সম্পর্কে এক মজার গল্প শুনালেন। ফেকাহ শাস্ত্রের একখানা বিখ্যাত কিতাবের নাম -'বাকায়া'। আলিয়া মাদ্রাসায় এটা পড়ানো হয়। কিন্তু কিতাবখানা এত কঠিন যে সাধারণত ছাত্ররা মূল বাকায়াহটার ধারে কাছে না গিয়ে শারহে বাকায়া বা বাকায়া বোধিনী নামক পুস্তকের উপর নির্ভর করে। একদিন নাকি মাদ্রাসা সিলেবাস সম্পর্কে এক কমিটির আলোচনা প্রসঙ্গে 'বাকায়ার' কথা ওঠে। শহীদুল্লাহ সাহেব কমিটিতে ছিলেন। তিনি বার বার আপত্তি জানিয়ে বলতে থাকেন কিতাবখানার নামতো 'শারহে বাকায়া' নুরুজ্জামান সাহেব বললেন আমি তো শুনে অবাক। বুঝলাম ডক্টর শহীদুল্লাহ কোনো দিন মূল বাকায়ার নামই শোনেননি।

'বিশ সেলের' কাছাকাছি ছিলো জেলের পাগলা গারদ। সেখান থেকে অনবরত চেঁচামেচির আওয়াজ কানে আসতো। এ পাগলাদের মধ্যে এক ব্যক্তি ছিলো যাকে সবাই বুজুর্গ মনে করতো। সে এখনো জেলে আছে কিনা জানি না। শুনেছি ১৬ই ডিসেম্বরের পর যখন জেলের ফটক খুলে দেওয়া হয় এবং সব কয়েদী বেরিয়ে যায় তখনো এ লোকটা তার আস্তানা ত্যাগ করেনি। এ ঘটনার ফলে জেলের পাহারাদারদের চোখে তার মর্যাদা আরো বৃদ্ধি পায়। প্রথম প্রথম পাগলদের চেঁচামেচিতে ঘুমের ব্যাঘাত হতো। তারপর এতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। 'বিশ সেলের' উপর তলায় কয়েকজন কম্যুনিস্ট কয়েদী ছিলো। একজন ছিল রণজিৎ। আরেকজন পাবনার টিপু বিশ্বাস। এদের নামতে দেওয়া হতো না। তবে খাজা খায়েরউদ্দিন নীচে থেকে রণজিতের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন এবং তার চিঠিপত্র বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও মাঝে-মধ্যে করতেন। এ রকম একটা লম্বা চিঠি খাজা সাহেব আমাকে দেখিয়েছিলেন। ইংরেজীতে লেখা তার মধ্যে ছিলো মার্কসিস্ট দর্শনের আলোচনা। কিছুটা পড়ে দেখলাম রণজিৎ নামে এই ভদ্রলোক বিশ্বাস করেন যে মার্কসিস্ট দর্শনে বিশ্ব রহস্যের সমাধান রয়েছে। দুনিয়ায় এমন কোনো কিছু নেই যার ব্যাখ্যা এই দর্শনে নেই। এ লোকটিকে আমি কখনো দেখিনি। কারণ ঘাড়ে পিঠে ব্যাথা থাকার কারণে আমি মুখ উঁচু করে উপর দিকে তাকাতে পারতাম না।

মুজিববাদ

একদিন টিপু বিশ্বাস এক বিস্ফোরণ সৃষ্টি করলেন। জেলের কোনো কর্মচারীর ব্যবহারে রেগে ফেটে পড়ে বিষম জোরে ওদের শাসাতে লাগলেন এই বলে যে এর প্রতিশোধ নিয়ে ছাড়বেন। জেল কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে থাকেন যে তিনি একেবারে অসহায় তবে এটা তাদের চরম ভুল। তার চিৎকারে আমরা হতবাক হয়ে গেলাম। জেল কর্তৃপক্ষ কোন প্রতিক্রিয়া প্রদশর্ন না করে চুপ করে রইলেন। এত তর্জন গর্জন আমি জীবনে কখনো শুনিনি। বলা বোধ হয় প্রয়োজন যে টিপু বিশ্বাস একটি বামপন্থী সন্ত্রাসী দলের নেতৃত্ব করতেন। শেখ মুজিবের সঙ্গে তাঁর বিরোধ ঘটেছিলো কেনো সে রহস্যের সন্ধান আমি কখনো পাইনি। তবে এটা লক্ষ্য করেছি '৭২-৭৩ সালে বহু লোক যারা একাত্তরে শেখ মুজিবকে সমর্থন করেছিল এবং বহু দক্ষিণপন্থী লোকদের হত্যা করে বিজয় উল্লাস করতো তাদের সঙ্গেও আওয়ামী লীগের বিরোধ ঘটতে শুরু করে। আওয়ামী লীগ মনে করতো তাদের কোনো নীতি বা কর্মের বিরুদ্ধে কোন সমালোচনা করা চলবে না। সামান্য সমালোচনা করলেও এরা মনে করতো যে আওয়ামী লীগের কর্তৃত্বে ফাটল ধরবে। শেখ মনি তো প্রথম থেকেই প্রচার করতে শুরু করেছিলো যে মুজিববাদের মত এমন একটা অভিনব রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আদর্শ দুনিয়ায় আর কখনো দেখা যায়নি। এ সমস্ত কথা এ সময়ের বাংলা ও ইংরেজী দৈনিকে প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হতো। শেখ মুজিব যিনি ছিলেন একজন রাজনৈতিক নেতা, তিনি হঠাৎ হয়ে গেলেন কার্ল মার্কসের মত এক তাত্ত্বিক। সবচেয়ে আশ্চর্য লেগেছে যে খন্দকার ইলিয়াসের মত শিক্ষিত ব্যক্তিরাও 'মুজিববাদ' নামক এই অদ্ভুত তত্ত্ব পুরাপুরি হজম করেছিলেন।

১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে আমি, ডক্টর মোহর আলী ও ডক্টর দীন মোহাম্মদ ইউনিভার্সিটি থেকে চিঠি পেলাম যে ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ দালাল হিসেবে আমাদের বরখাস্ত করেছেন। আমার বেলায় এই পদচ্যুতির তারিখ ছিল বোধ হয় ১৩ই জুলাই। তার অর্থ ১৯শে ডিসেম্বর '৭১ থেকে '৭৩ সালের ১৩ই জুলাই পর্যন্ত আইনতঃ ইউনিভার্সিটিতে আমার চাকরী বহাল ছিল। কিন্তু আমার বকেয়া বেতন পরিশোধ করা দূরে থাকুক, আমার প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা দিতেও প্রথমে তারা অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত ডক্টর আবদুল মতিন চৌধুরীর আমলে যখন প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা দেওয়া হয় তখন শুধু আমার নিজের জমা দেওয়া টাকাটাই পেয়েছিলাম। এর সমপরিমাণ টাকা ইউনিভার্সিটির তরফ থেকে ঐ ফান্ডে জমা দেওয়ার কথা। সেটা আমাকে দেওয়া হয়নি। এই প্রসঙ্গে আরো উল্লেখযোগ্য যে সৈয়দ মঞ্জুরুল আহসান সুপ্রীম কোর্টে কেইস করে যখন রায় পান যে দালাল আইনে আমার পদচ্যুতি সম্পূর্ণ অবৈধ তখনো ইউনিভার্সিটি সিন্ডিকেট আনুষ্ঠানিকভাবে সেই পদচ্যুতির আদেশ প্রত্যাহার করেনি এবং আমাকে কোন খেসারত দেওয়া হয়নি। আমি যখন খেসারতের জন্য চিঠি লিখি তারা এক নতুন অজুহাতের আশ্রয় নিলেন, রেজিস্টার আমাকে জানালেন যে ইউনিভার্সিটি বা সরকারের এক নিয়ম আছে যে পদচ্যুত থাকাকালীন অন্য কোথায়ও যদি চাকরী গ্রহণ করেন তবে তিনি নতুন চাকরিতে যে বেতন পাবেন সেটা খেসারত থেকে বাদ দিয়ে শুধু বাকী টাকাটাই তাকে দেওয়া হবে। এই অদ্ভুত নিয়মের যৌক্তিকতা কি তা হৃদয়ঙ্গম করা সহজ নয়। যদি সত্যিই এ রকম নিয়ম থেকে থাকে তবে তার অর্থ এই হবে যে পদচ্যুত ব্যক্তির যদি খেসারত প্রাপ্তির আশা থাকে তবে তাকে চুপ করে কোন কাজকর্ম না করে অনাহারে থাকতে হবে। আর নতুন চাকরীর বেতন যদি পুরানো চাকরীর বেশী হয় তখন আর খেসারত প্রদানের প্রশ্ন উঠবে না। আমার বেলায়ও তাই ঘটেছিলো। এই সমস্ত প্রশ্ন যখন দেখা দেয় তখন আমি মক্কার ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করি। সেখানে ঢাকার চেয়ে বেশী বেতন পেতাম বলে আমাকে আমার প্রাপ্য দেওয়া হলো না।

'৭৩ সালের আরেকঢি ঘটনা হচ্ছে যে আমার বিরুদ্ধেও দালাল আইনে সরকার মামলা রজু করেন। আমাকে এ নিয়ে দু'বার কোর্টে হাজির হতে হয়। বলা বাহুল্য, এ ধরনের অভিজ্ঞতা জীবনে আমারএইপ্রথম। কোনো উকিল পাওয়া গেলো না। শেষ পর্যন্ত আমার ফুপাতো ভাই সৈয়দ মঞ্জুরুল আহসান যিনি নিজে কিছুদিন আগে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, সাহস করে আমার কেইস পরিচালনা বকরতে এগিয়ে আসেন। মঞ্জুর আমাকে বলে দিয়েছিল যে, হাকিম আমার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য কোর্টে অভিযোগগু পাঠ করে শুনাবে এবং জিজ্ঞাসা করবে আমি গিল্টি বা দোষী নই কি না। আমাকে বলা হলো আমি যেনো বলি নট গিল্টি। তাই বললম। তারপর কেইসটি কিছুদিনের জন্য মুলতবি হয়ে যায়। দ্বিতীয় তারিখে আবার আমাকে কোর্টে হাজির হতে হয়। তখনো আইনের খুটিঁনাটি নিয়ে সৈয়দ মঞ্জুরুল আহসানের সঙ্গে হাকিমের আলোচনার পর মামলাটি মুলতবি করা হয়। এটা ১৯৭৩ সালের শেষ দিকের ঘটনা। আর আমাকে কোর্টে যেতে হয়নি। কারণ ঐ সালের ৫ই ডিসেম্বর আমরা সবাই জেল মুক্ত হই।

'৭৩ সালের শেষার্ধে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। উত্তর বঙ্গে দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার লোক মৃত্যূ মুখে পতিত হয়েছিলো সে কথা আগে একবার উল্লেখ করেছি। অন্য দিকে হঠাৎ করে সমাজতন্ত্রের নীতি অনুসরণ করতে যেয়ে সরকার যখন মিল-কারখানা অনভিজ্ঞ এবং দুশ্চরিত্র লোকদের হাতে অর্পণ করেন তখন উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এবং দেশের চতুর্দিকে দেখা দেয় চরম অভাব-অনটন। কিন্তু কাগজ পত্রে এ সম্বন্ধে কোন সমালোচনা হতো না। শুধু সংবাদ পাঠ করে আঁচ করা যেতো দেশে কি হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের নেতৃবর্গের লাইফ স্টাইল


একদিকে দেশের এই দুর্দশা অন্য দিকে শুনতাম আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের বিলাসবহুল জীবনের কথা। এ সময় গাজী গোলাম মোস্তফা নামক এক ব্যক্তিকে বাংলাদেশ রেডক্রসের প্রধান করা হয়। দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের জন্য যে বিপুল পরিমাণ বিদেশী সাহায্য আসা শুরু করে তার বন্টন-বিতরণের ভার ছিল এই গোলাম মোস্তফার উপর। শুনতাম সাহায্যের সিকি পরিমাণ অর্থও লোকের হাতে পৌছাত না। খাদ্য-ঔষধ-কাপড়-চোপর-কম্বল ইত্যাদি যা এসেছিলো তার কিছুটা বিক্রী হতো ব্ল্যাক মার্কেটে, আর কিছু যেত ইন্ডিয়ায়। হেনরি কিসিঞ্জার একবার রিলিফের দ্রব্যাদি দিল্লীর রাস্তায় দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি তখন এ দেশকে বটমলেস ব্রেড বাসকেট বা তলাবিহীন রুটির ঝুড়ি এই আখ্যা দেন। এ দুর্নাম আমাদের এখনও কাটেনি। হিসাব করে দেখা গেছে যে একাত্তরের পর কয়েক বছরে বাংলাদেশ যে বিদেশী সাহায্য পেয়েছিলো তার পরিমাণ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত জার্মানী মার্শাল প্ল্যানের যে সাহায্য পায় তার চেয়েও বেশী। অথচ এর বিনিময়ে দেশ কিছুই পেল না। কারণ বলা নিষ্প্রয়োজন। এই বিপুল অর্থের সিংহভাগ বিদেশী ব্যাংকে জমা হতো আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের নামে, দেশে তখন কে সবচেয়ে ধনী এরকমের একটা প্রতিযোগিতর কথা আমাদের কানে আসতো। অনেকের ধারণা ছিলো রেডক্রসের গাজী গোলাম মোস্তফাই নাকি বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি। আমাদের কানে যে সমস্ত কথা এসেছে আমি সে কথাই বলছি। কারণ এ সব খবরের সত্যতা যাচাই করার সাধ্য আমাদের ছিল না।

আর এক গল্প শুনেছি। সে আরো মজার। আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় এক নেতার বাড়ীতে তখন নাকি খানাপিনা তৈরী হতো তিন রকমের। দেশী, মোগলাই এবং সাহেবী। একদিন শুনেছি ছাত্রলীগের এক সদস্য যার সঙ্গে শেখ মুজিবের ছেলেদের বন্ধুত্ব ছিলো এই নেতার বাড়ীতে বেড়াতে আসে। তাকে দুপুরের খাবার খেয়ে যেতে বলাহয়। সে রাজী হয়। জিজ্ঞাসা করা হয় সে তিন ধরনের খাবারের কোনটা খাবে। সে মোগলাই খাবে বলে জানায়। পেট ভরে পোলাও-কোরমা খাবার পর যখন পেটে একেবারে জায়গা ছিল না তখন তার ধারণা হয় যে বিদায় নেবার আগে দেশী খানার চেহারাটা একবার দেখে নেবে। সেই টেবিলে যেয়ে তার তো চক্ষু স্থির। বড় বড় চিতল এবং রুই মাছের টুকরো দেখে ভরা পেটেও তার জিহ্বায় পানি আসে। কিন্তু তখন ওসব খাবার উপায় ছিলো না। তবুও সে এক টুকরা চিতল খাওয়ার লোভ সামলাতে পারেনি। এই ছাত্রটির মুখে যিনি গল্পটি শুনেছিলেন তিনিই আমাকে এসব কথা জানান।

আরো শুনেছি গাজী গোলাম মোস্তফার একটা কাজ ছিল রিলিফের টাকা দিয়ে আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতাদের দৈনিক বাজার করে দেওয়া। শুনতাম '৭২- '৭৩ সালেও এদের প্রত্যেকের বাড়ীতে কাঁচা বাজারই হতো প্রায় হাজার টাকা। অর্থনীতি ধ্বংস হওয়ার আরেক কারণ মিল-কারখানা রাষ্টায়ত্ত হবার পর কেউ আর কাজ করার প্রয়োজন বোধ করেনি। অনুপস্থিত থেকেও অনেকেই বেতন নিয়েছে। আবার অনেক ভুয়া নাম বেতনের খাতায় বসিয়ে নতুন ম্যানেজাররা তাদের বেতন বাবদ টাকা নিতেন। সারা দেশে এভাবে শুরু হয় লুটপাটের পালা। মুক্তিযোদ্ধারা অবাঙ্গালী এবং পাকিস্তানপন্থী বাঙালীদের বাড়ীঘর সহায় সম্পত্তি দখল করে বসে। '৭৩ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে অবস্থা যখন চরমে পৌছায় তখন বিপুল সংখ্যক লোকজনকে জেলে অটকে রেখে পোষণ করা হয়। সরকারের পক্ষে এটা কঠিন হয়ে পড়ে। এই কয়েদীদের অন্তত দু'বেলা খেতে দিতে হতো। আমি একথা বলছি না যে শুধু এই কারণেই ডিসেম্বরে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এ কারণটি যে সরকারী সিদ্ধান্তের উপর প্রভাব ফেলেছিলো তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

অক্টোবর থেকে সাধারণ ক্ষমার গুজব ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এরকমের কথাবার্তা দু'বছরের মধ্যে অনেকবার শুনে নিরাশ হয়েছি বলে আমার নিজের মনে এ সময় কোনো উত্তেজনার সৃষ্টি হয়নি। তারপর সরকার শেষ পর্যন্ত যখন ঘোষণা করেন যে দালাল আইনে আটক সমস্ত ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তখনো এই আদেশে কতগুলো শর্ত আরোপ করা হয়। প্রথমতঃ খুন জখম এ রকমের কোনো অপরাধে যারা দন্ডিত হয়েছিলো তাদের বেলায় এটা প্রযোজ্য হবে না, এবং সে সম্বন্ধে সরকার নতুন কোন তদন্ত করবে না।

তাছাড়া কোর্টে যাদের মামলা ঝুলছিলো তাদের নির্দেশ দেওয়া হলো যে সরকারের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা দেখিয়ে হাকিমের কাছ থেকে ছাড় নিতে হবে। এতে কারো কারো বেলায় জেল থেকে মুক্ত হতে বেশ কয়েকদিন লেগে যায়। আমাকে মুক্ত করা হয় পাঁচই ডিসেম্বর। সকাল বেলায় আমার ফ্যামিলি আমাকে নিতে এসে শুনলো যে, কোর্টের হুকুম ছাড়া আমাকে ছাড়া হবে না। তখন সৈয়দ মঞ্জুরুল আহসান সেদিনই কোর্টে গিয়ে তদবির করে এক হুকুম লিখিয়ে নিতে সমর্থ হয়। আমি সেদিন বিকাল বেলা সন্ধ্যার একটু আগে বাসায় ফিরে আসি। পেছনে রেখে এলাম অনেক অপমান, অবমাননা এবং দুর্ব্যবহারের স্মৃতি। আমি আগেই বলেছি প্রথম দিকে জেলের ওয়ার্ডাররা আমাদের মানুষই জ্ঞান করতো না। সে আচরণে সামান্য একটু পরিবর্তন এলেও জেলের নিয়ম অনুসারে এমন কতগুলো কাজ করা হতো যাতে ভুলবার উপায় ছিলো না আমরা কতটা অসহায়। সপ্তাহে একদিন জেলের আইজি সেল পরিদর্শন করতে আসতেন। তখন আমাদের আবার তালা দিয়ে সেলে বন্ধ করে রাখা হতো চিড়িয়াখানার জানোয়ারের মতো। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে আওয়ামী লীগের কয়েকজন মন্ত্রী এ রকম পরিদর্শনে একবার আসেন। এর মধ্যে ছিলেন তাজউদ্দিন এবং ডক্টর কামাল হোসেন। তাদের সঙ্গে যারা ছিলেন তাদের ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না কিন্তু ডক্টর কামাল হোসেন ইউনিভার্সিটিতে যখন শিক্ষকতা করেন তখন থেকে তাঁকে চিনি, উনি আমার দিকে তাকালেনই না। মুখে ছিলো চরম ঘৃণার ভাব, তাজউদ্দিন জিজ্ঞাসা করলেন আপনি কেমন আছেন? মনে হলো এটাও একটা বিদ্রুপ, আরো অপমানিত বোধ করলাম এ জন্য যে পরিদর্শনে কেউ এলে সেলের ভিতরেও আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে বলা হতো। বসবার উপায় ছিলো না।

সাপ্তাহিক পরিদর্শন ছাড়া জেলের জমাদার রোজই একবার করে সমস্ত সেল ঘুরে দেখতো। ওয়ার্ডারদের একটু উপরেই তার স্থান। সামান্য একটু লেখাপড়া হয়তো জানতো। কিন্তু ব্যবহারে মনে হতো সে যেনো একজন বড় কর্তা ব্যক্তি। জেলে যে একেবারে ভালো ব্যবহার পাইনি, তা নয়। একজন ডিআইজি ছিলেন। তিনি যথা সম্ভব ভদ্র ব্যবহার করতেন। আমাদের আটক করে রাখা হয়েছে এজন্য উনি যেন কুন্ঠা বোধ করতেন। একবার এক ছোকড়া ওয়ার্ডার কিভাবে এক কয়েদীকে খতম করেছিলে। সে কাহিনী শোনায়। সে কয়েক বছর আগের কথা। কয়েদিদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেওয়ায় তাদের উপর ফাঁকা গুলী করার হুকুম হয়। লোকটি আমাকে বললো যে ভুলে তার গুলী একটা লোকের পায়ে লেগে যায়। সে ভাবে লোকটি যদি জেল কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করে সে বেকায়দায় পড়বে। আহত কয়েদী যাতে আর কথা বলবার সুযোগ না পায় সেজন্য লোকটি আরেকবার গুলী করে তাকে মেরে ফেলে। বলা বাহুল্য, ঐ ঘটনার পরিসমাপ্তি ওখানেই ঘটে।

আরো শুনেছি যে, কয়েদীদের জন্য দৈনিক যে বাজার করা হয় তার ভাগ আইজি থেকে শুরু করে সব অফিসারদের বাড়ীতে পৌঁছে দিতে হয়। ছিটেফোঁটা যা থাকে তাই কয়েদীদের ভাগ্যে জুটে। আরেকটা ব্যাপার উল্লেখ করা দরকার। কয়েদীরা দই শ্রেণীতে বিভক্ত। প্রথম হচ্ছে বিচারাধীন কয়েদী, দ্বিতীয়তঃ সাজাপ্রাপ্ত কয়েদী। এই দুই শ্রেণীতেই আবার আরেকটা শ্রেণী বিভাগ আছে। বৃটিশ আমল থেকেই রাজনৈতিক বন্দীরা কতগুলো সুবিধা ভোগ করতো যা ছিলো অন্যদের জন্য নিষিদ্ধ। পাকিস্তান আমলে ইউনিভার্সিটি শিক্ষক যাঁরা দু'একবার ভাষা আন্দোলনের কারণে জেল খেটেছেন তাদের মুখেও শুনেছি যে খাওয়া-দাওয়া ব্যাপারে তাদের কোন অভিযোগ ছিল না। বরঞ্চ যে পরিমাণ দুধ-মাখন-রুটি মাছ-গোশত এদের জন্য বরাদ্দ ছিল তা অনেকে খেয়ে কুলাতে পারতো না। এঁরা টুথ ব্রাশ-টুথপেস্ট, খবরের কাগজ এ সবই পেতেন। কিন্তু আমরা যারা একাত্তর সালের পর রাজনৈতিক কারণে বন্দী হয়ে জেলে এসেছিলাম আমাদের এসব সুবিধা কোনোটিই দেওয়া হয়নি। অনেকে এ নিয়ে অভিযোগ করেছেন। তাজউদ্দিন যখন পরিদর্শনে আসেন তখন নাকি খান আবদুস সবুর খান তাকে বলেছিলেন, "আমরা তোমাদের সঙ্গে কি ব্যবহার করেছি, এটা কি তার যথাযোগ্য প্রতিদান?"

জেলের কর্মচারীদের অভিযোগ অনেক ছিল। '৭৩ সালে দু'একজন বাদে প্রায় সবাই যখন মুজিববিরোধী হয়ে উঠে তখন এরা সবুর খান, ফজলুল কাদের চৌধুরি, খাজা খয়ের উদ্দিন- এদের বলতো স্যার আপনারা যখন সরকার গঠন করবেন, আমাদের দিকে একটু নজর রাখবেন। তার মানে এরা ধরেই নিয়েছিল যে আওয়ামী লীগ সরকার টিকছে না। আশ্চর্যের কথা জেল খাটা লোক আগেও পুনরায় রাজনৈতিক ক্ষমতায় যেতে পেরেছেন কিন্তু জেল থেকে বেরিয়ে জেলের আভ্যন্তরীণ অবস্থা উন্নয়নের কথা একবারও তাদের মনে হতো না। আমি আগেই বলেছি যে জেলের যে পরিবেশ তাতে ভালো লোকও এখানে অসৎ হয়ে উঠতে বাধ্য হয়। সাজা প্রাপ্ত চোর-ডাকাত বেরিয়ে আবার চুরি ডাকাতিই করতে যায়। বরঞ্চ আরো একটু পাকা হয়ে। সাধারণ কয়েদীরা সামান্য একটু নিয়ম ভঙ্গ করলে ওয়ার্ডারদের হাতে বেদম মার খায়। আমাদের ফালতুদের মুখে প্রতি সপ্তাহেই এ সমস্ত কাহিনী শুনেছি। বিহারী হলে তো কথাই ছিলো না। তাদের সামান্য পদস্ফলন হলেও নির্যাতনের সীমা থাকতো না। জেলের পরিমন্ডলে প্রত্যেকটি ওয়ার্ডারই স্যাডিস্ট হয়ে উঠে। নির্জীব লোকজনকে মেরে এরা এক রকমের পাশবিক আনন্দ উপভোগ করে।

আরেকটি ব্যাপার খুব খারাপ লেগেছে। দু' সপ্তাহ পর পরিবারের লোকজন যখন দেখা করতে আসতো, না ছিল কোনো প্রাইভেসি, না ছিলো ভালো বসবার ব্যবস্থা। এক কামরায়ই দু' তিন পরিবারের লোকজন জমায়েত হয়ে বিভিন্ন কোণায় আশ্রয় নিতো। তখন প্রাইভেসির কথা ভাবাই যেত না। ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই আমাদের সেলে যাওয়ার তাগিদ পেতাম। প্রথম প্রথম রান্না করা খাবার আনা নিষেধ ছিলো। শুধু কলা বা ঐ জাতীয় ফল সেলে আনা যেত। পরে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। বিশেষ, করে ঈদ এবং অন্যান্য পর্বের সময়। জেল থেকে যখন বেরিয়ে আসি তখন নিজের মনেই সন্দেহ হয়েছে যে আমি আবার স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারবো কিনা। শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছিলাম, অর্থনৈতিকভাবে হয়ে পড়েছিলাম বিপর্যস্ত। ভবিষ্যতে যে কয়দিন আয়ু থাকবে সে সময়টা কি করে চলবে এই দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে বাসায় ফেরত এলাম। তবে দু'বছর পর মুক্ত হতে পেরেছি এই অনুভূতি সেই মুহুর্তে আমার সমস্ত দুশ্চিন্তাকে ছাপিয়ে উঠেছিলো।

বাসায় এসে অনেক কথা শুনলাম যা আগে আমাকে বলা হয়নি বা যা আগে জানবার উপায়ও ছিল না। তখন মনে হয়েছিল যে ঢাকা সেন্ট্রাল জেল খেকে মুক্ত হয়ে এসেছি বটে কিন্তু আমি যেন এক বৃহত্তর কারাগারে প্রবেশ করেছি। প্রথমতঃ আমরা যারা পাকিস্তানের আদর্শে বিশ্বাস করতাম তাদের কোন বাক স্বাধীনতা ছিলো না। আকার ইংগিতেও পাকিস্তানের কথা বলা ছিলো চরম দন্ডনীয় অপরাধ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে দন্ড হতো মৃত্যূদন্ড। সরকার পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার না করলেও তথাকথিত মুক্তিবাহিনীর লোকজন এসে এ রকম হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে অসংখ্য। তাদের বিরুদ্ধে নালিশ বা মামলা রজু করার কথাই উঠতো না। তারাই ছিলো দেশের হর্তাকর্তা বিধাতা। প্রায় রোজই খবরের কাগজে দেখতাম এ ধরনের সংবাদ। ইংরেজীতে 'উইচ হান্ট' বলে একটা কথা আছে। মধ্যযুগে যখন ইউরোপীয় সমাজে এই বিশ্বাস প্রচলিত ছিলো যে ডাইনী বুড়িরা গোপনে শয়তানের উপাসনা করে এবং মানুষের ক্ষতি করার অপরিমিত ক্ষমতা তাদের আছে। তখন সমাজে কোন দুর্ঘটনা ঘটলেই ডাইনী খুঁজে বের করার চেষ্টা শুরু হতো। জুবজুবে কোনো বুড়িকে নিরালা কোনো জায়গায় দেখা মাত্র সন্দেহ করা হতো যে তারা অপকর্মে লিপ্ত। সঙ্গে সঙ্গে তাদের ধরে এনে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার রেওয়াজ ছিল। শাসক শ্রেণীর কোন ব্যক্তি অসুস্থ হলেও সন্দেহ করা হতো যে এটা ডাইনীদের শয়তানির ফল। ইংল্যান্ডের প্রথম এলিজাবেথ একবার যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন অনেক বুড়ি প্রাণ হারিয়েছে। তাছাড়া এর পেছনে খৃষ্টান যাজকদেরও সমর্থন ছিল। তাঁরা মনে করতেন যে তথাকথিত ডাইনীদের নির্মূল করে দিতে পারলে খৃষ্টান ধর্মের উন্নতির পথে একটা বড় অন্তরায় অপসারিত হবে। মোদ্দা কথা হচ্ছে উইচহান্টের ফলে সাধারণ লোকের জীবনও বিপন্ন হয়ে পড়েছিলো। পাদ্রীরা অনবরত খোঁজ করে বেড়াতেন কারো ধর্ম বিশ্বাসে কোথাও ফাটল দেখা দিয়েছে কিনা।

(বইটির pdf version download করুন এখানে)



 

Add comment


Security code
Refresh